রোজা : তাকওয়ার প্রশিক্ষণ

মাওলানা ওহিদুদ্দিন খান:

রমজানের রোজার নির্দেশ দিতে গিয়ে পবিত্র কুরআনের সুরা বাকারায় বলা হয়েছে— এই রোজা তোমাদের উপর এই জন্য ফরজ করা হয়েছে যেন তোমাদের ভেতর তাকওয়া সৃষ্টি হয়। (‘লাআল্লাকুম তাত্তাকুন,’ সুরা বাকারাহ, আয়াত ১৮২)।

তাকওয়ার অর্থ বেঁচে থাকা বা পরহেজ করা। ধরা যাক, একটি কাঁটাযুক্ত পথ। আর আপনি ঐ পথ দিয়ে নিজেকে অক্ষত রেখে অতিক্রম করতে পারলেন— তো তা হলো তাকওয়া। এভাবেই মন্দ কাজ থেকে বেঁচে জীবনের সফর চালিয়ে নেওয়া ঈমানদার ব্যক্তির কাজ। এই বেঁচে থাকার পন্থা বেছে নেওয়ার নামই তাকওয়া। রমজান মাস এই তাকওয়ার অনুশীলনের মাস।

রোজার মাসে খাদ্য ও পানীয় পরিত্যাগ করা একটি প্রতীকি আমল। প্রকৃতপক্ষে যা পরিত্যাজ্য সেগুলো হলো আল্লাহ তা’য়ালার হারাম করা সমস্ত বস্তু। হালাল বস্তুর সাময়িক হারাম ঘোষণা সবধরনের হারাম বস্তু স্থায়ীভাবে পরিত্যাগ করার অনুশীলনমাত্র। যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বৈধ বস্তুকে ছাড়তে রাজি হবে সে ব্যক্তি অবৈধ বস্তুকে পরিত্যাগ করতে আরো সহজে রাজি হবে।

এই দুনিয়ায় মানুষের জন্য যে পরীক্ষা রয়েছে তা হলো হালাল ও হারামের মধ্যে পার্থক্য করা। ব্যক্তি যেন হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী হয়ে ওঠে। স্বাধীন বা স্বেচ্ছাচারী জীবনের বদলে বিধিবদ্ধ জীবনযাপন করে। এই দায়িত্বশীল জীবনের প্রশিক্ষণের জন্যই রোজার পথ এখতিয়ার করা ঈমানদারগণের ওপর ফরজ করা হয়েছে।

রোজার শুধু বাহ্যিক দিকটি ইসলাম প্রত্যাশা করে না। প্রকৃত আবেদনসহ রোজা প্রত্যাশিত। এ জন্য হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও মিথ্যার ওপর আমল করা ছাড়েনি, তার পানাহার ছেড়ে উপবাস করার প্রয়োজন আল্লাহর নেই। (সহি বুখারি, হাদিস নম্বর : ১৯০৩)।

রসুল (স)-এর সময়ে কিছু মানুষ পানাহার ছেড়ে রোজা রেখে ইসলামে নিষিদ্ধ পরনিন্দা বা গিবত অব্যাহত রাখে। খবর পেয়ে রসুল (স) বললেন, ‘ওরা আল্লাহর হালালকৃত বস্তু দিয়ে রোজা রেখেছে; কিন্তু আল্লাহর হারাম করা বস্তু দিয়ে ইফতার করে নিয়েছে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নম্বর: ২৩৬৫৩)।

পরহেজগারি জীবনকে অন্যভাবে বলা যায়— সতর্ক জীবনযাপন। মানুষ দুই রকমের : কেউ সতর্কতা অবলম্বন থেকে উদাসীন। এরা যা ইচ্ছে হয় বলে, যা ইচ্ছে হয় করে। আরেক ধরনের মানুষ রয়েছে যারা সব সময় সতর্কতার পথ বেছে নেয়। তারা সুনির্দিষ্ট নীতি মেনে একটি পথ বেছে নিয়ে অন্য পথকে পরিত্যাগ করে, পরহেজগার মানুষও এমন। একজন পরহেজগার ব্যক্তি পুরোপুরি সতর্ক একজন মানুষ। তার কথা ও কাজ হয় খোদার নির্দেশমাফিক।

রোজার দিনে ব্যক্তির খাদ্য ও পানীয়ই যে শুধু ছাড়তে হয় তা নয়; একজন রোজাদারকে অনেক অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হয়। রোজাদার ব্যক্তি তার ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার উপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। এতে ব্যক্তি কিছু জিনিস থেকে নিজেকে দূরে রাখার শিক্ষা পায়। সারা জীবন কিছু জিনিস থেকে মুক্ত থাকার এই শিক্ষাই হলো পরহেজগারীর চূড়ান্ত অনুশীলন। রোজা রেখে ব্যক্তি শপথ গ্রহণ করে, হারাম জিনিস তো বটেই, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তিনি হালাল জিনিসও ছাড়তে রাজি আছেন।

ইমাম বুখারি (হাদিস নম্বর : ৭৪৯২) এবং ইমাম মুসলিম (হাদিস নম্বর: ১১৫১) বর্ণনা করেন যে, রসুল (স) বলেছেন, ‘মানুষের প্রতিটি সৎকাজের প্রতিদান দশগুণ থেকে সাতশগুণ পর্যন্ত দেওয়া হয়। কিন্তু রোজার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রোজা বিশেষভাবে আমার জন্য এবং আমিই এর প্রতিদান দেবো।’ বান্দা আমার জন্য আপন ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা ও আহার ত্যাগ করে। রোজাদারদের জন্য রয়েছে দুটি আনন্দ : এক আনন্দ ইফতারের সময়, আরেক আনন্দ যখন রোজাদার তার প্রতিপালকের সঙ্গে মিলিত হবে। রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের সুগন্ধির চেয়েও উত্তম। রোজা ঢাল স্বরূপ। তোমাদের মধ্যে কেউ রোজাদার হলে সে যেন গালি না দেয় এবং হৈচৈ না করে। কেউ তাকে গালি দিলে বা ঝগড়া বাঁধালে তার উচিত বলে দেওয়া ‘আমি রোজাদার।’

রোজা ব্যক্তির ভেতর তাকওয়া ও সতর্কতার এই মেজাজ তৈরি করে। রমজানের এক মাসের এই চর্চা একজন মানুষকে এমন যোগ্য করে গড়ে তুলে যে, সারা বছর সে এমনভাবে জীবনযাপন করে যেন হালাল বস্তুর জন্য তিনি ইফতারকারী এবং হারাম বস্তুর জন্য তিনি রোজাদার হয়ে উঠেন।

অনুবাদ : মহিউদ্দিন মণ্ডল

আগের সংবাদরোহিঙ্গা ক্যাম্পে জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেবে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
পরবর্তি সংবাদসংকট মোকাবিলায় তরুণদের আহ্বান জানালেন শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী