লালখান বাজারের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন : সংস্কার নাকি ভাঙন?

মুসান্না মেহবুব

দেশের প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী ইসলামি রাজনৈতিক দল নেজামে ইসলাম পার্টির একাংশের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে ছিলেন চট্টগ্রামের বর্ষীয়ান আলেম ও লালখান বাজার মাদরাসার মুহতামিম মুফতি ইজহারুল ইসলাম। নেজামে ইসলাম পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা ছিল তাঁর। কিন্তু সম্প্রতি দলটির কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের পর দেখা যাচ্ছে, দলের কোনো দায়িত্বেই তাঁর নাম আর নেই। দীর্ঘদিনের সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। তাঁর জায়গায় এসেছেন সাবেক সহসভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা সারওয়ার কামাল আজিজী। পরিবর্তন এসেছে মহাসচিব পদেও। মাওলানা আবদুল মাজিদ আতহারীর বদলে মহাসচিব হয়েছেন মাওলানা মুসা বিন ইজহার।

কয়েক মাস আগে তাবলিগ ইস্যুতে মুফতি ইজহারুল ইসলাম বাংলাদেশের ‘জমহুর ওলামায়ে কেরামে’র বিপক্ষে গিয়ে তাবলিগের বিতর্কিত আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভির সাফাই গেয়ে সমালোচিত হয়েছিলেন। সাদ কান্ধলভির পক্ষাবলম্বন করে কয়েকটি মজলিসে বয়ানও করেছিলেন তিনি। এর জেরে তাঁর পরিচালিত চট্টগ্রামের লালখান বাজার মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছিল হাইআতুল উলয়া থেকে। কিন্তু তাঁর দুই ছেলে মাদরাসার নির্বাহী পরিচালক মুফতি হারুন ইজহার এবং মাওলানা মুসা বিন ইজহার বাবার এ অবস্থানের বিরোধিতা করে তাবলিগ ইস্যুতে জমহুর ওলামায়ে কেরামের ওপর আস্থাবান আছেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই থেকে পিতার সঙ্গে তাঁদের মতপার্থক্য জনিত একটা দূরত্বও সৃষ্টি হয়েছিল।

এই দূরত্বের কারণেই কি বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এ আলেমকে নেজামে ইসলাম পার্টি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে নেজামে ইসলাম পার্টির লালখান বাজার মাদরাসা-কেন্দ্রিক যে একটা বলয় ছিল, সেটার ভাঙন নিয়েও একটা প্রশ্নবোধক তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে কথা হয়েছিল লালখান বাজার মাদরাসার নির্বাহী পরিচালক মুফতি হারুন ইজহারের সঙ্গে। তিনি জানান, নেজামে ইসলাম পার্টির সঙ্গে, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারার কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাস করেন না, এ ধরনের কোনো দলের কার্যক্রম সম্পর্কেও তাঁর খুব কোনো জ্ঞাতি নেই। তাই নেজামে ইসলামের নেতৃত্বে কেন পরিবর্তন ঘটল, তিনি বলতে পারবেন না।

পিতার সঙ্গে তাবলিগ ইস্যু বা অন্য কোনো মতপার্থক্য তাঁরা দুই ভাইয়ের আছে কি-না জানতে চাইলে, এ বিষয়েও আলাপে রাজি হননি হারুন ইজহার। তবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন দলের বাইরে সব ধরনের রাজনীতির চর্চা কার্যত বন্ধ করে রাখা হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে কোন দলের নেতৃত্বে কে এলো, কে গেলো, তা খুব কোনো গুরুত্ব বহন করে না। মুসলমানদের সর্বাঙ্গীন যে অধঃপতন ঘটছে, সে ব্যাপারে বরং আমাদের প্রত্যেককে এখন ঐক্যবদ্ধভাবে ভাবা উচিত।

তবে নেজামে ইসলাম পার্টির নেতৃত্ব থেকে মুফতি ইজহারের সরে দাঁড়ানোর কারণ সরলভাবেই জানিয়েছেন তাঁর অপর ছেলে ও দলের নতুন মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইজহার। তিনি জানান, তাবলিগ ইস্যুতে জমহুর ওলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণে দলের নেতাকর্মীদের একটা সংকোচ তৈরি হয়েছিল তাঁকে ঘিরে। তিনিও দলের নেতৃত্বে থাকতে আর আগ্রহবোধ করছিলেন না। সবকিছু মিলিয়েই নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে দলের মধ্যে। যার কারণে নতুন সেশনে তাঁর আর সম্পৃক্তি থাকেনি।

তাবলিগ ইস্যুতে পিতার সঙ্গে এখনও মতপার্থক্য আছে কি না, থাকলে এর জেরে তাঁর সঙ্গে কোনো মনোমালিন্য চলছে কিনা জানতে চাইলে মাওলানা মুসা বিন ইজহার বলেন, মতপার্থক্য অবশ্যই আছে। আমরা বারবার বলে এসেছি, বাবার এই অবস্থানের পক্ষে আমরা নই। আমরা জমহুর ওলামায়ে কেরামের সঙ্গে আছি।

তবে এ নিয়ে পিতা-পুত্রের সম্পর্কের কোনো টানাপোড়েন নেই বলে জানান মুসা বিন ইজহার। বলেন, যেকোনো বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে, তাই বলে পিতৃসুলভ সম্পর্কে চিড় ধরানো তো উচিত না। তিনি আমাদের মুরব্বি হিসেবে আছেন, পিতা এবং মুরব্বি হিসেবে আমরা তাঁকে যথাযথ শ্রদ্ধা ও সম্মান করি। লালখান বাজার মাদরাসার মুহতামিমের পদেও তিনি আছেন, থাকবেন। তবে মাদরাসার পরিচালনা ও নীতিগত সকল কার্যক্রম আমার ভাইয়ের (হারুন ইজহার) দায়িত্বেই আঞ্জাম দেওয়া হয়।

নেজামে ইসলামের কার্যক্রম থেকে সরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক জীবন থেকে কি তিনি অবসর নিয়েছেন, নাকি নতুন কোনো দল দাঁড় করাবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে মুসা বিন ইজহার জানান, আপাতত অবসরই বলা চলে। নতুন কোনো দল গঠনে তিনি যাবেন না, সে আগ্রহ বা ইচ্ছা তাঁর নেই। নিজের ব্যক্তিগত অন্যান্য ব্যস্ততা নিয়েই এখন সময় পার করছেন।

নতুন দায়িত্বগ্রহণের পর কীভাবে কাজ করবেন, ইসলামি রাজনীতিতে কতটা ভূমিকা রাখবেন, জানতে চাইলে মাওলানা মুসা বলেন, আমাদের সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ীই আমরা সামনে এগোবো। দলকে চাঙ্গা করতে যা যা করা লাগে সব পদক্ষেপই গ্রহণের চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি রাজনীতিতে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে, এ থেকে কীভাবে উঠে আসা যায়, সে ব্যাপারে সবার মধ্যে একটা সমন্বয় তৈরির ব্যাপারেও আমরা কাজ করে যাব।

পর্যবেক্ষকদের মতে, লালখান বাজার-কেন্দ্রিক নেজামে ইসলাম পার্টি রাজনৈতিকভাবে কখনোই খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেনি, তবে মুফতি ইজহার সাহেবের কারণে দলটি আলাদা একটা গুরুত্ব বহন করত, কিন্তু তাবলিগ ইস্যুতে মুফতি ইজহারের বিতর্কিত অবস্থানের কারণে সেই গুরুত্বও এখন অনেকটা ম্লান হয়ে গেছে। পাশাপাশি  খোদ রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে তাঁর দুই ছেলের মতপার্থক্য বাংলাদেশের ধর্মীয় সমাজে গভীর একটা বিভক্তির নির্দেশ করে।

মাওলানা মুসা বিন ইজহার মুফতি ইজহারের সন্তান হবার পাশাপাশি খেলাফত আন্দোলনের বর্তমান আমির মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জীর জামাতাও। কর্মজীবনে ঢাকাকেন্দ্রিক তাঁর সমস্ত ব্যস্ততা। নেজামে ইসলামের একাংশের মহাসচিব হবার মধ্য দিয়ে তরুণ রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি ইসলামি ঘরানার রাজনীতির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে বলতে গেলে নতুন। বিশ্লেষকরা বলছেন, তাঁর এই নেতৃত্ব গ্রহণ তার সামনে নতুন একটা সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। তবে ভবিষ্যতে ইসলামি রাজনীতিতে তিনি কতটা সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন, তা সময়ই বলে দেবে।