লিবিয়ায় মিশরের সেনা মোতায়েন: বাড়ছে আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধের ঝুঁকি

মুনশী নাঈম :

দেশের বাইরে সেনা মোতায়েনের অনুমতি দিয়েছে মিশরের সংসদ। দেশটির প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাহ সিসি এর আগে লিবিয়ায় থাকা তুরস্কের সেনাদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তারপরই সোমবার একটি ক্লোজ ডোর অধিবেশনের মধ্য দিয়ে মিশরের বাইরে এই সেনা মোতায়েন পার্লামেন্টে অনুমোদিত হল। খবর আল-জাজিরা।

খবরে বলা হয়, মিশরের জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিতে নিজ সীমানার বাইরেও দেশটি সেনা মোতায়েন করতে পারবে বলে সম্মত হয় পার্লামেন্ট। এটি পশ্চিম ফ্রন্টের জন্য তৈরি হচ্ছে বলেও জানানো হয় সেখানে। অর্থাৎ, মিশরের পশ্চিমে থাকা প্রতিবেশি লিবিয়ার কথাই এখানে বোঝানো হয়েছে। সেখানে চলমান গৃহযুদ্ধে বিপরীত দুই পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে তুরস্ক ও মিশর। মিশরের সেনারা লিবিয়ায় প্রবেশ করলে এতদিন ধরে চলা প্রক্সিযুদ্ধ সম্মুখ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকে লিবিয়ায় সশস্ত্র দলগুলোর ওপর বিমান হামলা চালিয়ে আসছে কায়রো। এরপর ২০১৪ সাল থেকে দেশটি পূর্ব লিবিয়ায় গাদ্দাফির প্রাক্তন জেনারেল হাফতারকেও সমর্থন করছে। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী, কায়রো এখন গ্রাউন্ড-যুদ্ধে সেনা পাঠালে যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি পাবে।

লিবিয়ায় নিযুক্ত জাতিসংঘ মিশনের প্রধান স্টিফেন উইলিয়ামস দেশের বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করতে এবং জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার নির্মম লঙ্ঘনের অবসান ঘটাতে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের আহ্বান জানিয়েছেন। রবিবার প্রতিবেশী আলজেরিয়ার রাষ্ট্রপতি আবদেলমাদজিদ তেবউনের সাথে বৈঠকের পর তিনি এই মন্তব্য করেন।

‘বিদ্রোহী হাফতার’

গত সোমবার লিবিয়া, তুর্কি এবং মাল্টার কর্মকর্তাদের মধ্যে আঙ্কারায় ত্রিপক্ষীয় আলোচনা শেষে হাফতারকে অবিলম্বে সমর্থন বন্ধের দাবি জানিয়েছে তুরস্ক। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুলুসি আকার বলেছেন, লিবিয়ার শান্তি, সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা বিনষ্টকারী বিদ্রোহী হাফতারকে দেওয়া সমস্ত ধরণের সহায়তা এবং সমর্থন অবিলম্বে বাদ দিতে হবে।

ইউএন-স্বীকৃত সরকারের (জিএনএ) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফাতি বাশাগা বলেছেন, হাফতার সমর্থকদের ‘অবাস্তব ও ভুল প্রকল্প’কে সমর্থন করা বন্ধ করা উচিত। মিশরের হস্তক্ষেপ তেল সমৃদ্ধ লিবিয়াকে আরও অস্থিতিশীল করবে।

মিশরের প্রেসিডেন্ট গত জুনে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, সিরত বা অভ্যন্তরীণ আল-জুফরা বিমানবন্দরের উপর যে কোনও হামলা কায়রোকে লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্ত রক্ষার লক্ষ্যে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে প্ররোচিত করবে। জিএনএ উত্তর আফ্রিকার দেশটিতে মিসরের সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকির নিন্দা জানিয়ে এটিকে একটি ‘যুদ্ধের ঘোষণা’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে।

কাতারের প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সোমবার তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এবং লিবিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে লিবিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানিয়েছে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

মিশরের সীমানা থেকে সিরত ৮০০ কিলোমিটার (৫০০ মাইল) দূরে অবস্থিত। কায়রো শহরটিকে একটি ‘রেড লাইন’ হিসাবে দেখছে এবং লিবিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলির মধ্যে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। আঙ্কারা ও জিএনএ হাফতারকে শহর থেকে সরে এসে যুদ্ধবিরতি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে।

আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধ

২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকে সহিংসতা আর বিভক্তিতে জর্জরিত হয়ে আছে উত্তর আফ্রিকার তেল সমৃদ্ধ দেশ লিবিয়া। গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে দেশটিতে সক্রিয় রয়েছে দু’টি সরকার। এর মধ্যে রাজধানী ত্রিপোলি থেকে পরিচালিত সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে জাতিসংঘ ও তুরস্কসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশ। আর দেশটির পূর্বাঞ্চল থেকে পরিচালিত জেনারেল খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন অপর সরকারটিকে সমর্থন দিচ্ছে মিশর,সংযুক্ত আরব আমিরাত,জর্ডান,সৌদি আরব, ফ্রান্স ও রাশিয়া।

ত্রিপোলি দখলে হাফতার বাহিনীর একটি ব্যর্থ প্রয়াসকে সমর্থন করেছিল রাশিয়া। ফলে লিবিয়ায় মস্কোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে ক্রমশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে এক ফোনালাপে মিসরের প্রেসিডেন্ট সিসি লিবিয়ায় নিরাপত্তা অবনতি রোধ করতে মিশরের দৃঢ় সংকল্পের কথা জানায়। মিশরের প্রেসিডেন্টের মুখপাত্রের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দুই নেতা যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে এবং লিবিয়ায় সামরিক বৃদ্ধি এড়াতে একমত হয়েছেন।

ত্রিপোলি ভিত্তিক সাদেক ইনস্টিটিউটের পরিচালক আনাস এল-গোমতী বলেছেন, ‘মিশর লিবিয়ায় নিজের প্রভাব হারানোর বিষয়ে উদ্বিগ্ন। যদি জিএনএ এবং তুরস্ক এগিয়ে যেতে চায় তবে মিশর তার সমস্ত প্রভাব হারানো এবং হাফতার অত্যাবশ্যকীয় তেল সংস্থাগুলির নিয়ন্ত্রণ হারানো নিয়ে সত্যিই চিন্তিত। সুতরাং এমন একটি আবহাওয়া তৈরি করার চেষ্টা চলছে, যাতে ট্রাম্প এরদোগানের কাছে ফোন করেন। এই ফোন-কূটনীতি খারাপ, তেমন সুবিধার নয়।’

এদিকে গত সপ্তাহে সিসি কায়রোতে হাফতারের অনুগত কয়েক ডজন উপজাতি নেতার সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। সেখানে তিনি পুনরাবৃত্তি করেছিলেন, ‘জাতীয় সুরক্ষার প্রত্যক্ষ হুমকির মতো বিষয়ে মিশর অলসভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে না।’ লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় সংসদ যা হাফতারকে সমর্থন করে, তারাও সিসিকে সেনা পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছিল।

সূত্র: আল জাজিরা