শুভ পরিণয়

রাকিবুল হাসান:

মেনিখালী নদীর তীরে মাঝেমধ্যেই বিকাল যাপন করতে আসেন শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরী। বিকেলের মৃদুমন্দ বাতাস তার প্রিয়। বিকেলে এই নদীটাকে অদ্ভুত রহস্যময় লাগে। অচেনা সওদাগরের বজরা খটখট শব্দ তুলে চলে যায়। রাতযাপনের জন্য কোনো বজরা ঘাটে এসে ভীড়ে। বজরাতেই রাতের খাবার রান্না করতে বসে ব্যবসায়ীরা। জানালা দিয়ে মাটির চুলা থেকে বেরিয়ে আসে ধোঁয়া। তবে মানেরীর সেদিকে খেয়াল থাকে না। তিনি নদীর তীরে এসেও কিতাব পড়েন। শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা দরসে যে কথাগুলো বলেন, তা অনুলিখন করেন। দেখার মধ্যে মনোযোগ দিয়ে দেখেন সূর্যাস্তের দৃশ্য। তিনি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন ডুবে যাওয়া সূর্যের হলুদ আভা ডানায় মেখে উড়ে যাওয়া পাখির দিকে।

সেই এক যুগেরও অধিক আগে তিনি বিহার থেকে শায়খের সঙ্গে এই সোনারগাঁয় চলে এসেছিলেন। তিনি এসেছিলেন কেবল শায়খের ইলম ও আমলের গুণে মুগ্ধ হয়ে। শায়খ শুধু হাদিস ও ফিকহে প্রাজ্ঞ নন, তিনি পাশাপাশি ভেষজশাস্ত্র, গণিত, ভূগোল শাস্ত্র এবং রসায়ন শাস্ত্রেও একজন পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি তার জন্য উপুর করে দিয়েছেন তার ইলমের খাজানা। কোনো কার্পণ্য করেননি।
কদিন আগেও শায়খ বলছিলেন, ‘হাদীস-ফিকহ তুমি পড়েছ। আমি চাই—তুমি রসায়নশাস্ত্রটাও রপ্ত করে ফেলো।’
তিনি বিনীত হয়ে বলেছিলেন, ‘সুদূর বিহার থেকে আমি আপনার নিকট হাদীস পড়তে এসেছি। রসায়ন পড়তে আসিনি। এসব আমার দরকারও নেই।’
শায়খ মানেরীর কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘তুমি না চাইলে জোর করব না।’
তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘শুকরিয়া।’

তবে এবার শায়খ যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা পত্রপাঠ তিনি না করে দিতে পারেননি। প্রস্তাব শুনেই মনে হলো, হুট করে ‘না’ বলে দিলে সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। তিনি মাথা নিচু করে চুপ করে বসে রইলেন। শায়খ তাকে বললেন, ‘সময় নাও। ভাবো।’
তিনি বললেন, ‘আমার ভাবার কিছু নেই। আপনি যা ভালো মনে করবেন, তাই হবে।’
শায়খ বললেন, ‘অবশ্যই তোমার ভাবার আছে। তুমি ভাবো—তুমি কি চাও। তুমি পারবে কিনা।’

আজ এই নদীতীরে বসে শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরী খানিক নিঃসঙ্গতা অনুভব করছিলেন। মা-বাবা কাছে থাকলে তাদেরকে অন্তত জিজ্ঞেস করা যেতো, তাদের মতামত কী? শায়খ যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা গ্রহণ করব কিনা। কিন্তু এটাও ঠিক—এই দীর্ঘ সময়ে তিনি মা-বাবার শূন্যতা অনুভব করেননি। শায়খ তাকে নিজের ছেলের মতোই স্নেহ করেছেন। তিনি সবার সঙ্গে বসে খেতে চাননি; তাকে একা আলাদাভাবে খাবারের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তিনি পড়ার জন্য আরব থেকে এনে দিয়েছেন বিভিন্ন কিতাব। আজ তিনি আমার হাতে তুলে দিতে চাইছেন তার প্রিয় মেয়ে—যুবাইদাকে। এক দুই তিন ভেবে মানেরী সিদ্ধান্ত নিলেন—তিনি যেমন শায়খের সঙ্গে তৈরী করেছেন ইলমি সম্পর্ক, তাঁর সঙ্গে কায়েম করবেন রক্তের রিশতাও।

মানেরী যখন এই সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন দিল্লির সম্রাট গিয়াসুদ্দিন বলবন ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর বড় ছেলে মঙ্গলদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন। ছোট ছেলে বুগরা খান গভর্নর হিসেবে শাসন করছেন বাংলার লাখনৌতি। কিন্তু বুগরা খান দিল্লির মসনদের জটিলতায় নিজেকে আর জড়াতে চাননি। ফিরিয়ে দিলেন মসনদে বসার আহ্বান। তার বদলে মসনদে বসলো তার ছেলে কায়কোবাদ। কায়কোবাদের বয়স তখন আঠারো। এদিকে দিল্লির অধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে বুগরা খান ‘নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ’ উপাধী ধারণ করে লাখনৌতির স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন।

মেনিখালী নদীর উত্তর তীরবর্তী মুগড়াপাড়ায় অবস্থিত মারাসাতুশ শরফ। মাদরাসায় ছাত্র প্রায় দশ হাজার। উপমহাদেশের প্রথম হাদীসশিক্ষাকেন্দ্র এটি। এই মাদরাসার প্রথম ছাত্র শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরী। তার একমাত্র শিক্ষক শায়খ আবু তাওয়ামা। মানেরী অধিকাংশ সময় কাটান মাদরাসার লাইব্রেরিতে। ফজর পড়ে আজ তিনি লাইব্রেরির দিকে যাচ্ছিলেন। শায়খের খাদেম এসে বললো, ‘ইবাদতখানায় শায়খ আপনাকে ডাকছেন।’
মানেরী ধীরপায়ে এগিয়ে গেলেন লাইব্রেরি সংলগ্ন ইবাদতখানার দিকে। ইবাদতখানাটি সমতল ভূমি থেকে কয়েকগজ মাটির নিচে। সিঁড়ি বেয়ে নামতে হয়। শায়খ আবু তাওয়ামা এখানেই ব্যক্তিগত ইবাদত-বন্দেগি করেন। ফজরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলে যিকির আযকার। সূর্যোদয়ের পর চাশত পড়ে দরসগাহে বসেন। মানেরী ইবাদতখানায় গিয়ে সালাম দিলেন। শায়খ একটা জায়নামাজ এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বসো। বসো।’
মানেরী জায়নামাজ পাশে সরিয়ে খালি ফ্লোরেই বসলেন।
শায়খ বললেন, ‘কী ভাবলে?’
মানেরী বললেন, ‘আমি রাজি।’
শায়খ বললেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’
মানেরী বললেন, ‘শায়খ, মোহরের টাকা দেবার সামর্থ্য আমার নেই।’
শায়খ শুভ্র দাড়ি আলোকিত করে হেসে বললেন, ‘আমি ব্যবস্থা করবো।’

ইবনে বতুতার ভাষায় দিল্লির মসনদে কায়কোবাদের শাসনের প্রাথমিক দিনগুলো ছিল ‘ঈদের দিন’ আর রাতগুলো ছিল ‘শবে বরাতের’ মতো। অত্যন্ত দানশীল ও মহান ছিলেন তিনি। কিন্তু তার দরবারের কর্মকর্তারা ছিল স্বার্থবাজ; কিশোর কায়কোবাদকে তারা ডুবিয়ে দিলো মদ আর নারীতে। প্রধানমন্ত্রী নিজামুদ্দিন সাম্রাজ্যের সকল ক্ষমতা হাতে নেয়ার জোর প্রয়াস শুরু করলো। সেই খবর বাংলা মুলুকেও এসে পৌঁছলো। ছি ছি রব পড়ে গেলো চারদিকে। শায়খ আবু তাওয়ামার সংস্পর্শে এসে ধর্মেকর্মে মন দিয়েছেন বুগরা খান। ছেলের এই অধঃপতন তিনিও মেনে নিতে পারছিলেন না। চিঠির পর চিঠি পাঠাতে লাগলেন ছেলের কাছে। কিন্তু তার ছেলে তখন মদের নেশা এবং নারীর ফাঁদে অন্ধ। ভালো কিছু ভাববার মতো শুভ বিবেক তার নেই।

বুগরা খান দরবারে বসে আছেন। দিনের প্রথম সভা। তার সামনে একটা গ্লাসে খেজুরের রস। টাটকা। দরবারের লোকেরা এই সময় এটা সেটা নিয়ে সুলতানকে পরামর্শ দেন। সুলতান পরামর্শ শুনতে শুনতে পান করেন খেজুর রস। এক জগ রস নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকে নেয়ামত নামের এক যুবক। মর্জি ভালো থাকলে সুলতান দু’গ্লাস রস খান। তিনি ইচ্ছে করেই বলেন, ‘নেয়ামত, আরেক গ্লাস নেয়ামত দাও তো।’ কিন্তু সুলতান আজ এক গ্লাসই শেষ করতে পারছেন না। রসের গ্লাসে ঠোঁট রেখে আনমনা হয়ে যাচ্ছেন। কখনো কাঁচের গ্লাসটা দাঁতের সঙ্গে লাগিয়ে ঠকঠক করছেন। নেয়ামত সতর্ক হয়ে গেলো। সুলতানের মর্জি আজ ভালো নেই।

রসের গ্লাস ফিরিয়ে দিয়ে সুলতান বললেন, ‘আপনারা বলছেন, দিল্লিতে আমি অভিযান চালাই?’
সমস্বরে সবাই বললো, ‘জি। এর বিকল্প দেখছি না।’
সুলতান ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘কেন?’
একজন বললো, ‘মদ আর নারীর নেশা একমাত্র তরবারিই কিছুটা কমাতে পারে।’
সুলতান বললেন, ‘ভুল বলেছো। সৎসঙ্গে স্বর্গবাস আর অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। আমার ছেলের সঙ্গটা ভালো না।’
একজন বললো, ‘কিন্তু তাকে সতর্ক করার অনেক চেষ্টা আপনি করেছেন। এবার একটু কঠিন হতে হবে আপনাকে।’

দরবারের ভারী পর্দা সরিয়ে এই সময় হাজির হলো সুলতানের দূত শামস দবির। সুলতান বললেন, ‘কার চিঠি?’
দূত বললো, ‘শায়খ আবু তাওয়ামা।’
সুলতানের মুখে এতক্ষণে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠলো। শায়খের চিঠি যখন পান, তার শান্তি শান্তি অনুভূত হয়। মনে হয় সবকিছু সুন্দর হয়ে যাচ্ছে। দূত চিঠি সুলতানের হাতে দিল। তিনি খাম খুলে পড়তে লাগলেন—

মহামান্য শাসক,
আপনার ছেলে, দিল্লির শাসক কায়কোবাদের অসংলগ্ন আচরণের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এটা আপনার জন্য সম্মানহানীকর। যদিও আপনি দিল্লির রাজনীতির জটিলতা থেকে দূরে থাকতে চেয়েছেন, কিন্তু এখন এভাবে হাতছেড়ে বসে থাকা সমীচীন নয়। আপনার ছেলেকে সঠিক পথে আনা আপনার দায়িত্ব। আপনি উদ্যোগী হোন। আমরাও দোয়া করছি—আমাদের দোয়া আপনার সঙ্গে আছে।

বি:দ্র: আমার মেয়ে যুবাইদার সঙ্গে আমার ছাত্র শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরীর সঙ্গে বিবাহ ঠিক হয়েছে। দিন-তারিখ জানিয়ে দিব। আপনার উপস্থিতি কামনা করছি।

ইতি
বান্দা আবু তাওয়ামা
মাদরাসাতুশ শরফ, সোনারগাঁ

সুলতান এতক্ষণ ঠিক করতে পারছিলেন না—কী করবেন। দরবারের অনেকেই দিল্লিতে অভিযান পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছিলো। তিনি চাইছিলেন অভিযান না চালিয়ে অন্য উপায়ে যদি কায়কোবাদকে ঠিক করা যায়। কিন্তু শায়খের চিঠি পেয়ে তার সব দ্বিধা দূর হয়ে গেলো। তিনি ভাবলেন—এভাবে বসে থাকলে হবে না। উদ্যোগী হতে হবে। তিনি ঘোষণা দিলেন দিল্লি অভিযানের। অভিযানে বের হবার আগে তিনি শায়খের চিঠির উত্তর লিখে গেলেন—

শায়খ,
দুঃখের মাঝেও যে সুখের সংবাদ আসে, তা এই অধমের জন্য বিরাট সৌভাগ্যের। আপনার মেয়ের বিবাহে থাকতে পারব কিনা জানি না। আমি দিল্লি অভিযানে বের হচ্ছি। দেখুন কী ভাগ্য আমার—নিজের ছেলের বিরুদ্ধে অভিযানে যেতে হচ্ছে। এজন্যই মন চায়—রাজত্ব ছেড়ে কোনো গহীন জঙ্গলে নির্জনবাসে চলে যাই। আমাদের জন্য দোয়া করবেন। যেন সফল হতে পারি।

ইতি
বুগরা খান
আপনার খাদেম

বাবার যুদ্ধাভিযানের কথা শুনে কায়কোবাদ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। তিনি চাচ্ছিলেন না বাবার বিরুদ্ধে মাঠে নামতে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নিজামুদ্দিন তাকে অভিযানে নামতে প্ররোচিত করলো। প্ররোচিত হয়ে কায়কোবাদ শাসনকর্তা এবং জায়গীরদারদের ডেকে পাঠিয়ে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতে বললেন। নিজে দ্রুত একটি সেনাবাহিনী গঠন করে দিল্লি থেকে রওয়ানা হলেন। তার সঙ্গে ছিলেন মহাকবি আমির খসরু। যমুনা পার হয়ে জয়পুর নামে একটি স্থানে পৌঁছে কায়কোবাদ খান জাহান বারবককে এক দল সৈন্য দিয়ে সরযু নদীর তীরে পাঠালেন। বুগরা খানও সরযু নদীর তীরে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি বারবকের কাছে শামস দবীরকে দূত হিসেবে পাঠালেন। উভয় পক্ষে এরপর কিছু আলোচনা ও ভীতি-প্রদর্শন হল, কিন্তু কাজ কিছু হল না। ইতোমধ্যে কায়কোবাদ তাঁর বাহিনী নিয়ে সরযূর তীরে শিবির স্থাপন করলেন। নদীর এক পারে বাবা, আরেক পারে পুত্র। একজন বাংলার সুলতান , আরেকজন দিল্লির সম্রাট ।

প্রিয় আত্মজ যুবাইদার বিয়ের তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছেন শায়খ আবু তাওয়ামা। আয়োজন খুব বেশী আড়ম্বরপূর্ণ না। একদম সাদামাটা। দাওয়াতি মেহমানের মধ্যে— কয়েকজন মাদরাসার শিক্ষক, কয়েকজন সওদাগর, মানেরীর কয়েকজন সহপাঠি। বিয়েটা হবে শুক্রবার, জুমার পর। মুসল্লিদের উপস্থিতিতে বিয়ে পড়িয়ে খেজুর ছিটানো হবে। শায়খ আবু তাওয়ামা একটি চিঠিও লিখে দিয়েছেন বিহারে, শায়খ ইয়াহইয়া মানেরীর কাছে। সেই চিঠির জবাবও এসেছে ত্বরিত গতিতে।

শায়খ তার প্রিয় মানেরীকে ডাকলেন। তাঁর হাতে তুলে দিলেন একটি খাম। কিন্তু মানেরী তো বাড়ি থেকে আসা চিঠি পড়েন না। এক যুগ পার হয়ে গেলো। বাড়ি থেকে চিঠি আসে, তিনি চিঠি না পড়েই ট্রাংকে রেখে দেন। তার আশঙ্কা হয়—চিঠি পড়লেই বাড়ি যেতে ইচ্ছে করবে। দুঃখের সংবাদ এলে এখানে আর মন টিকবে না। নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ অটুট রাখতেই এই ব্যবস্থা। শায়খ বললেন, ‘আমার পাঠানো চিঠির উত্তর দিয়েছে তোমার বাবা। পড়ো।’ মানেরী চিঠি খুলে দেখলেন বাবার গোটা গোটা অক্ষরে লেখা—’শায়খ যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা সৌভাগ্যের। তোমার প্রতি আমাদের দোয়া রইলো। তোমার মা বলছেন, বিয়ের পর বউমাকে নিয়ে একবার এসে আমাদেরকে দেখে যেও। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।’ চিঠি পড়ে মানেরীর ঠোঁঠে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি।

শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার সামনে দুজন সওদাগর বসে আছে। ইয়ামানের সওদাগরের নাম আবু হামেদ; কুফার সওদাগরের নাম সালেহ হুসাইনি। আজ সকালেই তাদের জাহাজ এসে ভিড়েছে সোনারগাঁ বন্দরে। তারা শায়খের দাওয়াতি মেহমান।

একটা ব্যাগ শায়খের দিকে এগিয়ে দিল আবু হামেদ। শায়খ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। তাকালেন মানে ভ্রুজোড়া খানিক কুঁচকে ঠোঁটে লাগালেন আলতো হাসির রং। সওদাগর বললো, ‘আরবের আজওয়া খেজুর।’
আবু তাওয়ামা বললেন, ‘আমার জন্য?’
‘জি না।’
‘তাহলে?’
‘বিয়ের মজলিসের সুন্নত হিসেবে ছিটানোর জন্য।’

আগামীকাল শায়খের মেয়ের সঙ্গে তার প্রিয় শাগরেদ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরির বিয়ে। এই বিয়েতে কয়েকজন সওদাগরকেও দাওয়াত করেছেন তিনি। এদের মধ্যে দুজন আবু হামেদ এবং সালেহ হুসাইনি। বিশেষভাবে এ দুজনকে দাওয়াত দিয়েছেন শায়খ। কদিন আগে তারা আরব থেকে শায়খের জন্য কিছু কিতাব এনে দিয়েছে। কিতাবগুলো এদেশে পাওয়া যায় না। কিতাবগুলো পেয়েই শায়খ দারুণ উচ্ছ্বসিত।

শায়খের সামনে ছোট্ট একটা বাটিতে কাঁচা খেজুর। শায়খ দুটো খেজুর দুজনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘বাংলা মুলুকের খেজুর। শ্রীহট্ট থেকে এসেছে।’ খেজুর দুটো মুখে দিতেই দুজনের মুখ রসে ভরে যায়। সালেহ হুসাইনি খেজুরটা শেষ করে ব্যাগ থেকে বের করল এক বোতল মেশক আম্বর। সুঘ্রাণে মৌ মৌ করতে লাগলো পুরো মাদরাসা। মেশকের ঘ্রাণ পৌঁছে গেলো অন্দরমহলেও।
সালেহ হুসাইনি বললো, ‘এটা নব পরিণয়ে যারা আবদ্ধ হচ্ছে, তাদের জন্য।’
শায়খ হেসে বললেন, ‘তাহলে তো আমাদের জন্য বারণ। আমাদের পুরাতন পরিণয়।’
সওদাগর শায়খের রসিকতায় খানিক অপ্রস্তুত। আলতো হাসি দিয়ে বললো, ‘পুরাতনদের অধিকার আরও বেশি, আরও পোক্ত। তাই তাদের উল্লেখ করতে হয় না বলেই জানি।’
শায়খ বললেন, ‘তেমন না। মূলত ছেলেমেয়েদের দিলেই মা-বাবাকে দেয়া হয়।’
সওদাগর বললো, ‘ইয়াহইয়া মানেরির হাতে উপহারটুকু দিতে চাই।’
শায়খ বললেন, ‘তাহলে আগামীকাল বিয়ের মজলিসেই দিয়ো। আম্বরের ঘ্রাণে মজলিসও মৌ মৌ করবে। সুঘ্রাণ হৃদয় প্রশান্ত করে।’

শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরীকে আজ বড্ড লাজুক লাগছে। মাথায় পাগড়ি, গায়ে পাজামা-পাঞ্জাবি। শান্ত সমাহিত হয়ে বসে আছেন শায়খ আবু তাওয়ামার সামনে। তাদের ঘিরে বসে আছে গোটা শতেক মানুষ। এদের মধ্যে মাদরাসার ছাত্র সংখ্যাই বেশী। সওদাগর সালেহ হোসাইনি সামনের সারিতে বসে থাকা বড়দের হাতে মেশক আম্বরের ছোঁয়া দিচ্ছেন। মনে হচ্ছে—মেশকের ঘ্রাণে আয়োজন পূর্ণতা পেয়েছে।

শায়খ খুতবা পাঠ করে বললেন, ‘শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার মেয়ে যুবাইদা খাতুনকে মহরে ফাতেমি ধার্য করে তোমার হাতে তুলে দিচ্ছি। বলো—কবুল।’ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরী বললেন, ‘কবুল।’

সোনারগাঁয়ে যুবাইদা-মানেরীর সম্পর্কটা সুন্দরভাবে গড়ে উঠলেও সরুয নদীর তীরে টানাপোড়েনে পড়েছে বাবা-ছেলের সম্পর্ক। বুগরা খান কায়কোবাদকে ভয় দেখাচ্ছেন তাঁর বিপুল হস্তিসংখ্যার কথা বলে। কায়কোবাদ তার বাবাকে ভয় দেখাচ্ছেন তার বিপুল অশ্বসংখ্যার কথা বলে। তবে কায়কোবাদ কূটনৈতিক মারফত খবর পাঠালেন, ‘তার বিপুল শক্তি থাকতে পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি বাবার ক্ষতি করতে চাননা। বাবা এসে যদি তার সঙ্গে দেখা করেন, তিনি তার চরণে মুকুট নিবেদন করবেন।’ ছেলে যেমন যুদ্ধ চায় না, বাবাও চান না। বাবা তার সাক্ষাতে রাজি হলেন। কায়কোবাদ বলে পাঠালেন, ‘আমার মুকুট যদি আকাশ স্পর্শও করে, তবুও আমার মাথা থাকবে আপনার চরণতলে।’

ছেলের পিত্রশ্রদ্ধা দেখে বুগরা খান দারুণ খুশী। তবে প্রথমেই তিনি দেখা করলেন না। দামী উপঢৌকন সমেত পাঠালেন তার দ্বিতীয় পুত্র কায়কাউসকে। কায়কোবাদ ভাইকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। সিংহাসন থেকে নেমে এসে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। টেনে নিয়ে তাকে সিংহাসনে নিজের পাশে বসালেন। পরদিন কায়কোবাদ নিজের শিশুপুত্র কায়মুসকে একজন অভিজ্ঞ উজিরের সঙ্গে দিয়ে অনেক উপহার সমেত বাবার কাছে পাঠালেন।

ছেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ আর বিলম্ব করতে চাচ্ছিলেন না বুগরা খান। সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি দেখলেন, কায়কোবাদ ওপারে পদচারণ করছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি নদী পার হয়ে গিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন বুকে। দুই বুকের উষ্ণতায় গলে গেলো অভিমানের পাথর। শীতল হয়ে গেলো ক্ষোভের বহ্নিশিখা। সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে মহাকবি আমির খসরু সে মায়াময় দৃশ্য দেখছিলেন। তিনি এই দৃশ্য থেকেই ধার করেন পরবর্তী বইয়ের নাম—’কিরান-ই-সদাইন’ অর্থাৎ দুই তারকার সাক্ষাৎ।

বাবার পরামর্শক্রমে প্রধানমন্ত্রী নিজামুদ্দিনকে বরখাস্ত করেন কায়কোবাদ। সতর্ক এবং সচেতন থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ফিরে যান দিল্লি। বুগরা খান ফিরে আসেন লাখনৌতি। ফিরেই জানতে পারেন—শায়খের মেয়ের বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। শীতের মওসুম। নবদম্পতির জন্য তিনি উপহার পাঠালেন একজোড়া কম্বল, একজোড়া শীতের কাপড়। উপহারের সঙ্গে পাঠালেন একটি চিঠি।

শায়খ আবু তাওয়ামা রাতের খাবার খেতে বসে সবাইকে চিঠি পড়ে শুনান। তাতে লেখা—শায়খ, দিল্লি অভিযান থেকে ফিরেছি। আমার ছেলে আমাকে বাংলার স্বাধীন সুলতান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সে ওয়াদা করেছে—আর কখনও বিপথে পা বাড়াবে না। বিয়ের খবর শুনে আনন্দিত হয়েছি। পরিণয় শুভ হোক। নবদম্পতির জন্য সামান্য হাদিয়া পাঠালাম। অনেকদিন হলো আপনাকে দেখি না। অচিরেই আমি একদিন আসবো।’

চিঠি শোনা শেষ হলে শরফুদ্দিন মানেরী লক্ষ্য করলেন, যুবাইদা তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তাহলে এতক্ষণ কি সে শায়খের চিঠি মন দিয়ে শুনেনি?

বিজ্ঞাপন