শেষের কবিতা ও অয়ং ভয়ং রবীন্দ্রনাথং

মওলবি আশরাফ:

মোকদ্দমা 

বিবাদী দেবেন্দ্রনাথ-পুত্র রবীন্দ্রনাথের নামে বিদেশি সাহিত্য থেকে চুরি ও নকলের দায়ে ‘পাঠকের আদালতে’ দায়ের করা মোকদ্দমায় আমরা দুই ধরনের বিচারক পাই : একদল রবীন্দ্রনাথকে ‘চোর, কপিবাজ, লেখকই না’ ইত্যাদি বিশেষণের বিষমাখা খঞ্জর দিয়ে তীব্র আক্রমণ করে, আর অপর দল কেবল স্বীকার করে নেন রবীন্দ্রনাথ চুরি করেছেন। তৃতীয় আরেক দল (বিচারক না বলে উকিল বললেই বেশি খাপসই হবে) যারা প্রথম দলের ওপর ড্রামাটিক সুরে ‘অবজেকশন ইয়োর অনার’ বলবে, তাদের সন্ধান এখনতক প্রবন্ধকার পাননি, তাই তিনি দীর্ঘদিনের লাল গাউন ফেলে নিজেই কালো গাউন পরে দরবারে হাজির হয়েছেন। ইয়োর অনার, আমার মত ও অমত প্রকাশে আপনার অনুমতি প্রার্থনা করছি।

প্রথমেই স্বীকার নিচ্ছি রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আজকের দিন পর্যন্ত চর্চা ও বাকবিতণ্ডা সাহিত্যক্ষেত্রে আমাদের দৈন্যতাকেই বারবার সামনে এনে হাজির করে। সলিমুল্লাহ খান যখন বলেন রবীন্দ্রনাথকে তিনি আক্রমণ করেন এইজন্য যে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে শক্তিশালী কাউকে তার নজরে পড়ে না, আর নিজের শক্তিমত্তার পরীক্ষা তো আরেকজন শক্তিশালীর সাথে দৈতযুদ্ধেই হয়— আমরা তখন দ্বিমত পোষণ করতে পারি না। রবীন্দ্রনাথকে বলা যায় রাঘব বোয়াল, তার সামনে কোনো পুটিমাছই টিকে থাকেনি, তার নানামুখী শক্তিমত্তা এত বেশি যে, ‘রবীন্দ্রনাথ কে’ এই প্রশ্নের উত্তর আমরা এক শব্দে দিতে পারি না, কেননা শিল্প-সাহিত্যের এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ দিক নেই যেখানে তিনি হাত দেননি। যেখানে আর সব শিল্পীদের শিল্পের শ্রেষ্ঠত্ব প্রথম যৌবনেই ফুরিয়ে যায়, সেখানে রবীন্দ্রনাথ যত বুড়ো হয়েছেন তাঁর শিল্পত্বের রোশনাই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছে। জীবদ্দশায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে অভিজাতকূল শ্রীমতী নারীরূপে উপস্থাপন তো করেছিলেনই, মৃত্যুর পরেও রেখে গেছেন বৃহস্পতিতুল্য প্রভাববলয়। এটা আমাদের জন্য বেদনাদায়ক বৈ অন্য কিছু নয়। মৃত্যুর আশি বছর পরেও তার চেয়ে মহান কারুর সময়কে প্রতিনিধিত্ব না করাই প্রমাণ করে আমরা এক জায়গায় আটকে আছি, থেমে আছে ঘড়ির কাঁটা প্রায় এক শতক ধরে, আমাদের প্রগতিশীলতার পরম্পরা অবিচ্ছিন্ন রয়নি। একথার সাথে সুর মিলিয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও, শেষের কবিতায় তিনি বলেন, ‘কবিমাত্রের উচিত পাঁচ-বছর মেয়াদে কবিত্ব করা…

ভালো লাগার এভোল্যুশন আছে। পাঁচ বছর পূর্বেকার ভালো-লাগা পাঁচ বছর পরেও যদি একই জায়গায় খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে তা হলে বুঝতে হবে, বেচারা জানতে পারে নি যে, সে মরে গেছে। একটু ঠেলা মারলেই তার নিজের কাছে প্রমাণ হবে যে, সেন্টিমেন্টাল আত্মীয়েরা তার অন্ত্যেষ্টি-সৎকার করতে বিলম্ব করেছিল, বোধ করি উপযুক্ত উত্তরাধিকারীকে চিরকাল ফাঁকি দেবার মতলবে।’

রবীন্দ্রনাথ একই সাথে সব্যসাচী আবার ছিলেন খুব উর্বর ও প্রভাবশালী। অনেক বাদীর ক্ষোভের পেছনে এই কারণটি থাকতে পারে। তারা হরেক পদ্ধতিতে হরহামেশাই চান রবীন্দ্র-বলয় ডিঙাতে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আরো মহান বানাতে এর প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি, কিন্তু তাই বলে রবীন্দ্রনাথকে ইনকার করে রবীন্দ্র-বলয় ডিঙানোর জরুরত নেই। তারপরও বাদীপক্ষের অভিযোগ আমরা শুনব, নাহলে কোনো ফয়সালায় পৌঁছা সম্ভব হবে না ইয়োর অনার।

বলা হয় রবীন্দ্রনাথ একসময় ‘দ্বিতীয় চ্যাটার্টন’ হবার ‘চেষ্টায় প্রবৃত্ত’ হয়েছিলেন। রাসেল রায়হান লিখেন : টমাস চ্যাটার্টন ছিলেন জনৈক ইংরেজ কবি। এই ভদ্রলোক প্রাচীন গ্রিক কবিদের নকল করে কবিতা লিখতেন। ১৭ বছর বয়সে তিনি আত্মহত্যা করলেও তার সময়ে বেশ খ্যাতি লাভ করেছিলেন। চ্যাটার্টনের এই নকল করার ঘটনাটা রবীন্দ্রনাথকে খুব স্পর্শ করল। তিনি তখন মৈথিলী ভাষার কিছু প্রাচীন কবিতা-টবিতা আগ্রহ নিয়ে পড়েছেন। প্রাচীন কবিদের লেখা পড়তে পড়তে হঠাৎ দু–একটি ‘কাব্যরত্ন’ চোখে পড়ে, সে আবিষ্কারে তিনি অন্ধকারে মাণিক্য তুলে আনার আনন্দ পান। চ্যাটার্টনের গল্প শুনে হঠাৎ বালক রবীন্দ্রনাথের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে যায়। এক বর্ষার দুপুরে খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে ওই মৈথিলী কবিতার অনুকরণে লিখে ফেলেন কয়েক লাইন কবিতা। নিজের কৃতিত্বে তখন দারুণ খুশি তিনি। কয়েক দিনের মধ্যেই লেখা হতে থাকল আরও কয়েকটি। এবার লেখকেরও তো একটা নাম দিতে হয়। তাই নিজেই নাম ঠিক করলেন—ভানুসিংহ। পরবর্তীতে এই কবিতার সংকলনই হয় রবীন্দ্রনাথের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’

কৈশোরের ব্যাপারস্যাপার সহনীয় চোখে দেখা যায়, কিন্তু বাঙালির গর্ব নোবেল পদক পাওয়া যেই কাব্যগ্রন্থ নিয়ে, গীতাঞ্জলির ইংরেজি তর্জমা The song offerings-এর বিভিন্ন কবিতায় বাইবেলের Songs of Solomon-এর মধ্যে খুল্লামখোল্লা মিল পান, মিল পান বেশ কিছু খ্রিষ্টীয় গানেও, তখন রবীন্দ্রমোল্লাদের মুখের বাত্তি ডিম হয়ে যায়, বলার কোনো কথাই পান না।

এছাড়াও ‘চিত্রা’ কাব্যের ‘এবার ফিরাও মোরে’ এবং ‘মানসী’ কাব্যের ‘বধূ’ কবিতা দুটির ভাব ও কাঠামো ইংরেজ কবি শেলি ও ওঅর্ড্‌স্‌ওঅর্থের কবিতার নকল বলে অনেকে অভিমত প্রকাশ করেছেন। এডগার এলান পো ও ন্যাথানিয়েল হর্থনের গল্পের মিল রয়েছে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি গল্পে। এরমধ্যে ‘রবিবার’ গল্পটি এলান পো’র ‘দ্য এথিস্ট’ গল্পের হুবহু কপি।

তবে একথা এড়িয়ে যাবার জো নেই যে, বাদীপক্ষের কারো কারো মোকদ্দমায় হিংসার হলদে অনল নিশ্চিতরূপে ছিল, নয়তো কালীপ্রসন্ন বিদ্যাবিশারদ তার ‘মিঠেকড়াতে’ এভাবে লিখতে পারতেন না— “রবীন্দ্রনাথ মোটেই লিখতে জানতেন না, স্রেফ টাকার জোরে ওর লেখার আদর হয়। পাঁচকড়ি বাবু একথাও বহুবার স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথের প্রায় যাবতীয় সৃষ্টিই নকল। বিদেশ থেকে ঋণ স্বীকার না করে অপহরণ।”
মুহাম্মাদ আব্দুল আলিম লিখেন, “বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেসব কবিতা লিখেছেন তার অধিকাংশই অন্য কবির কবিতা থেকে চুরি করে লিখেছেন।”

জবানবন্দি 

তো আমি আজকের সভায় বিচারকের সামনে উপস্থাপন করব রবীন্দ্রনাথের কাব্যধর্মী উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’। কারো কাছে উপন্যাসটি যেমন ‘নেহাৎ মামুলি একটি গল্প শব্দবিন্যাসের জোরে জমানা উতরে গেছে’ মনে হয়, আবার কারো জবানে ‘ক্লাসিক, মনস্তাত্ত্বিক, কালজয়ী, অনন্য শিল্পকর্ম’ বিশেষণে আদৃত। বাংলাভাষীদের সাহিত্যচর্চার সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি আখড়ায় যুক্ত হওয়ার সময় ভাইভাবোর্ডে ‘শেষের কবিতা’ থেকে প্রশ্ন করা হয়, তারা মনে করেন ‘এখন পর্যন্ত যিনি শেষের কবিতা পড়েননি, বাংলাসাহিত্যের দরজার চৌকাঠে তার পা পড়েনি।’ তো আসল কথা হলো— এমন সুপ্রসিদ্ধ একটি উপন্যাসে খোদ রবীন্দ্রনাথই অমিত রায় চরিত্রের মুখ দিয়ে দিয়েছেন তার চুরির জবানবন্দি!

ঘটনা অনেকটা এমন : অমিত রায় খুবই ব্যতিক্রমী এক চরিত্র। একদিন ওদের বালিগঞ্জের এক সাহিত্যসভায় রবি ঠাকুরের কবিতা ছিল আলোচনার বিষয়। অমিতের জীবনে এই সে প্রথম সভাপতি হতে রাজি হয়েছিল… একজন সেকেলেগোছের অতি ভালোমানুষ ছিল বক্তা রবি ঠাকুরের কবিতা যে কবিতাই এইটে প্রমাণ করলেন। দুই-একজন কলেজের অধ্যাপক ছাড়া অধিকাংশ সভ্যই স্বীকার করলে, প্রমাণটা একরকম সন্তোষজনক। সভাপতির আলোচনার পালা এলে অমিত রায় রবীন্দ্রনাথকে আক্রমণ করে নানা কথার ফাঁকে একথাও বলেন—
‘… রবি ঠাকুরের বিরুদ্ধে সব চেয়ে বড়ো নালিশ এই যে, বুড়ো ওঅর্ড্‌স্‌ওঅর্থের নকল করে ভদ্রলোক অতি অন্যায়রকম বেঁচে আছে।’

একদম সরল স্বীকারোক্তি। তবু সওয়াল ওঠে, একজন শিল্পী বা সাহিত্যিক চুরি করে নকল করে কেবল স্বীকারোক্তি দিলেই কি বেকসুর খালাস?

এই সওয়ালের জবাব দেওয়ার আগে আমাদের জানতে হবে সাহিত্যে ও শিল্পে চুরি বা নকল অনৈতিক কিনা। বুড়ো সক্রেটিসকে কি যদি আবার আদালতে হাজির করি, তিনি প্লেটোর মুখ দিয়ে বলবেন, ‘যথাযথ শাসিত একটি রাষ্ট্রে কবি ও শিল্পীদের প্রবেশকে নিষিদ্ধ করাই সঠিক সিদ্ধান্ত।’ কী কারণে কবি ও শিল্পীদের ওপর এমন দয়ামায়াহীন রায়, যদি এই প্রশ্ন করি, প্লেটোর মুখ দিয়ে সক্রেটিস তখন বলবেন, ‘উত্তমত্ব এবং মন্দত্বের প্রশ্ন যখন আসে, তখন অনুকৃত-জিনিস অনুকরণকারী সৃষ্টি করে, তার ব্যাপারে তার যেমন কোনো ধারণা থাকে না, তেমন সত্য অভিমতও থাকে না।…
কবি যখন সৃষ্টি করে, তা কি ভালো, না মন্দ, তা না জেনেই কবিতা রচনা করে যেতে থাকে : আর যে অনুকৃতি তিনি সৃষ্টি করেন, তা হয় নাদান আমজনতার রুচিতুষ্টিকারী জিনিস।… কেননা অনুকরণ সবসময় সত্য থেকে দুই কদম দূরে অবস্থিত।’ (প্লেটোর রিপাবলিক, দশম পুস্তক, অনুবাদ : আমিনুল ইসলাম ভুইয়া)

এই বক্তব্য যুগ যুগ মানুষদের ভাবিয়েছে, ক্রিটিকেরা আলোচনা-সমালোচনা করেছে, অবশেষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছিয়েছে যে, একজন শিল্পীর কাজ নয় আদর্শের জন্য কবিতা লেখা, তবে তারা চাইলে পারে কবিতায় শিল্পে কোনো আদর্শকে উপস্থাপন করতে, কিন্তু সৃষ্টির ব্যাপারে তারা স্বাধীন। একজন কবি যখন শব্দ দিয়ে কিছু আঁকেন, একজন চিত্রশিল্পী যখন তার ক্যানভাসে কবিতা বুনন করেন, তখন তারা নির্মাণ করেন আপন গতিপথ, আপন ধর্ম।
একজন শিল্পীর শিল্পচেতনা জন্ম নেয় প্রকৃতি কিংবা সামাজিক বাস্তবতা কেন্দ্র করেই, কিন্তু শিল্পীর জন্য জরুরি নয় সামাজিক-রীতিনীতি অনুশাসন অনুসরণ করা।

শিল্পী কোনো নীতি-নৈতিকতার প্রচারক বা নবী নয়। শিল্পী যদি নিরাবরণ শরীরকে পবিত্রতার প্রতীকী বানায়, তবে তা-ই সই। কারণ শিল্পী স্রেফ সৌন্দর্যের পূজারী, আর সত্যকেই কেবল সুন্দর হতে হবে এমন কোনো কথা নেই, মিথ্যাও সুন্দর হতে পারে। মিথ্যাও মানুষকে তৃপ্ত করতে পারে, আবার তৈরি করতে সত্যকে গ্রহণ করার নতুন যৌক্তিকতা।মিথ্যা না থাকলে সত্য সত্যই-বা হবে কি করে

তাছাড়া নীতিনির্ধারকের ছাঁকনিতে ঢালার আগে যেকোনো জিনিসই সত্য কিংবা মিথ্যা হওয়ার গুণসম্পন্ন থাকে। এখন যদি আইন করা হয় কোনো মিথ্যা সৌন্দর্য সৃষ্টি করা যাবে না, তাহলে গোটা সৃষ্টিশীলতার পথই রুদ্ধ হয়ে যাবে, যা কিছুতেই উচিৎ নয়। কোনটা উত্তম কোনটা মন্দ, কোনটা গ্রহণীয় কোনটা অগ্রহণযোগ্য— সেটা নাহয় নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র বা ধর্ম। কিন্তু শিল্প চিরকাল স্বাধীন। এবং শিল্পের ওপর এই বিধিনিষেধ আরোপ করাও সম্ভব নয়।

একটু আবেগী হয়ে প্লেটো-সক্রেটিসে চলে গেলেও আমাদের মাথার ওপরে কিন্তু এখনও এই প্রশ্ন ঝুলছে— ‘শিল্পে চুরি বা নকল কি জায়েজ?’

ইতোমধ্যে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, ‘কবি বা শিল্পী প্রচলিত নৈতিকতা দ্বারা পরিচালিত হন না, বরং তারা নিজেরাই সৃষ্টি করেন নয়া নয়া নীতি।’ শিল্পে ও সাহিত্যে চুরি বিষয়ে তাদের নীতি হলো এটি বিনাপ্রশ্নে জায়েজ!

কেন এই নীতি? কারণ এই অমীয় বাণী : ‘এন কোল খাদাশ তাখাত হাশামেশ’— সূর্যের নীচে নতুন কিছুই ঘটে না। (אֵין כָּל חָדָשׁ תַּחַת הַשָּׁמֶשׁ‎ —Hebrew bible, Old testament, Ecclesiastes, 1:9)

আরেকটু পষ্ট করে বলি, একই সূর্যের নীচে নতুন কিছু যদি ঘটে তাহলে শিল্পের জন্ম তো এভাবেই হবে যে, শিল্পী এখান থেকে একটু নিবে ওখান থেকে একটু নিবে তারপর সবগুলোর মিশ্রণ ঘটিয়ে সৃষ্টি করবে নতুন এক কিছু।

Art is a Mutation— শিল্প জিনিসটা হলো রূপান্তর। ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার মতো রূপ বদলে বদলে একে শক্তিশালী হতে হয়। যত বেশি হোস্ট ধরতে পারবে আর শুষে নিতে পারবে শক্তি, ততই সে ক্ষমতাশালী হয়ে উঠবে। এই জন্যই আহমদ ছফা ব্রাত্য রাইসুকে রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই যে বিভিন্ন জায়গা থেকে নিয়ে তালি দেওয়ার ক্ষমতা এটাই মানুষকে বড় করে।’

সাহিত্যে চুরি বা নকলকে বলা হয় প্রভাব। জর্মন কবি গ্যোয়েটে যেমন বলেন, “সাহিত্যে তালি মারা একটা আর্ট। একে (স্থূল অর্থে) চুরি বলা ঠিক না। কারণ বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশল এখানে খাটাতে হয়।”

ইংরেজিতে এর জন্য আলাদা টার্ম আছে, Plagiarism —এর অর্থ সাহিত্য ভাবনা চুরি বা অপহরণ। বাংলায় এর প্রতিশব্দ বানানো হয়েছে : কুম্ভীলকবৃত্তি। (বাদীপক্ষের রসকষহীন যেসব মনোবিজ্ঞানী লেখা চুরিকে মেন্টাল ডিজঅর্ডার অভিহিত করেছেন, তারা এর নাম দিয়েছেন— স্কাপিসট্রি।)

প্রভাব বিষয়ে বিভিন্ন লেখকদের টুকরো টুকরো অনেক কথা আছে। যেমন :
অস্কার ওয়াইল্ড বলেন, “অপরের ধারণা যুক্ত করে চূড়ান্ত সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠা লেখকের অধিকারের মধ্যে পড়ে।”
আমেরিকান নাট্যকার উইলসন মিজনার বলেন, “একজনের লেখা বা ভাবনা অনুকরণ যদি দূষণীয় হয়, তবে দুজন বা ততোধিক লেখকের ধারণা বা ভাবনার অনুসরণ কী করে গবেষণার স্বীকৃতি পেতে পারে? তাহলে তো আর গবেষকদের ভাতই নেই। গবেষণা মাত্রই চুরি।”
তবে প্রভাব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাই নোবেলজয়ী সাহিত্যিক মঁসিয়ে অঁদ্রে জিদ থেকে। তিনি তার ‘সাহিত্যে প্রভাব’ প্রবন্ধে লিখেন ‘এমন কিছু কল্যাণকর প্রভাব আছে, যা সাধারণের চোখে ভালো মনে হয় না। অথচ প্রভাবকে চূড়ান্তভাবে ভালো বা মন্দ কোনোটাই বলা উচিত নয়। কারণ প্রভাবের যাচাই হয় যিনি প্রভাবিত হন তাঁর ভালো-মন্দের আপেক্ষিকতায়।’
অঁদ্রে জিদ আরও বলেন,
‘প্রভাবকে ভয় করে যাঁরা দূরে সরে থাকেন তাঁরা আত্মার দৈন্যকেই তুলে ধরেন। তাঁদের মাঝে নতুন কিছু খোঁজা বৃথা। কেননা নতুন কিছু অর্জনের প্রয়াস তাঁদের মাঝে নেই।’…
‘মহৎ ব্যক্তিরা হৃদয়ের সকল আকুতি দিয়ে প্রভাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। কারণ মহৎ সৃষ্টির সম্ভাবনার প্রতীক্ষায় এঁরা নববধূর মতোই কম্পিত-বক্ষ। হৃদয়ের বিপুল সম্ভারকে এঁরা নিশ্চিতরূপে জানেন’…
(সাহিত্য ও নন্দনতত্ত্ব বিষয়ক তিনটি ফরাসি প্রবন্ধ, অনুবাদক : মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ)

ইয়োর অনার, হয়তো খেয়াল করেছেন যে, শিল্প ও সাহিত্যে চুরির বৈধতা দিতে গিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব আমিও চুরি করে জোড়াতালি লাগিয়ে উপস্থাপন করছি। পাবলো পিকাসো কতই-না চমৎকার বলেছেন, ‘ভালো শিল্পীরা নকল করেন আর মহান শিল্পীরা করেন চুরি!’

ফয়সালা 

রবীন্দ্রনাথ বিদেশি সাহিত্য থেকে যে চুরি করেছিলেন এতে তো কোনো সন্দেহ নাই, তবে আমি মনে করি তার মনোজগৎ সবচেয়ে বেশি ঋদ্ধ হয়েছিল ফারসি সাহিত্য থেকে। গীতাঞ্জলিকে যারা বলেন বাইবেলপ্রভাবিত, আদতে তারা ফারসি সাহিত্যের খবর রাখেন না। আমি তো বরং গীতাঞ্জলির ছত্রে ছত্রে ফারসি সাহিত্য আর পারসিক সুফিবাদ খুঁজে পাই।
ইয়োর অনার, গীতাঞ্জলির ইংরেজি তর্জমার প্রথম কবিতায় যখন পড়ি :
❝আমারে তুমি অশেষ করেছ।
এমনি লীলা তব।
ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ
জীবন নব নব।
কত যে গিরি কত যে নদী-তীরে
বেড়ালে বহি ছােটো এ বাঁশিটিরে,
কত যে তান বাজালে ফিরে ফিরে
কাহারে তাহা কব॥❞

গুরুদেবের মানবাত্মার সাথে বাঁশির উপমা আমাকে মনে করিয়ে দেয় মওলানা জালালুদ্দিন রুমির মসনবির প্রথম দ্বিপদী :
❝লো বাঁশরি, শোন আমার কথা—
প্রিয়’র বিরহে আমার যত যাতনা❞
রুমিও সেখানে আত্মাকে বাঁশঝাড় থেকে বিচ্ছিন্ন বাঁশির সাথে তুলনা করেছিলেন। অসম্ভব নয় রবীন্দ্রনাথ মওলানা রুমি থেকে ‘ভাবচুরি’ করেছিলেন।

খোদ রবীন্দ্রনাথ যখন পারস্য সফরে যান, তখন জনৈক পারস্যবাসীকে বলেন, ‘…আপনাদের পূর্বতন সুফীসাধক কবি ও রূপকার যারা আমি তাদেরই আপন, এসেছি আধুনিক কালের ভাষা নিয়ে; তাই আমাকে স্বীকার করা আপনাদের পক্ষে কঠিন হবে না।’ (পারস্য যাত্রী, পৃ. ৪১)

কবি হাফিজের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করেছেন এইভাবে, “এই সমাধির পাশে বসে আমার মনের মধ্যে একটা চমক এসে পৌঁছল, এখানকার এই বসন্তপ্রভাতে সূর্যের আলোতে দূরকালের বসন্তদিন থেকে কবির হাস্যোজ্জ্বল চোখের সংকেত। মনে হলো আমরা দুজনে একই পানশালার বন্ধু, অনেকবার নানা রসের অনেক পেয়ালা ভরতি করেছি। আমিও তো কতবার দেখেছি আচারনিষ্ঠ ধার্মিকদের কুটিল ভ্রূকুটি। তাদের বচনজালে আমাকে বাঁধতে পারেনি; আমি পলাতক, ছুটি নিয়েছি অবাধপ্রবাহিত আনন্দের হাওয়ায়। নিশ্চিত মনে হলো, আজ কত-শত বৎসর পরে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান পেরিয়ে এই কবরের পাশে এমন একজন মুসাফির এসেছে যে মানুষ হাফেজের চিরকালের জানা লোক।”(পারস্য যাত্রী, পৃ. ৪৩)

ফারসি সাহিত্যে বা সুফিবাদে লাইলি-মজনুর উপস্থিতি খুব বেশি রকম পাওয়া যায়। এই লাইলি হলো পরমাত্মার রূপক আর মজনু মানবাত্মার। মানবাত্মার মাঝে সবসময় ছটফটানি থাকে পরমাত্মার সাথে মিলনের, এটাই বিভিন্ন রূপকল্পে উপস্থাপন করা হয়েছে, তবে প্রতিটি গল্পই বিয়োগান্তক। মানে, মজনু কখনোই লাইলিকে পায় না, এমনকি অনেক সময় মনে হয় মজনু চায়ও না লাইলির সাথে তার মিলন হোক, সে এরকম ছটফটানি নিয়েই অনিঃশেষ সময়কাল থাকতে চায়।

এই লাইলি-মজনুই বৈষ্ণব পদাবলিতে গিয়ে হয়ে যায় কৃষ্ণ আর রাধা। রবীন্দ্রনাথ দু’হাত ভরে ভরে এই দুইখান থেকে প্রভাব গ্রহণ করেছিলেন।

কিন্তু …

একটা গল্প শুনেছি বাবার মুখে। এক গ্রাম্য লোকের দুই মেয়ে ছিল। বড় মেয়েকে লেখাপড়া করাতে পারেননি, তাই পাশের গ্রামের অশিক্ষিত তবে সহজসরল একজন ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দেন। আর ছোট মেয়ে ছিল বুদ্ধিমতি ও মেধাবী, তাই তাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে বিয়ে দেন পণ্ডিতবাড়িতে, জামাইবাবু কিনা সংস্কৃত ভাষার মাস্টার। গ্রাম্য লোকটি ছোট জামাই নিয়ে খুব গর্ব করতেন, সবসময় তার কথা হাঁটেবাজারে বলে বেড়াতেন, আর ওদিকে অশিক্ষিত বলে বড় জামাই নিয়ে লজ্জিত ছিলেন। বড় জামাইকে তাই বলে দিয়েছিলেন ছোট জামাইয়ের উপস্থিতিতে কখনো যেন শ্বশুরবাড়ি না আসে, দুইজনের মধ্যে কখনো যেন সাক্ষাৎ না হয়। ঘটনাক্রমে একদিন বড় জামাই শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে এয়েছেন, গ্রাম্য লোকটি জানালা দিয়ে দেখলেন বাড়ির দিকে ছোট জামাইও ধীরে ধীরে হেঁটে আসছে। বড় জামাইকে বললেন, ‘ছোট জামাই আসছে, আমার মানসম্মান নষ্ট কোরো না, সাত-তাড়াতাড়ি খাটের নীচে লুকাও’। তো যথা আজ্ঞা। এদিকে ছোট জামাই এলেন, বসলেন, আয়েশ করে খাওয়াদাওয়া করলেন, আর ওদিকে খাটের নীচে বড় জামাই রাগে ক্ষোভে আর বিরক্তিতে চূড়ান্ত পর্যায়ে। গ্রাম্য লোকটি এবার ছোট জামাইকে বললেন, ‘জামাইবাবু, তুমি তো সংস্কৃত জানো, আমাদের গীতা থেকে কিছু শ্লোক শোনাবে?’ জামাই শ্লোক পাঠ করছিলেন, ওদিকে খাটের নীচ থেকে বড় জামাইয়ের মনে হলো— ‘আরে এ তো বাংলার মতোই, শুরুতে অয়ং ভয়ং বলে আর শব্দের শেষে অনুস্বার যোগ করে। এই-ই পারাতে যদি সম্মান হয়, এ তো আমিও পারব!’ তারপর বড় জামাই সাথে সাথে খাটের তল থেকে বের হয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
‘অয়ং ভয়ং যদিং সংস্কৃতং হয়ং, বড় জামাইং কেনং খাটের তলে রয়ং!’

ইয়োর অনার, নিশ্চয় মনে প্রশ্ন জেগেছে এই গল্পের শানেনজুল কী, আবার শিরোনামের সাথে দেখি মিলও আছে, তাহলে এতক্ষণ কী নিয়ে বললেন আর এক্ষণ কী নিয়ে বলবেন?

শান্ত হোন জনাব। স্বীকার করি আমি ভণিতা অতিমাত্রায় দীর্ঘায়িত করে ফেলেছি, কিন্তু আপনিও সম্ভবত ওই অংশ মিস করে এসেছেন যেখানে আমি বলেছি ‘লাল গাউন ফেলে কালো গাউন পরে দরবারে হাজির হয়েছি।’ পুরানো অভ্যাস ছাড়া সহজ নয়, তো এসব সহ্য করতেই হবে জনাব। চলুন, আলোচনা আরও লম্বা না করে আসল কথায় যাই। ক্রমে ক্রমে সব জট খোলা হবে, আস্থা রাখুন কালো গাউনে!

উপরের গল্পে যেমন আমরা দেখেছি শুধুমাত্র অনুস্বার যোগ করেই বাংলাকে সংস্কৃত বানানো যায় না, তেমনি প্রভাবকে গ্রহণ করে যথাতথা লাগালেই হয় না, তাকে উপযুক্ত ক্ষেত্রে লাগানোতেই শ্রেষ্ঠত্ব সৃষ্টি হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠিক এখানটাতেই ভুল করে বসেছেন। প্রভাবকে রূপান্তর করতে গিয়ে তিনি যে ভুলটি করেছেন আমি মনে করি, বলতেই হয় এটি সাধারণ ভুল নয়, তিনি মানবাত্মা-পরমাত্মার প্রেমের রূপককে সাধারণ নর-নারীর প্রেমে ব্যবহার করেছেন। রক্তমাংসের প্রেমকে বানিয়ে তুলেছেন বায়বীয় প্রেম। এটা খুব সাধারণ বিষয় হতো, যদি-না রবীন্দ্রনাথ মজবুত প্রভাববলয় নির্মাণ করতেন এবং তা শতবর্ষী প্রবীণ হতো।

আমরা শেষের কবিতায় যদি চোখ বুলাই, দেখতে পাব তার সমাপ্তিতে অমিত রায় লাবণ্যের পরিবর্তে কেতকীকে বিয়ে করছেন, আর লাবণ্য করছেন শোভনলালকে। অমিত সেখানে যুক্তি দিচ্ছেন : ‘কেতকীর সঙ্গে আমার সম্বন্ধ ভালোবাসারই; কিন্তু সে যেন ঘড়ায়-তোলা জল, প্রতিদিন তুলব, প্রতিদিন ব্যবহার করব। আর লাবণ্যর সঙ্গে আমার যে ভালোবাসা সে রইল দিঘি; সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাতে সাঁতার দেবে।’

স্পষ্টতই মনে হচ্ছে এই প্রেম ঠিক নর-নারীর প্রেম নয়। নর-নারীর প্রেম একটি সুনিশ্চিত সমাপ্তি চায়, এই প্রেম কেবল মানসিক নয়, শারীরিকও। অবশ্য প্রেমের ক্ষেত্রে আমরা মানসকে প্রাধান্য দিই, তাই বলে শরীর অস্বীকার করি না। আর মনোবিজ্ঞানও এটাই বলে, শরীরকে কেন্দ্র করেই জন্ম নেয় নর-নারীর প্রেম।

আমরা যদি শেষের কবিতাকে সুফিবাদী চোখে দেখি, খুবই চমৎকার ও একটি উমদা ব্যাখ্যা পাই।
❝একদিন আমার সমস্ত ডানা মেলে পেয়েছিলুম আমার ওড়ার আকাশ; আজ আমি পেয়েছি আমার ছোট্টো বাসা, ডানা গুটিয়ে বসেছি। কিন্তু আমার আকাশও রইল।❞ —এই বাক্যটি সামনে নিয়ে আমরা এগোই।

ইয়োর অনার, অমিত রায়কে যদি আপনি ধরে নিন মজনু, আর লাবণ্য লাইলি। অমিত মানবাত্মার রূপক আর লাবণ্য পরমাত্মার। অমিতর পরমাত্মার প্রতি উৎসাহ আছে, ঠিক আগ্রহ নাই। কিন্তু একদিন হলো কী, সুফি জুনায়েদ বাগদাদির মতো অ্যাক্সিডেন্টলি পরমাত্মার দর্শন পেয়ে গেলেন অমিত, অতঃপর পরমাত্মার সাথে পূর্ণমিলনের খেয়াল তার মনে জাগরূক হলো। ঠিক করলেন সব ছেড়েছুড়ে ইমাম আল গাজালির মতো পরমাত্মার মিলনে ধ্যান করবেন। কিন্তু মানবীয় নিয়মকানুন থেকে তিনি বের হতে পারছিলেন না। জগৎ-সংসারের মায়ায় সে যে জড়িয়ে পড়েছিল বহুবছর আগে, তার পিছুটান ছিল। কেতকী হলো এখানে জগৎ-সংসারের রূপক। আর শোভনলাল হলো ফেরেশতা বা সংসারবিরাগীর রূপক, যে অমিতর মতো পরিপূর্ণ নয়। শোভনলাল কি শেষতক পরমাত্মার সাথে মিলনের সৌভাগ্য পেয়েছিল, না অমিত তথা সংসারী মানবাত্মা পেয়েছিল— এই প্রশ্ন হয়ে রবে চিরকালের অমীমাংসিত রহস্য!

সাধারণ একটি প্রেমের উপন্যাস হয়ে গেল অধ্যাত্মবাদী একটি উপন্যাস। ফরিদুদ্দিন আত্তারের ‘মানতিকুত তয়েরে’ যেমন পাখপাখালির জবানে আধাত্মিকতা শিখি, বাংলায় তেমনই শিখব রবীন্দ্রনাথ থেকে, অমিত-লাবণ্যের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে।

কিন্তু আমার মনে হয় না এই ব্যাখ্যা খুব সহজে কেউ স্বীকার করে নিবে। না নিলেই কি গীতাঞ্জলি আর শেষের কবিতা একই রকম প্রেম প্রকাশ করবে? কোথায় মানবীপ্রেম আর কোথায় ঈশ্বরপ্রেম। রবীন্দ্রনাথের এই দুটোর মধ্যে তফাৎ না তৈরিই আমি মনে করি সবচেয়ে বড় ভুল। রবীন্দ্রসাহিত্যের প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মকে যদি বড় কোনো ক্ষতি করে থাকে, তাহলে এই দিকটাতেই করেছে।

ইয়োর অনার, আপনার মনে হতে পারে তিলকে তাল বানিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনা তা নয়। পুরো বিষয়টি স্পষ্ট করে বলি : আমাদের মস্তিষ্ক এভাবে কাজ করে যে, আপনি একটি শব্দের সাথে যেই অনুভূতি যোগ করবেন, মস্তিষ্ক ওটাকেই সংরক্ষণ করে রাখবে। তেঁতুলের সাথে যদি টক শব্দ যোগ করেন, তেঁতুল শব্দ শোনামাত্র টকটক অনুভূতি আপনার মনে জেগে উঠবে। তেমনই নারীপ্রেম বলে যদি আপনি বুঝেন ত্যাগ, কেবল ‘গোপনে বিরহডোরে বাঁধা’, তাহলে যেকোনো প্রেমের সাথেই ত্যাগ শব্দ স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে যাবে। অথচ প্রেম একটি শক্তি। প্রেম মানুষকে কাবু করে না, বরং যুদ্ধংদেহী করে তুলে, প্রেমের জন্য চায় উল্টো পুরো দুনিয়াকে মুখ ভেংচিয়ে ত্যাগ করতে,— এক্ষেত্রে শুধুমাত্র আলাদা ঈশ্বরপ্রেম, সেখানেই কেবল ত্যাগ মহিমাময়, আর কোথাও নয়।

ইয়োর অনার, আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি গানের অংশ উপস্থাপন করব, পাশাপাশি উপস্থাপন করব উর্দু কবি মুজতার খয়রাবাদির একটি কবিতা, বিষয়টি আপনিই পরখ করবেন।
রবীন্দ্রনাথ লিখেন,
❝যদি আর কারে ভালোবাসো, যদি আর নাহি ফিরে আসো, তবে তাই হোক আমি যত দুখ পাই গো…❞
এখানে কবি প্রেমাস্পদকে পুরাপুরি মুক্ত করে সবধরনের ত্যাগ স্বীকার করে নিচ্ছেন। অপরদিকে মুজতার খয়রাবাদি লিখছেন,
❝তোমায় চাইব আবার তোমার অন্য প্রার্থীকেও মেনে নিব? আমার মন আমায় ফেরৎ দাও, এমন ঝগড়া হতেই পারে না!❞

কী শক্তিশালী প্রেম! এখন পাঠক যখন প্রেমের এই শক্তিমত্তা দেখে অভ্যস্ত হবে, তখন শুধু নারীপ্রেম নয়, জগতের সব প্রেমেই একই ফর্মুলা কাজে লাগাবে। সে হয়ে উঠবে সাহসী ও নাছোড়বান্দা। অথচ রবীন্দ্রনাথ নারীপ্রেমের ক্ষেত্রেই আমাদের ম্যানিপুলেট করেছেন ঋষিত্বে, তার গান শুনে আমরা উঠে দাঁড়ানোর শক্তিও খুঁজে পাই না। ‘দুর্বলতায় রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে ঠিক এই কারণেই তরুণ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ লিখেন, ‘রবীন্দ্রনাথের যে প্রবণতা তাঁর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছিল তা হলো, ঋষিত্বের প্রতি তাঁর দুরপনেয় লোভ।’

শুধু প্রভাবের ছোট্ট একটি ভুল ব্যবহার আমাদের পরিণত করেছে দুর্বল ও ভীরু জাতিতে। চিন্তা করে দেখুন, প্রভাব কী ভয়ানক জিনিস।

আমরা আবার মঁসিয়ে অঁদ্রে জিদের প্রবন্ধে ফিরি। তিনি বলছেন, ‘মহৎ ব্যক্তিরা যে বিপুল ভাবধারাকে তুলে ধরেন, অন্য দশজন তাকে সত্য বলে গ্রহণ করেন। সে ভাবধারাকে গ্রহণের মধ্যে থাকে এক নীরব ও অচেতন নতিস্বীকার।’

রবীন্দ্রনথের প্রতি এই অচেতন নতিস্বীকারই আমাদের প্রেমকে আটকে দিয়েছে ত্যাগে। আর ত্যাগের প্রতি যে ‘মহত্তর’ গুণ আমরা আরোপ করছি, সেটা সে অচেতনতারই ফল। এবং ঠিক এটিই আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে একশ বছর, পরিণত করেছে বন্ধ্যায়। আমরা এখন নতুনকে ভয় পাই।

সোজা কথায়, রবীন্দ্রনাথ একজন ভালো প্রভাব গ্রহণকারী ছিলেন, কিন্তু প্রভাব সৃষ্টির বেলায় ভালো থাকেননি, এর জন্য অতি অবশ্যই তিনি দায়ী নন, তিনি তার কাজ করে গেছেন স্রেফ, আমরাই বরং তার মধ্যে অন্ধভাবে আটকে থেকে সৃজনশীলতার পথে সীসা ঢালা প্রাচীর নির্মাণ করে বসেছি।

শিল্প সবসময় নতুনত্ব চায়, আর নতুনত্ব মিউট্যান্ট হয় পুরাতন থেকেই। শিল্পের ক্ষেত্রে নতুনত্ব পেতে হলে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে পুরাতন থেকে প্রভাব গ্রহণ করেছিলেন, যেভাবে তিনি একই সাথে গ্রহণ করেছিলেন ফারসি সংস্কৃত মৈথিলী জর্মন ও ইংরেজি সাহিত্য থেকে, আমরা যদি ঠিক তা-ই করি, সারাবিশ্বের সব সাহিত্য থেকে উদার মনে গ্রহণ করতে পারি, তাহলে নিশ্চয় ভাঙতে পারব শক্ত রবীন্দ্র-বলয়। এবং এর প্রয়োজন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আরো সমৃদ্ধশীল করার জন্যেই। তবে কিছুতেই রবীন্দ্রনাথের কৃতিত্ব অস্বীকার করে নয়, এমনকি আমরা এই বলয় ভাঙতে সহায়তা নিব খোদ রবীন্দ্রনাথ থেকেই। ইয়োর অনার, শেষের কবিতায় অমিতর জবানে তিনি নিজেই জানিয়ে দিয়েছেন আমাদের প্রথম পদক্ষেপ কী হবে—‘ওঁ (রবীন্দ্রনাথ) যদি মানে মানে নিজেই সরে না পড়ে, আমাদের কর্তব্য ওঁর সভা ছেড়ে দল বেঁধে উঠে আসা!’

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদনাইজেরিয়ায় ১২ বছরের সহিংসতায় নিহত প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ
পরবর্তি সংবাদসোমবার থেকে সারাদেশে কঠোর লকডাউন