সানোয়ার রাসেলের একগুচ্ছ কবিতা

ফজর

রাতের চরণ শেষ,
নিশাচর প্রাণিরা গেছে এবার বিশ্রামে।
পুবের আকাশে এক অদ্ভুত আলো আসে নেমে!
সুবহে সাদিক! সুবহে সাদিক!
এই আলো দেখবে না জগতের লোকে?
দেখবে না, রাত্রির ঘুম বাসা বেঁধে আছে
যাহাদের চোখে।
এমন সময়,
যেন এক সুবাতাসে বয়ে আসে
আযানের সেই শুভ ধ্বনি-
‘আস সালাতু খায়রুম মিনান নাওম’
ক্লেদের বিছানা ছেড়ে মানুষেরা উঠবে এখনি।
পশ্চাতে পড়ে রবে ব্যয়িত অতীত আর
মরে যাওয়া রাত,
সুবহে সাদিক নিয়ে এলো এক নয়া সওগাত,
নতুন প্রশ্বাসে।
শীতল বাতাসে সব ক্লান্তি উবে যায়।
সুবহে সাদিকে যারা দেখে সেই অপূর্ব আলো,
মহান রবের নামে রয় তারা নিমগ্ন সেজদায়,
অটল বিশ্বাসে!

লাশবাহী দেশের প্রতি

অত জোরে নয়
আরও অনেকটা ধীরে চলো
নম্র হয়ে
কেননা তুমি শোকাহত
তুমি একটা মানুষের লাশ বইছো
ওরকম তীক্ষ্ণ সাইরেন বাজিয়ে
রাস্তা কাঁপিয়ে
সকলকে সন্ত্রস্ত করে চলা তোমাকে মানায় না;
বড় অশ্লীল লাগে।
তুমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে চলো
নিদেনপক্ষে,
আষাঢ়ের কৃষ্ণমেঘের মতো মুখ গম্ভীর করে,
তোমার মুখ দেখে যেন সকলেই বুঝে যায়
তুমি একটা মানুষের লাশ বইছো।
লাশের বাহককে অতটা উচ্ছ্বসিত মানায় না
মৃত্যু উপত্যকায় অতটা কোলাহল বড্ড অশ্লীল লাগে।

পিতার অন্তর

দুনিয়াটা দুঃখের আখড়া,
দেশে ও বিদেশে শুধু দুঃখের খবর।

মার্কিন মুল্লুকে নাকি সাদারা ঝাঁপিয়ে পরে
কালোরঙ্গা লোকের উপর।
ইয়েমেনে শান্তি নাই,
সিরিয়ায় কে যে কারে মারে তার পাইনা ঠাহর!
বহুদিন ধরে মরে বিপ্লবী ফিলিস্তিনিরা
প্রথম কেবলায় নাকি জায়নেরা দিচ্ছে পাহারা।
স্পেনেও মানুষ মরে, ওখানেও দুঃখের পসরা,
শঙ্কায় ডুবে আছে ইউরোপ,
আফ্রিকা খুঁজে মরে শান্তিতে মরার খসড়া।

দেশের কথাই যদি ধরি,
ঝড়ে, জলোচ্ছ্বাসে, বন্যার করাল গ্রাসে
প্রতিদিন মরি।
দৈনিক পত্রিকা যেন নিয়মিত শোক সংবাদ,
খুনে, গুমে, ধর্ষণে ভরপুর– শান্তি যেন বিলুপ্ত প্রবাদ।
প্রতিদিন লাশ হই গাড়িতে, বাড়িতে,
প্রতিদিন কারবালা দেশজ হাড়িতে।

শোক-দুঃখের কথা আর কত কহতব্য,
বললে তো ফুরাবে না, তালিকা বিস্তর,
সব শোক ম্লান হয়ে যায়,
সব দুঃখ তুচ্ছ হয়, সকল খবর,
যখন শুনতে পাই বাড়ি ফিরে,
‘আজ আমার সন্তানের জ্বর।’

যে কাফেলা ছুটে চলে মানুষের দিকে

গাছে গাছে জমে আছে অন্ধকার
পাতায় পাতায়
ছিল যত জোছনার ফুল
ভুলের ঘুণপোকারা কুড়ে কুড়ে খেয়ে নিলো সব
ইয়া রব! ইয়া রব!
পাপের পায়েল পায়ে আর কত পথ
চলে যাই
চারিদিকে লোভের দরিয়া
লালসার ঢেউ ধেয়ে আসে
শ্বাপদ উল্লাসে
মানুষের ভীড় দেখি মানুষ দেখি না;
মুখের মুখোশ পরে কতিপয় অমানুষ
বিমানবিকতার হাসি হাসে।
হাওর ভেসেছে বানে
মানুষ মরেছে ভূমি ধ্বসে
অভাবের রূপ দেখি পচে যাওয়া ধানে।
তুমিও তো দেখো এই সব
ইয়া রব! ইয়া রব!
মৃত মানুষের যত জীবিত স্বজন
ঈদের নতুন জামা চাল চিনি মাংস মশলা
বেঁচে থাকাদের প্রয়োজন।
ক্ষুধা আর ভাতের চাহিদা
প্রাগৈতিহাসিক শৈবালের মতো মগজে মজ্জায়
তবু থেকে যায়।
একটি শিশুর লাল জামা
একটি দিনের ভরা থাল
মেটাতে পারে কি কভু পিতার অভাব!
মানুষের মত কিছু লোকে তবু হয়ে হয়রান
ছুটে চলে আশা নিয়ে
সাথে নিয়ে প্রাণ অম্লান
আমি শুধু দেখি সেইসব
ইয়া রব! ইয়া রব!
গাছে গাছে জোছনার ফুলে ভরে দাও হে আবার
হৃদয়ের শুভাশিস নিয়ে শুভকামী
যেন হতে পারি আমি সেই কাফেলার।

এ আবার কেমন কবি

কবি আসছেন, তা-ই নিয়ে মস্ত তোড়জোড়।
উত্তরীয়, ফুলের তোড়া
ঘৃত-প্রদীপ পঁচিশ জোড়া
কবি আসছেন, তা-ই নিয়ে উৎসাহী সবাই বিভোর!

কবি আসছেন, ব্যস্ত সবাই, প্রোগ্রামের আগে।
মঞ্চ প্রস্তুত, সুসজ্জিত
কণ্ঠ তৈরী, সুললিত
ঢলানি মলানিও বলা আছে কিছু, যদি লাগে!

শুধু কি-তাই, কবি আসছেন বলে ব্যাকস্টেজেও মস্ত হ্যাপা।
কখন কী চান,
প্রোগ্রামের ফাঁকে যদি তামুক টানতে যান!
কিংবা লালপানি?
প্রস্তুত সব, কবিদের ওসব দরকার বলেই জানি।
গেলো বারের কথা ভুলিনি,
ওসব না পেয়ে সেবারের কবি কী ভীষণ ক্ষ্যাপা!

অবশেষে চমকে গেলাম, যখন কবি এলেন আমাদের কাছে!
ঘৃত-প্রদীপ জ্বাললেন না,
লালপানি বা গাঁজা খেয়ে টললেন না,
ঢলানি মলানিদের সাথে ঢললেন না!
বক্তৃতার ফাঁকে ব্যাকস্টেজে এসে বললেন, ‘এখানে কি জায়নামাজ আছে?’

এ আবার কেমন কবি!

ফি আমানিল্লাহ

আমি ও আমরা
প্রতিদিন মৃত্যুকে দেখি
এক লহমার দূর থেকে
প্রতিদিন।
যেরকম
উড়ন্ত চিলের নখ থেকে
আচমকা খসে যায় একেকটা
কপাইল্যা মাছ, সেইভাবে দৈনিক বেঁচে ফিরি।

পথে, ঘাটে, বাজারে, বন্দরে
মৃত্যুর গায়ের খসখসে কাপড়ের
স্পর্শ পাই, বেঁচে ফিরি কেউ কেউ
ফিরে এলে
নিদাঘ বেলার মতো
মায়েদের তপ্ত হৃদয়
তরপানি শেষে ফেলে স্বস্তির শ্বাস।
পরদিন বের হতে গেলে
দোয়া পড়ে রোজকার মত বুকে ফুঁক দিয়ে বলে,
‘বাপ আমার, সাবধানে যাস।’