সাহাবিদের হাতে গড়া ১৪ শ’ বছরের ঐতিহ্যমণ্ডিত মসজিদ আল বিদিয়া

মুহাম্মাদ ইছমাইল, আরব আমিরাত থেকে

ইসলামের সোনালি যুগে সাহাবায়ে কেরামের হাতে গড়া এই মসজিদটি ১৪ শ’ বছরের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা এলাকায়। মসজিদটির নাম আল বিদিয়া মসজিদ (مسجد البدية)। আরব আমিরাতের প্রাচীনতম মসজিদ ও ঐতিহাসিক প্রত্মতাত্বিক নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত আল বিদিয়া মসজিদটি। ফুজাইরা শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার উত্তরে আল বিদিয়া নামক স্থানে ৫৩ বর্গমিটার (৫৭০ বর্গফুট) আয়তন জুড়ে মসজিদটি অবস্থিত। এটি অটোমান(ওসমানীয়) মসজিদ নামেও পরিচিত।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় ফুজাইরা প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর ১৯৯৭-৯৮ সালে মসজিদটির নির্মাণকাল নিয়ে অনুসন্ধান করে। অনুসন্ধানের রিপোর্টে, মসজিদটি ১৪৪৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে লোক মুখে শোনা যায়, ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমানের (রা.) সময় ইসলাম প্রচারের জন্য আগত কিছু সাহাবা পাহাড় কেটে এই মসজিদটি তৈরি করেন।

প্রায় ৫৭৩ বছর বয়সী আল বিদিয়া মসজিদ স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের অধিকারী। এর আকর্ষণীয় স্থাপত্যশৈলী সবাইকে অবাক করবে। যাতে অত্যন্ত দক্ষ ডিজাইনারের ছোঁয়া লক্ষ করা যায়। মসজিদটি যেখানে অবস্থিত সেই জায়গাটিও এক অনন্য পরিবেশ- একদিকে পর্বতশ্রেণী দ্বারা বেষ্টিত, অপরপাশে সাগর। বড় ও ছোট আকারের পাথর এবং কাদা মাটি দ্বারা মূলত মসজিদটি নির্মিত হয়।

সম্পূর্ণ কাঁচামাটি ও পাথরের তৈরি আল বিদিয়া মসজিদ। চারপাশের দেয়াল ছাড়া একটি মাত্র মাটির পিলারের উপর ভর করে আছে ৫ শ’ বছরেরও অধিক পুরনো এই প্রাচীন মসজিদ। কাঁচা মাটি দিয়ে পলেস্তারা করা হয়েছে দেয়ালে। বিভিন্ন সময় সংস্কার করা হলেও বর্তমানে দেয়ালের কিছু কিছু জায়গা থেকে পলেস্তারা খসে পড়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে কয়েকবার দেয়ালের রঙও পরিবর্তন করা হয়েছে। মূল মসজিদে কোনো জানালা নেই। তবে বাতাস যাতায়াতের জন্য মূল ফটকের কিছুটা অংশ প্রায় সময় খোলা থাকে।

আলো আসার জন্য ছোট ছোট কয়েকটা ফাঁকা রাখা হয়েছে। মসজিদের ছাদে ভিন্ন রকমের চারটি গোল গম্বুজ, ছোট মেহরাব ও একটি মিম্বার ভেতরের দেয়ালের কারুকাজ- সব কিছুতেই রয়েছে দারুণ নির্মাণশৈলী। কোরআন রাখার জন্য দেয়ালের চারপাশে বক্স করা আছে।

মসজিদের সামনে একটি পানির কূপ ও পেছনে দুটি দুর্গ আছে। দুর্গ দুটি মসজিদের পেছনের অংশে পাহাড়ের উপরে অবস্থিত। দুর্গ দুটি সম্পর্কেও মতপার্থক্য রয়েছে এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে। কারো মতে আজান দেয়ার জন্য ব্যবহৃত হতো এই দুর্গ, আবার কারো মতে সাহাবারা যুদ্ধের সময় নিরাপত্তার জন্য তৈরি করেছিলেন দুর্গ দুটি। দুর্গের চূড়ায় উঠলে একদিকে আরব উপসাগরের অংশ বিশেষ দেখা যায়। অপরদিকে খেজুর বাগানের নয়নাভিরাম দৃশ্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে খুব সহজে।

বর্তমানে মসজিদের ভেতরে কিছু কোরআন শরিফ, চারটি বাতি, দুটি এসি, মাইক, একটি দেয়ালঘড়ি ও একটি বিদ্যুৎ চালিত পাখা আছে। আল বিদিয়া মসজিদে জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত না হলেও প্রতিদিন এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা।

২০০৩ সালের মার্চে দুবাই মিউনিসিপ্যালিটি নিজস্ব অর্থায়নে মসজিদের বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও পর্যটকদের সুবিধার্থে নির্মাণ করেছে মহিলা ও পুরুষদের জন্য আলাদা অজুখানা, বিশ্রাম কক্ষ, পাহাড়ের উপরে দুর্গে যাতায়াতের জন্য পাথরের সিঁড়ি, সীমানা প্রাচীরসহ মসজিদের পাশে তৈরি করা হয়েছে একটি বাগান। এ ছাড়া এখানে দুটি দোকানও রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় দিবসে আমিরাতের ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্রের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় এখানে।

ফুজিরাহসহ পুরো আমিরাতের অনত্যম দর্শনীয় স্থান এটি। প্রতিদিন আল বিদিয়া মসজিদ প্রাঙ্গণ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত থাকে।

আল বিদিয়া মসজিদের অবস্থান ফুজিরাহ শহরের দিব্বা-খোরফাক্কান সড়ক হয়ে শারম থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার ও সানদী বিচ থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার দক্ষিণে আল বিদিয়া নামক স্থানে। দর্শণার্থীদের জন্য প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এটি উন্মুক্ত থাকে। এ ছাড়াও এখানে আসা পর্যটকরা ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে ফুজিরাহ, খোরফাক্কান ও কালবা বিচ। পর্যটকদের জন্য রয়েছে উন্নতমানের খাবার হোটেল, থাকার জন্য রয়েছে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই ফুজিরাহ রোটেনা, লি মেরডিয়াম ও খোরফাক্কান ওশিয়্যানিক হোটেল। নামাজ আদায়ের জন্য রয়েছে নতুনভাবে তৈরি নান্দনিক শেখ জায়েদ মসজিদ।