সিলেটে ইসলামি রাজনীতির হালপুরসি

মুনশী নাঈম:

সিলেটে নির্বাচনী লড়াই যেমনই হোক, ইসলামি বিভিন্ন ইস্যুতে সরব আছে ইসলামি দলগুলো। সিলেটে ইসলামি রাজনীতির হালপুরসি করতে কথা বলেছি সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে। তারা আসন্ন উপজেলা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন ইতোমধ্যেই। আজকের পর্বে অন্যান্য আলোচনার সঙ্গে ইসলামি রাজনীতির হালপুরসিটাও থাকলো।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ

কথা হয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সিলেট মহানগর শাখার সেক্রেটারী হাফেজ মাওলানা মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে। তিনি জানালেন, অন্যান্য জেলার মতো এখানেও জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে কমিটি রয়েছে। কেন্দ্র থেকে যে নির্দেশনা দেয়া হয়ে, তা তারা পালন করেন। তবে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তারা প্রথমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ভোটকেন্দ্রের অবস্থা হতাশাজনক। তবে মাহমুদুল হাসানের দাবি, গণমানুষ তাদের সঙ্গে রয়েছে।

সামনে পৌরসভা নির্বাচনের জন্য দলটি ইতোমধ্যেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। মহানগর সেক্রেটারী বললেন, তারা কেন্দ্রের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন।

ইসলামী ঐক্যজোট

সিলেট জেলায় সরব উপস্থিতি আছে ইসলামী ঐক্যজোটের। সরব এই কার্যক্রম ধরে রেখেছেন সিলেট মহানগর সভাপতি মুফতি ফয়জুল হক জালালাবাদী এবং জেলা সভাপতি এবং বিভাগীয় সমন্বয়ক আসলাম রহমানি। আমার কথা হয় আসলাম রহমানির সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘সিলেটে উপজেলা এবং থানা পর্যায়ে কমিটি আছে। তবে সেসব কমিটির কার্যক্রম আপাতত স্থগিত আছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনীতি করাটাও মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আমাদের মহানগর এবং জেলা কমিটি সক্রিয়। কেন্দ্র থেকে যে কর্মসূচী দেয়া হয়, তা আমরা পালন করি। নিজেরাও বিভন্ন ইস্যুতে মিটিং-মিছিল করি।’

নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গত উপজেলা নির্বাচনে আমরা ১১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি। আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি সিলেট সদরে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট বিভাগে আমরা চারটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি। আমার আসন ছিল কুলাউড়া, মুফতি ফয়জুল হকের আসন ছিল সিলেট সদর। নির্বাচনী প্রচারণায় আমরা যতবড় মিছিল করেছি, শোডাউন দিয়েছি, বিএনপিও অত বড় মিছিল দিতে পারেনি। তবে সমর্থনের তুলনায় ভোট এসেছে নেহায়েত কম। মানুষ সমর্থন দেয়, কিন্তু ভোট দেয় না।’

সিলেট মহানগর শাখার কার্যক্রম শুরু হয় ২০১১ সালে, মুফতি আমিনী রহ. এর মৃত্যুর কিছুুদিন আগে।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম:

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সিলেট মহানগর শাখার সভাপতি মাওলানা খলিলুর রহমান। জেলা সভাপতি মাওলানা মুশাহেদ আলী। গোয়াইনগাট উপজেলায় দলটির একমাত্র নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা গোলাম আম্বিয়া কয়েস। সিলেটে দলটির কার্যক্রম অন্যান্য জেলা থেকে বেশ গতিশীল। সক্রিয়, সবল।

দলটির প্রচার সম্পাদক মাওলানা সালেহ আহমাদ জানালেন, জেলার প্রতিটি উপজেলায় তাদের সক্রিয় কমিটি রয়েছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট বিভাগে দুইটি আসনে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। সিলেট-৫ আসন থেকে মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারূক এবং সুনামগঞ্জ-৩ আসন থেকে শাহিনূর পাশা চৌধুরী। আর গত উপজেলা নির্বাচনে ৫ টি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে দলটি। তবে আসন্ন নির্বাচনে দশাধিক উপজেলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।

মাজার

সিলেটে অনেক মাজার রয়েছে। এরমধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মাজার হলো:

১. হযরত শাহজালাল রহ., আম্বরখানা, সিলেট।
২. হযরত শাহপরাণ রহ., খাদিমপাড়া, সিলেট সদর, সিলেট।
৩. হযরত শাহজাদা আলী, শাহজালালের মাজারের পূর্ব পাশে।
৪. হযরত হাজী ইউসুফ, শাহজালালের মাজারের দক্ষিণ পাশে।
৫. হযরত হাজী খলিল, শাহজালালের মাজারের দক্ষিণ পাশে।
৬. হযরত হাসান শহিদ, হাসান শহিদ মহল্লা, সিলেট।
৭. হযরত নূরউল্লাহ্ ওরফে শাহ্ নূর , বন্দর বাজারের দক্ষিণ খাসিয়া পট্টি, সিলেট।
৮. হযরত শায়খ খান্ডা ঝকমক, রায়নগর মহল্লা, সিলেট।
৯. হযরত শায়খ আবু তুরাব, জেল রোড, সিলেট।
১০. হযরত শায়খ মধূ শহিদ, মধূ শহিদ মহল্লা, সিলেট।
১১. হযরত সৈয়দ মোক্তার, রায়নগর মহল্লা, সিলেট।
১২. হযরত জিন্দাগীর, জিন্দাবাজার, সিলেট।
১৩. হযরত খাঁজা আদিনা, খাস দবিরে আদিনা মসজিদের কাছে, সিলেট।
১৪. হযরত দেওয়ান ফতেহ মোহম্মদ, শেখপাড়া, সিলেট।
১৫. হযরত শাহ্ মদন , টিলাগড়
১৬. হযরত শায়খ নিজাম উদ্দিন ওসমানী, দয়ামীর, বালাগঞ্জ, সিলেট।

ওরস

ফেঞ্চুগঞ্জ ও কানাইঘাট অঞ্চল ওরসের জন্য বিখ্যাত। তারমধ্যে তালবাড়ি খালপাড়ের ওরস অন্যতম। ওরসের সময় বহুদূর থেকে মানুষ নৌকা দিয়ে মুরগি, গরু, ছাগল প্রভৃতি নজরানা স্বরূপ নিয়ে আসে। হজরত শাহজালালের মাজারে এবং শাবিপ্রবির নিকটস্থ মুইয়ার চরের হাবিবুর রহমান খোরাসানির মাজারে বেশ বড় ধরণের ওরস অনুষ্ঠিত হয়। শাহজালালের ওফাত দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত ওরসে অগুণতি মানুষের সমাগম ঘটে। রাত্রিযাপনও প্রায় সকলে দরগায় করেন।

লোকসংগীত

সিলেটের প্রত্যেক উপজেলাতেই কিছু লোককবির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তাদের গান তাদের স্ব স্ব অঞ্চলে প্রচলিত। একটা সময় এই গানগুলো বেশ প্রচলিত থাকলেও এখন অনেক কম। বাংলা একাডেমির ‘বাংলাদেশে লোকজ সংস্কৃতি: সিলেট’ বইয়ে সিলেটে বর্তমানে প্রচলিত ৪০টি মারেফতি গান, ৯টি মুর্শিদি গান এবং ১৭টি ইসলামি সংগীত উল্লেখ করা হয়েছে।

একটি ইসলামি সংগীত:

আল্লাহ লক্ষ কোটি সেজদা আমার গ্রহণ করো
তোমায় ডাকিতেছে বলে আল্লাহু আকবার
লক্ষ কোটি সেজদা আমার গ্রহণ করো।
ছামিউম বাছিরও তুমি আর জানি অন্তর্জামী
অসীম অপরাধী আমি, আমারে সংশোধন কর।
দিলে থাকলে ফাঁকি জোকি কওছাই আমি কিলা ডাকি
আমার প্রতি মায়া রাখি, বহাও রহমতের ঝড়।
শাস্তি দিলে সহ্য করমু, তুমি ছাড়া আর কোথায় যাইমু
তোমার গোলাম তোমারই রইমু মস্তফা বুঝেনা পর।

একটি মুর্শিদি গান:

আমি অকূলে পড়িয়া ও দয়াল মুর্শিদ
ডাকি তোমায় কাঁদিয়া।
একে মোর ভাঙ্গা তরী অকূলে ভাসাইতে পারি
তুমি বিনে ঘোর নিনাদে কে নিবে তরাইয়া।
অকূল নদীর তুফান দেখিয়া, প্রাণ উঠে মোর চমকিয়া
ও নামেতে কলঙ্ক রবে তরী গেলে ডুবিয়া
সঙ্গের সাথী যারা ছিল সকলই পালাইয়া গেল
ফকির আপ্তাবেরই প্রাণ থাকিতে দেখিও একবার আসিয়া।

একটি মারেফতি গান:

প্রেমিক যারা আনন্দেতে নাচিয়া বেড়ায়
থেকে প্রেম গাছের ছায়ায়।
আইদ্য যুগে প্রেম করিলা রাসুল ও আল্লায়,
আদম হাওয়া প্রেম করিয়া আইলা দুনিয়ায়।
প্রেম বাগানে ফুল ফুটেছে আজব নমুনায়
সুগন্ধেতে ভ্রমর অলি নাচিয়া বেড়ায়।
মস্তফা কয় প্রেমের গাছে উঠা বিষম দায়
মরার আগে মরছে যারা, ডালে ডালে বায়।

বিজ্ঞাপন