সৌদির সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তির নানাদিক

ইমরান চৌধুরী

সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের একটি ‘ব্যাপকভিত্তিক’ প্রতিরক্ষা চুক্তি হবার কথা কয়েকদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে। গত কয়েক মাসে দুই দেশের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বেশ কিছু সফর বিনিময় হয়েছে। এমনকি সৌদি আরব থেকে পবিত্রতম দুই মসজিদের দুইজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সফরও ঘটেছে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তিকে সামনে রেখেই।

শোনা যাচ্ছে, বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় নিজের জন্য বিভিন্ন ধরণের হাতিয়ার খরিদ ও উৎপাদন বাবদ ১০ বিলিয়ন ডলারের সাহায্য চাইবে সৌদি আরবের কাছে। আবার বাংলাদেশ সৌদি আরবের হয়ে কোন দ্বিপাক্ষিক সামরিক সংঘাতেও নিজেকে জড়িত করতে ইচ্ছুক নয়। তাহলে সৌদি আরবের সাথে সম্ভাব্য সামরিক চুক্তির কারণ কি?

ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে এখন দ্রুত সমরসজ্জার প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। আর বাংলাদেশের সামরিক শক্তিকে ঢেলে সাজাতে যে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ ও তহবিলের যোগান দরকার, তা বাংলাদেশকে দিতে পারে কেবল দুটি শক্তি- চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি ব্লকের ধনী মুসলিম রাষ্ট্রগুলো। দৃশ্যত বাংলাদেশ কেবল চীনের উপর ভরসা না করে আরব বিশ্বের দিকেও নজর দিয়েছে।

একে এক অর্থে বিচক্ষণ ফয়সালা বলা যায়। এটা এজন্যই বললাম, কারণ যদি সামরিকায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শুধুই চীনের উপর নির্ভরশীল হবার নীতিতে থাকতো, তাহলে দেশটি চীনের বলয়ে সম্পূর্ণরূপে পেঁচিয়ে যেতো। একে নিবারণে, অথবা ভারসাম্য আনায়নে, এবং চীনা অস্ত্রের পাশাপাশি উন্নতমানের পশ্চিমা হাতিয়ারের জন্য রাস্তা খোলা রাখার একটি কৌশল হতে পারে সৌদি আরবের সাথে সামরিক চুক্তির উদ্যোগ।

তবে এখানেও কথা থাকে। সৌদি আরবের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা বাজেট গ্রহণের এহেন সম্ভাবনা কয়েক বছর আগেও সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল। কিন্তু বর্তমানে অবস্থা বদলেছে। তেল নির্ভর সৌদি অর্থনীতি ক্রমেই সংকুচিত হতে শুরু করেছে। সৌদি আরব বিভিন্ন প্রকাশ্য ও প্রক্সি সংঘাতে খুব বাজেভাবে জড়িয়ে গেছে। এমতাবস্থায় সৌদি আরবের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি করার আগে খুব সাবধান হতে হবে।

আমার মতে, সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কে তহবিল আনায়ন ছাড়াও তথ্যের আদানপ্রদান, যৌথ মহড়া ও প্রশিক্ষণ, সমরাস্ত্র উৎপাদনে অর্থ ও প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে ইজারার মাধ্যমে উভয়ের, বিশেষত বাংলাদেশ কতৃক সৌদি সমরাস্ত্র ব্যবহারের বিধান রাখা সম্ভব। ইজারা বা ধার বা ভাড়ায় সৌদি হাতিয়ার ব্যবহারের সুযোগ পেলে সবচেয়ে লাভবান হবে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী। এছাড়াও কুয়েত সশস্ত্র বাহিনীর মতো বাংলাদেশী অফিসাররা প্রেষণে সৌদি সামরিক বাহিনীতেও স্টাফ ডিউটি করতে পারবে।

পাশাপাশি সৌদি আরবের সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নিবিড় হলে বাংলাদেশ বিভিন্ন পশ্চিমা অস্ত্র ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে এভাবে যে, তখন জরুরী প্রয়োজনে বাংলাদেশ যদি পশ্চিমা উৎপাদকের কাছ থেকে স্পেয়ার পার্টস নাও পেতে পারে, তাহলে চুক্তির আওতায় সৌদি আরব বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেবে। ২০০৭-০৮ সালে বার্মার সাথে যখন সামরিক উত্তেজনা ব্যাপকতর হয়েছিলো, তখন বাংলাদেশ বিমানবাহিনী কিছুদিনের জন্য স্পেয়ার পার্টসের সংকটে ভুগেছিল। জরুরী সময়ে এহেন দুর্বিপাক যুদ্ধ সক্ষমতা অনেকটা কমিয়ে দেয়।

যাহোক, সর্বোপরি সৌদি আরবের সাথে কোনরূপ সামরিক চুক্তিতে উপনীত হতে হলে বাস্তব অবস্থাকে সর্বদা মদ্দেনজর রাখতে হবে। তবে এখানে আরেকটি বিষয়কে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। তা হচ্ছে, মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক মুসলিম আবেগ ও ভ্রাতৃত্ব নির্ভর। এই সম্পর্ক কোন রাজবংশ নির্ভর নয়। উদাহরণ হিসেবে ইরানের কথা বলা যায়। ইরানে রেজা শাহ পাহলভির পতনের পর ধর্মগুরুদের শাসন কায়েম হয়ে সবকিছু ওলটপালট হলেও বাংলাদেশের (এমনকি পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও) সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তার প্রভাব ছিল অতীব অনুল্লেখ্য। সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হবার সুযোগ কম।

ইবনে সউদ রাজবংশ নিয়ে আপত্তি ও আশংকা থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য আরবের অবস্থান নিয়ে কোন সংশয় নেই। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এমনভাবে চলতে হবে, যাতে সৌদি আরবের নিজস্ব এবং অপাংক্তেয় ঝামেলায় না জড়িয়ে নিজের আখের গোছানো সম্ভব হয়, আবার সামরিক অংশীদারিও বিকশিত করা যায়…।

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদচীনে এবারো রোজা পালন নিষিদ্ধ
পরবর্তি সংবাদমুক্তামণি পরপারে