হাজী মুহাম্মদ মুহসিন : বাংলার কিংবদন্তী দানবীর

মুসান্না মেহবুব

অঢেল সম্পদের মালিক ছিলেন, কিন্তু সে সম্পদ থেকে একটা পয়সাও নিজের জন্য খরচ করতেন না, সমস্ত সম্পদ ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন ধর্ম মানবতা ও সমাজের সেবায়। নিজে কুরআন শরিফ লিখে যে অল্প খানিক রোজগার করতেন ও দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করতেন। চিরকুমার ছিলেন বিধায় সংসারের ঝামেলাও ছিল না, কুরআন লিখে পাওয়া অল্প রোজগার দিয়েই চালিয়ে নিতেন একজন মানুষের জীবন-জীবিকার খরচ। পরোপকারী দানবীর এ মহান মানুষটির নাম হাজী মুহাম্মদ মুহসিন।

নিঃস্বার্থ সমাজ সেবা ও দানশীলতার কারণে তিনি আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন। বর্তমানেও দানের ক্ষেত্রে তুলনা দিতে গিয়ে তাঁর দৃষ্টান্তই টেনে আনা হয়। প্রায় তিনশত বছর পরও তাঁর অবদান আমাদের সামনে দৃশ্যমান রয়েছে।

অঢেল সম্পত্তির মালিক ছিলেন হাজী মুহাম্মদ মহসিন। এসব সম্পদ তিনি দুহাতে অকাতরে বিলিয়ে গেছেন। মহসিনের পূর্ব পুরুষরা অত্যন্ত ধনী ছিলেন। ইরান থেকে বাংলায় আসা তার বাবা হাজী ফয়জুল্লাহ ছিলেন একজন ধনী জায়গিরদার।

মাতা জয়নব খানমেরও হুগলি, যশোর, মুর্শিদাবাদ ও নদীয়ায় বিস্তর জমি ছিল। তার বোন মন্নুজানের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী হিসেবে মহসিন বোনের সম্পত্তির মালিক হন।

এতো সম্পদের মালিক হয়েও মহসিন ছিলেন খুব ধার্মিক ও নিরহঙ্কারী। তিনি সর্বদা সহজ সরল জীবনযাপন করতেন। ইমাম বাড়া প্রাসাদ নিজের খরচে বানিয়েছিলেন, কিন্তু সে প্রাসাদে বাস করতেন না তিনি, প্রাসাদের পাশে একটি ছোট কুটিরে ছিল তার নিবাস।

১৭৩২ সালে হুগলিতে জন্মগ্রহণ করেন মহান এ দানবীর। তাঁর বাবা হাজী ফয়জুল্লাহ ও মা জয়নাব খানম। ফয়জুল্লাহ ছিলেন একজন ধনী জায়গিরদার। তিনি ইরান থেকে বাংলায় এসেছিলেন।

জয়নব ছিলেন ফয়জুল্লাহর দ্বিতীয় স্ত্রী। জয়নবেরও পূর্বে বিয়ে হয়েছিল। মন্নুজান খানম নামে তার ও তার সাবেক স্বামী আগা মোতাহারের একটি মেয়ে ছিল। আগা মোতাহারও বিপুল সম্পদের মালিক ছিলেন।

হুগলি, যশোর, মুর্শিদাবাদ ও নদীয়ায় তার জায়গির ছিল। আগা মোতাহারের সম্পত্তি তার মেয়ে মন্নুজান উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জন করেছিলেন। ১৮০৩ সালে মন্নুজানের মৃত্যুর পর মহসিন তার উত্তরাধিকারী হিসেবে সম্পদের মালিক হন।

গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে মহসিন ও তার সৎ বোন মন্নুজান শিক্ষার্জন করেছেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য রাজধানী মুর্শিদাবাদ যান। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি দেশভ্রমণে বের হন। সফরকালে তিনি হজ পালন করেন। এ সময় তিনি মক্কা, মদীনা, কুফা, কারবালাসহ বহু স্থান পরিদর্শন করেন। ইরান, ইরাক, আরব, তুরস্কসহ অনেক দেশ সফর করেছেন হাজী মহসিন। সফর শেষে দীর্ঘ ২৭ বছর পর দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফেরার পর তিনি তার বিধবা বোনের সম্পদ দেখাশোনা শুরু করেন।

বোনের মৃত্যুতে তার সম্পদের মালিক হন মহসিন। কিন্তু একজন ধার্মিক এবং সহজ-সরল জীবনের অধিকারী মহসিন সেই সম্পদ নিজে ভোগ করেননি। সম্পদের সমস্তটুকু মানুষ এবং মানবতার কল্যাণে ব্যয় করেছেন। চিরকুমার হবার কারণে বংশধরেে জন্য সম্পদ রেখে যাওয়ার কোনো তাড়াও ছিল না তাঁর।

১৭৬৯-৭০ সালের দুর্ভিক্ষের সময় তিনি অনেক লঙ্গরখানা স্থাপন করেন এবং সরকারি তহবিলে অর্থ সহায়তা প্রদান করেন। ১৮০৬ সালে মহসিন ফান্ড নামক তহবিল প্রতিষ্ঠা করে তাতে দুইজন মোতাওয়াল্লি নিয়োগ করেন। ব্যয়নির্বাহের জন্য সম্পত্তিকে নয়ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে তিনটি ভাগ ধর্মীয় কর্মকাণ্ড, চারটি ভাগ পেনশন, বৃত্তি ও দাতব্য কর্মকাণ্ড এবং দুইটি ভাগ মোতাওয়াল্লিদের পারিশ্রমিকের জন্য বরাদ্দ করা হয়।

হুগলির হুগলি মহসিন কলেজ ও চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ তাঁর দানশীলতার দৃষ্টান্ত হয়ে আজও জ্বলজ্বল করছে। এ দুটো প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সময় মহসিনের ওয়াকফকৃত অর্থ ব্যবহৃত হয়। তার পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠে দৌলতপুর মুহসিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এছাড়াও মহসিন ফান্ডের অর্থে অসংখ্য দরিদ্র ছাত্রের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে এখনও।

ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঘাঁটির নাম বিএনএস হাজী মহসিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হলের নামও তাঁর স্মরণেই রাখা হয়েছে।

হাজী মুহাম্মদ মহসিন ১৮১২ সালে হুগলিতে ইন্তেকাল করেন। তাকে হুগলি ইমামবাড়ায় দাফন করা হয়।