হাফেজ মাওলানা জাওয়াদ রহ. : সিলেটের এক আলোকিত মনীষী

মাওলানা ফয়সাল আহমাদ জালালাবাদী:

হজরত শাহজালাল, শাহপরাণ ও শায়খুল ইসলাম সাইয়িদ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. এর স্মৃতিবিজড়িত সিলেটের পূণ্য ভূমিতে জন্মগ্রহণ করেছেন অনেক মনীষী। যারা ইলম, আমল, তাকওয়া ও এখলাস দিয়ে দেশে দেশে সর্বসাধারণকে সত্যের রাহনুমায়ি করেছেন, নববি শিক্ষাদীক্ষার আলোর ধারায় হৃদয় তাদের সিঞ্চিত করেছেন।

শায়খুল হাদিস হাফেজ মাওলানা জাওয়াদ রহ. ছিলেন সিলেটের ক্ষণজন্মা মনীষীদের অন্যতম। তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ বৈচিত্র্যময় প্রতিভার উজ্জ্বল নক্ষত্র। শায়খুল আরব ওয়াল আজম শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. এর বিশিষ্ট ছাত্র। তার শিক্ষা ও দীক্ষার দৃপ্তপ্রদীপ। মাদানি শিক্ষাদীক্ষা গ্রহণ করে আজীবন দরসে হাদিসের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। পাশাপাশি দেশ ও সমাজের প্রয়োজনে সাড়া দিয়ে দক্ষ হাতে আধ্যাত্মিক চিকিৎসা করেছেন। শিরক-বিদআত, ফিরকায়ে বাতেলার প্রতিরোধে আপোষহীন লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন।

জন্ম ও জন্মস্থান

মুহাদ্দিস সাহেব রহ. ১৫ মার্চ, ১৯১৮ ইং.সালে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মস্থান সিলেট জেলাধীন কানাইঘাট থানার অন্তর্গত রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের সুপ্রসিদ্ধ পারকুল গ্রামে, তাঁর পিত্রালয়ে। বাবার নাম জনাব আব্দুল বারী। দাদার নাম জনাব ইয়াসিন মিয়া। পরদাদার নাম সাধু চৌধুরী।

তাঁর বাবা-মা ছিলেন অত্যন্ত আল্লাহভীরু ও ধর্মপরায়ণ। পরিবেশগতভাবেই তাঁর পরিবারে ধর্মানুভূতির আবহ বিরাজমান ছিল। বাবা-মা তাঁদের ধর্মীয় চেতনা থেকেই শিশু মুহাদ্দিস সাহেবের জন্য ধর্মীয় তাৎপর্যমণ্ডিত একটি নাম নির্বাচন করেন। তাঁর নাম রাখেন মুহাম্মদ জাওয়াদ। জাওয়াদ অর্থ দাতা বা দানশীল। তিনি তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধ্যায় থেকে ‘মুহাদ্দিস সাহেব’ উপাধিতে ভূষিত হন। আজও তিনি সকলের কাছে মুহাদ্দিস সাহেব নামেই পরিচিত।

পড়ালেখার হাতেখড়ি

মুহাদ্দিস সাহেব হুজুর রহ. এর বাবা-মা ধর্মপরায়ণ হওয়ার সুবাদে ধর্মীয় শিক্ষা দিয়েই তার পড়ালেখার হাতেখড়ি হয়। শিক্ষাজীবনের শুরুটা হয় বাড়িতে, তাঁর বিদুষী বাবা-মায়ের কাছে। কায়দা আমপারা এবং পবিত্র কুরআন করিমের নাজেরা পড়া শেষ হলে তাঁর শিক্ষজীবনে সাময়িক সঙ্কট দেখা দেয়। বাড়ির আশপাশে দু’দুণ্ড এলাকায় উল্লেখযোগ্য কোন শিক্ষাকেন্দ্র না থাকায়, পারিবারিক অজানা কোন কারণে তাঁকে পড়ালেখা ক্ষান্ত দিতে হয়। এ সময় তাঁকে পারিবারিক কাজকর্মে একান্ত হতে হয়।

সব আল্লাহর বিধান। পড়ালেখার প্রতি মুহাদ্দিস সাহেব রহ. এর আগ্রহ ও আন্তরিকতা ছিলো ঐকান্তিক ও অপরিমেয়। তাই বুঝি আল্লাহ পছন্দ করে তাঁকে এ আয়াতাধীন লোকদের অন্তর্ভূক্ত করেছেন; الله يجتبي إليه من يشاء ة ويهدي إليه من ينيب (১৩) অর্থ : ‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছা মনোনিত করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী হয় তাকে পথ প্রদর্শন করেন।’(সূরা:শুরা আয়াত ন.১৩)

তিনি আল্লাহর ‘মনোনয়নের’ নেয়ামত লাভ করেছিলেন। সমাজের সব ধরণের কুসংস্কারকে তিনি কুপোকাত করেছিলেন। তিনি আল্লাহ অভিমুখী হয়ে তাঁর পথে প্রদর্শিত হয়েছিলেন।

হিফযুল কুরআন

তৎকালীন সিলেটে ইলমে কেরাতে বিজ্ঞ ও বিদগ্ধ এবং আদর্শ ছাত্র গঠনে বিখ্যাত ছিলেন হাফেজ কারি আব্দুল হাই রহ.। মুহাদ্দিস সাহেব রহ.তাঁর সোহবত-সাহচর্য ও শিষ্যত্বে নিজেকে সমর্পণ করেন। এবং অতি অল্প সময়ে কুরআন করিমের হিফয সমাপ্ত করেন। হিফয শেষে আপন উসতাযের কাছে পুরো কুরআন বিনা লুকমায় (নির্ভুল)শোনান। উসতাযে মুহতারাম খুশি হয়ে তাঁর মাথায় হিফয সমাপনের স্বীকৃতি স্বরুপ দস্তারে ফজিলত পাগড়ি পরিয়ে দেন। হযরত মুহাদ্দিস সাহেব রহ. এর তেলাওয়াত ছিলো অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর ও হৃদয়াকর্ষক। তাঁর তেলাওয়াতে আহ্লাদিত হয়ে উঠতো কুরআনের মর্মবাণী। কুরআনের শব্দগুলো তাঁর ওষ্ঠযুগলে চমকিত হতো পূর্ণিমায় নক্ষত্রের মত। কণ্ঠে সুরে-সুরে তরঙ্গায়িত হতো জান্নাতি সমীরণের মধুর আবেশ। মুহাদ্দিস সাহেব রহ.শেষ বয়সে হার্টের রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত অধিক হারে কুরআন তেলাওয়াত করতেন। তিনি রমযানে এতেকাফ করতেন। এতেকাফ অবস্থায় প্রতিদিন অন্তত একবার খতম করতেন। তেলাওয়াতের আধিক্যতার করণ তাঁর হিফয ছিলো ওষ্ঠধর মজবুত, অনর্গল মুখোপস্থিত।

উচ্চশিক্ষার সন্ধানে

ছাত্র মুহাদ্দিস সাহেব রহ. প্রাথমিক শিক্ষা এবং কুরআনে কারিমের হিফয অত্যন্ত সুচারুরূপে সম্পন্ন করে ইলমে ওহীর প্রতি অপরিমেয় আগ্রহ ও আন্তরিক অভিনিবেশ থেকে তৎকালীন সিলেটের মাদারে-ইলম কানাইঘাট থানাধীন গাছবাড়ি জামিউল উলূম মাদরাসায় ভর্তি হন। তাঁর মেধা মনোযোগ ও মননশীলতা ছিলো সকল ছাত্র-উসতাযের মনজয়ী ও আস্তার্জক। আসাতিযা কেরামের খিদমত ও পরিচারণে ছিলেন স্বভাবজাত। মাদরাসার নিয়ম-কানুনের প্রতি তাঁর অন্তর্গত সবিনয় শ্রদ্ধাশীলতা ছিলো সকলের স্নেহ ও সুধারণা অর্জনকারী। আর এ সবের স্বতঃস্ফূর্ততার কারণে তিনি অতি অল্পসময়ে আসাতিযায়ে কেরামের একান্ত নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন এবং সকলের কাছে সুছাত্রের খ্যাতি অর্জন করেন। মুহাদ্দিস সাহেব রহ.এর মুশফিক ও মুহসিন উসতায, শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর সুযোগ্য ছাত্র হযরত মাওলানা ফজলে হক ফাজিল সাহেব রহ.(মৃত্যু:১৯৮৯ঈ.) তাঁর উপর সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেছিলেন “কেয়ামতের দিন আল্লাহ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন—তুমি নাজাতের জন্য কী নিয়ে উপস্থিত হয়েছে? আমি তখন হাফেজ জাওয়াদকে আল্লাহর দরবারে পেশ করবো।”

এছাড়া ছাত্র মুহাদ্দিস সাহেব রহ.আপন এখলাস ও এখতেসাস,তায়াক্কুজ-তাফক্কুর-ফাঈলিয়্যাত-হিকমত দ্বারা আসাতিযা কেরামের এতটাই আস্থার পাত্র হয়েছেন, তাঁকে পুরো প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সেক্রেটারির দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। গাছবাড়ির এই প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি সর্বাদৃত সুনামের এবং চূড়ারোহিত সফলতার সাথে সবকটি শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। সবিশেষ ১৯৪৭ ঈ.সালের মাঝামাঝি সময়ে আসাম শিক্ষবোর্ডের অধীনে পরিচালিত মাদরাসা বোর্ডের পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে ফাজিল সমাপন করেন। এখানে তাঁর উসতাযগণের মধ্যে আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরি রহ.(১৩২৭-১৩৯০ হি.) এবং মাওলানা ফজলে হক ফাজিল সাহেব রহ. ছিলেন অন্যতম। এরপর আলিয়া ধারার সর্বোচ্চ স্তর ‘কামিল’ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার জন্য ১৯৪৭ এর শেষের দিকে আসাতিযা কেরামের পরামর্শে সিলেট আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানেও তিনি আসাতিযা কেরামের প্রতি নতশির শ্রদ্ধা, পড়ালেখায় স্থির মনোযোগ এবং আমলে-আখলাকে সযত্ন ও আদর্শবান হওয়ার অল্পসময়েই সকলের নজর কাড়তে সক্ষম হন। ১৯৪৮ ইং. এর শুরুর দিকে সরকারি মাদরাসার শিক্ষাবোর্ডের ‘কামিল’ শ্রেণির বার্ষিক কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের সাক্ষর রাখেন। সিলেট আলিয়া মাদরাসায় তাঁর আসাতিযা কেরামের মধ্যে আল্লামা সহুল উসমানি রহ. এবং আল্লামা মুহাম্মদ হুসাইন রহ.(জৈন্তা) ছিলেন অন্যতম।

দেওবন্দ গমন

মুহাদ্দিস সাহেব রহ.গাছবাড়ি ও সিলেট আলিয়ায় তৎকালীন প্রথিতযশা বিদগ্ধ ওলামায়ে কেরামের সাহচর্য ও শিষ্যত্ব লাভের পর ইলমে দ্বীনের গভীর ব্যুৎপত্তি অর্জনের লক্ষ্যে ১৩৬৭ হিজরী মোতাবেক ১৯৪৮ ঈ. সালের মাঝামাঝি সময়ে দারুল উলূম দেওবন্দ গমন করেন। মুহাদ্দিস সাহেব রহ. যখন দারুল উলূম দেওবন্দ ভর্তি হন তখন ‘সদরুল মুদার্রিসীন এবং শায়খুল হাদিস ছিলেন শায়খুল ইসলাম সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ.(১২৯৬-১৩৭৭ হি.)। মুহাদ্দিস সাহেব রহ. সেখানেও পড়ালেখার প্রতি প্রত্যয়-প্রাণ প্রবণতা, আমলের প্রতি অপরিমেয় আগ্রহ, অনুপম আদর্শ এবং আসাতিযা কেরামের প্রতি অন্তরগত অকৃত্রিম অনুরক্তির ফলে তাঁদের একান্ত কাছের হয়ে ওঠেন।

বিশেষত হযরত মাদানি রহ. এর সাথে তাঁর সুনিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মুহাদ্দিস সাহেব রহ. শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর কাছেই বুখারি শরিফ এবং সুনানে তিরমিযি শরিফ অধ্যয়ন করেন। এছাড়া হাকিমুল ইসলাম কারি তায়্যিব রহ.(১৩১৫-১৪০৩ হি.) আল্লামাতুল মা‘কুল ওয়াল মানকুল ইবরাহিম বলয়াবি রহ.(১৩০৪-১৩৮৭ হি.) শায়খুল আদব ওয়াল ফিকহ আল্লামা এ‘জাজ আলী রহ.(১২৯৯-১৩৭৪ হি.) প্রমুখ আসাতিযা কেরামের সুপ্রিয় ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। তিনি দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে দাওরা হাদিস শেষ করেন ২১ শা‘বান ১৩৬৮ হি.মোতাবেক ‘১৮ জুন ১৯৪৯ ইং.তারিখে.(ফয়যানে শায়খুল ইসলাম নাম্বার)

মাদানি ভক্ত মুহাদ্দিস সাহেব রহ.

শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর প্রতি মুহাদ্দিস সাহেব রহ. ছোটবেলা থেকেই অনেক দুর্বল ছিলেন। তাঁর এ দুর্বলতার মূলে শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর সিলেট গমন ও অবস্থানের সাথে অনেকটা সহোদর-সম্পর্ক রয়েছে। হযরত শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. সিলেট আগমন ও অবস্থানকালে মুহাদ্দিস সাহেব রহ. এর বয়স ছিলো ৬/৭ বছর। একটি শিশুর ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপিত হয় তার বাবা-মা,পরিবার ও পারিপার্শ্বিক আদর্শের উপর। মুহাদ্দিস সাহেব রহ. একটি ধর্মপরায়ণ পরিবারের সদস্য হওয়ার সুবাদে এ ছোট্ট বয়সেই শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর বিভিন্ন মাহফিলে শ্রোতা হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন এবং তাঁর হৃদয়াকর্ষক দ্বীনি আলোচনা শুনতে থাকেন। সাথে সাথে অন্বেষণমনা বাল্যচোখে শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর জীবনাদর্শ এবং গতিপ্রকৃতি অবলোকন করে চলেন। সে থেকেই ছোট্ট মুহাদ্দিস সাহেবের মানসপটে শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর মাধুরিমা উম্মেষিত হতে থাকে। দিন যত গড়াতে থাকে, অল্পে অল্পে বালক মুহাদ্দিস সাহেবের দৃষ্টিও প্রসারিত হতে থাকে। আর তাঁর বিকাশোম্মুখ মনমুকুরে শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর পরিচয়, অবস্থান, সাধনা, সংগ্রাম, যুহদ, তাকওয়া, ইনাবত ইলাল্লাহর সুবিমল নির্মল ও হৃদয়গ্রাহী পরিচয় প্রকাশ পেতে থাকে।

এভাবে শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর আদর্শ, চেতনা, শ্রদ্ধা-ভক্তি, প্রেম-ভালবাসা, সর্বোপরি তাঁর মুখচ্ছবি-মানচ্ছবি মুহাদ্দিস সাহেবের অন্তরতলে প্রোত্থিত হয়ে ওঠে। শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. সিলেট থেকে দেওবন্দ পুনঃগমনের পরও তাঁকে,তাঁর আদর্শও চেতনাকে হৃদয়ের বরণডালায় সাজিয়ে রাখেন মুহাদ্দিস সাহেব রহ.। তাই প্রতিবছর শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর সিলেট সফরের জন্য মুহাদ্দিস সাহেব রহ.অত্যন্ত আগ্রহী থাকতেন।
একবার শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ.গাছবাড়ি জামিউল উলূম মাদরাসায় আগমন করেন। মুহাদ্দিস সাহেব তখন গাছবাড়ি মাদরাসার ছাত্র এবং উক্ত প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সেক্রেটারিও ছিলেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই তাঁর উপর অর্পিত হয় শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর সংবর্ধনা আয়োজনের দায়িত্ব। তখন সিলেট থেকে গদার বাজার পর্যন্ত পাকা রাস্তার সংযোগ ছিলো। পরবর্তী প্রায় ৪/৫ মাইল পথ তখনও কাঁচা রাস্তার ছিলো। হযরত মুহাদ্দিস সাহেব রহ. উক্ত সংবর্ধনায় মাদরাসা ছাত্রদের পাশাপাশি সর্বসাধারণেরও ব্যাপক সম্পৃক্ত করেছিলেন। ফলে সংবর্ধনা আয়োজনে উপচে পড়া বিশাল এক কাফেলা উপস্থিত হয়। এ কাফেলা গদার বাজার অতিক্রম করে মাদরাসা পর্যন্ত বিস্তৃত পথে শায়খুল মাদানি রহ.কে প্রাণভরে সংবর্ধনা জানায়। শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. ছিলেন সাদামাটা একটি সাধারণ গাড়িতে। গাড়ি এগিয়ে চলছে। গাড়ির সাথে সাথে জনতার এ দীর্ঘ সারি লম্বা পথ পায়ে হেঁটে শীর্ণ-দৃশ্য এ স্বর্ণ-যাত্রীকে গাছবাড়ি পর্যন্ত নিয়ে আসে। মুহাদ্দিস সাহেবের এ নজিরবিহীন সংবর্ধনা আয়োজন এবং বিপুল জনসমাগমের ইতিহাস প্রবীণদের মুখে মুখে সপ্রশংস জীবন্ত হয়ে আছে। (তথ্য সূত্র:আল্লামা জিল্লুল হক, সাবেক হেড মুহাদ্দিস সিলেট আলিয়া)

মুহাদ্দিস সাহেবের এ আন্তরিকতা, ভক্তি-শ্রদ্ধা ও আত্মিক সম্পর্কের দৃঢ় রজ্জু হযরত শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর অন্তিম মুহুর্ত পর্যন্ত অটুট ছিলো।অতঃপর মুহাদ্দিস সাহেব ভালবাসার এ অনন্য বাঁধনে জড়িয়ে নেন তাঁর পুত্রদেরও।

মাদানি পরিবারের সাথে মুহাদ্দিস সাহেব রহ. এর ঘনিষ্ঠতা

একবার হযরত মুহাদ্দিস সাহেব রহ. অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ অসুস্থতা তাঁকে সিলেটের পুরাতন সদর হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়েছিলো। শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর বড় সাহেবযাদা ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়িদ আসআদ মাদানি রহ.(১৩৪৬-১৪২৭ হি.) তখন সিলেট সফরে ছিলেন। উল্লেখ্য,মুহাদ্দিস সাহেব রহ.ফেদায়ে মিল্লাত রহ. এর সহপাঠি ছিলেন। সহপাঠির অসুস্থতার কথা শুনে ফেদায়ে মিল্লাত রাহ.পুরাতন সদর হাসপাতালে তাঁর হাল পুরসি করতে যান। ফেদায়ে মিল্লাতের আগমন উপলক্ষে সেদিনের হাসপাতাল যেন ওলামায়ে কেরামের মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিলো। তিনি মুহাদ্দিস সাহেবের পাশে কিছুক্ষণ অবস্থান করেন। হাল-পুরসি শেষে তিনি সহপাঠীর আরোগ্য কামনা করে উপস্থিত সকলকে নিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। (প্রত্যক্ষদর্শী, মাও.তাজুল ইসলাম, সাহেবযাদা মুহাদ্দিস সাহেব রহ.)

উসতাযভক্তি

হযরত মুহাদ্দিস সাহেব ছাত্রজীবনে যেমন উসতাযভক্ত এবং প্রাণোৎসর্গ ছিলেন, কর্মজীবনেও তাঁদের আদেশ পালন, খেদমত ও ইহতেরামের প্রতি সদাসচেতন ছিলেন। একবার কানাইঘাট থানাধীন আকুনি মাদরাসার কোন একটি বিষয় নিয়ে মতানৈক্য হয়। একপক্ষে ছিলেন তাঁর জনৈক উসতায, অপর পক্ষে ক’জন গ্রামবাসী। বিষয়টি সমাধানের জন্য সকলে মুহাদ্দিস সাহেবকে মনোনীত করলো। দিনক্ষণে সকলে বসলো। আলোচনা শুরু হলে গ্রামবাসীর পক্ষে কিতাব দেখার প্রয়োজন হলো। গ্রামবাসীর পক্ষের একজন আলেম মাদরাসার মাকতাবা থেকে একটি কিতাব এনে পড়তে শুরু করলো। মুহাদ্দিস সাহেব তাকে খুব শক্ত ভাষায় ধমকে থামালেন। বললেন, ‘এখানে আমাদের মুরব্বি উসতায রয়েছেন। প্রয়োজনে তিনি কিতাব পড়ে আমাদের বুঝাবেন। তিনি তাঁর জ্ঞানগভীরতা ও তীক্ষ্ণতা থেকে তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে বলতে পারবে?’

মুহাদ্দিস সাহেব সেদিন বিচারকের আসনে হয়েও উসতাযের ইহতেরামও সম্মানের প্রতি লক্ষ্য রেখে নিজেকে ছাত্ররূপেই পেশ করেছেন। এমনি আসাতিযার ভক্তি-শ্রদ্ধায় তাঁর হৃদয় পুরিপূর্ণ ছিলো। মুহাদ্দিস হিসেবে ব্যাপক সুখ্যাতি অর্জনের পরও আসাতিযা কেরামের সামনে নিজেকে অবনত রাখতেন। কোন একজন উসতাযের সাথে সাক্ষাত হলে নিজেকে খেদমতের জন্য এগিয়ে দিতেন। সত্যিই যে যত বড় হয়, সে তত নত হয়। যে যত নত হয়, সে তত নড় হয়।

অধ্যয়নে মনযোগিতা

মুহাদ্দিস সাহেব রহ. পড়ালেখার প্রতি সচেষ্ট ছিলেন। আসাতিযা কেরামের পাথেয় গ্রহণ এবং নির্দেশ পালনে ছিলেন অকুন্ঠ। তিনি যখন ছোট্ট জাওয়াদ, কারী আব্দুল হাই সাহেবের কাছে কুরআন হিফয পড়ছেন, একদিন সূরা ইনশেরাহের এক আয়াতে সিফাত আদায়ে ত্রুটি হয়েছিল। কারী সাহেব তাকে স্নেহসিঞ্চিত কল্যাণাদেশ শোনান-‘এই শব্দটি যতবার ভুল পড়েছো, ততবার শুদ্ধ করে পড়।’ মুহাদ্দিস সাহেবের উসতাযের কথা মত ১৪ হাজার বার আয়াতটি মশক করেন। (তথ্যসূত্র: হা. রজব আলী)

ফাজিল পরীক্ষা দেওয়ার জন্য মুহাদ্দিস সাহেবের একান্ত উসতায হযরত মাও.ফজলে হক ফাজিল সাহেব পরীক্ষাকেন্দ্রে ছাত্রদেরকে নৌকাযোগে নিয়ে যাচ্ছেন। মুহতারাম ফাজিল সাহেব মুহাদ্দিস সাহেবকে বয়যাবি কিতাব পরীক্ষার দিন জিজ্ঞেস করলেন কী পড়েছো? মুহাদ্দিস সাহেব উত্তরে বললেন, হুজুর যা পড়িয়েছেন, আল্লাহর ফজলে পূর্ণটুকু শুনিয়ে দিতে পারব। মুহতারাম ফাজিল সাহেব বললেন, ঠিক আছে আমাকে এখনই শুনিয়ে দাও। মুহাদ্দিস সাহেব উসতাযের নির্দেশ পেয়ে নৌকায় বসে বায়যাবি শরিফের সিলেবাসের পূর্ণটুকু হুবহু অক্ষরে আক্ষরে শুনিয়েছেন।(মাও. সালাহুদ্দিন, ছাত্র)

মুহাদ্দিস সাহেব রহ. কিতাব মুতালাআয় বসলে এক ধ্যানে একাগ্রচিত্তে অবিরাম রত থাকতেন। তিনি যখন গাছবাড়ি মাদরাসার তালিবুল ইলম, নারায়ণপুর গ্রামের আলহাজ উসমান আলী সাহেবের ঘরে লজিং থকতেন। শৈশবে একবার আমি (লেখক) বাড়িতে গিয়েছিলাম। জনৈক বৃদ্ধা আমাকে জানালেন-‘মুহাদ্দিস এশার পরে পড়াশোনায় মগ্ন হলে ফজর হয়ে যেত, তাঁর কোন হুশও থাকত না। ভেতর থেকে তাঁকে ফজরের সংবাদ জানালে তিনি উঠে ফজর আদায় করতেন।’

ইলমে ওহীর খেদমত

মুহাদ্দিস সাহেব রহ. আসাতিযা কেরামের বিশেষ আস্থা, সুদৃষ্টির সৌভাগ্য এবং তাঁদের হৃদয় খোলা দোআ নিয়ে অত্যন্ত সুনামের সাথেই ছাত্রজীবন শেষ করেন। ইলমে ওহীর প্রতি তাঁর তৃষাতুর প্রাণের তীব্র তামান্না ছিলো মাতৃক্রোড় থেকে। ইলমে আমলে আদবে আখলাকে অনন্য মুহাদ্দিস সাহেব খেদমতের জীবন কেবল শুরু করলেন। দরস-তাদরীসের স্বাতন্ত্রময় জীবনব্রত নিয়ে দেওবন্দ থেকে দেশের মাটিতে পা রাখবেন মাত্র। খেদমত –জীবনের এ সূচনালগ্নেই শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ.তাঁকে দরসে হাদিসের জন্য নির্বাচন করেন।

বগুড়া জামিল মাদরাসা:(১৯৪৯-১৯৫১ ইং.)

হযরত মুহাদ্দিস সাহেব রহ. কর্মজীবনে সর্বপ্রথম বগুড়া জামিল মাদরাসায় শায়খুল হাদিস পদে নিয়োজিত হন। উত্তরবঙ্গের দেশখ্যাত এই প্রতিষ্ঠানটি তখন হাদিসের দরস দানের জন্য হযরত শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর কাছে হাদিস শাস্ত্রবিদগ্ধ একজন আলেমের আবেদন জানায়। হযরত শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর প্রথম দৃষ্টি পড়ে মুহাদ্দিস সাহেবের উপর। অতঃপর শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. তাঁকেই মনোনীত করেন। শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর এই মনোনয়নে প্রতিষ্ঠানটি সাদরে সানন্দে সম্মতি জানায়। শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ.মুহাদ্দিস সাহেবকে যখন পাঠাবেন, দোআ স্বরুপ নিজের মহত্তর পাগড়িটি মুহাদ্দিস সাহেবের মাথায় পরিয়ে তাঁকে মহিমান্বিত করেন। কেন যেন বিদায় বিরহ ভুলে থাকার একটি নিদর্শন মুহাদ্দিস সাহেবকে জড়িয়ে দেন।

হযরত শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর হেদায়েত ও পথ নির্দেশে মুহাদ্দিস সাহেব দেওবন্দ থেকে সরাসরি বগুড়া জামিল মাদরাসায় আগমন করেন।এবং তাদরীসী জীবনের শুরু থেকেই বুখারি শরিফ অধ্যাপনার হিরকোজ্জ্বল সৌভাগ্য অর্জন করেন।

তাঁর জীবনি গ্রন্থ ‘ইলমে ওহীর আলোকস্নাত’ মোড়ক উম্মোচনের দিন প্রধান অতিথি আল্লামা মুহিব্বুল হাক দা.বা. (শায়খুল হাদিস ও মুহতামিম কাসিমুল উলূম দরগাহ মাদরাসা) তাঁর প্রদত্ত বক্তব্যে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের যে সকল সূর্যসন্তান তাদরীসী জীবনের প্রথম থেকে বুখারি শরিফ অধ্যাপনার হিরকোজ্জ্বল সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, তাঁদের মধ্যে হযরতুল আল্লাম হাফিয জাওয়াদ রহ. এর নাম অন্যতম।’ তিনি বুখারি শরিফ অধ্যাপনার সৌভাগ্য অর্জন করার জন্য মাদরাসা পরিবর্তন বা মাদরাসায় কোন্দল সৃষ্টি করাকে সম্পূর্ণরুপে মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন। আমাদের রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম মসনদে বুখারির আসন অলংকৃত করেন।

একটি মকবুল এদারায় বুখারি শরিফের দরস দিয়ে কর্মজীবনের শুভসূচনা তাঁর জীবনেও মাকবুলিয়াতের প্রতীক বহন করে। তাঁর ইখলাস ও ইখতেসাসের বদৌলতে জামিল মাদরাসার তলাবা ও আসাতিযা কেরামের কাছে একজন মিছালি ও আদর্শ উস্তায বলে বিভূষিত হন। বলতে বলতে ১৯৪৯-১৯৫১ঈ.এর সংক্ষিপ্ত সময়ে জামিল মাদরাসার বাইরে নানা জায়গায় নানা প্রতিষ্ঠানে তাঁর দরসের, ইলমও আমলের, আখলাক ও আদর্শের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

আশরাফুল উলূম বালিয়া মাদরাসা, মোমেনশাহী:(১৯৫১-১৯৫৩ইং.)

১৯৫১-১৯৫২ ইং. শিক্ষাবর্ষে বৃহত্তর মোমেনশাহীর সুপ্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল উলূম বালিয়া মাদরাসায় দাওরা হাদিস চালু হয়।ফলে সেখানে হাদিস বিশেষজ্ঞ একজন শায়খুল হাদিসের প্রয়োজন দেখা দেয়। সেখানে দাওরা হাদিসের উদ্যেক্তা ছিলেন শায়খুল হাদিস আল্লামা যাকারিয়া কান্ধলবি রহ. (১৩১৫-১৪০২হি.) এর স্নেহভাজন ছাত্র আল্লামা দৌলত আলী রহ.(১৯০১-১৯৮৮ঈ.)। সাথে সাথে তিনি বালিয়া মাদরাসায় বুখারি শরিফের দরসের জন্য মুহাদ্দিস সাহেবকে মনোনীত করেন। এবং মুহাদ্দিস সাহেবের জন্য সৌভাগ্যের এই বার্তা নিয়ে সিলেটে তাঁর গ্রামের বাড়িতে নিজেই আগমন করেন। মুহাদ্দিস সাহেব রহ. আল্লামা দৌলত আলী রহ. এর মত ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তির আবহ থেকে এবং বুখারি শরিফ পাঠদানের সৌভাগ্যে শামিল হতে আন্তরিক উচ্ছ্বাসের সাথে প্রস্তুত হন। সেমতে ১৯৫১ ইং.সালের মাঝামাঝি সময়ে জামিল মাদরাসায় ইস্তফা দিয়ে বালিয়া মাদরাসায় বুখারির মসনদে সমাসীন হন। ১৯৫১-১৯৫৩ ইং.পর্যন্ত তিনি বালিয়া মাদরাসায় বুখারি শরিফসহ আরও কয়েকটি হাদিসের কিতাবের দরস প্রদান করেন। তাঁর জ্ঞানগর্ভ ইখলাসানা দরস মোমেনশাহীর আলেম ও তালেবুল ইলমদের মাঝে সমূল্য সমাদৃত হয়। তৎকালের ওলামায়ে কেরাম আজও সপ্রশংস তাঁকে আস্থা ও মহব্বতের দৃষ্টিতে স্বাতন্ত্রতার স্বীকৃতি প্রদান করেন। (তথ্যসূত্র: শায়খুল হাদিস হযরত মাও. গিয়াসুদ্দীন রহ. শায়খে বালিয়া)

হয়বতনগর মাদরাসা, কিশোরগঞ্জ (১৯৫৪-১৯৫৯ ইং.)

১৯৫৪ ইং.সাল থেকে মুহাদ্দিস সাহেবের তাদরীসে ধন্য হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয় কিশোরগঞ্জের আনওয়ারুল উলূম হয়বতনগর মাদরাসা। বিশ্ববরেণ্য হাদিস বিশারদ ফখরে আলম আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি রহ.(১২৯২-১৩৫২হি.) এর নামে মাদরাসারটির নামকরণ হয় ১৯৩৪ ইং.সালে।মাদরাসাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তাঁরই স্নেহধন্য ছাত্র সিলেট বিজয়ী সাইয়িদ নাসিরুদ্দীন রহ. এর বংশধর এবং উত্তরসূরী, ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের বীর মুজাহিদ আল্লামা সাইয়িদ মুসলেহ উদ্দীন রহ. (১৯০৬-১৯৮৯ঈ.)। অল্প সময়ে আনওয়ারুল উলূম মাদরাসা বৃহত্তর মোমেনশাহীতে ইসলামী শিক্ষার প্রাণকেন্দ্ররূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে। মাকবুলিয়াতের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৯ ইং .সালে মাদরাসাটি ‘কামিল’ শ্রেণীতে উন্নীত হয়। ইতোমধ্যে মাও. মুসলেহ উদ্দীন রহ. এর ইসলামি আন্দোলনের কর্মপরিধি বহুধা বিস্তৃত হওয়ায় হয়বতনগর মাদরাসার জন্য একজন সুবিজ্ঞ ও সুযোগ্য হেড মুহাদ্দিসের প্রয়োজন হয়। মাও.মুসলেহ উদ্দীন রহ.এর বিচিন্ত দৃষ্টিতে মুহাদ্দিস সাহেব রহ. এর পাণ্ডিত্য ও প্রাজ্ঞতা প্রধান্য পায়। তিনি মাদরাসার জমিদাতা দেওয়ান মান্নান দাঁদ খার সাথে পরামর্শপূর্বক তার নিমন্ত্রণনামাসহ মুহাদ্দিস সাহেবকে হাদিসের হিরণ্বিত মসনদে সমাসীন করতে প্রাণপন চেষ্টা অব্যাহত রাখেন।

মুহাদ্দিস সাহেব রহ. নানাদিক চিন্তা করে এই প্রতিষ্ঠানে দ্বীনের তাকাযা অত্যাধিক বলে স্থির পান এবং মাও.মুসলেহ উদ্দিন সাহেবকে ‘হ্যাঁ জ্ঞাপক’ সম্মতি ও সিদ্ধান্ত জানান। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খিদমতরত বালিয়া মাদরাসায় ইস্তফা পেশ করেলে তাঁকে তাঁর যোগ্য স্থলাভিষিক্ত মুহাদ্দিসের সন্ধান দেয়ার অনুরোধ করা হয়। তিনি শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর খাস শাগরেদ বরিশাল মাহমুদিয়া মাদরাসার তৎকালিন মুহাদ্দিস হযরত নুরুদ্দিন গহরপুরি রহ. (১৯২৪-২০০৫ঈ.) কে এ মর্মে অনুরোধ জানালে তিনি রাজি হন। মুহাদ্দিস সাহেব রহ. গহরপুরি রহ.কে স্থলাভিষিক্ত করে ১৯৫৪ঈ.সালে হয়বতনগরে কামিল মাদরাসায় হাদিসের খেদমতে আত্মনিয়োগ করেন।

তাঁর এখানকার দরসে বুখারি এতই সমাদৃত হয়েছিল, তখনকার সময়ে দুই শতাধিক তালিবুল ইলম তাঁর দরসে ইলমুল হাদিস আহরণ করত। সেখানে তাঁর অনুপম আদর্শ, মানবিক ও চারিত্রিক গুণাবলি এবং সার্বক্ষণিক সুন্নতে একনিষ্ঠ অনুসরণ জনসাধারণকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। ইসলাহে নফসের মহত উদ্দেশ্যে সেখানে প্রচুর সংখ্যক মুসলমান মুহাদ্দিস সাহেবের হাতে বায়আত হতে থাকে। বিশেষত দেওয়ান মান্নান দাদ খাঁ এবং জমিদার পরিবারের অন্যান্য সদস্যগণ তাঁর প্রতি বেশী আকৃষ্ট হয় এবং তা গভীর ঘনিষ্টতায় পরিণত হয়। মুহাদ্দিস সাহেবের সাথে শুধু দেওয়ান পরিবারেই নয়, পুরো হয়বতনগরের সাথেই এক আত্মার হৃদ্যতা যেন সৃষ্টি হয়েছিলো। হয়বতনগর এলাকাবাসী মুহাদ্দিস সাহেবকে চির স্মরণীয় করে রাখার জন্য তার নামে কিশোরগঞ্জ শহরের নওগা ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকায় স্থানীয় মুন্সিবাড়ির আলহাজ মুসা সাহেব নিজ অর্থায়নে তার বাড়ি সংলগ্ন ‘আল-জাওয়াদ’ নামে তিনতলা বিশিষ্ট একটি জামে মসজিদ নির্মাণ করেন। মুহাদ্দিস সাহেবের সাথে তাদের ভালবাসার স্থায়িত্বের সূত্রে ২০০৯ ইং.সালে তাঁর ছোট ছেলে ফয়সাল আহমদ কাসেমী এর ইমামতিতে উক্ত মসজিদের উদ্বোধন হয়। তারা এ মর্মে সিদ্ধান্ত নেয়, আমৃত্য মুহাদ্দিস সাহেবের ছোট ছেলে যে সপ্তাহেই শুক্রবার সেখানে উপস্থি হবেন, তিনিই জুমা পড়াবেন। তাদের এ সিদ্ধান্ত আজও অটুট রয়েছে এবং আলহামদুলিল্লাহ,তা প্রতিফলিত হচ্ছে।

মুহাদ্দিস সাহেব রহ. সেখানে থাকাকালীন হাকিমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানবি রহ. (১২৮০-১৩৬২হি.) এর অন্যতম খলিফা, নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি এবং সাবেক সাংসদ হযরত আতহার আলী রহ. (১৮৯১-১৯৭৬ঈ.) ঐতিহাসিক শহীদি মসজিদ সংলগ্ন একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি সমাজের সর্বত্র দ্বীন প্রতিষ্টা ও সংস্কারমূলক নানা উদ্যোগ গ্রহণ এবং কর্মতৎপরতা চালান। তখন মুহাদ্দিস সাহেব রহ.তাঁর একান্ত সহকর্মী হয়ে ভূয়সী ভূমিকা রাখেন। ( তথ্য সূত্র: আল্লামা আযহার আলী আনওয়ার শাহ রহ., সাবেক মুহতামিম জামিয়া ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জ)

সিলেট দেউলগ্রাম মাদরাসা (১৯৫৯-১৯৭১ ইং.)

মুহাদ্দিস সাহেব রহ. এর তাদরীসী খেদমতের চতুর্থ প্রতিষ্ঠান সিলেটের দেউলগ্রাম মাদরাসা। ১৯৫৯ ইং.সালে এ মাদরাসায় দাওরা হাদিসের সূচনা হয়।ফলে স্বাভাবিকভাবেই অভিজ্ঞ একজন শায়খুল হাদিসের প্রয়োজন দেখা দেয়। এ মর্মে প্রতিষ্ঠানটির আহলে শুরার অনুসন্ধানে মুহাদ্দিস সাহেবের নামই উঠে আসে। তৎকালীন মুহতামিম মাওলানা শিহাবুদ্দীন রহ. সহ (১৯০৯-১৯৭২ ইং.) মাদরাসা কর্তৃপক্ষের একটি প্রতিনিধি দল মুহাদ্দিস সাহেবের সাথে দেখা করে তাঁকে আবেদন জানান। একই সময়ে মুহাদ্দিস সাহেবের বাবা-মা বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হন। মুহাদ্দিস সাহেব বাবা মায়ের কথা চিন্তা করার পাশাপাশি আপন এলাকার প্রতি তাঁর দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা বিবেচনা করে হয়বতনগর ছেড়ে সিলেট আসার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তাঁর এ সিদ্ধান্ত মাদরাসা কর্তৃপক্ষ অনেকটা ভাবলেশহীন হয়ে পড়েন। এ প্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ তাদের কোন কর্তব্য স্থির না পেয়ে মুহাদ্দিস সাহেবকে আজীবন হয়বতনগরে যাতায়াত এবং বরকত দানের অনুরোধ জানিয়ে তাঁর ইস্তফাপত্র গ্রহণ করে নেয়। অবশেষে ১৯৫৯ ইং.সালেই উপরোক্ত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মুহাদ্দিস সাহেব সিলেটের দেউলগ্রাম মাদরাসায় বুখারির মসনদ সূচনা করেন।

হযরত মুহাদ্দিস সাহেব রহ. দেউলগ্রামের শায়খুল হাদিস থাকাকালীন ১৩৮১হি.সালে কোন কারণে মাদরাসার মুহতামিম পদ শূন্য হয়ে যায়। আহলে শুরার সিদ্ধান্ত হয়, মুহাদ্দিস সাহেব মুহতামিম হবেন। শুরার সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপত মুহাদ্দিস সাহেব একটি শর্ত জুড়ে দেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে এ পদের জন্য দ্বিতীয় কাউকে নির্বাচন করতে হবে। এই মর্মে তিনি অস্থায়ীভাবে দেউলগ্রাম মাদরাসার মুহতামিম নিযুক্ত হন। ১৩৮৩ হি.সালে স্থায়ী মুহতামিম নিযুক্ত হলে মুহাদ্দিস সাহেব থাকে সব দায়-দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন।

১৯৫৯-১৯৭১ ইং.সাল পর্যন্ত মুহাদ্দিস সাহেব দেউলগ্রাম মাদরাসায় শায়খুল হাদিস ছিলেন। ১৯৭১ ইং. এ মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের আর সব প্রতিষ্ঠানের মত দেউলগ্রাম মাদরাসাও বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় মুহাদ্দিস সাহেব নিজ এলাকার রাজাগঞ্জ মাদরাসায় শিক্ষতার দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। এবং ব্যক্তি উদ্যোগে নিজ এলাকায় ইসলামি আবহ বিরাজ রাখার প্রয়াস পান।

ঢাকা উত্তর রানাপিং মাদরাসা, সিলেট (১৯৭২-১৯৮১ ইং.)

হযরত মুহাদ্দিস সাহেব রহ.এর তাদরীসী খিদমতের পঞ্চম প্রতিষ্ঠান ঢাকা উত্তর রানাপিং মাদরাসা। স্বাধীনতার পরবর্তী বছর ১৯৭২ ইং.সালে আল্লামা কাশ্মীরি রহ. এর খাস শাগরেদ আল্লামা রিয়াসত আলী রহ. (১৩০৯-১৩৯৭ বঙ্গাব্দ) এর স্মৃতিবিজড়িত তৎকালীন সিলেটের মাদারে ইলম ঢাকা উত্তর রানাপিং মাদরাসায় এক জন মুহাদ্দিসের প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন রিয়াসত আলী রহ. মুহাদ্দিস সাহেবকে নির্বাচন করে প্রস্তাব জানালে মুহাদ্দিস সাহেব প্রস্তুত হন। ১৯৭২ ইং. সালে তিনি এ প্রতিষ্ঠানে প্রথম সারির মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করেন। এখানেও তার পূর্বকার সব সুনাম সুখ্যাতি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে মাওলানা রিয়াসত আলী রহ. বার্ধক্যে পড়ে গেলে মুহাদ্দিস সাহেবকে বুখারি শরিফের দরসের জন্য মনোনীত করেন। ১৯৮১ ইং.সালের শেষ পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত সুচারুরূপে তাঁর দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। এসময় তিনি মাওলানা রিয়াসত আলী রহ. এর একান্ত আস্থাভাজন হয়ে অবস্থান করেছিলেন।

জামিয়া ইসলামিয়া রাজাগঞ্জ ইউনিয়ন, সিলেট (১৯৮২- ৭ জুন ১৯৯৬ ইং.)

মুহাদ্দিস সাহেবের তাদরীসী জীবনের পুরোটাই ছিলো সময়ের চাহিদায় সাড়া দেয়া। তিনি যেখানে দ্বীনি তাকাজাকে প্রণিধান দেখতেন, সেখানেই তাকাজা পূরণে চলে যেতেন। জামিয়া ইসলামিয়া রাজাগঞ্জ মাদরাসায়ও তিনি এভাবে যোগদান করেন। এ প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮১ ইং.-এ পূর্ব পর্যন্ত মক্তব, হিফয ও কিতাব বিভাগের কয়েকটি জামাত নিয়ে সুনামের সাথে চলে আসছিলো। আল্লামা শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ.(১১১১-১১৭৬হি.) তাঁর রচিত ফুয়ুজুল হারামাইন কিতাবে লিখেছেন, ‘যে এলাকায় হাদিসের দরস হয়, সে এলাকার সাথে মাদিনায় রওজা আতহারের নূরের সম্পর্ক স্থাপন হয় ‘ ১৯৮১ ইং.মোতাবেক ১৪০১ হিজরীতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা রাজাগঞ্জ এলাকার প্রতি বিশেষ রহমত নাযিল করেন। রাজাগঞ্জ এলাকায় মুহাদ্দিসদের এক বরকতময় জামাতের পদার্পণ ঘটিয়ে মদীনার সবুজ গম্বুজের সাথে নূরের সম্পর্ক তৈরি করে দেন। রাজাগঞ্জ মাদরাসায় দরসে হাদিসের সিদ্ধান্ত হয়। মুহাদ্দিস সাহেবের দরসে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে রাজাগঞ্জ মাদরাসায় দাওরা হাদিসের সূচনা হয়।

মুহাদ্দিস সাহেব তখন ঢাকা উত্তর রানাপিং মাদরাসায় হাদিসের খিদমতে নিয়োজিত ছিলেন। এমতাবস্থায় যখন রাজাগঞ্জ মাদরাসার আলেম-ওলামা, মজলিমে আমেলা ও শূরা এবং সর্বসাধারণের দ্বীনি তাকাজা সামনে আসে, অনুরোধের ডাকও ক্রমে আবদার হয়ে উঠে, প্রেক্ষিত বিবেচনায় মুহাদ্দিস সাহেব রজাগঞ্জে আসার কর্তব্য স্থির করেন এবং ১৯৮২ ইং. সালে বুখারি শরিফের দরস শুরু করেন। মুহাদ্দিস সাহেব দীর্ঘকাল মুহতামিমের পদে আসীন ছিলেন। প্রশাসনিক সকল কাজ তিনি পরিচালনা করতেন। তবে অর্থবিষয়ক কায়-কারবার থেকে সচেতনভাবে বেঁচে থাকতেন। তিনি মুহতামিম থাকা সত্ত্বেও কখনো একটি রশিদ বইও সাথে রাখতেন না। তখন মাদরাসার অর্থ বিষয় দেখভাল করতেন আমার একান্ত উসতায, বিশিষ্ট বুযুর্গ সুদীর্ঘ ৫২ বছরের পরিচালক, মুহতামিম হযরত মাওলানা আমজাদ আলী খওয়াজপুরি রহ. (১৯৩০-২০০৪ঈ.)। ১৯ মুহাররম ১৪১৭ হিজরি মোতাবেক ৭ জুন ১৯৯৬ ইং. মুহাদ্দিস সাহেবের দুনিয়ার জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত রাজাগঞ্জ মারাসাতেই শায়খুল হাদিস এবং দীর্ঘকাল মুহতামিম পদে নিয়োজিত ছিলেন।

আসাতিযায়ে কেরাম

দারুল উলূম দেওবন্দে তাঁর উসতাযদের মধ্যে অন্যতম হলেন-শায়খুল ইসলাম সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ., আল্লামা ইবরাহিম বলিয়াবি রহ., শায়খুব আদব আল্লামা এ‘জাজ আলী রহ., হাকীমুল ইসলাম কারী তায়্যিব রহ. প্রমুখ।

বাংলাদেশে তাঁর উসতাযদের অন্যতম হলেন-হাফেজ কারী আব্দুল হাই রহ., আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরি রহ., মাওলানা মুহাম্মদ হুসাইন সাহেব রহ., আল্লামা সাহুল উসমানি রহ., হযরত মাওলানা ফজলে হক ফাজিল সাহেব রহ.,প্রমুখ।

শাগরেদবৃন্দ

তাঁর নিকট হাজারো ছাত্র ইলমে ওহী অর্জন করে বিভিন্ন জায়গায় দ্বীনি খিদমতে মশগুল রয়েছেন। তম্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন- হযরতুল আল্লাম যিয়া উদ্দিন সাহেব, মুহতামিম ; আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর মাদরাসা। আল্লামা গিয়াস উদ্দিন শায়খে বালিয়া রহ., সাবেক শায়খুল হাদিস বালিয়া মাদরাসা। আল্লামা ইমদাদুল হক সাহেব দা.বা., শায়খুল হাদিস বালিয়া মাদরাসা। হযরত মাওলানা নুরুল্লাহ রহ.; সাবেক শায়খুল হাদিস ও মুহতামিম হয়বতনগর কামিল মাদরাসা,কিশোরগঞ্জ। হযরতুল আল্লাম মাওলানা তহা রহ.মুহতামিম; হয়বতনগর কামিল মাদরাসা, কিশোরগঞ্জ। হযরতুল আল্লাম মাওলানা নজির আহমদ সাহেব, শায়খুল হাদিস রেঙ্গা মাদরাসা, সিলেট। হযরত মাওলানা মুসতাকিম আলী সাহেব রহ.শায়খুল হাদিস আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর মাদরাসা।

বিবাহ

নিজ গ্রামের আলহাজ আব্দুল গণী সাহেবের একমাত্র মেয়ে ফাতেমা। মুহাদ্দিস সাহেব রহ. দেওবন্দ থেকে দেশে ফিরে জামিল মাদরাসার পর কিশোরগঞ্জ মাদরাসায় হেড মুহাদ্দিসের দায়িত্ব গ্রহণ করেন মাত্র। মুহাদ্দিস সাহেবের যখন এই অবস্থান, ফাতিমার তখন বয়সকাল। আলহাজ আব্দুল গণী সাহেব একমাত্র মেয়ের জন্য সুপাত্র খোঁজ করে মুহাদ্দিস সাহেবকে পছন্দ করেন এবং কিছুদিন পরেই এই তাপসী নারীর সাথে মুহাদ্দিস সাহেবের বৈবাহিক বন্ধন সম্পন্ন করেন।

সন্তান-সন্ততি

মুহাদ্দিস সাহেব রহ.চার ছেলে এবং চার মেয়ের জনক ছিলেন। মেয়ে চারজন হলেন তাহিরা, তায়্যিবা, সালমা, হাসনা। এদের মধ্যে তৃতীয় মেয়ে সালমা শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেন। ছেলে চারজন হলেন-মাওলানা তাজুল ইসলাম, মুহাম্মদ সাদিকুল ইসলাম, মাওলানা বদরুল ইসলাম, মাওলানা ফয়সাল আহমদ কাসেমী।

মানুষের কল্যানে সময়ের প্রয়োজনে

দরস-তাদরীস মুহাদ্দিস সাহেবের জীবন ব্যস্ততার মূল থাকলেও সমাজসেবায়ও তিনি ব্যাপক পদচারক ছিলেন। জনহীতকর ও কল্যানমূলক কার্যক্রম, উন্নয়নমূলক নানা উদ্যোগ ও তৎপরতা মুহাদ্দিস সাহেবের জীবনের অন্যতম একটি অঙ্গন ছিল। সংস্কারমুখী আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন তিনি। তাঁর সমাজসেবার অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আজও স্থায়ী হয়ে আছে রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের পারকুল গ্রামের বাঁধ প্রকল্পের কার্যকরি পদক্ষেপ ও বাস্তবায়ন। পারকুল গ্রামের ভেতর দিয়ে একটি খাল সুরমা নদি থেকে বড় হাওড়ে গিয়ে মিলিত হয়েছে। বর্ষাকালে খালটি প্রবল প্লাবিত হয়। এই প্লাবন কয়েক বছর যাবত হতে থাকলে ১৯৮৭-৮৮ ইং. এর দিকে পারকুল গ্রামের অস্থিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। তখন মুহাদ্দিস সাহেবের ব্যাপক তৎপরতায় দ্রুত বাঁধ প্রকল্পের উদ্যোগ নেয়া হয়। মুহাদ্দিস সাহেবসহ গ্রামের কয়েকজন মুরব্বি তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব রকিবুদ্দিন সাহেব এবং এমপি বিগ্রেডিয়ার মজুমদার সাহেবের সাথে এতদসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা করেন। পরবর্তীতে বার্ধক্যের কারণে এমপি সাহেবের সাথে তাঁর সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা কষ্টকর হয়ে পড়ে। এজন্য তিনি কয়েকজন মুরব্বির তত্ত্বাবধানে যুবকদের একটি দল যোগাযোগ রক্ষার জন্য প্রস্তুত করেন। তাঁর ও তাদের ব্যাপক তৎপরতায় অবশেষে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মুখ দেখে।

খেদমতে খালক, বিশেষত জনসেবায় মুহাদ্দিস সাহেব ছিলেন নিবেদিত-প্রাণ। সাধারণ মানুষের মায়া-মমতায়, দয়া-দরদে তাঁর হৃদয়ের খণ্ড খণ্ড তিথিগুলো ষোলকলায় পূর্ণ ছিলো। দুঃখে- কষ্টে তিনি ছুটে যেতেন মানুষের দ্বারে, মানুষের কাছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন তাঁর পথে কাঁটা পেতে রাখা বুড়ির বাড়ি গিয়ে সেবা-শুশ্রূষা করেছেন, রাসূলের এ অদ্যাবহেলিত বৈশিষ্ট তাঁর ভিতর সর্বমূল্যে পাওয়া যেত। তিনি অসুস্থদের যথাসম্ভব বিছানায় গিয়ে দেখ-ভাল-হাল-পুরসি করতেন। তিনি মানুষের আসমানি বালায় (কথিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ) অনেক বেশি বিচলিত হয়ে পড়তেন। একবার অনাবৃষ্টিতে প্রচণ্ড খরা মানুষকে ভীষন বিপদগ্রস্ত করে ফেলে। খাল-বিল-কুপের পানি শুকিয়ে জমিনে ফাটল ধরে। পানির অভাবে জীবজন্তুর প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়। সে সময় ইরি ধানের চাষ হতো না। আমন ও বোরো ফলনের জন্য মানুষের বৃষ্টির খুব প্রয়োজন ছিলো। অবস্থা বেগতিকের দিকে ধাবমান দেখে মুহাদ্দিস সাহেব উদ্যোগী হন। গ্রামের সকলে মিলে পার্শ্ববর্তী ‘বড় হাওর’ নামক এলাকায় সালাতুল ইসতিসকা আদায় করেন।কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে দোআ-কান্না করেন। আল্লাহ সে দোআ কবুল করেন। তাঁর গ্রামে ফেরার পূর্বেই আল্লাহর রহমতে বৃষ্টিবর্ষণ শুরু হয়।

সামাজিক বিচারাচার

আজ থেকে ত্রিশ-বত্রিশ বছর পূর্বে এদেশের বিচার ব্যবস্থা এখনকার মত সুবিন্যস্ত ছিলো না। তাছাড়া কোর্ট-কাচারি সম্পর্কে মানুষের অনভিজ্ঞতা, মানুষের অত্যধিক অভাব-অনটন এবং যাতায়াতের অপ্রতুল ব্যবস্থাপনার কারণে মানুষ আইন-আদালতের দারস্থ খুব কমই হতো। স্মরণাপন্ন হতো সামাজিক ব্যক্তিত্বদের। তাঁদের কাছেই নিজেদের বড় বড় সমস্যার সুরাহা ও সমাধান মেনে নিতে হতো। গ্রাম্য সালিশের সিদ্ধান্তই হতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।মুহাদ্দিস সাহেব গ্রাম্য সালিশ কমিটির নিয়মিত সদস্য না হলেও অঘোষিতভাবে তিনিই ছিলেন বিচারকদের মধ্যমণি। তাঁর বিচারকার্য সম্পাদন হতো অত্যন্ত নিখুঁত ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে। হযরত আলী রা. (মৃত্যু:৪০ হি.) যেমন জামাতে সাহাবার শ্রেষ্ঠ বিচারক ছিলেন। মুহাদ্দিস সাহেবও সমকালে সকলের শ্রেষ্ঠ বিচারক ছিলেন। তাঁর ব্যাপারে বিচার বহিভূর্ত অনুযোগ বা বিচার পরবর্তী বিরুপ প্রতিক্রিয়ার কোন প্রমাণ নেই। বাদি-বিবাদি উভয় নিশ্চিন্ত থাকতো-মুহাদ্দিস সাহেব আছেন, ইনসাফানা ফয়সালা (ন্যায়বিচার) ইনশাআল্লাহ পাবো।’

তিনি গাছবাড়ি, আকুনি, জৈন্তা, গোয়াইনঘাট, নারায়ণপুর ও ঝিঙ্গাবাড়ির বড় বড় ঝগড়া-বিবাদ এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির সামাল দিতেন। অতি উদ্বেগজনক পরিস্থিতিও অত্যন্ত সুকৌশলে স্বাভাবিকতায় নামিয়ে আনতেন। এতদাঞ্চলে প্রবীণ মাত্রই এসব বিষয় আবগত রয়েছেন।

বিদআত প্রতিরোধ

মুহাদ্দিস সাহেব রহ. মানুষ্যজীবনের জৈবিক ঝায়-ঝামেলার শরঈ সমাধানের মাধ্যমে যেমন সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় কর্ণধার ছিলেন, এমনই সামাজিক অস্থিতিশীলতা, গোত্রীয় ও সাম্প্রদায়িক বিবাদ দূরীকরণে ইসলামের উদারনৈতিক আদর্শের আলোকে বাতিল-বেদআতের আপনোদন এবং অধর্ম ও কুসংস্কার প্রতিরোধে কঠোরহস্ত ছিলেন। মানুষের পরিবার ও সমাজজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাভাবিকীকরণ ও ভারসাম্য রক্ষার একমাত্র অবলম্বন ইসলামের মধ্যপন্থার সুমহান আদর্শকে সমুন্নত রাখতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নীতি ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আমৃত্যু আত্মনিয়োজিত ছিলেন।

একবার রাজাগঞ্জের খালপার গ্রামে ইসহাস নামে এক ভণ্ডপীরের অনুপ্রকাশ ঘটে। তাকে ঘিরে তার দরবারে শরিয়ত বিরোধী নানা কর্মকাণ্ড ক্রমশ বাড়তে থাকে। কিন্তু এই এলাকার ওলামায়ে হকের প্রভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে ইসলামের সঠিক চেতনায় জাগ্রত থাকায় মুহুর্তে ভণ্ডপীরের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে ধর্মপ্রাণ সচেতন মানুষ তাকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে বয়কট করতে থাকে। নিরুপায় হয়ে সে থানায় মিথ্যা মামলার আশ্রয় নেয়। ধর্মীয় বিষয় হওয়ার কয়েকটি থানার প্রশাসন সম্মিলিত হয়ে মামলাটি আমলে নেয় এবং আদর্শিকভাবে ব্যাপক জনসম্পৃক্ত হওয়ায় সালিশি বৈঠকের মাধ্যমে এর একটা বিহিত করার সিদ্ধান্ত হয়। আলোচনার মাধ্যমে বিয়ানীবাজার থানার আলীনগরে নবান আলী বাড়িতে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ধর্মসচেতন তৌহিদি জনতার পক্ষে নেতৃত্বের বলিষ্ঠভাবে দৃঢ় অবতরণ করেন মুহাদ্দিস সাহেব রহ.। কয়েকটি থানার প্রশাসনের সামনে মুহাদ্দিস সাহেবের শক্ত চোয়ালে ভরাট কণ্ঠে কুরআন-হাদিস ভিত্তিক বিজ্ঞজনোচিত সাবগর্ভ আলোচনায় ভণ্ড ইসহাক কুপোকাত হয়ে কাঁচুমাচু শুরু করে।সেদিনের বৈঠকে প্রশাসন ভণ্ড ইসহাককে তার অধর্ম কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়ে তৌহিদি জনতাকে বিজয়ী ঘোষণা করে।

রাজনীতি

রাজনীতির অঙ্গনে হযরত মুহাদ্দিস সাহেব কোন দলের সদস্যপদে সক্রিয় ছিলেন না। তবে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি লালনে তিনি শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ.কে প্রাধান্য দিতেন এবং তাঁরই চেতনায় তিনি উদ্দীপ্ত উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত ছিলেন। তিনি শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর আদর্শ লালন করেই সিলেট অঞ্চলে বৃটিশ খেদাও আন্দোলনের একজন কর্মবীর সদস্য ছিলেন। তিনি প্রথমে ইংরেজদের বিরুদ্ধে গণসচেতনার প্রতি নজর দেন এবং এতে তিনি শতভাগ সফলও হন। একসময় বৃটিশ-বেনিয়া উপনিবেশদের বিরুদ্ধে সিলেট অঞ্চল থেকে আকাশ-বাতাসও যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করে।এতদাঞ্চলে মুহাদ্দিস সাহেবের ক্ষমতা দম্ভ নিশ্চিদ্র নিরাপত্তাবলয় কিছুই ছিলো না। বিরোধী রাজনীতির নিছক সান্ত্বনাও ছিলো না। তা সত্ত্বেও তাঁর প্রতি জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন আর ভালোবাসার প্রাণবন্ত প্রকাশ ছিলো আন্দোলনের গতিবৃদ্ধিতে অনন্য নিয়ামক। এই নিয়ামক অর্জনে মুহাদ্দিস সাহেবের ভূমিকা ওৎপরতা ছিলো উপমাযোগ্য।

অবশেষে ইংরেজরা যখন তীব্র আন্দোলনের ক্রমাগত ক্ষিপ্র আঘাতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে লেজ গুটিয়ে নেয়, কিছু সময় পর অখণ্ড ভারত দ্বিখণ্ড হয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন পাকিস্তান; নতুন রাষ্ট্র। জালিম পাকবাহিনীর হাত থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে মুহাদ্দিস সাহেবের আরো কিছু রাজনৈতিক তৎপরতা প্রমাণিত। তৎকালীন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুহাদ্দিস সাহেবের উসতায আল্লামা বায়মপুরি রহ.প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিলেন। নির্বাচনে বায়মপুরি রহ. এর পক্ষে জমিয়তের নেতৃত্বের স্থানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন মুহাদ্দিস সাহেব রহ.। মুহাদ্দিস সাহেবের সারা কর্মজীবনের রাজনীতির অঙ্গনে এটুকুই তৎপরতা পাওয়া যায়।

তাযকিয়া

পড়ালেখার পাশাপাশি ছাত্র মুহাদ্দিস আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ ও আত্মিক পরিশুদ্ধতার প্রতিও সজাগ-সচেতন ছিলেন। প্রাথমিকভাবে তিনি দেওবন্দ গমন করে প্রাণপ্রিয় উসতায শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ.এর সাথে ইসলাহি সম্পর্ক গড়ে তোলেন। পড়ালেখার প্রাতিষ্ঠানিকতা শেষে শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ.এর হাতেই বাইআত হন। নিয়মতান্ত্রিকভাবে রিয়াজাত-মোজাহাদা, অযিফা-আযকার আদায়ে আন্তরিক হন। দেশে আগমনের অনেক পর একবার তিনি একটি স্বপ্ন-সাক্ষাত লাভ করেন। স্বপ্নটি তিনি মাদানি রহ. এর দ্বিতীয় খলিফা হাজি আব্দুল বারি রহ. এর নিকট খুলে বলেন। হাজি সাহেব তাকে সুসংবাদের সম্বোধন করে স্বপ্নটির ব্যাখ্যা প্রদান করেন, ‘তুমি আপন মুরশিদ হতে ইজাযত প্রাপ্তির দ্বারপ্রান্তে।’ হাজি সাহেব মুহাদ্দিস সাহেবকে শায়খ বরাবর চিঠি লেখার পরামর্শ দেন। কিন্তু ইতোমধ্যেই ৫ ডিসেম্বর ১৯৫৭ ইং.তারিখে শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ.পরলোক গমন করায় সাক্ষাত বা চিঠি কোনটির সুযোগ হয়ে উঠেনি।

শায়খুল ইসলাম মাদানি রহ. এর ইন্তেকালের পর মুহাদ্দিস সাহেব আপন শায়খের দ্বিতীয় খলিফা হাজি আব্দুল বারি রহ. এর কাছে মুরাজাআত করে তাঁর হাতে বাইআত হন এবং পরবর্তীতে তাঁর থেকে খেলাফত লাভে ধন্য হন। মুহাদ্দিস সাহেব রহ.থেকে খেলাফতপ্রাপ্তগণ হলেন; হযরত মাওলানা ত্বহা সাহেব, (বর্তমান বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম মাও.মিযান সাহেবের আব্বা), শায়খুল হাদিস হয়বতনগর মাদরাসা, কিশোরগঞ্জ। কর্নেল অবসরপ্রাপ্ত এ.আর.এম.হাম্মাদ সাহেব, ডি, এম.এইচ.মহাখালী, ঢাকা।

বাইতুল্লাহর সফর

মুহাদ্দিস সাহেব রহ. ছিলেন আল্লাহ প্রেমে সদাবিভোর একজন বুযুর্গ। আল্লাহর শানে জালালির সামনে নতজানু ছিলেন সবসময়। এর বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন নামায-বন্দেগীর মাধ্যমে। সাথে সাথে আল্লাহর শানে জামালির প্রতিও তিনি অনেক দুর্বল ছিলেন। শানে জামালিতে মুগ্ধ ও আকৃষ্ট হয়ে তাঁর ইশক ও মুহাব্বতের এক আকুলতা মুহাদ্দিস সাহেবের ভিতর আজন্ম ছিলো। দরসে হাদিসের শুরু থেকে সাহিবে হাদিসের রওজা যিয়ারতেরও এক সুতীব্র ব্যাকুলতা ছিলো তাঁর হৃদয় জুড়ে। মুহাদ্দিস সাহেবের অব্যক্ত এই আকুলতা এবং সুতীব্র এই ব্যাকুলতা পূর্ণতায় পৌঁছেছে ১৯৮৩ঈ.সালে পবিত্র হজ আদায়ের মাধ্যমে।

মুহাদ্দিস সাহেব রহ. এর হজে আগমনের কথা শুনে তাঁর সাথে হজ করার মানসে বৃহত্তর সিলেটের, বিশেষ করে কানাইঘাট থানার বিপুল সংখ্যক সৌদিপ্রবাসী এ বছর হজ করেন। প্রবাসীগণ হজের পুরো সময় মুহাদ্দিস সাহেবের সাথেই থাকতেন। তাঁর আশপাশে এত মানুষের সার্বক্ষণিক সমীহ-উপস্থিতি, তাঁর প্রতি অগাধ ভক্তির নিরেট প্রকাশ দেখে কুয়েতের জনৈক শায়খ আশ্চার্যান্বিত হন। বিস্ময় প্রকাশ করে অভিভূত হন। মুহাদ্দিস সাহেবের সাথে পরিচায়ান্তে আকৃষ্ট হয়ে তাঁর প্রতি হৃদয়ের ভালবাসা প্রকাশ করেন। হজের দিনগুলোতে প্রতিদিন তাঁর দস্তরখানে একটি বকরি হাদিয়া পেশ করেন।

মুহাদ্দিস সাহেব হারামে যতদিন ছিলেন, পুরো সময় হারামের ভিতরে থেকে তওয়াফ, খানায়ে কাবার প্রতি দৃষ্টি, নামায, কুরআন তেলাওয়াত, দোআ-যিকির, মোরাকাবা ইত্যাদিতে মশগুল থাকতেন। বিশেষ কোন মানবিক প্রয়োজন হলে পরিমিত সময়ের জন্য বের হতেন।

হজের কাজ সম্পন্ন করার পর তিনি মদীনায় গমন করেন। রওজা আতহারে সালাম নযরানার পর সারা রাত সেখানে ইবাদত, তেলাওয়াত, দোআ-দুরুদ, মোরাকাবায় মশগুল থাকতেন। অধিকহারে রিয়াযাত, মোজাহাদা, মোরাকাবা-মোশাহাদা এবং একাধারে রাত্রি জাগরণের ফলে তিনি এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এক বছর আরজাবাদ মাদরাসার মুহতামিম আল্লামা শামসুদ্দিন কাসেমী সাহেব রহ.(১৯২৩-১৯৯৬ ইং.) হজের সফরে ছিলেন। তিনি মুহাদ্দিস সাহেবের অসুস্থতার খবর শুনে তাঁর সেবা-শুশ্রুসায় উপস্থিত হন। পরবর্তীতে আমাদের এক ভগ্নিপতি আলহাজ সাইফুল ইসলাম সাহেব সুস্থ হওয়া পর্যন্ত তাঁর দেখাশোনা করেন।

মৃত্যু

১৯৯৬ ইং.জাতীয় নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়। দীর্ঘদিন স্বাভাবিক হার্টের রোগে ভোগার পর মে মাসের শেষের দিকে তিনি শয্যাশায়ী হন। তাঁর অসুস্থতার শুরুটা ছিলো সামাজিক দ্বৈত-দূরীকরণ শীর্ষক একটি সেমিনারে। তৎকালীন সিলেট ৫ আসন (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ ) ছিলো ওলামায়ে কেরামের দখলে।তখনও সিলেটের ওলামায়ে কেরামের মাঝে শক্তিশালী একটি ঐক্য বিদ্যমান ছিলো। কিন্তু ৯৬ এর নির্বাচনে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম এবং খেলাফত মজলিসের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হয়। ওলামায়ে কেরামের এই মতানৈক্য ও বিভক্তি মুহাদ্দিস সাহেবকে দারুণ পীড়া দেয়। মুহাদ্দিস সাহেব তখন বিরূপ প্রতিক্রিয়া এবং কাঁদা ছোড়াছুড়ি থেকে বাঁচিয়ে এই বিভক্তিকে বৈচিত্র হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। এ বিষয়ে রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের ওলামায়ে কেরাম এবং থানা পর্যায়ের শীর্ষ ওলামায়ে কেরামের সাথে জামিয়া ইসলামিয়া রাজাগঞ্জ মাদরাসার দোতলার হলরুমে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। তিনি তখন হার্টের রোগী ছিলেন। তাঁর শরীরে হার্ট রোগীদের জন্য ব্যবহৃত প্রেসমিকার যন্ত্র লাগানো ছিলো। সভায় তিনি উপস্থিত ওলামায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে নাতিদীর্ঘ আলোচনা রাখেন। এতে তিনি সভাস্থলেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।

পরদিন তাঁকে সিলেট জালালাবাদ ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। এতক্ষণে তাঁর অসুস্থতার খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আত্মীয়-স্বজন, ওলামায়ে কেরাম এবং সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে দেখার জন্য জালালাবাদ ক্লিনিকে ভিড় জমায়। দীর্ঘ ১৭/১৮ দিন তাঁকে সেখানে রাখা হয়। কিন্তু তাঁর শরীরের কোন উন্নতি ও পরিবর্তন না হওয়ায় চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে ঢাকায় নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

১৯ মুহাররাম ১৪১৭ হি.মোতাবেক, ৭ জুন ১৯৯৬ ইং. রোজ শুক্রবার । সকাল বেলায় তাঁকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। রওয়ানা হওয়ার পর তাঁর শরীর তুলনামূলক ভাল মনে হচ্ছিলো। আমাদের মনে আশার আলো উঁকি দিলো, আল্লাহ তাঁকে সুস্থ করবেন।

তখন দুপুর আড়াইটা। আমাদের এম্বুলেন্স বি-বাড়িয়া , সরাইল থানা, চান্দিনা এলাকা অতিক্রম করছে। তৃতীয় ভাই মাওলানা বদরুল ইসলাম আচমকা এম্বুলেন্স থামাতে বললেন। ড্রাইভার এম্বুলেন্স থামালেন। আব্বাজান কেমন যেন করছেন। তাঁর ঠোঁট দু‘টি থেকে থেকে নড়ে ওঠছে। আমাদের মুখে কালিমার তালকিন- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’
…অদৃশ্য কারো আগমন ঘটেছে, মুহাদ্দিস সাহেবের কাছে। তাঁর বন্ধুর কাছ থেকে ডাক এসেছে; প্রভুর পক্ষ থেকে ডাক এসেছে। মুহাদ্দিস সাহেব বন্ধুর সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছেন। শুধু যেন এই ডাকের অপেক্ষায় ছিলেন। আগন্তুক চলে গেছেন, মুহাদ্দিস সাহেবকে সাথে নিয়ে………..
ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

তাঁর জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হয় জামিয়া ইসলামিয়া রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের বার্ষিক সম্মেলন মাঠে। জানাযার নামাযে ইমামতি করেন শায়খুল ইসলাম সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. এর ছাত্র ও খলিফা হযরত মাওলানা হাফিয আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়া রহ.। পারকুল গ্রামের কবরস্থানে তাঁর বাবা-মায়ের নিকটবর্তী স্থানে দাফন করা হয়।

এ কীর্তিমান মহান সাধক পুরুষ যদিও আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের অন্তরে তাঁর নাম অঙ্কিত হয়ে আছে ও থাকবে যুগযুগ ধরে। মহান আল্লাহ পাক তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সুউচ্চ আসনে সমাসীন করুন এবং হযরতের ফয়েজের দ্বারা আমাদেরকে প্রাচুর্যময় করুন। আমীন।

নোট:

বিস্তারিত দেখতে পারেন তার জীবনি গ্রন্থে ‘শায়খুল হাদিস আল্লামা হাফিয জাওয়াদ রহ.: ইলমে ওহীর আলোকস্নাত’

লেখক: মুহাদ্দিস, দারুল উলুম মাদানীনগর মাদরাসা, নারায়নগঞ্জ, ঢাকা

বিজ্ঞাপন