‘হিউম্যান বিয়িং’: কী আছে বইতে?

মুহাম্মদ নাফিস নাওয়ার:

পথিক কিছুক্ষণ রাস্তার পাশের চা দোকানটার বেঞ্চিতে বসে একটু জিরিয়ে নিলো। লম্বা সফরে বেরিয়েছে সে, বাড়ি ছেড়ে পাড়ি দিয়েছে বহু পথ। এখনও চলতে হবে অনেকটা। কথায় আছে, মানুষ ঠেকে শেখে। পথিকেরও অবস্থা হয়েছে এমন। বহুবারই বিপদে পড়তে পড়তে পড়েনি, আগেভাগে বুঝে ফেলায় সটকে পড়তে পেরেছে। আর কয়েকবার বিপদে পড়ে যেতেই হয়েছে। ওই যে, ঠেকে শিখতে গেলে কিছুটা বিপদে তো পড়াই লাগে। .

বেঞ্চি থেকে উঠে দাঁড়ালো পথিক, বুক ভরে তাজা হাওয়া টেনে নিয়েই হুশশ করে ছেড়ে দিলো সবটুকু। মনে মনে ভাবলো, আহা! সাথে যদি অভিজ্ঞ কেউ থাকতো অথবা অন্তত নিজের যদি কিছুটা জানাশোনা থাকতো, তবে সফরটা এতো ঝামেলার হতো না।

লিখতে বসেছি ‘হিউম্যান বিয়িং’ নিয়ে। ইফতেখার সিফাত ভাইয়ের প্রথম মৌলিক গ্রন্থ। লিখতে বসে উপরে জনৈক পথিকের গল্প টানলাম কেনো? .

কারণ আমাদের সবারই অবস্থা হচ্ছে গল্পের এই পথিকের মতই। আমরা তো সবাইই এই দুনিয়ার বুকে পথিক। গল্পের পথিকের মত এমন অনুভূতি থাকুক বা না থাকুক, পথিক হিসেবে নিজেদেরকে সংজ্ঞায়িত করতে আশা করি আমাদের কারও কোনো সমস্যা নেই। তবে বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, উপরের গল্পের এই পথিকের মতই বরং বলা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে আরও খারাপ আমাদের অবস্থা। আমরা পথ তো চিনিই না, কোন দিকে যাচ্ছি সে সম্পর্কেও কোন আইডিয়া নেই। কেন যাচ্ছি তাও জানি না। পথের জায়গায় জায়গায় লুকিয়ে থাকা বিপদগুলোর সম্পর্কেও নেই কোন ধারণা কিংবা জানাশোনা।.

মুসলিম হিসেবে আমাদের পথ শুরু হয়েছে দুনিয়ায়, শেষ হবে আখিরাতে। এই পথের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, আজকের দুনিয়ার বাস্তবতায়, যেসব মায়াজাল আর মিথ্যার বুনন আমাদের পথে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে, সেসব সম্পর্কে আমাদের জানাশোনা আদৌ আছে কি? আমরা কি এতোটুকুও জানতে পেরেছি যে আমাদের পথে এরকম বাধাবিপত্তির পাহাড় তুলে রাখা হয়েছে? অধিকাংশ মুসলিমের জন্যই জবাবটা এখানে হচ্ছে – A BIG ‘NO’!

আফসোস! শত আফসোস!

জানা কি দরকার না? চেনা কি উচিত না? কুফফার নিয়ন্ত্রিত এই বিশ্বব্যবস্থা আপনার জন্য মতাদর্শিক যেসব মিথ্যার জাল বুনে রেখেছে, সেগুলোকে চেনা কি আপনার ‘ফার্স্ট প্রায়োরিটি’ হবার কথা না?

ভাবুন, ভালো করে ভাবুন। যদি উপরের প্রশ্নগুলোর জবাব হয় হ্যাঁ, তবেই পরের প্যারা পড়তে শুরু করেন। নয়তো আগে প্রশ্নগুলোর যথাযথ জবাব কি হবে, সেটা নিয়েই ব্যস্ত থাকুন। কারণ সেটাই হবে আপনার জন্য বেশি যৌক্তিক।.যাদের উত্তর হবে হ্যাঁ, তাদের জন্যই লিখছি।

হিউম্যান বিয়িং। খুব পরিচিত শব্দ। হতে পারে পরিচিত, কিন্তু সরল কিছু নয়। হিউম্যান বিয়িং-শব্দযুগল দিয়ে আসলে কি বোঝানো হয়? কি এর উদ্দেশ্য? আরে! শব্দের আবার উদ্দেশ্য কি? এমন প্রশ্ন মনের মধ্যে আসছে, তাই না? আসুন, লেখকের কাছ থেকেই জবাব নিয়ে আসি। উদ্দেশ্য তো আছেই, আলবৎ আছেই আর থাকবেই। উদ্দেশ্য ছাড়া আছে নাকি কিছু?

‘পুরো পাশ্চাত্য সভ্যতা যেই দার্শনিক সত্তার উপর দাঁড়িয়ে আছে তাকে বলা হয় হিউম্যান বিয়িং। পশ্চিমা সামাজিক বিজ্ঞান এই নির্দিষ্ট সত্তাকে নিয়েই কাজ করে।…হিউম্যান বিয়িং নিছক কোন মানুষ না। সে এক নির্দিষ্ট চিন্তার, বিশেষ ধরনের মানুষ। হিউম্যান বিয়িং এমন কেউ, যে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে স্বতঃসিদ্ধ সত্য হিসেবে মেনে নেয়। যে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অমুখাপেক্ষী মনে করে। বিভিন্ন জীবনব্যবস্থা ও দর্শনকে সে মূল্যায়ন করে কেবল একটি মাপকাঠি দিয়ে। সেটা হলো মানবিক চাহিদা। মানবিক চাহিদা ও কামনা-বাসনার সীমাহীন পূর্ণতাই এই হিউম্যান বিয়িং-এর জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য।’

ফ্ল্যাপের এই লেখা থেকেই শুরু হয়ে বইটির শেষ পর্যন্ত এরপর একে একে উন্মোচিত হয়েছে এমন সব সত্যের, যেগুলো আমাদের চলার পথে বিভ্রমের সৃষ্টি করে শেষমেশ আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করে ছাড়ে। লেখক ইফতেখার সিফাতের সাবলীল আলোচনায় একের পর এক উঠে এসেছে যুগের বুদ্ধিবৃত্তিক সব চোরাবালির পরিচয়। শুরুতেই এসেছে সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচনা ‘পরিভাষার চোরাবালি’ শিরোনামে। আমাদের অধিকাংশই পরিভাষার এই তেলেসমাতি বুঝি না বলে জন্ম দেই ‘ইসলামি অমুক’, ‘ইসলামি তমুক’ নামের বিচিত্র সব হাঁসজারুর (হাঁস + সজারু)। এরপরই আলোচনার গতিময়তায় ঢুকে পড়েছে আধুনিক পশ্চিমের শেকড় নিয়ে একেবারে আবশ্যকীয় একটা আলোচনা আর এরপর একে একে এসেছে বিভিন্ন কুফরি সভ্যতা, তাদের সাংস্কৃতিক ভিত, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, রেনেসাঁ, ফরাসি বিপ্লব ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত সব আলোচনা।

এরপর ‘ইসলামের দৃষ্টিতে’ কিছু বিষয়ের সংজ্ঞায়ন নিয়ে অত্যন্ত জরুরি কিছু আলোচনা নিয়ে এসেছেন লেখক। বিশেষ করে ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাধীনতা, সমতা আর উন্নতি বলতে কি বোঝায়। এগুলো নিয়ে আলোচনা করাটা একেবারে মৌলিকভাবে জরুরি ছিল। কেননা পাশ্চাত্যের দর্শনের ভিত হিউম্যান বিয়িং, যার পরিচয় আমরা আগেই দিয়ে এসেছি, সেই হিউম্যান বিয়িং এর সাথে ইসলামের আবদুল্লাহ তথা আল্লাহর দাসের অবস্থা ও অবস্থান কেমন, সেটা ক্লিয়ার করা জরুরি ছিল। লেখক এই আলোচনাগুলোতে সেই কাজটাই সেরে নিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ।

এরপর অবধারিতভাবেই পাশ্চাত্যের হিউম্যান বিয়িং এর উদর থেকে বের হওয়া পচাগলা কিছু মতবাদের সাথে পাঠকের পরিচয় আর ইসলামের জায়গা থেকে সেগুলোর মূল্যায়ন টেনেছেন লেখক। পাঠক, এই জায়গাগুলোতে কিন্তু আপনাকে অতি অবশ্যই অত্যন্ত মনোযোগী হওয়াই লাগবে। এর মানে আবার এই না যে অন্য জায়গাগুলোতে মনোযোগ দেবেন না। এই আলোচনাগুলোর ক্ষেত্রে মনোযোগের আলাপ টানবার অর্থ হল, এই আলোচনাগুলোর প্রতি বেশি গুরুত্বারোপ করা। কারণ এসব চোরাবালিতেই আজকাল হরহামেশা ডুবছি আমরা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, দল আর রাষ্ট্র সমেত। আফসোস!

বইয়ের একেবারে শেষের দিকে র‍্যান্ডের আলোচিত রিপোর্টে উঠে আসা চার শ্রেণীর মুসলিমদের নিয়েও উঠে এসেছে মুখতাসার আলোচনা। এরপর উপসংহারে মাধ্যমে ইতি টানা হয়েছে অসাধারণ এই বইটার।.

পাঠক! লেখার শুরুতে এক পথিকের গল্প বলেছিলাম। গল্পটা কাল্পনিক, কিন্তু দৃশ্যকল্পটা একদম বাস্তব। আমাদের আজকের অবস্থা ঠিক এই পথিকের মতই। কিন্তু ‘হিউম্যান বিয়িং’ এর মত বই আপনার হাতের নাগালে থাকতেও যদি গল্পের এই পথিকের মতই হয় আপনার অবস্থা, তাহলে আসলে কিছু বলবার নেই আপনাকে। আসলেই বলবার নেই, শুধু হয়তো ঠোঁট ফুলিয়ে আফসোসের দম ফেলা ছাড়া!

এখানে প্রাসঙ্গিকভাবেই হয়তো একটা প্রশ্ন উঠে যাবে যে, পুরো লেখাতে বইটার মূল্যায়ন এসেছে একটা গাইডবুক হিসেবে। কেন, গাইড হিসেবে আল্লাহর কিতাব আর রাসূলের হাদীসই কি যথেষ্ট নয়? প্রশ্নটা সুন্দর, তবে এর উত্তরটাও প্রশ্নের চেয়েও সুন্দরতম উপায়ে এসেছে বইয়ের একদম শুরুতে ‘অভিব্যক্তি’ কলামে ডা. শামসুল আরেফীন ভাইয়ের লেখায়। আমি সেখান থেকে কোট করে মূল লেখাটা পড়ার মজাটা নষ্ট করে দিতে একদমই ইচ্ছুক নই, তবুও আপনাদের আগ্রহ মেটাতে সেই লেখার মূলভাবটুকু দুই এক কথায় এখানে বলে দিতে চাই। আর তা হল, হিদায়াতের উৎস হিসেবে আল্লাহর কিতাবকে গ্রহণ করবার আগে মন-মস্তিষ্কের যে অবস্থা কাম্য, আমাদের অধিকাংশেরই আজ সেই অবস্থা নেই। তাই কুরআনের মাধ্যমে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন শুরু করাটা আমাদের জন্য উপকারি না হয়ে উল্টো দিকে চলে যায়। এটা কুরআনের সীমাবদ্ধতা বা কমতি না, এটা আমাদের ‘পশ্চিমা-ওয়াশ’ ব্রেইনের ডিসফাংশনের কুফল। আল্লাহ আমাদেরকে এটা থেকে হিফাযত করুন। আমীন।

যাইহোক, কথা হলো অনেক। এতো বকবক আর শব্দ খরচ স্বার্থক মনে হবে যদি আপনারা বইটা কেনেন, হাতে নেন আর মন লাগিয়ে পড়ে চোরাবালি থেকে বেঁচে থাকেন। আল্লাহ যেন লেখকের এই মূল্যবান কাজ ও উনার সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কবুল করে নেন, নাযাতের উসীলা বানান আর সাথে আমাকেও মাফ করে দিয়ে কবুল করে নেন। ওয়ামা তাওফিক্বী ইল্লা বিল্লাহ। আমীন ইয়া রাব্বাল আলামীন।

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদএকজন অভ্র এবং বখতিয়ারের জ্বিন
পরবর্তি সংবাদকলরবের জনপ্রিয় শিল্পী মাহফুজুল আলমের ইন্তেকাল, জানাজা বাদ আসর