হিন্দু নির্যাতনের সংখ্যাতত্ত্ব : হিন্দুত্ববাদ বাংলাদেশ-বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে

তুহিন খান

সম্প্রতি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু অধিকার বিষয়ককর্মী হিসেবে পরিচিত এক নারী, প্রিয়া সাহার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে, দেশব্যাপী আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিওতে দেখা যায়, প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে নালিশ করছেন, বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩৭ মিলিয়ন তথা ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু ‘নিখোঁজ’, তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, কোনো সুবিচার তারা পাচ্ছেন না। তিনি তাঁর নিজের ঘরও পুড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ তোলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘কারা এসব করছে’ জিজ্ঞেস করলে প্রিয়া সাহা ইতস্তত করে বলেন যে, মুসলিম ফান্ডামেন্টালিস্টরা এসব করছে, আর সরকার তাদের শেল্টার দিচ্ছে।

প্রিয়া সাহার এই বক্তব্যে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে দেশজুড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে আইনের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। যে সংগঠনের তিনি সাংগঠনিক সম্পাদক, সেখান থেকেও তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে সাময়িকভাবে। তাঁর গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা বলছেন, জমি নিয়ে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব আর রেষারেষি থেকেই প্রিয়া এই কাণ্ড করছেন। তাঁর বাড়িতে আগুন দেওয়া হলেও সেটা কোনো সাম্প্রদায়িক ব্যাপার না, একান্তই ব্যক্তিগত রেষারেষি ও জমি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরেই এসব ঘটেছে। স্থানীয় সাংসদ বলছেন, প্রিয়া সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে, সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের এই সংখ্যাতত্ত্ব প্রিয়া কীভাবে পেলেন? আসলেই কি এদেশে ক্রমাগত সংখ্যালঘুদের নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে? ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু কি ‘ডিজএপিয়ার’ হয়ে গেছে? এই সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তি কী?

ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক শক্তি কেমন বাংলাদেশ চায়?

সেক্যুলার স্টেটের রাজনীতিতে রিলিজিয়াস মাইনরিটি একটি বড় ফেনোমেনা। দক্ষিণ এশিয়ার পোস্ট কলোনিয়াল বাস্তবতায়, বাংলাদেশও এর বাইরে না। এদেশে স্বাধীনতা-যুদ্ধের সময় থেকেই সংখ্যালঘুদের নিয়ে রাজনীতি করে আসছেন দেশি ও বিদেশি শাসকগোষ্ঠী।

দক্ষিণ এশিয়ার উঠতি পরাশক্তি ভারত একটি হিন্দুপ্রধান দেশ। একটি গোঁড়া হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল বর্তমানে দেশটির ক্ষমতায়। নব্বইয়ের দশকে বাবরি মসজিদ ভাঙা ছিল উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক স্থিতির পথে একটা বিরাট ধাক্কা। এই ঘটনার মাধ্যমেই বিশ্বে সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ভারতের অন্য একটা গোপন দিক উন্মোচিত হয়ে পড়েছিল, ভারতের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দর্শনের রগ-রেষায় জড়িয়ে থাকা হিন্দুত্ববাদ ও সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার কথা চাউর হয়ে গিয়েছিল গোটা বিশ্বে। সেসময়ও, বাংলাদেশের একজন লেখিকা তসলিমা নাসরিনের একটি বই, লজ্জা, গোটা ভারতে এই দাঙ্গার আগুনে বাড়তি জ্বালানির কাজ করেছিল বলে অনেক বিশেষজ্ঞেরই ধারণা। এমনকি বিজেপি তখন তসলিমার এই বইয়ের হাজার হাজার কপি বিতরণ করেছে মর্মেও তথ্য পাওয়া গেছে।

ভারতের হিন্দুত্ববাদী এই গোঁড়া রাজনৈতিক শক্তি তাদের টিকে থাকার ভিত্তি হিসেবে কেমন বাংলাদেশ চায়? লেখক ও কলামিস্ট বদরুদ্দীন উমর তাদের চাওয়াটিকে সরল ভাষায় এভাবে ব্যক্ত করেছেন, ‘বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি ও তাদের পিতৃসংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) জন্য খুব বেশি দরকার। চরমপন্থী সাম্প্রদায়িক দল হিসেবে ভারতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী রাখার জন্যই এটা তাদের দরকার। কাজেই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা বলতে যা বোঝায় সেটা না থাকলেও সেই পরিস্থিতি তৈরির জন্য বিজেপি বেশ পরিকল্পিতভাবেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’

বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান–দক্ষিণ এশিয়ার এই তিন মুসলিমপ্রধান দেশে হিন্দুদের দুর্দশাগ্রস্ত দেখানো বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই বাবরি মসজিদের ঘটনার পরে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির অতিরঞ্জিত বর্ণনা বাবরি মসজিদে হামলাকারীদের কাজের লেজিটিমেসি তৈরি এবং ভারতে মুসলিম-বিরোধী সেন্টিমেন্ট তৈরিতে বেশ সহায়ক হয়েছিল। সেই ঘটনার মূল হোতা নরেন্দ্র মোদিই এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

ভারতের পার্শ্ববর্তী দেশ, বিশেষত মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর সংখ্যালঘুদের জন্য ভারতে নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ অনেক সহজ করে দিয়েছে বিজেপি, এটা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেই ছিল। বাংলাদেশ সফরে আসা বিজেপির একটি প্রতিনিধিদলের নেতা বিজেপির ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য অরুণ হালদার বিবিসিকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে বহু হিন্দু তাদের বলেছেন যে দেশটিতে তারা এখন নিরাপদ বোধ করছেন না। বাংলাদেশে হিন্দুদের মনোবলে চিড় ধরেছে, সেটি ফিরিয়ে আনতে হবে। বাংলাদেশি হিন্দুদের এই মনোভাব তাঁরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছেও তুলে ধরবেন।’ এ ছাড়া অরুণ হালদার আরও বলেন, ‘কিছুদিন আগে হিন্দুধর্মাবলম্বী একজন প্রধান শিক্ষককে কান ধরে ওঠবস করানো হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্ন খবরাখবর আসে নির্যাতনের। সেগুলো শুনেও ভাবতাম যে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটছে। কিন্তু এখন হাজার হাজার মানুষ এ জিনিসটাই বলছে।’ (প্রথম আলো, ০১.০৬.২০১৬)

একদিকে লাখ লাখ মানুষকে ‘বহিরাগত’ তকমা দিয়ে দেশ থেকে উৎখাত করা, অন্যদিকে তিনদেশের সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগাই বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মূল অবস্থাটি প্রকাশ করে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের সংখ্যাতত্ত্বটিও এই বিজেপি প্রকল্পের পক্ষেই সাফাই গায়।

সংখ্যালঘু নির্যাতনের সংখ্যাতত্ত্ব

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ব্যাপারে প্রিয়া সাহার সংখ্যাতত্ত্বের উপর এখন চলছে বিস্তর আলোচনা। প্রিয়া কোত্থেকে পেলেন এই সংখ্যা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন অনেকেই।

তবে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের সংখ্যাতত্ত্বের ব্যবহার এবারই প্রথম নয়। এর আগেও বিভিন্ন এনজিও সংস্থা ও ব্যক্তিগতভাবে অনেকে গবেষণা করে বিভিন্নরকম সংখ্যাতত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন, যা পরিমাণে প্রিয়া সাহার উল্লেখিত সংখ্যার চেয়ে কম হলেও, আসলে কম নয়। প্রিয়া সাহা তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক ভিডিওবার্তায় সেসব সংখ্যাতত্ত্বের রেফারেন্সও দিয়েছেন।

২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর ঢাকায় এক গোলটেবিল বৈঠকে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত দাবি করেন, গত পাঁচ দশকে আনুমানিক ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দু ধর্মাবলম্বী দেশান্তরিত হয়েছেন।

এ ছাড়া সংখ্যালঘু নির্যাতনের এই সংখ্যাতত্ত্বে উঠে এসেছে আলোচিত-সমালোচিত অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাতের নামও। প্রিয়া সাহা তাঁর ভিডিওবার্তায় দাবি করেছেন, আবুল বারকাতের গবেষণায় সংশ্লিষ্ট ছিলেন তিনি, জানিয়েছেন–তাঁর দেয়া তথ্যগুলোর সাথে আবুল বারকাতের গবেষণার ফলাফল মিলে যায়। ফলে অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের নামও বারবার আলোচিত হচ্ছে এই সংখ্যালঘু নির্যাতনের সংখ্যাতত্ত্বের আলাপে।

আবুল বারকাতের গবেষণা

২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় বারকাত সাহেবের ‘বাংলাদেশে কৃষি ভূমি জলা সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ নামের বইটি। বইটির একটি অনুচ্ছেদ হলো ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভূসম্পত্তিকেন্দ্রিক প্রান্তিকতা : শত্রু ও অর্পিত সম্পত্তি আইন’। এখানে ৭১ নম্বর পৃষ্ঠায় আবুল বারকাত লিখেছেন : ‘আমার হিসেবে প্রায় পাঁচ দশকে ১৯৬৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আনুমানিক ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ নিরুদ্দিষ্ট হয়েছেন।’ হিন্দু-বৌদ্ধ-খিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত এই সংখ্যাটিই উল্লেখ করেছেন।

আবুল বারকাত সাহেবের এই গবেষণা বলে, দেশ থেকে প্রায় ১ কোটি ১৩ লক্ষ হিন্দু হারিয়ে গেছেন। ফলে হিন্দুদের সংখ্যা কমে আসছে। আবুল বারকাত সাহেব আরও বলেছিলেন, এরকম চললে ৫০ বছর পরে দেশে কোনো হিন্দুই থাকবে না। কিন্তু আসলে ঘটনা কি তাই?

অনুপাত কমা মানেই সংখ্যায় কমা নয়

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো মোতাবেক, ১৯৫১ সালে এদেশে সংখ্যালঘুদের অনুপাত ছিল ২৩.১, যা ২০১১-তে এসে দাঁড়িয়েছে ৯.৬-এ। এই হিসাবটি দেখিয়েই ক্রমাগত সংখ্যালঘু কমছে ইত্যাদি বলা হয়। কিন্তু অনুপাতে কমা মানেই কিন্তু সংখ্যায় কমা নয়। ১৯৫১ সালে যেখানে সংখ্যালঘু ছিল ৯০ লক্ষ, ১৯৭৪ সালে ছিল ১ কোটি ৪ লাখ ৩৯ হাজার, সেখানে ২০১১-তে এসে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩৮ লাখ ৩৯ হাজার। তার মানে, আদতে সংখ্যায় তারা বেড়েছে। কিন্তু, এই সময়কালে মুসলিম জনগোষ্ঠীও বেড়েছে আনুপাতিক হারে আরও বেশি। ফলে সংখ্যায় বাড়লেও অনুপাতে তারা কমে গেছে।

সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগ

স্বাধীনতার আগে দেশভাগের প্রেক্ষাপটে হিন্দু-ধর্মাবলম্বী অনেকেই দেশত্যাগ করেছেন, সেটা ভিন্ন একটা প্রেক্ষাপট। ১৯৭১-এর পরেও, নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে এদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচার হয়েছে। কিন্তু এসব ঘটনার বেশিরভাগই ছিল রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক নয়। এদেশে স্বাধীনতার পর থেকে কখনোই বড় আকারের কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং বিপুল সংখ্যায় দলে দলে হিন্দুদের দেশত্যাগের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু তবুও এত সংখ্যক হিন্দুর দেশত্যাগের কারণ কী?

এর উত্তর পেতে হলে বিজেপির নাগরিকত্ব নীতির দিকেও তাকাতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সংখ্যালঘুদের জন্য ভারতের নাগরিকত্ব নীতি এত শিথিল করা এবং তাদের সেখানে সেটেল হওয়ার একরকম পরোক্ষ আহ্বান জানালো ভারত, কেন? তারা মহান বলে? মোটেই না। সেরকম হলে রোহিঙ্গাদের তারা নিজেদের দেশে আশ্রয় দিত, তাড়িয়ে দিত না। আসলে মুসলমান বাদে অন্য ধর্ম, বিশেষত হিন্দু ধর্মের লোকদের জন্যেই ভারতের এই বিশেষ ব্যবস্থা। আর বিজেপির এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জ্বালানি যোগায় এই একতরফা সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের সংখ্যাতত্ত্বগুলো। বর্তমান সময়ে অনেক বাংলাদেশি হিন্দু পরিবার নিজেদের জমিজমা সবকিছু বিক্রি করে পর্যাপ্ত টাকা-পয়সা নিয়ে কেবল বিজেপি সরকারের নাগরিকত্ব-নীতির সুফল পেতে ভারত চলে যাচ্ছে–এমন একাধিক প্রমাণ রয়েছে, ওপারের লোকেরাও সেসব নিয়ে মুখ খুলছেন।

প্রিয়া সাহার দাবির কোনো ভিত্তি কি আছে?

প্রিয়া সাহার দাবির কোনো ভিত্তি কি আছে? এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণাই প্রিয়া সাহার উল্লেখিত সংখ্যার কথা বলেনি। এমনকি আবুল বারকাত সাহেবও বলেছেন, প্রিয়া সাহা তাঁর নামে মিথ্যাচার করেছেন। তাহলে এই সংখ্যা কোত্থেকে এল?

ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রিয়া নিজেই। তিনি বলছেন, ‘সংখ্যালঘুদের শতকরা ভাগ যদি এখনো দেশভাগের সময়ের মতই ২৯% থাকত তাহলে বর্তমানে তাদের সংখ্যা ৩ কোটি ৭০ লাখের বেশি হতো–সেটাই আমি বলতে চেয়েছি।’ কিন্তু আমরা আগেই দেখিয়েছি, অনুপাত কমা আর সংখ্যা বাড়া একদমই ভিন্ন জিনিস। দেশভাগের সময় সংখ্যালঘুদের অনুপাত যত ছিল, দিন বাড়লে তা কমতে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কারণ মুসলমানরা সংখ্যায় এদেশে এমনিতেই বেশি ছিল, আর দেশভাগের পরে ভারত থেকে প্রচুর মুসলমান এদেশে এসেছেও বটে।

প্রিয়া সাহা তিন কোটির যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা অযৌক্তিক ও হাস্যকর। একটা দেশের সংখ্যালঘুদের আনুপাতিক হিসেব করে, সেই আনুপাতিক সংখ্যাটিকে একজাক্ট ধরে, ‘এতজন লোক হারিয়ে গেছে’ বলাটা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। তাই প্রিয়া সাহার উচিত ছিল জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া, কিন্তু তিনি এখনও তাঁর বক্তব্যের নানান ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, অনেকের বরাত দিয়ে কথাটিকে জায়েজ করতে চাচ্ছেন।

আবুল বারকাত সাহেবের বক্তব্য

নিজের গবেষণার ব্যাপারে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আবুল বারকাত বেশ নরমসুরে কথা বলেছেন। ‘৫০ বছর পরে দেশে হিন্দু থাকবে না’–এই মন্তব্যের ব্যাপারে আবুল বারকাত বলেন, ‘এটা ছিল বাংলাদেশে অর্পিত সম্পত্তি আইন বিলোপের আগের সময়টার কথা। সেই পরিস্থিতির আলোকেই কথাটা বলা। এখন অর্পিত সম্পত্তি বিলোপ হয়েছে, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে, ট্রাইবুনাল করার কথা বলা হচ্ছে। তাই আমি মনে করি না যে (হিন্দু) শূন্য হয়ে যাবার ব্যাপারটা ঘটবে।’

এ ছাড়া বর্তমানে দেশের পরিস্থিতি কি সংখ্যালঘুদের খুবই প্রতিকূল, সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগ কি বাড়ছে, এই প্রশ্নের জবাবে বারকাত বলেন, তাঁর মনে হয় সেটা অনেকখানি কমে গেছে। তাঁর ভাষায়, ‘কারণ যখন অর্পিত সম্পত্তি আইন বিলোপ হলো, তখন হিন্দুদের সম্পত্তি ভেস্টেড হযে যাওয়া যে ইনটেনসিটিতে ছিল–তা হবার সম্ভাবনা আর থাকল না।’

‘আমি একটা ভালো জিনিস দেখছি, শত্রু সম্পত্তি বিলোপ আইন হয়েছে–যা কঠিন কাজ এবং কখনোই করা হয়নি। এখন ট্রাইবুনালে যাওয়া যায়। তবে আইন সবার জন্য হলেও সুবিচার পাবার সংগতি সবার থাকে না। তা যদি হয়, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যা আছে এবং সে সমস্যা দূর করতে হবে। আমি নৈরাশ্যবাদী নই।’

বারকাত আরও বলেন, ‘গবেষক হিসেবে আমি বলতে পারি যে বাংলাদেশ থেকে সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগের ইনটেনসিটি বা তীব্রতা কমে গেছে। তবে এক পরিবার থেকে একজন আরেক দেশে চলে গেলে তার সূত্রে অন্যরাও যায়–এটা হিন্দু বা মুসলমান সব পরিবারেই হতে দেখা যায়। এটাও একরকম মাইগ্রেশন, কিন্তু এটা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।’

প্রিয়া সাহার হিসেবটিকে ‘একটি সরল পাটিগণিত’ বলে অভিহিত করেন আবুল বারকাত।

ভারত থেকে মুসলিম মাইগ্রেশন

শুধু বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের ‘হারিয়ে যাওয়া’র কথা বলা হয়, কিন্তু ভারত থেকে কত মুসলমান হারিয়ে গেছে দেশভাগের পরে, সেই হিসেবটা কেউ তোলেন না।

দেশভাগের পরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ৩৪% মুসলমানের ‘হারিয়ে যাওয়া’র গল্পটা কেউ বলে না। কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটির প্রফেসর জয়া চ্যাটার্জি তাঁর ‘দ্য স্পয়েলস অব পার্টিশান’ নামক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ১৯৩১ সালে পশ্চিমবঙ্গের শহুরে জনগোষ্ঠীর প্রতি ৪ জনের ১ জন ছিল মুসলমান। আর ১৯৫১ সালে শহুরে মুসলিম জনসংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসে। ১৯৭১ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে প্রতি ১০ জনে ১ জনে!

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওগ্রাফির প্রফেসর ড. এ এফ এম কামাল উদ্দিনের একটি গবেষণা প্রবন্ধে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে প্রায় ৭ লক্ষ ভারতীয় বর্তমান বাংলাদেশে রিফিউজি হিসেবে এসেছে। ১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে সেটা উল্লেখিত হয়েছে। এরপর ১৯৫০ সালের কলকাতা দাঙ্গায়, ১৯৬১ সালের মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশে মুসলিম নিধন, ১৯৬২ সালে আসামে মুসলিম -বিরোধী দাঙ্গা, এবং ১৯৬৪ সালে কলকাতা দাঙ্গায় লক্ষ লক্ষ ভারতীয় মুসলিম আমাদের এখানে চলে আসে। কেবল ১৯৬৪ সালের কলকাতা দাঙ্গায় ৮ লক্ষ মুসলমান পূর্বপাকিস্তানে পালাতে বাধ্য হয়। ১৯৬৭ সাল নাগাদ আরও ৫ লক্ষ ৪০ হাজার রিফিউজি আসে, যাদের অধিকাংশই পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা।

এ কেবল বাংলাদেশে আসা রিফিউজিদের গল্প। পাকিস্তানের খোঁজ নিলে হয়তো বেরিয়ে আসবে আরও বড় সংখ্যা। এহেন ভারত ঠিক কোন উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের হিন্দুদের চরম নির্যাতিত প্রমাণ করতে চায়, এবং অন্যান্য দেশের হিন্দুদের আশ্রয় দিতে চায়, তা বিজেপির ‘মহাভারত’ ড্রকটিনের সাথে পরিচিত সকলেরই বোঝার কথা।

শেষকথা
আর মাত্র কদিন পরেই আসামে বিতর্কিত মানবতাবিরোধী নাগরিকত্ব রেজিস্টার (NRC)-এর ফাইনাল লিস্ট প্রকাশিত হবে। ৪০ লক্ষ বাংলাভাষী অসমিয় জনগণ, যাদের সিংহভাগই মুসলমান, তাদের বাস্তুহারা করার জন্যেই এই ঘৃণ্য অযৌক্তিক আয়োজন। বিশ্বব্যাপী এই ঘটনার বর্বরতাকে ধামাচাপা দিতে এবং ব্যাপারটিকে জায়েজ করতে প্রিয়া সাহাদের এইসব সংখ্যাতত্ত্ব বিজেপির খুবই দরকার। বিজেপির মুখপাত্র ‘দৈনিক যুগশঙ্খ’ কয়েকদিন আগে তাদের লিড নিউজ করেছে–‘অসমে খসরা-ছুট ৪০ লক্ষই বাংলাদেশি, নিখোঁজ ৩.৭০ কোটি হিন্দু ভারতে!’ বাংলাদেশ থেকে নির্যাতিত হয়ে পালানো তিন কোটি হিন্দুর ভার বইতে গিয়ে ৪০ লাখ ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ বের করে দেওয়া তো খুবই যৌক্তিক।

সংখ্যালঘু নির্যাতনের সংখ্যাতত্ত্ব ও সেসবে লাভবান বিজেপির ভারত এভাবেই উপমহাদেশে মুসলিম-বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, আর দক্ষিণ এশিয়াকে ঠেলে দিচ্ছে একটি অনিবার্য সংঘাতের দিকে।