৩য় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা থাকছে না, কওমি মাদরাসায়ও কি তা কার্যকর হবে?

রাগিব রব্বানি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক এক ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কোনো পরীক্ষা নেওয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এবং এ সিদ্ধান্ত চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই কার্যকর হবে।

তবে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পড়ার মান যাচাই করতে কোন পদ্ধতিতে তাদেরকে মূল্যায়ন করা হবে এবং কীভাবে তাদেরকে পরবর্তী ক্লাসে উন্নীত করা হবে, এ ব্যাপারে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি মন্ত্রণালয়। কেউ কেউ বলছেন, শিক্ষার্থীদের রোজকার ক্লাস-ডায়েরিতে ক্লাস-টিচারের মন্তব্যের ওপর ভিত্তি করেই তাদের মেধার মান যাচাই ও পরবর্তী ক্লাসে উন্নতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পরীক্ষা না নেওয়ার এ সিদ্ধান্ত কেবল প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেই নেওয়া হয়েছে, এটা কিন্ডারগার্টেন বা মাদরাসার নুরানি মকতব বিভাগের জন্যও আবশ্যক কি-না, তা এখন পর্যন্ত পরিস্কার নয়।

সরকারের এই উদ্যোগে শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেছে। তবে অধিকাংশের কাছেই ব্যাপারটা প্রশংসিত হচ্ছে। তাঁরা বলছেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাসি-আনন্দের মধ্য দিয়ে পাঠদান করা জরুরি। পরীক্ষার মতো প্রতিযোগিতামূলক ব্যাপার তাদের ভেতর একটা চাপ তৈরি করে। এবং এর প্রতিক্রিয়ায় পড়াশোনার প্রতি তাদের আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায়।

ক্লাস থ্রি পর্যন্ত স্তরকে কওমি মাদরাসায় সাধারণত নুরানি মকতব বিভাগ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষার সঙ্গেও পরিচিত হয় এই বিভাগে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ধারাবাহিকতায় কওমি মাদরাসার এ বিভাগগুলো থেকেও পরীক্ষা উঠিয়ে নেওয়া হবে কি-না, বা হওয়া দরকার কি-না—এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের মহাপরিচালক অধ্যাপক মাওলানা যোবায়ের আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা উঠিয়ে নেওয়া হবে কি-না, এটা তো মাদরাসা-কর্তৃপক্ষের ব্যাপার। বোর্ড তো ৫ম শ্রেণি থেকে পরীক্ষা গ্রহণ করে। নিচের ক্লাসগুলোর পরীক্ষাগ্রহণে বোর্ডের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। তারপরও বোর্ড যেহেতু অধীনস্ত মাদরাসাগুলোর পড়াশোনার মান ও সিলেবাস নির্ধারণেও কাজ করে, তাই বোর্ডের কার্যকরী পরিষদ বৈঠকে বসলে এ ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

‘তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে চাপ কমাতে পরীক্ষা উঠিয়ে দেওয়া খুব যৌক্তিক কিছু না। হ্যাঁ, অনেক বাচ্চার মধ্যে পড়াশোনার ব্যাপারে একটা ভীতি ও অনাগ্রহ কাজ করে, এটার সমাধানের জন্য সিলেবাসে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করা যেতে পারে। তারা যেভাবে আগ্রহী হয় পড়াশোনার প্রতি, সেদিক বিবেচনা করে সিলেবাস নতুন করে সাজানো যেতে পারে। কিন্তু এ জন্য যে পরীক্ষা উঠিয়ে দিতে হবে, এমনটা আমি খুব দরকার বলে মনে করি না। আর আমাদের মাদরাসাগুলোতে এসব ক্লাসের পরীক্ষা একদম শিক্ষার্থীদের উপযোগী করেই নেওয়া হয়।’

তাঁর এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বেফাকের কর্যকরী পরিষদের সদস্য ও বিশিষ্ট আলেম মুফতি তৈয়ব বলেন, ‘আমাদের মাদরাসাগুলোর মকতব বিভাগে ওভাবে আয়োজন করে আসলে পরীক্ষা নেওয়া হয় না, যে, শিক্ষার্থীদের ভেতর পরীক্ষাভীতি তৈরি হবে বা পড়াশোনার ক্ষেত্রে এ কারণে তাদের আগ্রহ কমবে। পরীক্ষা নেওয়া হয় একদম শাদামাটাভাবে, কেবলই তাদের পড়ার মান যাচাইয়ের জন্য, আর কিছু না। তাই আমাদের মাদরাসা-ঘরানার এ শ্রেণিগুলো থেকে পরীক্ষা উঠিয়ে দেওয়ার কোনো জরুরত নেই।’

মুফতি তৈয়ব আরও বলেন, ‘সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার সঙ্গে কওমি মাদরাসার কোনো সম্পর্ক নেই। এ ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্যও নয় এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো। কারণ কওমি মাদরাসা তার স্বকীয় চিন্তা ও সিদ্ধান্ত মুতাবেক পরিচালিত হয়। সরকার যেটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি আলিয়া মাদরাসার প্রাথমিক স্তর ও বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনে কার্যকর হতে পারে, কওমি মাদরাসায় তা কার্যকর করার কোনো সুযোগ নেই।’