অনৈতিকতা-বিদ্রোহের মিলন : ইসলামি সভ্যতায় ব্যতিক্রমী চোরসংঘ

অনৈতিকতা-বিদ্রোহের মিলন : ইসলামি সভ্যতায় ব্যতিক্রমী চোরসংঘ

মুজাহিদুল ইসলাম :

ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে চৌর্যবৃত্তি একটি চরম গর্হিত কাজ হিসেবেই বিবেচিত। সমাজের চরম অবহেলিত, অশিক্ষিত ও পশ্চাদপদ শ্রেণীর মানুষ বলতে গেলে বাধ্য হয়েই চুরি করে। যদিও বর্তমানে শিক্ষিত ও আধুনিক ব্যক্তিরা ডিজিটাল পদ্ধতির চৌর্যবৃত্তিতে লিপ্ত আছে। তবে চোরদের ভেতর ধর্মজ্ঞান, নীতিবোধ, সাহিত্যজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক মননশীলতার সুকুমারবৃত্তির সমন্বয় দেখা যায় না। তাছাড়া এ চিন্তা করাটাও যেন কেমন লাগে। কিন্তু ইতিহাসে চোরের এমন সুকুমারবৃত্তির নজির আছে।

ইসলামি ইতিহাসে এমন সুকুমারবৃত্তি লালন করা চোরদের কথা এই লেখায় উঠে আসবে।

এ শ্রেণীর উদ্ভবের প্রেক্ষাপট

হিজরি দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীর প্রথমার্ধে সমাজে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত এই শ্রেণী আবির্ভূত হয়। এই সম্প্রদায় মূলত ধনীদের থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করত। তবে হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে এসব ভবঘুরে ও চোররা বাগদাদের জন্য চরম মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা মানুষের নিকট থেকে কর আদায় করতে থাকে। বিশেষত তৎকালীন প্রভাবশালী অনেক আলাবী ও আব্বাসী এই চোর ও ভবঘুরেদের দলে ছিল।

এদের প্রথম সংগঠিত প্রকাশ ঘটে দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষে, আব্বাসীদের রাজধানী বাগদাদের পাঁচ বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধের সময়। খলিফা আমীন ও তার উত্তারাধিকারী মামুনের মধ্যে সংগঠিত হয় এ যুদ্ধ। এসময় সেনাবাহিনীসহ সমাজের কর্তারা আমীনের পক্ষাবলম্বন করলে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। তখন এই ভবঘুরে, জেলখানার কয়েদী ও চোরশ্রেণী আমীনের পাশে এসে দাঁড়ায় এবং তাদের কারণেই পরিস্থিতি আমীনের অনুকূলে আসে। ইবনুল আছীরের মতে, বাগদাদের মতো রাজধানীতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা যখন সাম্প্রদায়িক অবস্থার রূপ গ্রহণ করে এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়, তখনই এরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

সংগঠনের মজবুত বিন্যাস ও ব্যবস্থাপনা

শারীরিকভাবে সুঠাম দেহের অধিকারী এ গোষ্ঠী কষ্টসহিষ্ণু ও উন্মুক্ত স্থানে ঘুমোতে অভ্যস্থ ছিল। বেত্রাঘাত সহ্য করার অদ্ভুত শক্তি ছিল তাদের। এমনকি রাগিব ইস্পাহানী বলেন, এরা যদি নবুওয়াতের দাবী করে এবং সেজন্য বেত্রাঘাত সহ্য করাকে মুজিযা হিসেবে পেশ করে, তো অনেকটাই সম্ভব!

ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল তৎকালীন বিখ্যাত চোর আবুল হায়সামের জন্য দোয়া করতেন। চোরের জন্য দোয়া করায় আহমাদ বিন হাম্বলের ওপর তার সন্তান প্রশ্ন তুললে তিনি বলেন, আমাকে যখন বেত্রাঘাতের জন্য উপস্থিত করা হয়, আমার পিছন থেকে এক ব্যক্তি আমার কাপড় টেনে ধরে বলল, আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমি বললাম, না। সে বলল, আমি বিখ্যাত চোর আবুল হায়সাম। আমাকে আঠার হাজার বেত্রাঘাত করা হয়েছে। আমি দুনিয়া ও শয়তানের জন্য তা সহ্য করেছি। আপনি কি রহমানের আনুগত্যে বেত্রাঘাত সহ্য করতে পারবেন না!

এই ভবঘুরে চোরদের অদ্ভুত সব নাম ও উপনাম থাকতো। পিপড়ার পিতা, রসের পিতা, পোকার পিতা, আবর্জনার পিতা, মাছির পিতা ও কুকুরের পিতা ইত্যাদি। তাদের প্রতি দশজনের একজন কর্পোরাল, দশজন কর্পোরালের একজন দায়িত্বশীল থাকতো। এই দশজন দায়িত্বশীলের আবার একজন কমান্ডার হতো, দশজন কমান্ডারকে একজন সুপ্রিম কমান্ডার নেতৃত্ব দিতেন। তারা তাদের সুপ্রিম কমান্ডারকে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করতো।

বিপুল সৈন্যসংখ্যা ও অভিনব যুদ্ধপদ্ধতি

ঐতিহাসিকদের মতে এদের সদস্য সংখ্যা ছিল প্রচুর। আব্বাসী খলিফা আমীনের পক্ষ হয়ে একদিনে তাদের প্রায় একলক্ষ সৈন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।
তারা যুদ্ধের ময়দানে অনেকটা উলঙ্গভাবে অংশ নিতো। খুবই ছোট পায়জামা, মাথায় খেজুর পাতার শিরস্থান এবং নুড়ি ও বালুর তৈরী ঢাল দিয়ে লড়াই করতো। আব্বাসী বংশের মামুনের সেনাবাহিনীর দুর্ধর্ষ খোরাসানী ইউনিটের সৈন্যরা এদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রের আপদ-বিপদ হিসেবে আখ্যায়িত করতো।

এক যুদ্ধে পেশাদার ঘোড়সওয়ার ভবঘুরে পার্টির এক সৈন্যের দিকে তীর ছুঁড়তে থাকে। আর সে এলোপাতাড়ি লাফ দিয়ে বরং তার দিকে ছুঁড়ে দেয়া প্রতিটি তীর সংগ্রহ করে। ঘোড়সওয়ারের তীর যখন শেষ হয়ে যায়, চোরকে তরবারী দিয়ে আঘাত করতে উদ্যত হয়। চোর তার থলি থেকে একটি পাথর বের করে ছু্ঁড়ে মারলে ঠিক তার চোখে আঘাত করে। ঘোড়সওয়ার কোনভাবে পালিয়ে জীবন বাঁচিয়ে গিয়ে বলে, এরা মানুষ না অন্যকিছু!

শিক্ষিত ও মার্জিত চোর

চোর ও ভবঘুরেদের জীবনের চমৎকার একটি দিক ঐতিহাসিকগণ তুলে ধরেছেন। ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি উচ্চমার্গের সাহিত্যবোধের অধিকারী ছিল তারা।

একবার একচোর এক বাগান মালিকের নিকট থেকে তার পোশাক চুরি করতে চাইল। বাগানের মালিক তার নিকট সময়ের আবেদন করে বলল, বাড়ীতে গিয়ে চোরের নিকট পোশাক পাঠিয়ে দিবে। এবং আরো বলল, আমি কসম করছি, তোমাকে এটা সদকা হিসেবেই দিব। চোর উত্তর দিল, ‘আমি ইমাম মালিক রহ. এর সূত্রে বলছি, তিনি বলেন, চোরদের নিকট যে কসম করা হয়, তা পালন করা আবশ্য নয়।’

উভয়ের মধ্যে আলোচনার একপর্যায়ে চোর জানায়, ‘আমি আল্লাহর রাসূল থেকে এই পর্যন্ত সকল চোরদের ইতিহাস অধ্যায়ন করেছি। এমন কোন চোর পাইনি, যে বাকিতে চুরি করেছে। আমি ইসলামে নতুন কোন বেদআত তৈরী করতে চাই না, কেয়ামত পর্যন্ত যার ভার আমাকে বহন করতে হবে। সুতরাং আপনি আপনার কাপড় খুলে আমাকে দিন। বাগানের মালিক কাপড় খুলে দিয়ে চলে গেল।

চোরদের ধর্মব্যখ্যা

ইমাম জাহিয চোরদের বিভিন্ন ঘটনা তুলে এনেছেন। তাদের এই কর্মকাণ্ডের পক্ষে সাফাই তুলে ধরেছেন।

একবার ব্যবসায়ী আবু হারিছ প্রখ্যাত চোর ইবনু সাইয়ার আল কুরদীর মুখোমুখি পড়লেন। আবু হারিছ কিছু কবিতার মাধ্যমে চোরের প্রশংসা করলেন। চোর তার কবিতায় মুগ্ধ হল। তবে বলল, ‘জানি না, এটা তোমার কবিতা কি না?’ সে আবু হারিছকে পরীক্ষা করতে চাইল। নিজের থেকে আবু হারিছের কবিতার মতো একটি কবিতা আবৃত্তি করে বলল, অনুরূপ কবিতা আবৃত্তি করো। আবু হারিছ নতুন একটি অনুরূপ কবিতা আবৃত্তি করলে আবু সাইয়ার চোর বলল, তোমার কী কী চুরি করা হয়েছে। সে জানালো তার ও তার কাফেলার বিভিন্ন জিনিস চুরি করা হয়েছে। আবু সাইয়ার চোর তাদের জিনিস ফেরত দিল।

আবু হারিছ সুযোগ বুঝে সাহিত্যপ্রেমী চোরকে তার এ পেশা অবলম্বনের কারণ জিজ্ঞেস করলে চোর জানায়, তিনি জাহিযের কিতাবে পড়েছেন, সমাজে তাদের উদ্ভবের কারণ হলো, ধনীদের জাকাত না দেয়া। এই সকল ধনী ব্যবসায়ীরা তাদের আমানতের খিয়ানাত করে, যাকাত দেয়া থেকে বিরত থাকে। তাই আমাদের জন্য তাদের সম্পদ হালাল। চোররা দরিদ্র। তারা যদি ধনীদের মাল জোরপূর্বক নিয়ে যায় তা চোরদের জন্য বৈধ হবে।

আলোচনার সময় চোর আবু হারিছকে বলল, আমি ব্যবসায়ীদের এখনই উপস্থিত করছি। আমি আপনাকে দেখাবো, তাদের সম্পদ আমাদের জন্য হালাল কেন হবে। চোর আবু সাইয়ার কিছু ব্যবসায়ীকে উপস্থিত করে তাদেরকে জাকাতের বিভিন্ন মাসআলা জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়। এভাবে একাধিক ব্যবসায়ীর মাধ্যমে সে তার দাবির সত্যতা প্রমাণের চেষ্টা করে।

একবার কাজী তানুখী তার বংশেই বেড়ে ওঠা এক যুবককে তার চৌর্যবৃত্তির কারণ জিজ্ঞেস করেন। সে জানায়, ‘জনাব, আমি বড় হয়েছি। কিন্তু অস্ত্র চালনা ছাড়া আর কিছু আমি রপ্ত করতে পারিনি। বাগদাদে গিয়ে সৈন্যবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে আমি এদের সাথে যুক্ত হয়েছি। যদি সুলতান আমার প্রতি ইনসাফ করতেন, আমাকে আমার বীরত্বানুসারে চাকরী দিতেন ও আমার দ্বারা উপকৃত হতেন, তবে তো আমি আজকের এই অবস্থানে থাকতাম না।

জনৈক চোর বলেন, আমাদের অবস্থা বাদশাহ থেকে ভালো। কারণ, তারা এতিমের মাল ভক্ষণ করে। বিভিন্ন গোষ্ঠী একে অপরকে আটক করে তাদের সম্পদ লুট করে নিজেদের যোদ্ধা পরিচয় দেয়। আবার এটাকে সর্বোত্তম রিযিক বলে অভিহিত করে। আর আমরা বিশ্বাসঘাতক ও ফাসেক লোকদের সম্পদ লুট করি। এটা তো মন্দ নয় বরং স্বাভাবিক।

তারা যা কিছুই বলুক না কেন, ফুকাহায়ে কিরাম তাদের এসব ঠুনকো অজুহাত ও যুক্তিকে নাকচ করে দিয়ে তা হারাম হওয়ার মতই দেন। কোন মহৎ উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য চৌর্যবৃত্তির মতো পন্থা অবলম্বন কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

চৌর্যশিল্পের নীতিমালা ও ধর্মবোধ

তারা তাদের এই চৌর্যবৃত্তির জন্য মৌলিক নীতিমালাও প্রণয়ন করেছে। চোরগুরু উসমান বলেন, ‘শত্রু হলেও আমি কখনো প্রতিবেশীর ঘরে চুরি করিনি। জেনেশুনে কোন ভদ্রলোকের ঘরে চুরি করিনি। আমার সাথে যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তার সাথে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি।’

চৌর্যবৃত্তিতে সফলতার জন্য তিনি তার অনুসারীদের বলেন, ‘তোমরা যদি আমাকে তিনটি জিনিশের জামানাত দিতে পারো, আমি তোমাদের সফলতার সাথে চুরি সম্পন্ন করার নিশ্চয়তা দিবো। এক. প্রতিবেশীদের ঘরে চুরি করবে না। দুই.আল্লাহর হুদুদকে ভয় করবে। তিন. নিজের পার্টনার থেকে বেশী নিবে না।’

চুরির জন্য ওঁত পেতে থাকা চোরদের একবার একব্যক্তি সালাম দেয়। চোররা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে শুরু করল, লোকটি সালাম দিয়েছে এবং আমরা সালামের উত্তর দিয়েছি। এতে সে আমাদের থেকে নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রাখে। তার কোন কিছু চুরি করা যাবে না। তাছাড়া অন্য কেউ যাতে চুরি না করে সে জন্য চোরের গুরু তাকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেয়ার জন্য লোক দিয়ে পাঠিয়ে দেয়। ঐ ব্যক্তি তাদের আচরণে মুগ্ধ হয়ে তাকে কিছু দেয়। চোর যখন তার সাথীদের নিকট ফিরে আসে, অপেক্ষমাণ চোররা এই সম্পদ গ্রহণে তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলে, এটা তো তার প্রতি নিরাপত্তা প্রদানের বিনিময়গ্রহণ, যা চুরি হতেও জঘন্য!

নীতিহীন চৌর্যবৃত্তির করুণ পরিণতি

হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে বাগদাদের আমীর শীরযাদ চোরদের তৎকালীন নেতা ইবনে হামদীর সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। প্রতি মাসে সে আমীরকে পনের হাজার দিনার দিবে। বিনিময়ে সে নিরাপদে চুরি করে যাবে। এতে করে দেশের আইন-শৃংখলা পুরা ভেঙ্গে পড়ে। তবে বাগদাদের প্রশাসন তাদের সাথে চুক্তির মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন পলিসি ও কর্মতৎপরতা সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল হতে পারে। পরবর্তীতে বাগদাদের পুলিশ-প্রধান ইবনে হামদীকে হত্যা করেন। এ শাস্ত্রের বিজ্ঞজনের মতানুসারে ইবনে হামদী সম্পূর্ণ নীতিহীন না হওয়ার নীতিমালা অনুসরণে ব্যর্থ হওয়ায় তার এই করুণ পরিণতি হয়েছে।

আগের সংবাদমৌলভীবাজারে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার ভারতীয় এক নাগরিক
পরবর্তি সংবাদভারতে মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে তৎপর হচ্ছে আরএসএস