অমুসলিম ঘোষণা : সেকুলারদের আপত্তির পর্যালোচনা

অমুসলিম ঘোষণা : সেকুলারদের আপত্তির পর্যালোচনা

ইফতেখার জামিল :

বাংলাদেশে ধর্মের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রশ্ন খুবই অস্পষ্ট। একদিকে যেমন সেকুলারিজমকে সংবিধানের ভিত্তি বানানো হয়েছে, অন্যদিকে ইসলামকে এখনো রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল রাখা হয়েছে। আমাদের রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে এমন দ্বৈততার বহু দৃষ্টান্ত দেওয়া যাবে। বস্তুত বাংলাদেশের সমকালীন ইতিহাস এই দ্বিধা ও দ্বৈততায় পরিপূর্ণ। একদিকে ধর্মীয় পরিচয় ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার ফলে ইসলামকে বাদ দেওয়া সম্ভব হয় না। নির্বাচনের আগে বা ধর্মীয় বিশেষ আনুষ্ঠানিকতায় রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক নেতারা মুসলিম পরিচয় প্রকাশে কম যান না।

আবার পশ্চিমা ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে ‘রাজনৈতিক সম্পর্ক’ টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ইসলামকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় স্থাপন করাও তাদের পক্ষে অসম্ভব। এই সংশয়ের দীর্ঘ চর্চায় যোগ হয়েছে পশ্চিমা শিক্ষা, সংস্কৃতি, আইন ও প্রশাসনব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক পরিসরে ক্ষমতার অসম মেরুকরণ ও জাতীয়ভাবে সেকুলার সংস্কৃতির বিস্তারে সেকুলারিজম আমাদের সমাজে যুক্তি ও ব্যাখ্যাব্যবস্থা হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে। একদিকে আইন হিসেবে যেমন সেকুলারিজমকে হাজির করা হয়, যেহেতু সেকুলারিজম কূটনৈতিক সম্পর্ক ও সংবিধানের ভিত্তি, তাই সবাই একেই ‘বৈধতা’ ও ‘অথরিটি’ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আবার এর সাংস্কৃতিক প্রভাবে অনেকের দাবী সেকুলারিজমকে ‘যুক্তি’, ‘ইনসাফ’ ও ‘প্রমাণ’ হিসেবেও মেনে নিতে হবে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার দাবী উঠেছে। সবসময়ের মতো এখানেও সেকুলার কার্ড দেখানো শুরু হয়েছে। ‘বৈধতা’, ‘অথরিটি’, ‘যুক্তি’, ‘ইনসাফ’ ও ‘প্রমাণ’ হিসেবে সেকুলারিজমকে সামনে আনা হচ্ছে। বলাই বাহুল্য যে, বাংলাদেশ যেমন এককাট্টা ইসলামি রাষ্ট্র নয়, তেমনি সেকুলার রাষ্ট্রও নয়। আদতে ইসলামের মত সেকুলারিজমের এমন এককাট্টা কোন রুপ বা প্রস্তাবনা নেই। একেক দেশে একেক রকমের সেকুলারিজম জারি আছে, আবার ঐতিহাসিকভাবেও সেকুলারিজমের চর্চায় বিভিন্নতা এসেছে। এসব প্রেক্ষিতে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার আন্দোলনে সেকুলার আপত্তির পর্যালোচনা জরুরী হয়ে উঠেছে।

অমুসলিম ঘোষণার দাবী : আলেমদের ব্যাখ্যা ও যুক্তি

বাংলাদেশে অফিশিয়াল হিসাব অনুযায়ী প্রায় লাখ খানেক কাদিয়ানি আছে। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রকৃত সংখ্যা এর থেকে অনেক বেশী। বিশ্বের যেসব দেশে বিপুল সংখ্যক কাদিয়ানি বাস করে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। অমুসলিম ঘোষণার দাবীর পেছনে আলেমদের ব্যাখ্যা হচ্ছে, তারা ইসলামের সবচেয়ে মৌলিক প্রস্তাবনার সাথে দ্বিমত পোষণ করে। ফলে সাদা যেমন কালো নয়, পানি আর আগুন যেমন এক নয়, তেমনি কাদিয়ানিরাও মুসলিম নয়। তাদের প্রস্তাবনার যুক্তি হচ্ছে, একদিকে ঐতিহাসিকভাবে যেমন কাদিয়ানিরা পশ্চিমাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে, তেমনি বর্তমানেও এই সম্পর্ক চলমান আছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ অনেক জায়গায় কাদিয়ানিদের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়, দৃষ্টান্ত হিসেবে ইরাক ও পাকিস্তানের কথা আনা যায়, তেমনিভাবে এখনো কাদিয়ানিদের প্রধান কার্যালয় লন্ডনে অবস্থিত, লন্ডনে ইসলামি টিভি চ্যানেল প্রচারে কড়াকড়ি থাকলেও কাদিয়ানিদের মিডিয়ায় কোন রকম বিধিনিষেধ নেই । পাশাপাশি তাদের বিপুল অর্থায়ন নিয়েও আছে অনেক প্রশ্ন। ফলে আলেমরা কাদিয়ানি প্রকল্পকে পশ্চিমা ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেন ও ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।

বেশকিছু প্রায়োগিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আলেমদের দাবী হচ্ছে, কাদিয়ানিরা অশিক্ষিত মুসলমানদের সাথে প্রতারণা করে তাদেরকে দলভুক্ত করছে। সে হিসেবে দেখা যায়, পশ্চিমা ও আফ্রিকার দেশগুলোতে অশিক্ষা ও দরিদ্রতার সুযোগে কাদিয়ানিদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। যেমন নাইজেরিয়ায় প্রায় ত্রিশ লাখ, নাইজারে প্রায় দশ লাখ, ঘানায় সাত লাখ, কঙ্গোতে ছয় লাখ, সিয়েরা লিয়ন ও ক্যামেরুনে প্রায় পাঁচ লাখ ও ইন্দোনেশিয়ায় চার লাখ কাদিয়ানির বসবাস। এভাবে আফ্রিকার অশিক্ষা ও দরিদ্রতার সুযোগে কাদিয়ানিরা জনমিতি পরিবর্তন করে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে আলজেরিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সরকার কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করেছে। দুই হাজার ষোল সালে আলজেরিয়ায় কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয় এবং কুশিলবদের অনেককে গ্রেফতার করা হয়। দুই হাজার আট সালে ইন্দোনেশিয়ায় দুই মন্ত্রণালয় ও এটর্নি জেনারেল প্রতারণার অভিযোগে কাদিয়ানিদের নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেন।

তবে যেহেতু কোন ধর্মীয় গোষ্ঠীকে ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিলেই হবে না, তার সামাজিক ও আইনি পরিচয় চিহ্নিত করতে হবে। সে হিসেবে বাংলাদেশের মুসলিম নেতৃত্ব প্রাইভেসি তত্ত্ব ও আইনের ভিত্তিতে তাদেরকে অমুসলিম আখ্যা দেওয়ার দাবী জানিয়ে যাচ্ছেন। কাদিয়ানিদের নাগরিক অধিকার রক্ষা করার বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই মন্তব্য করে আলেমদের যুক্তি হচ্ছে, অমুসলিম ঘোষণার মাধ্যমেই প্রাইভেসি ও প্রতারণা প্রশ্নের সমাধান করা সম্ভব। এতে সামাজিক শৃঙ্খলা ও কাদিয়ানিদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিতে অধিকতর ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। তবে আগেই যেমন বলেছি, আলেমদের এই দাবীর সাথে সেকুলাররা দ্বিমত পোষণ করছেন। ‘সেকুলারিজমের’ ‘যুক্তি’, ‘ইনসাফ’ ও ‘প্রমাণ’ এর ভিত্তিতে তারা অমুসলিম ঘোষণার বিরোধিতা করছেন। এই লেখায় আমরা তাদের আপত্তিগুলো পর্যালোচনার চেষ্টা করবো।

কাদিয়ানি প্রশ্ন ব্যাখ্যায় সেকুলার আপত্তির সঙ্কট

এক্ষেত্রে সেকুলারদের সবচেয়ে বড় যুক্তি হচ্ছে, রাষ্ট্র ধর্মীয় বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। কেননা রাষ্ট্রের কোন ধর্ম থাকতে পারে না। রাষ্ট্র নাগরিকদের কল্যাণে কাজ করে, এখানে মতাদর্শিক বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে না। বাস্তবতা হচ্ছে, রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের এই সম্পর্ক সেকুলারিজমের এককাট্টা চরিত্র নয়, বরং একমাত্র ফ্রেঞ্চ সেকুলারিজমকেই রাষ্ট্র ও ধর্মের এমন সম্পর্কের প্রবক্তা বলা যেতে পারে। আমেরিকান সেকুলারিজম থেকে শুরু করে ভারতীয় সেকুলারিজমও যে ধর্মমুক্ত নয়, সেটা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। আমেরিকান সন্ত্রাস বিরোধী অনন্ত যুদ্ধ, মুসলিম ব্যান, ইজরাইলকে প্রত্যক্ষ সাহায্য ও মেনিফেস্ট ডেস্টিনির মধ্যে ধর্মের প্রভাব খুবই স্পষ্ট। পাশাপাশি ভারতে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল, তিন তালাক নিষিদ্ধের বিল, নাগরিক আইন ও মাদরাসায় অনুদান বন্ধের ঘোষণাও এসেছে সেকুলারিজমের ভিত্তিতে।

ফলে ধর্মমুক্ত সেকুলারিজম বা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। কেননা মানুষের বাইরে রাষ্ট্রের কোন অস্তিত্ব নেই। মানুষের সমষ্টিই রাষ্ট্র পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে যেমনি ভাবে মানুষ তার ধর্মবোধ থেকে মুক্ত হতে পারে না, তার বোধ-বুদ্ধি-আবেগ-কল্পনায় ধর্মের প্রভাব থেকেই যায়, তাই ধর্মমুক্ত মানুষ, সেকুলারিজম বা রাষ্ট্র বলে কিছু নেই। এখন প্রশ্ন হতে পারে, আমেরিকান ও ভারতীয়রা যেভাবে ধর্মীয় পরিচয়কে জুলুমের ক্ষেত্রে ব্যবহার করছে, বাংলাদেশের আলেমরাও কেন তাদের ধর্মবিশ্বাসকে জুলুমের ক্ষেত্রে ব্যবহার করবেন? এর সংক্ষিপ্ত উত্তর হচ্ছে, কদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা না করলে বেশ কিছু জটিলতা তৈরি হবে।

প্রচলিত আইনে বিবাহ, বিবাহ-বিচ্ছেদ ও সম্পত্তি বণ্টনের মতো বিষয়ে প্রত্যক্ষভাবে ধর্মীয় মতামত গৃহীত হয়েছে। এছাড়াও অনেক বিষয়ে পরোক্ষভাবে ধর্মীয় প্রভাব জারি আছে। ইসলামি বিধান অনুযায়ী অমুসলিমরা সম্পত্তির ভাগ পায় না, অমুসলিমদের সাথে বিবাহও বৈধ নয়, এখন কেউ কাদিয়ানি হয়ে গেলে তার সম্পত্তিপ্রাপ্তি ও বিবাহের কী হবে, এমন মামলা আদালতে গেলে আদালত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। মুসলমানরা কাদিয়ানিদের মসজিদ বা অন্য কোন জায়গা ইসলামি কাজে ব্যবহার করার সুযোগ চাইলে আদালতের পক্ষ থেকে আইনিভাবে বাঁধা দেবার কোন সুযোগ নেই। পাশাপাশি আফ্রিকা, আলজেরিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে আইনিভাবে এর মোকাবেলার সুযোগও নেই বললেই চলে। এভাবে বাংলাদেশের জনমিতি পরিবর্তনের বিশাল ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। যে ঝুঁকি আমরা পরিবার পরিকল্পনার মতো অপবিজ্ঞান ভিত্তিক প্রকল্পগুলোতেও দেখেছি।

পাশাপাশি বাংলাদেশে সেকুলারিজম আরোপিত, এটি অনেক সেকুলার লেখক পর্যন্ত স্বীকার করেন। পিনাকী ভট্টাচার্যের বয়ানে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের আগে আওয়ামীলীগ ও শেখ মুজিবের বক্তব্যে সেকুলারিজমের কোন প্রস্তাবনা ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের চাপে পড়ে সেকুলারিজম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বরং সত্তরসহ পরবর্তী নির্বাচনপূর্ব ইশতিহারে ইসলামি বিরোধী আইন না করার অঙ্গীকার সবসময় হাজির ছিল। বিশেষত উগ্রবাদ-মাদকের মতো ইস্যুতে রাষ্ট্র ধর্ম ও ধর্মীয় নেতাদের সাহায্য ও সমর্থন কামনা করে, প্রশ্ন হচ্ছে, যে রাষ্ট্র ধর্মের প্রাইভেসির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন মোকাবেলা করতে আগ্রহী বা সক্ষম নয়, সে রাষ্ট্র কীভাবে জরুরী ইস্যুতে ধর্মীয় সাহায্য কামনা করে ? এভাবে ভাবলে দেখা যাবে, রাষ্ট্র ধর্ম বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারে না, এটি প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়।

সেকুলারদের বিভিন্ন প্রশ্ন : ব্যাখ্যার চেষ্টা

ক) ‘অমুসলিম ঘোষণা ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী’

আলেমরা কাদিয়ানিদের নাগরিক অধিকার ও ধর্মচর্চায় বাঁধাপ্রদান করেন না বা করার তাদের ইচ্ছেও নেই। তাদের দাবী বরং প্রাইভেসি কেন্দ্রিক ; ষড়যন্ত্র করে কেউ নিজেদের মুসলমান দাবী করতে পারবে না। কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার মাধ্যমে তাদের প্রতারণা ও আইনি জটিলতার সমাধান ঘটবে। সেক্ষেত্রে তারা নিজেদেরকে মুসলিম দাবী করে ধর্মান্তর করতে পারবে না। জনমিতি পরিবর্তনের আশংকাও কমে যাবে। যেমন আলেমরা খৃস্টান মিশনারিদের প্রচারে বাঁধার সৃষ্টি না করলেও ঈসাই মুসলিম জামাতের ব্যানারের পশ্চিমা ষড়যন্ত্র প্রতিরোধের চেষ্টা চালান।

এখানে বলে রাখা ভালো, মুসলিম দেশগুলোতে ধর্মীয় স্বাধীনতা কখনোই ইস্যু ছিল না। কেননা ইসলাম ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। কাউকে জুলুম, প্রতারণা বা ভয় দেখিয়ে ইসলাম গ্রহণ করানোর সমর্থন করে না। পক্ষান্তরে আধুনিক কালের আগে খৃস্টান দেশগুলোতে জোরপূর্বক কনভার্ট করার সুযোগ ছিল, ভিন্নধর্ম নিয়ে রাষ্ট্রের ভেতরে বসবাস করার কোন ব্যবস্থা ছিল না। ধর্মীয় ভিন্নতা থাকলেই রাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার বা জোরপূর্বক কনভার্ট। স্পেনের কথা আমরা সবাই জানি। পাশাপাশি প্রটেস্টান্ট রিফরমেশনের পরেও পিলগ্রিমসদের আমেরিকায় অভিবাসনের পেছনেও এই কারণ কার্যকর ছিল। এর প্রেক্ষিতে ধর্মীয় স্বাধীনতার দাবী প্রাসঙ্গিক ও জরুরী হয়ে উঠেছিল। এর সাথে প্রাইভেসির ভিত্তিতে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার দাবীর কোন মিল নেই। এখানে রাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার বা জোরপূর্বক কনভার্টের কোন দাবী বা চেষ্টা নেই।

খ) ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ সরকারের কাছে অমুসলিম ঘোষণার দাবী’

বর্তমান সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে প্রশ্ন আছে। বৈধতা নিয়েও অনেক সংশয় আছে। ফলে সেকুলারদের অনেকের মন্তব্য হচ্ছে, এমন একটি সরকারের কাছে কাদিয়ানিদের অমুসলিম দাবী করাটা হাস্যকর। এখানে বলে রাখা ভালো, রাষ্ট্র ও সরকার এক নয়। বর্তমান সরকারের আমলে এই বিভেদ রেখা অস্পষ্ট হয়ে গেলেও কোন দেশ রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে বিভক্তি ছাড়া চলতে পারে না। বর্তমান সরকারের অনেক কার্যক্রমে সমালোচনা থাকলেও রাষ্ট্রের কাছে দাবী জানানোর মধ্যে কোন সমস্যা থাকার কথা নয়। যেমন পুলিশ আপনাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করলেও আপনি সেই আইন ব্যবস্থার কাছেই জামিন দাবী করেন।

সরকার বা প্রশাসনে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও আপনিও কিন্তু আইনি ও রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার বাইরে যান না। বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের বিদ্যমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সেকুলারাইজেশনের ঐতিহাসিক অবৈধ ধারাবাহিকতায় আলেমরা সংস্কার চান। এই আন্দোলন সেই সংস্কার চেষ্টার সিলসিলা। আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে যে সেকুলার প্রবণতা বিদ্যমান, এতে আইয়ুব খান ও ভারতীয় হস্তক্ষেপের বিশেষ প্রভাব আছে। মজার বিষয় হচ্ছে, কোন সেকুলার আইয়ুবি বা ভারতীয় সেকুলারাইজেশনের বিরোধিতা করেন না।

গ) ‘এই আন্দোলন ভারত ও পশ্চিমাদের কাছে আওয়ামীলীগের সমর্থন নিশ্চিত করবে’

অনেকেই বলতে চান, কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার দাবী বরং আওয়ামীলীগকে সাহায্য করবে। কেননা এতে আওয়ামীলীগ ভারত ও পশ্চিমাদেরকে দেখাতে পারবে, বাংলাদেশে মৌলবাদী সঙ্কট বাড়ছে। মৌলবাদীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে আওয়ামীলীগকেই ক্ষমতায় থাকতে ও রাখতে হবে। এভাবে ইসলামপন্থীরা পশ্চিম ও ভারতের কাছে উগ্র বলে বিবেচিত হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, জনগণের সমর্থন ছাড়া পশ্চিমা বা ভারতীয় সমর্থনের চিন্তাও অগণতান্ত্রিক চিন্তা। উদারতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেলেও ভারত বা পশ্চিমারা ইসলামপন্থীদের সাহায্য করবে না। ফলে পশ্চিমা-জুজুর কোন ভিত্তি নেই।

ঘ) ‘এই দাবী অগণতান্ত্রিক’

অনেকের ব্যাখ্যা মতে অমুসলিম ঘোষণার আন্দোলন যদিও বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠদের দাবী, তবে নিছক সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আইন পাস করলে সেটা আর গণতন্ত্র থাকে না। এটা মূলত লিবারেল সেকুলারদের সবচেয়ে বড় ট্র্যাম্পকার্ড। তারা প্রশ্নবিদ্ধ ও কালো টাকার নির্বাচনের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র থেকে ইসলাম ও ইসলামি আইন বিতাড়িত করতে চান, তবে কখনো ইসলামপন্থীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবিধা পেলে সংখ্যালঘু রক্ষা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রস্তাবনা সামনে নিয়ে আসেন। তখন তারা বলেন, গণতান্ত্রিক আদর্শ ও মতাদর্শ রক্ষা করতে হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংখ্যালঘুদের বিপক্ষে যায় এমন কোন আইন করা যাবে না।

একটু তলিয়ে দেখলেই বুঝবেন, তারা রাষ্ট্রের মাধ্যমে আদর্শ বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাদের যে মৌলিক দাবী ; রাষ্ট্র ধর্মীয় ও আদর্শিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে পারে না, সেই দাবির সাথে উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের যুক্তি সরাসরি সাংঘর্ষিক। বস্তুত উদার গণতন্ত্র বা লিবারেল ডেমোক্রেসির এটি একটি মৌলিক সমস্যা। সে নিজেই নিজের বিরোধী। এ জন্যেই আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক দেশে উগ্র ডানপন্থার উত্থান ঘটছে। নিজেদের দেশে উগ্র ডানপন্থার উত্থান ঘটলেও পশ্চিমারা মুসলমানদেরকে জোরপূর্বক লিবারেল ডেমোক্রেসির বাইরে যেতে দিতে চান না। প্রয়োজনে স্বৈরাচারদের সাহায্য করেন। একই চরিত্র অধিকাংশ সেকুলাদেরও।

ঙ) ‘এটি বর্ণবাদী দাবী’

অন্যকে ধর্ম থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা একটি বর্ণবাদী প্রস্তাবনা। কেননা এতে কাদিয়ানিদেরকে তাদের মৌলিক ও মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। আদতে এই প্রশ্নের কোন ভিত্তি নেই। কেননা কাদিয়ানিদের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে আলেমরা কখনোই কোন নেতিবাচক অবস্থান সমর্থন করেন না। বরং প্রাইভেসী ও প্রতারণার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে আলেমরা অমুসলিম ঘোষণার দাবী করছেন। এতে কাদিয়ানিরা জাতিগতভাবে অযোগ্য বা নিচু শ্রেণীর, এমন কোন যুক্তি নেই।

কেউ খৃস্টান ধর্মের অনুসারী হলে তার সাথে যে আচরণ করা হবে, কাদিয়ানিদের সাথে একই আচরণ করা হবে। পাশাপাশি কাদিয়ানিদের সাথে যে আচরণ করা হবে, কাদিয়ানিরাও মুসলমানদের সাথে সমান আচরণ করবে। তারাও মুসলমানদের অকাদিয়ানি ঘোষণার দাবী জানাতে পারে। এখানে বর্ণবাদের কিছু নেই। আমার গাড়ি আমার, আমার জামা আপনার নয়, এই দাবী কোনভাবের বর্ণবাদী নয়। বস্তুত এই প্রাইভেসি প্রশ্নের মিমাংসা ছাড়া বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে কাদিয়ানি প্রশ্নের সমাধান করা সম্ভব নয়।

আগের সংবাদকাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবি: কেন যৌক্তিক?
পরবর্তি সংবাদবাস-নসিমন সংঘর্ষ, প্রাণ গেল ৫ শ্রমিকের