আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ : মুসলিম বাংলার অনুসন্ধান চালিয়েছেন যিনি অক্লান্তভাবে

মুসান্না মেহবুব :

আজ ১১ অক্টোবর। বাংলা সাহিত্যে মুসলিমদের অবদান অনুসন্ধান ও প্রমাণে অক্লান্ত ও অভূতপূর্ব গবেষক মুন্সি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের ১৪৯ তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দের এ দিনে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার সুচক্রদণ্ডী গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

মেহনতি জীবনের পুরো সময়টা জুড়ে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ নিজের মেধা, শ্রম, ঐকান্তিকতা, অনুসন্ধান ও আবিষ্কারের মাধ্যমে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অজানা অথচ অপরিহার্য ইতিহাস পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। বাঙালি মুসলিম সমাজের আত্মচেতনা বৃদ্ধি, মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগসৃজন, দেশের প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি এবং আত্মপ্রত্যয় ও আত্মমর্যাদা জাগানোর ক্ষেত্রে আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদের অবদান চিরস্মরণীয়। প্রাচীন পুঁথি আবিষ্কার, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, সম্পাদনা ও গবেষণায় অসাধারণ নিষ্ঠা, দক্ষতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় রেখে গেছেন তিনি।

পড়াশোনা ও বেড়ে ওঠা

জন্মের তিন মাস আগে বাবা মুন্সি নুরউদ্দীনকে হারিয়ে এতিম অবস্থায়ই তিনি পৃথিবীর আলোয় চোখ মেলেছিলেন। মা মিসরীজান বেগমের লালনপালনেই তাঁর বেড়ে ওঠা। কিন্তু কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যের শুরুভাগে, ১৭ বছর বয়সে মাকেও হারান আবদুল করিম।

পিতৃ-মাতৃহীন আবদুল করিম দাদা-দাদি ও চাচা-চাচির স্নেহছায়ায় এন্ট্রান্স পাস করেন এবং সচেষ্টায় বাংলা, সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। তার পড়াশোনা শুরু হয়েছিল বাড়ির দহলিজেই। সেখানেই তিনি আরবি-ফারসি ও বাংলায় পড়া শুরু করেন। অতঃপর তিনি সুচক্রদণ্ডী মধ্যবঙ্গ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এক বছর পড়াশোনা করে তিনি পটিয়া উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৮৯৩ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

উল্লেখ্য যে, এন্ট্রান্স পরীক্ষায় তার দ্বিতীয় ভাষা ছিল সংস্কৃত এবং সঙ্গত কারণেই উনিশ শতকে এন্ট্রান্স পাস করতে ইংরেজি ভাষাজ্ঞানেও পারদর্শী হতে হতো। চট্টগ্রাম কলেজে দু’বছর এফএ পড়ার পর ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে চট্টগ্রাম অঞ্চলের অনেক সম্পন্ন পরিবারের মতো তাদের পরিবারেও অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা অনিবার্য করে তোলে। এর সঙ্গে যোগ হয় শারীরিক অসুস্থতা। পরীক্ষার আগে তিনি টাইফয়েড এ আক্রান্ত হন। ফলে তার আর এফএ পরীক্ষা দেয়া হয়নি। এখানেই তার উচ্চ শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে।

পেশাগত কর্মজীবন

জীবিকার তাগিদে মুসলিম বাংলার মহান এ সাহিত্যসাধককে বিচিত্র পেশায় নিয়োজিত থাকতে হয়েছিল। তবে এর মধ্যে শিক্ষকতাকেই তিনি অগ্রগণ্য বিবেচনা করেন। ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করার পর সীতাকুণ্ড মধ্য ইংরেজি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের অস্থায়ী পদে যোগদান করেন। পরে ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রামের প্রথম সাব-জজ আদালতে কেরানি পদে চাকরি শুরু করেন।

কবি নবীনচন্দ্র সেনের সহযোগিতায় ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম কমিশনার অফিসে কমিশনারের পার্সোন্যাল এসিস্ট্যান্ট হয়ে আসেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হয়ে তাঁকে চাকরিচ্যুত হতে হয়। এরপর ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রামের আনোয়ারা মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে নিযুক্তি লাভ করেন। আবারও চাকরি বদল করে ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্কুল অফিসে কেরানির পদে চাকরি করার পর ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঐ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

সাহিত্যসাধনা

বাল্যকাল থেকেই পুঁথিপত্রের প্রতি খুব আগ্রহী ছিলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। জীবনভর তাঁর নেশা ছিল দৈনিক-সাপ্তাহিক-পাক্ষিক-মাসিক ইত্যাদি পত্রিকা পাঠ করা এবং সংগ্রহ করা।

শৈশবে তিনি তাঁর বাড়িতে তাঁর পিতামহ কর্তৃক সংগৃহীত কিছু পুঁথির সঙ্গে পরিচিত হন। এই পুঁথিগুলো পড়ে তিনি পুঁথি সংগ্রহে ও এ নিয়ে লিখতে আগ্রহী হন। এ পুঁথিগুলোর মধ্যেই পেয়ে যান ‘চণ্ডীদাসের পদাবলী’। এফএ ক্লাসের ছাত্র থাকাকালে আচার্য অক্ষয় সরকার সম্পাদিত ‘পূর্ণিমা’ পত্রিকায় ‘প্রাচীন পদাবলী’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। এই প্রবন্ধ পাঠ করেই মহাকবি নবীন চন্দ্রসেন সাহিত্যবিশারদের প্রতি আকৃষ্ট হন।

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ এমন একজন ব্যক্তি, যিনি আজীবন প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের সেবা করে গেছেন। বাঙালি লেখকেরা যখন পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রভাবে ও অনুরাগে আধুনিক বাংলা সাহিত্য সৃষ্টিতে নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছেন, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ তখন প্রাচীন ও মধ্যযুগের পুঁথি সংগ্রহ, পুঁথির রক্ষণাবেক্ষণ এবং পুঁথি সম্পাদনায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। মূলত পুঁথি সংগ্রহ, পুঁথির রক্ষণাবেক্ষণ ও পুঁথি সম্পাদন ছিল তার জীবনের ব্রত। বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রধান উপাদান পুঁথি পত্র ও এদেশের প্রাচীন ও মধ্য যুগের লৌকজ-সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর সম্পাদিত নরোত্তম ঠাকুরের ‘রাধিকার মানভঙ্গ’, কবিবল্লভের ‘সত্যনারায়ণের পুথিঁ’, দ্বিজ রতিদেবের ‘মৃগলুব্ধ’ রামরাজার ‘মৃগলুব্ধ সম্বাদ’, দ্বিজ মাধবের ‘গঙ্গামঙ্গল’, আলী রাজার ‘জ্ঞানসাগর’, বাসুদেব ঘোষের ‘শ্রীগৌরাঙ্গ সন্ন্যাস’, মুক্তারাম সেনের ‘সারদামঙ্গল’, শেখ ফয়জুল্লাহর ‘গোরক্ষবিজয়’ ও আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ (খণ্ডাংশ) বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে প্রকাশিত।

‘ইসলামাবাদ’ (চট্টগ্রামের সচিত্র ইতিহাস) ও ‘আরাকান রাজসভায় বাঙ্গলা সাহিত্য’ (মুহম্মদ এনামুল হকের সহযোগে রচিত) তাঁর দুটি মৌলিক গ্রন্থ।

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের মতো নিষ্ঠাবান পুঁথি সংগ্রহকারী বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আর একজনও নেই। তিনি ছিলেন মুসলমান, কোন হিন্দুর আঙ্গিনায় তাঁর প্রবেশাধিকার নেই, কিন্তু হিন্দুর ঘরে পুঁথি আছে শুনে তিনি ভিখারীর মত তার দ্বারে গিয়া পুঁথি দেখতে চাইতেন। পুঁথি সরস্বতী পূজার দিন পূজিত হয়। অতএব মুসলমানকে ছুঁতে দেয়া হবে না বলে অনেকে তাঁকে দেখতেও দেননি। অনেকে আবার তাঁর কাকুতি মিনতিতে নরম হয়ে নিজে পুঁথি খুলে পাতা উল্টে দেখিয়েছেন, মুন্সী সাহেব দ্বারের বাইরে দাঁডিয়ে হস্তস্পর্শ না করে কেবল চোখে দেখে নোট করে সেই সকল পুঁথির বিবরণ লিখে এনেছেন।

তিনি প্রায় ছয় শতাধিক পুঁথির পরিচয়মূলক প্রবন্ধ লিখে গেছেন। এসব প্রবন্ধ পুস্তকাকারে আজও প্রকাশিত হয়নি। প্রকাশিত হলে বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের অবদান সম্পর্কে ইতিহাস রচনার কাজ অনেকখানি সহজতর হতো।

সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলার সুধী সমাজ তাঁকে ‘সাহিত্য বিশারদ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আজীবন সদস্য ছিলেন। সাহিত্য, ভারতবর্ষ, নারায়ণ, মানসী, সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা, গৃহস্থালী, সুপ্রভাত, বঙ্গদর্শন, ভারতী, সম্মিলনী, স্বদেশ প্রেম, বিজয়া প্রভৃতি সেকালের সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এই গৌরব তাঁর সমসাময়িক যুগের অপর কোন মুসলমান লেখকের পক্ষে কমই ঘটেছে। এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক আবুল ফজলের বক্তব্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। অধ্যাপক আবুল ফজল ‘সাহিত্য বিশারদ স্মরণে’ শীর্ষক এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘তিনি পেশাদার সাহিত্যিক ছিলেন না। সাহিত্য সাধনাকে তিনি কোনদিন অর্থোপার্জনের উপায় হিসাবে ব্যবহার করেন নি। তিনি ছিলেন খাঁটি সাহিত্য সাধক। সাহিত্যের যেখানে যা কিছু উপকরণ দেখেছেন, পেয়েছেন তাই সংগ্রহ করেছেন, প্রাণপণ যত্নে আগলে রেখেছেন যক্ষের ধনের মতো, নূতন পুরাতন যা কিছু সাহিত্য সম্পদ তাঁর হাতে পড়েছে, তাই তিনি সযত্নে সংগ্রহ করে রেখেছেন, কিছুরই অপচয় হতে দেননি। একথা বোধ করি জোর করে বলা যায়, তাঁর সংগৃহীত গ্রন্থাবলীর সাহায্য ছাড়া বাংলা সাহিত্যের কোন পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচিত হতে পারবে না।’

মৃত্যু

মুসলিম বাংলা সাহিত্যের অভূতপূর্ব এই সাধকগবেষক ১৯৫৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে নিজ বাসভবনে রাতের বেলা ‘চট্টগ্রামের অজানা কাহিনী’ লিখতে বসে ১০টা ৪৭ মিনিটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। পরে স্থানীয় মসজিদের পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।

তাঁর জীবন ও কর্ম সর্ম্পকে প্রকাশিত গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে ফরহাদ খান ও সৈয়দুর রহমান সম্পাদিত ‘আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদকে নিবেদিত প্রবন্ধ সংকলন’ (১৯৯৪), ইসরাইল খান সম্পাদিত ‘আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ অভিভাষণসমগ্র’ (২০১০), আহমদ শরীফ রচিত ‘আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ জীবনী গ্রন্থ’ (২০০২) এবং আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত ‘আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ রচনাবলী’ ( ২০১৩)।

আগের সংবাদনারীরা মুখ খুলতে থাকলে যৌন হয়রানি অনেকটাই কমে আসবে : হাইকোর্টের বিচারপতি
পরবর্তি সংবাদআবরার হত্যা মামলায় অনিকের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী