
আবদুল্লাহিল বাকি :
‘যে ধারণা করে, সে আপন প্রেম লুকিয়ে রাখতে পারে — সে তো মিথ্যুক।
প্রেম হৃদয়ের জন্য বেশ ভারি।
গোপনীয়তার তিলও তাতে ঠাঁই পাবে না।’
আব্বাসী যুগের জনপ্রিয় দুনিয়াবিমুখ কবি আবুল আতাহিয়া এই কথাটি বলেছেন। এই মহান কবির জীবনেই এখন প্রবেশ করব আমরা।
জীবন ও প্রতিপালন
আবুল আতাহিয়া তার উপাধি। নাম ইসমাইল। উপনাম আবু ইসহাক। পিতা কাসিম বিন সুওয়াইদ বিন কায়সান। মাতা যিয়াদ আল মুহারেবীর কন্যা উম্মে যায়েদ। তিনি ১৩০ হিজরী মোতাবেক ৭৮৪ ঈসায়ীতে ‘আয়নুত তামর’ নামক অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন, যা ইরাকের কারবালা অঞ্চল থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আবুল আতাহিয়ার গায়ের বরণ ছিল সাদা। ঘন কালো কোঁকড়ানো চুল। সুভাষী, অমায়িক ও মিশুক। তবে তার চরিত্রে একটা অস্থিরতার অবস্থা ছিল। এজন্যই তিনি এক মত থেকে অন্য মতে, এক চরিত্র থেকে অন্য চরিত্রে সারাজীবন ঘুরে বেড়িয়েছেন।
‘আবুল আতাহিয়া’ লকবে তার পরিচিতি ও প্রসিদ্ধির অনেক কারণ পাওয়া যায় ঐতিহাসিক বর্ণনায়। বিখ্যাত ক্লাসিক সাহিত্যিক আবুল ফারাজ আস্পাহানী ‘আগানী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আব্বাসী খলিফা মাহদী একবার এক প্রসঙ্গে আবুল আতাহিয়াকে লক্ষ্য করে বললেন, “আন্তা ইনসানুন মুতাহাযলিকুন মু’তিহুন” (তুমি কৃত্রিম ও উন্মাদপ্রায়)। তখন থেকে সে আবুল আতাহিয়া নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। কারণ ‘মু’তিহুন’ ও ‘আতাহিয়া’ একই ধাতুমূল থেকে নির্গত। তবে উন্মাদনার অর্থকে বাহুল্য ও অতিরঞ্জন প্রদান করে ‘আতাহিয়া’ শব্দটা। তার সম্পর্কে আরো বর্ণিত আছে যে, তার মধ্যে কামুক প্রবৃত্তি, স্ফূর্তিময়তা ও এক ধরণের কৃত্রিম উন্মাদনা কাজ করতো।
আবুল আতাহিয়া শৈশবেই তার পিতা-মাতা ও পরিবার-পরিজনের সাথে আইনুত তামর অঞ্চল থেকে কুফায় চলে আসেন। এখানেই তিনি বেড়ে ওঠেন ও শিক্ষা-সংস্কৃতির সংস্পর্শ লাভ করেন। এখানে তিনি বিভিন্ন ধর্ম, মতবাদ ও সংস্কৃতির পরিচিতি লাভ করেন। একদিকে তিনি এখানে একদিকে খুঁজে পান ফুর্তি আনন্দের বাধা বন্ধনহীন জীবন। অন্যদিকে অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েন কুফার সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে। এখানে এসে আবুল আতাহিয়ার মাঝে প্রবল এক সাহিত্যবোধ ও কাব্যপ্রতিভার আলো বিকশিত হয়ে ওঠে। কুফায় তিনি সে সময়কার শ্রেষ্ঠ জ্বলজ্বলে একদল সৃষ্টিশীল কবির সঙ্গে পরিচিত হন যারা আরবী ভাষায় তখন নতুন শস্য উপহার দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং আবুল আতাহিয়ার মত তারাও ফূর্তি ও রসিকতা লালন করতেন। যাদের মধ্যে ছিলেন মুতি বিন ইয়াস, ওলিবাহ বিন হুবাব, আবু দামামাহ, হাম্মাদ আজরাদ, ইয়াহিয়া বিন যিয়াদ প্রমুখ, যাদেরকে বলা হত ‘হালাবাতুল আরদ’ (দেশের দুগ্ধ) ও ‘নাকশুয যামান’ (সময়ের সাক্ষর)।
খলিফাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা
আবুল আতাহিয়া যখন কুফা থেকে বাগদাদে আগমন করেন, তখন খলিফা মাহদীর সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরির লক্ষ্যে তার সাথে সাক্ষাত করেন এবং তার কাব্য ও মেধায় খলিফা মুগ্ধ হন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই তাদের সম্পর্কের মাঝে চিড় ধরে। উপলক্ষ্য ছিল মাহদীর প্রিয় ‘আতবা’ নামের এক সুন্দরী দাসী। তার প্রশংসা করে কবিতা লেখার কারণে খলিফা আবুল আতাহিয়াকে কারাগারে বন্দী করে। কিন্তু পরে মাহদীর প্রশংসায় একটা গীতিকা লেখার কারণে আবার ছাড়াও পেয়ে যায়।
মাহদী থেকে সূচনা হলেও এখানে থেমে থাকেনি খলিফাদের সাথে আবুল আতাহিয়ার সম্পর্ক। অন্যান্য খলিফাদের সাথেও তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল। সবচে’ বেশি ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল খলিফা হারুনুর রশিদের সাথে। হারুনুর রশিদের রাজ-অট্টালিকা বানানো শেষ হলে পরে সবাই এর সৌন্দর্য্য ও পূর্ণতার প্রশংসা করতে লাগল। তখন খলিফা হারুনুর রশিদ আবুল আতাহিয়াকে অট্টালিকা সম্পর্কে তার মতামত জিজ্ঞেস করল। উত্তরে কবিতার পংক্তি কেটে সে বলল, ‘উচ্চ প্রাসাদের শামিয়ানায়, সুখে শান্তিতে আপনি বসবাস করুন।’ হারুনুর রশিদ খোশ দিলে বলল, ‘বাহ! কী সুন্দর কবিতা। সামনে চলো।’ কবি বলল, ‘প্রভাতে ও সন্ধ্যায়, এই প্রাসাদে আপনি যা চাইবেন তাই পাবেন।’ খলিফা আরো খুশি হলেন। কিন্তু আবুল আতাহিয়া তখন বলল, ‘বুকের কম্পন আর মৃত্যুর গড়গড়া যখন শুরু হয়ে যাবে তখন আপনি নিশ্চিত বুঝতে পারবেন যে, আপনি প্রাসাদে বাস করেননি। বাস করেছেন প্রতারণায়।’ এই কথা শুনে খলিফা ঝরঝর করে চোখের পানি ফেলে কাঁদতে লাগল। কান্না শেষ হলে পরে আমলাদের হুকুম দিলেন সুসজ্জিত পর্দাগুলো খুলে ফেলতে আর প্রাসাদের দরোজায় তালা ঝুলিয়ে দিতে।
আব্বাসী যুগের প্রেক্ষাপটে আবুল আতাহিয়ার কবিতা
প্রাচীন আরবদের মাঝে সাহিত্যচর্চার যে মাধ্যমগুলো ছিল, তার মধ্যে অন্যগণ্য ছিল কবিতা। সেমেটিক ভাষাভাষী জাতি-গোষ্ঠীর মাঝে আরবদের মত অন্য কারো মাঝে কবিতার প্রতি এতটা নান্দনিক নির্ভরশীলতা দেখা যায় না। জাহিলিয়াতের যুগে আরবদের কবিতার যে প্রকল্প ছিল, ইসলামের আগমনের পরবর্তীকালে বিষয়গতভাবে তা থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়াস থাকলেও কবিতার গঠন, শব্দ পরীক্ষা, উপমা উৎপ্রেক্ষার প্রয়োগে নতুনত্ব ছিল না– বলা যায়। কিন্তু রাজনৈতিক ঘটনা কাব্য ও সাহিত্যে সর্বদাই প্রভাব বিস্তার করে। তাই আমরা দেখতে পাই আরবরা যখন হেজাযের শুষ্ক মরু থেকে বেড়িয়ে এসে প্রাচীন সভ্যতা সংস্কৃতির লালনক্ষেত্রগুলোতে রাজ্য বিস্তার করল তখন থেকে কবিদের কবিতায় প্রকল্প ও প্রকরণগত নতুনত্ব আসতে লাগল। কবিতায় প্রাচীন শুষ্ক মরুর জীবন ও যগতের ছবি মুছে গেল। নগরজীবন, ভোগ-বিলাস, ভিন্ন ভাষা থেকে অনূদিত জ্ঞান কবিতাকে প্রভাবিত করল। নতুনত্ব আসলো কবিতার লক্ষ্য, ভাষার প্রয়োগ, মর্মগত অন্বেষা ও ছন্দের মাত্রায়। এই সময়ের সৃষ্টিশীল প্রধান কবিদের মধ্যে ছিলেন বাশশার বিন বুরদ, আবু নাওয়াস, মুসলিম বিন ওয়ালিদ, আবু তাম্মাম, বুহতুরী, ইবনুর রূমী, ইবনুল মু’তায, আবু তায়্যিব মুতানাব্বী, ইবনে হানাঈ আন্দালুসী, আবুল আলা মাআররী ও আবুল আতাহিয়া।
কিন্তু স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, এই যুগের কবিতার টপিক আগের মতই অনেকটা গৎবাঁধা ছিল। প্রশংসা, নিন্দা, সাহসিকতা ও বংশীয় গর্ব প্রচার, শোকগাঁথা, বর্ণনা, রোমান্টিকতা, তিরস্কার ইত্যাদিই ছিল তাদের কবিতার প্রতিপাদ্য। এই ধারা থেকে বেড়িয়ে আসেননি আবুল আতাহিয়া। উপরোক্ত সকল বিষয়েই আবুল আতাহিয়ার বেশ কবিতা আছে। তবে তার নিজস্ব কিছু টপিকও ছিল, যেমন দুনিয়াবিমুখতা, উপদেশ ও হিকমত বর্ণনা। এসব বিষয়ে কবিতা লিখতে গিয়ে তার কাব্যগত নান্দনিকতার ক্ষতি হয়নি। বরঞ্চ তার লেখার সহজবোধ্যতার দরুণ তার পাঠকপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিক থেকে আধুনিক আরবী কবি নিযার কাবানীর সাথে তার তুলনা চলে।
সে কিভাবে প্রেমের কবিতাকে অতিক্রম করে যুহদিয়্যাত বা দুনিয়াবিমুখ কবিতায় আসলো তা নিয়ে একটা গল্প আছে। আবু সালামাহ গুনবী তাকে একবার জিজ্ঞেস করল, ‘প্রেম কবিতা থেকে যুহদিয়্যাতে কিভাবে আসলেন?’ আবুল আতাহিয়া তখন বলল, মাহদীর দাসী আতবার প্রেমে পড়ে কবিতা লেখার পর আমি স্বপ্নে দেখলাম, একজন আগন্তুক এসে আমাকে বলছে, তোমার মাঝে আতবার প্রতি যে অনুরাগ কাজ করছে, তা আল্লাহর নাফরমানী ছাড়া আর কি!’ এই কথাটা আমার উপর ব্যপক প্রভাব ফেলল। ঠিক তখনই আল্লাহর কাছে এই কবিতার কারণে তাওবা করলাম। এবং জীবন মৃত্যুর হাকিকত নিয়ে চিন্তা করতে লাগলাম। এরই প্রকাশ ঘটেছে আমার কবিতায়।’
সহজবোধ্যতা, গীতিময়তা ও সম্বোধন আবুল আতাহিয়ার কবিতার বৈশিষ্ট্য।
চিন্তাধারা
আবুল আতাহিয়া মানব, প্রকৃতি, জগত ও নৈতিকতা সম্পর্কে নতুন কোন চিন্তা ও দর্শনের অধিকারী ছিলেন না। বরং তিনি বিভিন্ন ধারার দর্শন নিজের মাঝে আত্মীকৃত করেছিলেন এবং তিনি তত্ত্বকথাকে কবিতায় রূপ দিয়েছিলেন।
ড. তহা হুসাইন তার সম্পর্কে বলেছেন, ‘ধর্মের দোহাই দিয়ে আবুল আতাহিয়া দুনিয়াবিমুখতায় তার কাব্যসমগ্র ভরে রাখলেও এটা মনে করা ভুল হবে যে, তিনি সুফি ও সাধুপুরুষ ছিলেন। বরং তিনি পাপাচার ও বিলাসিতায় প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি কাব্যদর্শন খুঁজে নিয়েছিলেন ইসলাম ও পারস্য দর্শন থেকে।’
তহা হুসাইনের মূল্যায়ন কতটুকু যথার্থ, তা প্রশ্নবিদ্ধ। তবে তা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতও নয়। কারণ, আমরা দেখতে পাই, তার বেশ কিছু কর্ম ও কবিতার সাথে ইসলামের বিরোধ আছে। তাছাড়া মানিকীয় ভাবধারার প্রভাব দেখা যায় তার উপর।
এই মহান দুনিয়াবিমুখ কবি বাগদাদে ২১৩ হিজরী মোতাবেক ৮২৬ ঈসায়ীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
