
আবু জর
শায়েখ আব্দুর রহমান আল-কাওয়াকেবী ছিলেন সিরিয়ার খ্যাতিমান একজন লেখক এবং প্যান আরব সংহতির একনিষ্ঠ সমর্থক। তিনি তাঁর সময়ের আরব এবং মুসলিম বিশ্বের জন্য ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবী। তাঁর চিন্তা ও রেখে যাওয়া লেখাজোখার প্রয়োজনীয়তা মুসলিম বিশ্ব এবং প্যান অ্যারাবিজমের বিভিন্ন ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাঁর সমালোচনার ওপর নির্ভর করেই আদর্শচ্যুত অটোমান ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্যান আরব ন্যাশনালিজমের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
প্রাথমিক জীবন
শায়েখ আব্দুর রহমান কাওয়াকেবীর জন্মসাল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মাঝে বিতর্ক রয়েছে৷ প্রসিদ্ধ তিনটি মত ১৮৪৯, ১৮৫৪ অথবা ১৮৫৫ ইংরেজি সন৷ তিনি তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হালাবের ( আলেপ্পো) একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
পড়ালেখা হালাবেই শুরু করেন। ইসলামিক সাইন্স ছিল তাঁর বিষয়। পাশাপাশি ভাষার প্রতি ছিল সীমাহীন আগ্রহ। তিনি তাঁর ছাত্রজীবনেই হালাবের আঞ্চলিক ভাষা, আরবি, তুর্কি এবং পারসিয়ান ভাষার ওপর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। যৌবনকাল থেকেই সাহিত্য ও রাজনীতির প্রতি ছিল ভীষণ আগ্রহ। ১৮৭৫ থেকে ১৮৮০ পর্যন্ত ফুরাত নামক একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। এ ছাড়াও তিনি শায়েখ রাশিদ রিদার প্রতিষ্ঠিত সংস্কারপন্থী প্রভাবশালী জার্নাল ‘আল মানার-’ও সম্পাদনা করেছেন।
কর্মজীবন
শায়েখ কাওয়াকেবী ফুরাত ও আল-মানার থেকে লব্ধ অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘আস-সাহবা’ নামক একটি স্বতন্ত্র সাহিত্য জার্নাল সম্পাদনা শুরু করেন। সেখানে তিনি তৎকালীন অটোমান স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লেখা প্রকাশ করতে শুরু করেন ৷ বিশেষত আলেপ্পোর শাসক জামিল পাশার সকল জুলুমের বিরুদ্ধে আস-সাহবাকে কেন্দ্র করে একটি প্রতিরোধের বলয় গড়ে তোলেন। মাত্র ১৫টি সংখ্যা প্রকাশের পর অটোমান শাসক পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়। এবং এখানেই শায়েখ কাওয়াকেবীর সম্পাদক-জীবনের ইতি ঘটে। এরপর তিনি সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হন। ওই সময়ে তিনি অটোমান সাম্রাজ্যের কট্টর বিরোধী হওয়া স্বত্ত্বেও অটোমান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। এবং দীর্ঘদিন বিভিন্ন পদে চাকুরি করেন৷
সিভিল সার্ভিসে চাকরির মেয়াদেই তিনি জাতীয় আইনজীবী পরিষদের সম্মানিত সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি সব সময়ই আরব জাতীয়তাবাদী রেনেসাঁর স্বপ্ন দেখতেন। তিনি তখন থেকেই আলেপ্পোর শাসকের বিরুদ্ধে বরাবর অটোমান রাজধানী ইস্তাম্বুলে অভিযোগ করে আসছিলেন। পরিণতিতে ইস্তাম্বুল থেকে আলেপ্পোর সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য একজন প্রতিনিধি পাঠানো হয়। প্রতিনিধি এসে শায়েখ কাওয়াকেবী এবং তাঁর অনুসারীদের বন্দী করে ফেলে। এবং কারারুদ্ধ করে।
দীর্ঘদিন কারাভোগের পর শায়েখ কাওয়াকেবী মুক্তি লাভ করেন। এবং সহসাই তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে। ১৮৯২ সালে এই অটোমান রাজবন্দী আলেপ্পোর মেয়র নির্বাচিত হন। মেয়র নির্বাচিত হবার পর সরাসরি অটোমানদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তিনি ইস্তামবুলে আবার চিঠি লেখা শুরু করেন। অটোমান শাসকগণ তাঁর ধারালো যুক্তির বিপরীতে কোনো উত্তর প্রস্তুত করতে অক্ষম হয়।
এই সময়ে তিনি লেখালেখির দিকে আবারও মনোযোগী হন এবং মিশর ও সিরিয়া থেকে তাঁর বই ‘উম্মুল কুরা’ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ১৮৯৯ সালে হিজরত করে মিসরে চলে যান। মিসরের তৎকালীন বুদ্ধিজীবী মহল তাঁকে সানন্দে বরণ করেন।
রাজনৈতিক চিন্তাধারায় তিনি জামালউদ্দিন আফগানির দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সমালোচনা, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও আন্দোলনের ক্ষেত্রে কাওয়াকেবীর মধ্যে জামাল আফগানির ছাপ লক্ষ করা যায়। তাঁর লেখালেখির বিরাট একটা অংশজুড়ে আছে অটোমান স্বৈরশাসনের সমালোচনা এবং আধুনিক ইসলামি রাষ্ট্রের রূপরেখার বয়ান।
তাঁর রচনা অত্যন্ত স্বচ্ছ ধাঁচের। কোনোরূপ অস্পষ্টতা এবং উহ্যতা তাঁর লেখায় পাওয়া যাবে না। ব্যক্তিগত জীবনেও উদ্যমী, জড়তাহীন ও সাহসী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিত্বের মাঝে এক বিচিত্র আকর্ষণ-ক্ষমতা ছিল। তিনি তাঁর ব্যক্তিত্বের ওপর গভীর আস্থা ও সাহসিকতা রেখে বলেছিলেন, ‘আমার যদি একটা সেনাবাহিনী থাকত, তাহলে ২৪ ঘন্টার ভেতর আমি স্বৈরশাসক আব্দুল হামিদকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফেলতাম।’
শায়েখ কাওয়াকেবী আজীবন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের ওপর অবিচল ছিলেন। তিনি টের পেয়েছিলেন আরব জাতীয়তাবাদীদের ভেতর অনারব মুসলিমদের প্রতি নীচু দৃষ্টি ছিল। মুসলিম হিসেবে তিনি আরব-অনারব বিভাজনের পক্ষে ছিলেন না কখনো। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে এনে দিয়েছিল বিশ্বব্যাপী মানুষের ভালোবাসা ও জনপ্রিয়তা।
তিনি অটোমানদের রাজধানী ইস্তাম্বুলের পক্ষপাতি ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, মুসলিম বিশ্বের রাজধানী হবে মক্কা। তিনি বিশ্বাস করতেন, মুসলিম খলিফা হবেন কুরাইশ গোত্রের; নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যেভাবে রেখে গিয়েছিলেন। কারণ, মুসলিমদের দিনশেষে ফিরতে হবে মক্কার দিকেই। এই রাস্তাটি তিনি তৈরি করে দিতে চেয়েছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি খুব সাদাসিধা জীবন যাপন করতেন। অর্ধশতকেরও বেশি বছর সময়ের জীবনে কখনই খুব বেশি অর্থবিত্তের মালিক হয়ে উঠতে পারেননি৷ তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরেই পরবর্তীতে জামাল আব্দুন নাসের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সফল রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠেন৷ এবং তাঁর নামে আরববিশ্বে গঠিত হয় ‘দ্যা কাওয়াকেবী ফাউন্ডেশন’।
ইন্তেকাল
মুসলিম জাতির অন্যতম এই অভিভাবক ১৯০২ সালে ইন্তেকাল করেন। তাঁর অনুরাগী ভক্তগণ এবং তাঁর পরিবারের লোকজন দাবি করেন, তুর্কি এজেন্টদের বিষপ্রয়োগে মৃত্যু হয় শায়েখ কাওয়াকেবীর। তবে এই তথ্যের গ্রহণযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
