
রাগিব রব্বানি
গতকাল ৩১ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছে আসামের জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি)’র চূড়ান্ত তালিকা। বহিরাগত হিসেবে অভিযুক্ত হবার কারণে এ তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন স্থানীয় বাসিন্দা। আর তালিকাভূক্ত হয়ে বৈধ নাগরিকত্ব নিশ্চিত হয়েছে ৩ কোটি ১১ লাখ ২১ হাজার ৪ জন বাসিন্দার।
তালিকা থেকে বাদ পড়া এই ১৯ লক্ষ বাসিন্দার অধিকাংশই হিন্দু। একটি সূত্র মতে এই সংখ্যা বাদ পড়াদের ৯০ পার্সেন্ট অর্থাৎ ১৭ লাখ। আর বাকি ২ লাখ মাত্র মুসলিম। তবে অপর একটি সূত্র বলছে, বাদ পড়াদের মধ্যে ১১ লক্ষ বাঙালি হিন্দু, ৬ লক্ষ বাঙালি মুসলমান আর বাকি দুই লক্ষ বিহার ঝাড়খণ্ড নেপাল ইত্যাদি অঞ্চল থেকে আসা বিভিন্ন ধর্মের বাসিন্দা।
চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়া এই মোট ১৯ লক্ষ বাসিন্দা এখনই বিদেশি বলে বিবেচিত হবেন না বলে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে। আগামী ১২০ দিনের মধ্যে ফরেনার্স ট্রাইবুনালে মামলার মাধ্যমে নিজেদের নাগরিকত্ব যারা প্রমাণ করতে পারবেন, তাদেরকে এনআরসি তালিকাভুক্ত করা হবে। ট্রাইবুনালের রায়েও যারা টিকবেন না, তাদের জন্য পর্যায়ক্রমে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার সুযোগ থাকবে।
শেষমেশ যারা মামলায় জিততে পারবেন না কিংবা যারা চূড়ান্তভাবে বিদেশি বলে ঘোষিত হবেন, তাদের ভবিষ্যত কী দাঁড়াবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ভারত থেকে একাধিকবার দাবি করা হয়েছে, বহিরাগতরা বাংলাদেশ থেকেই এসেছে, এদেরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও এদেরকে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে একাধিকবার। যদিও এখন এসে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ ইস্যুকে ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু এবং এর প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে না বলে মন্তব্য করেছেন।
এনআরসি তালিকা নিয়ে সৃষ্ট আসামের এই সংকটকে কেবলই মুসলমানদের সংকট হিসেবে দেখছেন না ভারতীয় বাঙালি মুসলিমরা। তারা বলছেন, সমস্যাটা যতটা না বাঙালি মুসলিমদের, তারচেয়ে বেশি বাঙালি হিন্দুদের। কারণ, এনআরসি থেকে হিন্দুদের নামই বেশি বাদ পড়েছে।
কলকাতার মুসলিম এক্টিভিস্ট জীম নাওয়াজ বলছেন, এনআরসি নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে যে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে, আসলে এতটা ভয়ের কিছু নেই। তিনি এ আতঙ্ক ছড়ানোর বিরোধিতা করে বলেন, একটি জাতিগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রাখলে সেই জাতিগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে শাসন ও শোষণ করতে সুবিধা হয়। এখন ভেবে দেখা যেতে পারে, এনআরসি নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত আতঙ্ক সৃষ্টির পেছনে কারা কাজ করছে।
জীম নাওয়াজের এই কথাগুলোর অনেকটা ব্যাখ্যা এসেছে কলকাতার অপর মুসলিম এক্টিভিস্ট রেয়াজউদ্দীনের সঙ্গে আলাপচারিতায়। তিনি ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে বলেন, এনআরসি’র কারণে মূলত বিপদে পড়েছে হিন্দু বাঙালিরা। বিজেপি ভোটের সময় আসামের বাঙালি হিন্দুদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, এনআরসি তালিকার মাধ্যমে তাদেরকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে, আর মুসলিমদেরকে তালিকা থেকে বাদ দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। এই প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে নিজেদের ভোটব্যাংক ভরেছিল হিন্দু বাঙালিদের ভোটে।
কিন্তু আসামে অসমীয়া ও বাঙালিদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী দ্বন্দ্ব প্রকট। বাঙালিদের সমূলে উচ্ছেদ করতে অসমীয়রা বদ্ধপরিকর। তাই বিজেপি সরকার যখন এনআরসি তালিকা প্রস্তুতের কার্যক্রম শুরু করল, ফরেনার্স ট্রাইবুনাল ও তালিকার দায়িত্বে থাকা অধিকাংশ অফিসার ও কর্মী অসমীয়া হবার কারণে এরা ঢালাওভাবে বাঙালিদের নাম, সে হিন্দু হোক কিংবা মুসলিম, বাদ দিতে লাগল। ফলে প্রথম খসড়া তালিকা প্রকাশের পর দেখা গেল কোটিরও অধিক বাঙালির নাম বাদ পড়েছে, কয়েক লাখ বাদে যাদের সকলেই হিন্দু বাঙালি। বিজেপি তাই বাধ্য হয়ে আরও একাধিক খসড়া প্রকাশ করে এ সংখ্যা কমিয়ে আনতে চেয়েছে। কিন্তু অসমীয়া কর্মকর্তাদের কারণে পুরোপুরিভাবে সফল হতে পারেনি। ফলে সর্বশেষ যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হলো, তাতে ১৯ লক্ষ মানুষ বাদ পড়েছে, যাদের ১১ লক্ষই হিন্দু।
ভোট ব্যাংক ধরে রাখতে বিজেপিকে এখন এই ১১ লক্ষ হিন্দুকে যেকোনোভাবে তালিকাভুক্ত করতে হবে, যার কারণে তারা আপিলের সুযোগ রেখেছে। কিন্তু এই ১১ লক্ষ হিন্দুকে আইনিভাবে তালিকাভুক্ত করা সহজ কাজ না, কারণ, এদের অধিকাংশই একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সেখান থেকে এসেছে। আর এনআরসির কানুনই হচ্ছে একাত্তরের ২৪ মার্চের আগে নিজের বা নিজের পূর্বপুরুষের বাস আসামে ছিল, এটা যারা প্রমাণ করতে পারবে না, তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ যাবে। ফলে বিজেপি পড়েছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে বাঙালি এই হিন্দুদেরকে তালিকাভুক্ত না করতে পারলে আসামে বাঙালি হিন্দুদের ভোটব্যাংক তাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে, অপরদিকে এনআরসি আইনের মারপ্যাঁচের কারণে এদেরকে অন্তর্ভুক্ত করাও সম্ভব না।
রেয়াজউদ্দীন বলেন, বাদপড়া হিন্দুদের তুলনায় মুসলিমদেরকে আইনি লড়াইয়ে জেতা অনেক সহজ। তাঁর মতে, একাত্তরের পরে বাংলাদেশ থেকে যারা এসেছে তারা হিন্দুই ছিল, মুসলিমদের কেউ আসেনি। তাই একাত্তরের আগে তারা আসামের বাসিন্দা ছিল এটা প্রমাণ করতে পারলেই সংকট থেকে উত্তরিত হয়ে যাবে, হিন্দুদের বেলায় যা দুঃসাধ্য।
তিনি জানান, এ ক্ষেত্রে বেশ কয়েকজন মুসলিম আইনজীবি বাদপড়া মুসলিমদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ের সেবা বিনামূল্য প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন। সেখানকার মুসলিম নেতা বদরুদ্দিন আজমল ও তার দলও ঘনিষ্ঠভাবে তাদেরকে সহযোগিতা করছে।
তবে ৬ লক্ষ মুসলমান কিন্তু কম না। তাছাড়া এদের প্রায় সকলেই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ও অভাবগ্রস্ত মানুষ। আইন-আদালতের মারপ্যাঁচ বোঝা এবং মামলা চালিয়ে যাওয়া তাদের পক্ষে অনেকটা দুঃসাধ্যই বটে। আর বদরুদ্দিন আজমলের দল বা মুসলিম আইনজীবিরা ৬ লক্ষ মানুষকেই যে সেবা দিতে পারবেন, তাও অসম্ভব। তাই দিনশেষে বড় একটা শংকা থেকেই যায় আসামের মুসলমানদের ব্যাপারে। এনআরসির এ জটিলতা তাদেরকে শেষমেশ কী পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
