
রাকিবুল হাসান
ইসলামের সার্বজনীন প্রকৃতি হলো—এগিয়ে যাওয়া। সেই সোনালী যুগে, ইউরোপ যখন অন্ধকারে, তখন ভ্রমণশিল্প এবং ভূগোলবিদ্যায় ইসলামি ব্যক্তিত্ত্বরা ছিলেন শীর্ষে। উমাইয়া এবং আব্বাসি খেলাফতের সময় ইসলামি সাম্রাজ্য যতটা বিস্তৃত এবং প্রলম্বিত হয়েছিলো, ইতিপূর্বে কখনো এমন হয়নি। এই সাম্রাজ্যের প্রশাসনে কড়া নিয়ম ছিলো—একজন বিচারক ও গভর্নরকে জানতে হতো দেশ, রাজ্য, অঞ্চল, প্রদেশের যাবতীয় তথ্য। বিষয়গুলো জানানোর জন্য নিয়োগ দেয়া হতো এমন একজন ব্যক্তি, যিনি কালের ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। গভর্নর কিংবা বিচারককে তিনি এসবের সর্বশেষ তথ্য জানাতেন, লিখে রাখতেন। ক্রমে ক্রমে এভাবেই গড়ে ওঠে ভূগোল শাস্ত্র, ভ্রমণকাহিনী।
আরবী ভূগোলশাস্ত্রের ঐতিহ্য
তৃতীয় হিজরি থেকেই ভূগোল শাস্ত্রে প্রচুর লেখালেখি শুরু হয়েছিলো। দেশ ও অঞ্চলের ভাগ ও বিভাগ নিয়ে কলম ধরেছিলেন লেখকরা। ফুটিয়ে তুলেছিলেন সেই অঞ্চলের সভ্যতা, ভৌগলিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনায় এনেছিলেন পাহাড়-পর্বত, নদী-নালার বয়ান। পূর্ব থেকে পশ্চিম; চীন থেকে স্পেন—সব দেশের জাতি, ধর্ম, বিশ্বাস, রীতিনীতি, আাচার-আচরণ বিস্তারিত তারা লিখে গেছেন পাতায় পাতায়। বিশ্লেষণ করেছেন দেশগুলোর রাজনৈতিক অবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা। এইসব লেখকদের মধ্যে অন্যতম হলেন : আল কিন্দি, ইবনে খুরদাজবাহ, কুদামা ইবনে জাফর, ইয়াকুবি, ইবনুল ফকীহ, হামদানি, ইবনে রাস্তাহ, ইবনে হাওকাল, আল আসতাখরী প্রমুখ।
প্রথম চতুর্থ শতাব্দীর আরবি ভ্রমণকাহিনী কিংবা ভূগোল শাস্ত্রের বইগুলো পড়লে পাঠক যে অনুসন্ধানী চেতনার দেখা পাবে, প্রাচ্যবিদরা ষোড়শ শতাব্দীতে এসে আরব এবং ইসলামি বিশ্বকে সেই অনুসন্ধানী চোখ দিয়ে মাত্রই দেখতে শুরু করেছে। অথচ আমাদের ভূগোলবিদরা আরও কত আগেই এসব বিস্তারিত লিখে গেছেন। তখন তারা লিখেছেন হয়তো সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক সেবার জন্য। কখনো অন্যান্য জাতি ও দেশ সম্পর্কে মানুষকে জানানোর জন্য, যেন তারা সেখানে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে পারে। কখনো বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্য। আমাদের ভূগোলবিদদের অন্তরে ছিলো ধর্মীয় চেতনা। এই ধর্মীয় চেতনাটাই ছিলো সবকিছুর মাপকাঠি। এর ভিত্তিতেই নির্মিত হতো ভূগোলবিদ্যার প্রাসাদ।
ইবনে ফুদলান : অনুসন্ধিৎসু রাষ্ট্রদূত
বাগদাদে তৃতীয় শতাব্দীর শেষভাগে জন্মগ্রহণ করেন আহমদ বিন ফুদলান বিন আব্বাস বিন হাম্মাদ। ৩০৯ হিজরি ৯২১ খৃস্টাব্দ মোতাবেক আব্বাসি খলিফা মুকতাদির বিআমরিল্লাহর আদেশে রাশিয়া এবং সাকালাবা অঞ্চলে যে প্রতিনিধি দল পাঠানো হয়, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন তিনি।
সাকালাবার বাদশাহ সে বছর আব্বাসি খলিফাকে লিখে পাঠালেন, ‘আমার কাছে এমন একজন লোক পাঠান, যিনি আমাকে দ্বীন বুঝাবেন। ইসলামি নিয়ম-কানুন শেখাবেন। আমি তাঁর জন্য মসজিদ নির্মাণ করে দিবো, মিম্বর তৈরী করে দেবো। মিম্বরে দাঁড়িয়ে তিনি আমার দেশের মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাবেন। সেইসঙ্গে একটি দুর্ঘও নির্মাণ করে দেবার আবেদন করছি, যেন আমার বিরুদ্ধে থাকা রাজাদের থেকে নিরাপদ থাকতে পারি।’
আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আব্বাসি খলিফা মুকতাদির বিআমরিল্লাহ সাকালাবার বাদশাহর কাছে একটি প্রতিনিধি দল পাঠালেন। এই দলের প্রতিনিধিত্বকারী ছিলেন চারজন। এদের সঙ্গে পাঠালেন কয়েকজন ফকিহ, শিক্ষক এবং খাদেম। শিক্ষক হিসেবে এই দলে যুক্ত হলেন ইবনে ফুদলান। এটা তো অপরিহার্য—অন্য দেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে যিনি যাবেন, তাকে অনেক জ্ঞান ও কৌশলের অধিকারী হতে হবে। সুতরাং ইবনে ফুদলানের এই রাষ্ট্রদূতদের দলে অন্তর্ভূক্তিকরণেই বুঝা যায়, তিনি নিশ্চয় জ্ঞানী ও কৌশলী ছিলেন। তাঁর দেখার দৃষ্টি ছিলো প্রখর, সূর্যের মতো জ্বলজ্বলে।
এই প্রতিনিধি দল ৩০৯ হিজরীর ১১ সফর, ৯২১ খৃষ্টাব্দের ২১ জুন বাগদাদ থেকে যাত্রা শুরু করে। ৩১০ হিজরীর ১৮ মুহররম, ৯২২ খৃষ্টাব্দের ১২ মে বুলগেরিয়ায় পৌঁছে। পথিমধ্যে পেরিয়ে যায় হামদান, রাঈ, নিশাপুর, বুখারা। তারপর মধ্য এশিয়ার গীহন নদীর পাড় ধরে পৌঁছে আরাল সাগরের নিকট খোয়ারজম পর্যন্ত। আবারো পথ চলতে চলতে পেরিয়ে যায় তারা ওস্ট ওয়ার্ট মরুভূমি, ইয়াইক নদী। তারপর পৌঁছে যায় ভোলগা নদীর অববাহিকায়। কিন্তু সেখান থেকে তারা কবে ফিরেছেন, তা জানা যায়নি।
এখানে লক্ষণীয় ব্যাপার হলো—রাশিয়া সাম্রাজ্যের সূচনা সম্পর্কে আরবি গ্রন্থগুলো যে তথ্য দেয়, এই তথ্যগুলোকেই রাশিয়া সাম্রাজ্যের সূচনার সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মনে করা হয়। এই গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম ইবনে ফুদলানের লিখিত গ্রন্থ।
রাশিয়াকে যেমন দেখেছেন ইবনে ফুদলান
ইবনে ফুদলান তাঁর গ্রন্থে তিনি রাশিয়ানদের শারীরিক সুস্থতা এবং সামর্থ্যের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বাণিজ্য করতে এসে কয়েকজন রাশিয়ান মৃত্যুবরণ করেছে। এবং এটেল নদীর পাড়ে শিবির স্থাপন করেছে। তাদের থেকে পুরু ও শক্তিশালী দেহ আমি কেথাও দেখিনি। তারা এমন কাপড় পরিধান করে, এক কাঁধ ঢাকা থাকে, আরেক কাঁধ উন্মুক্ত থাকে। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই থাকে কুঠার, তলওয়ার, ছুরি। ঘাড় থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত পুরো শরীরে গাছ কিংবা অন্যান্য দৃশ্য সম্বলিত ট্যাটু এঁকে রাখে তারা।
রাশিয়ান নারীদের সম্পর্কে বলেন, ‘প্রত্যেকটি রাশিয়ান নারী তাদের বুকের কাছে একটি আতরের কৌটা বেঁধে রাখে। নিজের স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ লোহা, কেউ তামা, কেউ স্বর্ণ দিয়ে এই কৌটা বানায়।
রাশিয়ান নারীরা গলায় স্বর্ণ কিংবা রূপার হার পড়ে। স্বামী যখন দশ হাজার দিরহামের মালিক হয়, স্ত্রীকে একটি হার বানিয়ে দেয়। যদি বিশ হাজার দেরহামের মালিক হয়, দুটি হার বানিয়ে দেয়। এভাবে প্রতি দশ হাজার দিরহাম উপার্জনে একটি করে হার বানিয়ে দেয়। ফলে দেখা যায় কারও কারও গলায় অনেকগুলো হার জমে গেছে।’
রাশিয়ানদের অপরিচ্ছন্নতা এবং গোসলের প্রতি অনীহার সমালোচনা করেছেন ইবনে ফুদলান। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিদিন তাদের ময়লা পানি দিয়ে মুখ এবং মাথার চুল ধুতে হবেই। সকালে একজন দাসী পানিভর্তি বড় একটি গামলা নিয়ে আসে মালিকের কাছে। মালিক গামলায় হাত, মুখ এবং চুল ধোয়। চিড়ুনি ভিজিয়ে চুল আঁচড়ায়। তারপর নাকের ময়লা এবং থুতু ফেলে গামলায়। মালিকের প্রয়োজন শেষ হলে এই নোংরা পানি-ই অন্যজনের সামনে এগিয়ে দেয়। সেই পানিতেই তারা হাত মুখ ধোয়।’
রাশিয়ানদের বাসস্থান সম্পর্কে বলেন, ‘একটি কাঠের ঘরে দশ বিশজন কিংবা তারচেয়ে বেশি লোক থাকে। সঙ্গে কাজের মেয়েও থাকে। তাদের প্রত্যেকের জন্য আলাদা বিছানা। একই ঘরে সবাই একসঙ্গে শুয়ে যায়, কেউ এতটুকু লজ্জা করে না।
তাদের কাঠের তৈরী মূর্তি আছে। ব্যবসায় সফল হবার মিনতি জানিয়ে তারা মূর্তির সামনে উপহার উপঢৌকন পেশ করে। বাণিজ্যে বের হলে তাদের জাহাজে থাকে মূর্তি। সেই মূর্তির সামনে উবু হয়ে পড়ে বলতে থাকে, হে প্রভু! দূর দেশ থেকে এসেছি। এই এই রঙের এতটি ক্রীতদাস নিয়ে যাচ্ছি বিক্রি করতে। উপঢৌকন দিলাম আপনার চরণে। যতদাম চাই, তত দামেই যেন ক্রীতদাসগুলো বিক্রি করতে পারি। ক্রীতদাস বিক্রির টাকা দিয়ে তুমি আমার রুটি-রুজির ব্যবস্থা করো প্রভু!’
শশ্মানে মৃতদেহ দাহ করার যাবতীয় কার্যক্রমের বিশদ বিবরণ দিয়েছেন ইবনে ফুদলান। তিনি বলেন, যখন তাদের নেতৃস্থানীয় কেউ মারা যায়, তার সঙ্গে তার সবচে প্রিয় দাস কিংবা দাসীকেও পুড়িয়ে ফেলা হয়। জীবিত পোড়া হয় না, বরং পোড়ানোর আগে দাস কিংবা দাসীকে শ্বাসরোধ অথবা ছুরি দিয়ে হত্যা করা হয়। মৃতদেহে প্রথম আগুন দেয় মৃতব্যক্তির সবচে কাছের মানুষ। চাই সে স্ত্রী হোক, ভাই হোক, মেয়ে হোক। পুড়িয়ে ফেলার ক্ষেত্রে রাশিয়ানদের একটি বিশ্বাস হলো—যদি না পোড়ানো হয়, তাহলে পরজগতে তাদের শত্রুদের আত্মার সঙ্গে তাদের দেখা হয়ে যায়। শত্রুর সামনে যেন না পড়ে, তাই তারা মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলে।’
হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর শুরু এবং খৃস্টীয় দশম শতাব্দীতে রাশিয়ার রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়ে ওঠা স্বচক্ষে দেখেছেন ইবনে ফুদলান। আরবি ভৌগলিক গ্রন্থের আলোকে রাশিয়া সম্পর্কে উপরে যা বিধৃত হলো, তা সংস্কৃতি ও সভ্যতার সঙ্গে রাশিয়ার পরিচিত হবার আগের গল্প। তখন আব্বাসি খেলাফত ও ইসলামি সভ্যতার তুলনায় রাশিয়ার রাজনীতি ও সভ্যতা ছিলো নিতান্তই শিশুসুলভ। তাই সভ্যতার আলো ছড়াতে ইসলামি সভ্যতা ও সংস্কৃতির শহর বাগদাদ থেকে মূর্তি পূজার অন্ধকারে আচ্ছন্ন রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে ফকিহ, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
আল জাজিরা আবলম্বনে
