ইরাক যুদ্ধের ১৬ বছর, ‘সন্ত্রাস-বিরোধী’ যুদ্ধের সাম্প্রদায়িকীকরণ

হামমাদ রাগিব 

২০ মার্চ। আমরা জানি ২০০৩ সালের এই দিনটাতে গণবিধ্বংসী অস্ত্র মজুদের বানোয়াট অভিযোগ তুলে আমেরিকার নেতৃত্বে ন্যাটো জোট আগ্রাসী আক্রমণ চালিয়েছিল ইরাক ভূমিতে। এবং শান্তিপূর্ণ একটা দেশকে অল্প কিছুকালের ব্যবধানে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছিল। কিন্তু আমরা যেটা খুব জানি না, সেটা হলো ২০০৩-এর এই আক্রমণের অনেক আগ থেকেই ইরাক-ধ্বংসের পরিকল্পনা এঁটে আসছিল বিশ্বমোড়ল আমেরিকা। এমনকি নাইন/ইলেভেনেরও আগে। নাইন/ইলেভেন এই আগ্রাসনের একটা বাড়তি অজুহাত সৃষ্টি করে দিয়েছিল কেবল।

মার্কিন তেল-বাণিজ্য-উপদেষ্টা ফালাহ আল-জিবারির ভাষ্যমতে, ২০০১ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ ক্ষমতা পাবার পরপরই ওয়াশিংটন, মধ্যপ্রাচ্য ও ক্যালিফোর্নিয়াতে ইরাকের সাদ্দাম হোসাইন সরকারকে উৎখাতের ব্যাপারে বেশ কয়েকবার গোপন মিটিং করেছিলেন। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আল-জিবারি আরও বলেছিলেন, সেসময় বুশ প্রশাসনের পক্ষে সাদ্দাম হোসাইনের প্রভাবশালী উত্তরসূরীদের সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলেন তিনি।

ইরাক আক্রমণ করার জন্য তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশ ও কোয়ালিশন বাহিনী যে কারণ দেখিয়েছিল তা হলো, দেশটি নাকি ১৯৯১ সালের চুক্তি অমান্য করে গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণ করছে এবং তাদের কাছে এ ধরনের অস্ত্রের মজুদও আছে। যা আমেরিকা, আমেরিকার জনগণ এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর জন্য বড় ধরনের হুমকি। কিন্তু আগ্রাসনের পরে পরিদর্শকরা ইরাকে গিয়ে কোনো ধরনের গণবিধ্বংসী অস্ত্র খুঁজে পায়নি। তারা জানায়, ইরাক ১৯৯১ সালেই গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণ ত্যাগ করেছে, ইরাকের উপর থেকে আন্তর্জাতিক অনুমোদন সরিয়ে নেয়ার আগ পর্যন্ত তাদের নতুন করে গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণের কোনো পরিকল্পনাও ছিল না। এখানে-সেখানে ছড়িয়ে থাকা টুকটাক যে অস্ত্র পাওয়া গেছে, তা আগেরগুলোরই ভগ্নাবশেষ। এরপর প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়ে মার্কিন প্রশাসন। এই সমালোচনা থেকে বাঁচতে তারা নতুন করে আবার দাবি তুলে, সাদ্দাম হোসাইন আল-কায়েদাকে সহযোগিতা করছেন, কিন্তু এর পক্ষেও কোনো প্রমাণ তারা দাঁড় করাতে পারেনি।

তার পরও আগ্রাসনের কিছু কারণ দেখানো হয়েছে। যেমন : ফিলিস্তিনের আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করা, ইরাকি সরকার কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণতন্ত্রহীন ইরাককে গণতান্ত্রিক রূপে গড়ে তোলা। কিন্তু এর কোনোটিই একটি দেশকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট কোনো কারণ হিসেবে প্রতিভাত হয়নি খোদ মার্কিন জনগণের বৃহৎ একটি অংশের কাছেও।

তবে যে জিনিশটার জন্য এই আগ্রাসন, তা একটু সমঝদার যে কারো কাছেই স্পষ্ট ছিল। আর তা হলো, ইরাকের অবারিত তেল-সম্পদ কুক্ষিগত করা। সাদ্দাম হোসাইনের কারণে যেটা সম্ভব হয়ে উঠছিল না। এ ছাড়াও আরও অনেক কারণের মধ্যে প্রধানতম আরেকটি কারণ হলো, স্বভাবজাত একরুখো শাসক সাদ্দাম হোসাইনের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারে নানাভাবে অসুবিধা হচ্ছিল।

আমেরিকার নেতৃত্বে ন্যাটো জোটের এই আগ্রাসন দেশটিকে অল্প কদিনের ভেতরেই ধ্বংসের জনপদে পরিণত করে। সাদ্দাম সরকারের পতনের পর চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে সীমাহীন সহিংসতা। যা আজ অবধি চলমান। একদিকে যেমন বিদেশি সৈন্যের আক্রমণ, অপরদিকে দীর্ঘদিন ধরে একত্রে বসবাসকারী ইরাকি জনগণের মধ্যে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব এবং সহিংসতা।

আমেরিকার লক্ষ্যই ছিল এটা। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে চালানো এমন আগ্রাসনের নাম যদিও তারা ‘সন্ত্রাস-বিরোধী যুদ্ধ’ দিয়েছে, কিন্তু তারাই আবার দেশে দেশে সন্ত্রাস করে বেড়াচ্ছে। মুসলিমদের মধ্যে পরস্পর অনৈক্য, ইসলামের বিরুদ্ধে জনমনে ঘৃণা তৈরি আর মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে পরস্পর বিবেদ তৈরি করে রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য। যাতে দুনিয়াজুড়ে নিঃশঙ্কভাবে তারা আধিপত্য চালিয়ে যেতে পারে।

এই ইরাকের কথাই ধরুন না! ২০০৩-এর আগে ইরাকে শিয়া-সুন্নির কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। সাদ্দাম হোসাইনের শাসনামলে ইরাকি জনগণের একটাই পরিচয় ছিল—ইরাকি। সেখানে শিয়া-সুন্নির আলাদা কোনো তফাত করা হতো না নিজেদের জাতীয় পরিচয়ে। এমনকি সাদ্দাম হোসাইনের সেনাবাহিনীতে প্রচুর শিয়া সদস্য ছিল, যারা ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। সম্প্রীতির একটা আবহ বিদ্যমান ছিল ইরাক জুড়ে। যদিও সাদ্দাম হোসাইনের বিরুদ্ধে শিয়া-নিপীড়নের অভিযোগ আছে, কিন্তু সেটা শিয়া বলে নয়, কুর্দি হবার কারণে এবং এই কুর্দিরা সাদ্দামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার কারণে।

কিন্তু ২০০৩-এর পর থেকে নতুন এক ইরাকের জন্ম হলো। আমেরিকা এসে কৌশলে শিয়া-সুন্নির বিভাজন রেখা টেনে দিলো। সুন্নি মুসলিম যারা, তারা অবাক হয়ে দেখল, এতদিন যাদের তারা ভাই মনে করত, একসঙ্গে সম্প্রীতির বসবাস ছিল যাদের সঙ্গে, সেই শিয়ারাই তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে। এবং সেটা আমেরিকার মদদে।

২০০৩-পূর্ব ইরাকে সুন্নি মুসলমানরা যদিও শিয়া-সুন্নির পার্থক্যটাকে খুব একটা গুরুত্ব দিত না, কিন্তু শিয়াদের ভেতরে চাপাপড়া একটা আত্মচেতনা ধিকিধিকি জ্বলত। আমেরিকা এসে সেই ধিকিধিকি আগুনে ঘি ঢেলে দেয় আর দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে সাম্প্রদায়িক বিবাদ। ১৬ বছর পর আজ ইরাকে আমেরিকার সম্মুখ আগ্রাসন থামলেও নেভেনি সাম্প্রদায়িকতার এই দাবানল। এই দাবানলে আজও পুড়ছে ইরাক, ইরাকের মুসলমান।

লেখক : ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর ডটকমের সহযোগী সম্পাদক

আগের সংবাদউপজেলা নির্বাচনের ফল প্রকাশ, আ. লীগ ৩২, বিদ্রোহী ১৫
পরবর্তি সংবাদচলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮.১৩ শতাংশ : অর্থমন্ত্রী