ইসলামি বানান ও পরিভাষা : নিয়ন্ত্রণ নেই কারো

ইমরান আবদুল্লাহ :

বাংলাভাষায় ইসলাম ও মুসলিম সংশ্লিষ্ট পরিভাষা এবং শব্দের বানান নিয়ে বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে নানাভাবে বিতর্ক চলছে। শব্দগুলোর বানানে হ্রস্ব-ই কার দীর্ঘ ই-কার হ্রস্ব-উ কার দীর্ঘ উ-কার নিয়ে যেমন বিশৃঙ্খলা রয়েছে, তেম্নি নবি রাসুল কুরআন কেয়ামত ইত্যাদি শব্দের লেখ্যরূপ নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। বাংলা একাডেমি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিজস্ব বানানরীতি থাকলেও সমন্বয়হীনতার কারণে এ রীতি শৃঙ্খলা ফেরাতে পারছে না। ফলে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে যার যেভাবে ইচ্ছা, সেভাবেই ইসলামি পরিভাষা ও বানানগুলো ব্যবহার করছেন।

ইতিমধ্যেই বাংলা একাডেমি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম আলোসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বানানরীতি রয়েছে। কিন্তু একটার সঙ্গে আরেকটার সমন্বয়হীনতার কারণে বিশৃঙ্খলাপূর্ণ একটা পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। ইসলামি শব্দের ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমি ও প্রথম আলোর বানানের নিয়ম বেশ সমস্যাপূর্ণ ও আপত্তিজনকও।

বাংলা একাডেমি তার বানানবিধিতে সংস্কৃতজাত নয় এমন শব্দের (যেমন : আরবি, ফারসি, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষা থেকে আগত) ক্ষেত্রে দীর্ঘ ঈ-কার (ী) ও দীর্ঘ ঊ-কার ( ূ) তুলে দিয়েছে; কিন্তু সংস্কৃত উৎসজাত শব্দের ক্ষেত্রে তা বহাল রেখেছে। সমালোচকরা বলছেন, এর ফলে বাংলা ভাষায় আরবি, ফারসি, ইংরেজি শব্দাবলির বানান ও উচ্চারণ মূল ভাষার বানান ও উচ্চারণের প্রতিফলন থেকে অনেক ক্ষেত্রেই দূরে সরে গেছে।

বিদেশি শব্দের বানানের ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমির সঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বানানের বড় ধরনের একটি তফাত রয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি পার্থক্য দেখা যায় ‘জ’ ও ‘য’ ব্যবহারের ক্ষেত্রে। ফাউন্ডেশন ‘যাল’, ‘সোয়াদ’, ‘যা’ প্রভৃতির ক্ষেত্রে ‘য’ ব্যবহার করে থাকে। এসব অক্ষরযুক্ত শব্দ বাংলা ভাষায় অনেক। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বাংলা একাডেমি ইসলাম-সংক্রান্ত কয়েকটি বিশেষ শব্দে ‘য’ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে। যেমন : আযান, ওযু, নামায, মুয়াযযিন, যোহর, রমযান প্রভৃতি। কিন্তু আগ বাড়িয়ে ‘প্রথম আলো’ নিয়ম করেছে : “বিদেশি শব্দ ও নামের বানানে ‘য’ না লিখে ‘জ’ লিখতে হবে।” বর্তমানে মিডিয়া ও সাধারণ শিক্ষিতদের লেখায় তাদের অনুকরণ চোখে পড়ার মতো।

বাংলা একাডেমির বানানরীতির সমস্যা বিষয়ে ইসলাম বিষয়ক লেখক ও গবেষক মুফতী মুহাম্মদ মর্তুজা লিখেছেন, একাডেমির আরো বেশ কিছু নিয়মের কারণে মুসলমানদের শত শত বছর ধরে ব্যবহার করে আসা অনেক শব্দের কেবল অপপ্রয়োগই হয়নি, বিকৃতিও ঘটে। যেমন : ‘দ্বীন’ বহুল প্রচলিত একটি আরবি শব্দ। বাংলা একাডেমির প্রমিত বানান অনুযায়ী তা লিখতে হয় ‘দিন’। আর বাংলা ভাষায় আগে থেকেই ‘দিন’ শব্দ রয়েছে, যার অর্থ ‘দিবস’। আবার অনেকে এ অসুবিধা বিবেচনা করে লেখেন ‘দীন’। কিন্তু ‘দীন’ শব্দও আগে থেকেই বাংলা ভাষায় আছে, যার অর্থ হলো ‘দরিদ্র, করুণ ও হীন’। এ অবস্থায় এ আরবি শব্দের জন্য এ দুটি বানানের যেটিই ব্যবহার করা হোক না কেন, তা-ই হবে বিভ্রান্তিকর। যদি বলা হয়, ‘দিনের কাজ করো’, তাহলে কেউ মনে করতে পারে যে তাকে ‘রাতের কাজ’ (ইঙ্গিতবাচক অর্থে ‘চুরি’) করতে নিষেধ করা হচ্ছে। আর যদি বলা হয় ‘দীনের খেদমত করো’, তাহলে সে মনে করতে পারে, তাকে দরিদ্রদের সেবা করতে বলা হয়েছে। তাই আমরা মনে করি, ইসলাম ধর্ম অর্থে ‘দ্বীন’ লেখাই শ্রেয়।’ (কালের কণ্ঠ, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬)

বাংলাভাষায় এরকম একাধিক নিয়মের কারণে, এবং নিয়মগুলোতে অসঙ্গতি থাকবার কারণে ইসলামি বানান ও পরিভাষা বিষয়ে বিশৃঙ্খল এক পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। ইসলামি অঙ্গনের অনেকে বাংলা একাডেমির নিয়ম অনুসরণ করে ইসলাম সংশ্লিষ্ট সমস্ত শব্দে দীর্ঘ ঈ-কার দীর্ঘ ঊ-কার পরিত্যাগ করেছেন, আবার অনেকে এর তীব্র প্রতিবাদ করে বাংলা একাডেমির নীতিকে খারিজ করে ইসলামি শব্দের বানানে শব্দের মূলরূপ ধরার চেষ্টা করছেন। আর অধিকাংশ মানুষই বিভ্রান্তিতে পড়ে নিজেদের মনমতো করে লিখছেন। এই পরিস্থিতিতে ইসলামি অঙ্গনের জন্য স্বতন্ত্র একটা বানানরীতি প্রণয়নের দাবি তুলছেন অনেকে। যাতে ইসলাম-সংশ্লিষ্ট লেখকরা একই বানানে লিখতে পারেন।

এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম ইসলামী লেখক ফোরামের সভাপতি মাওলানা জহির উদ্দীন বাবরের সঙ্গে। তিনি এর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে জানান, বেশ কয়েকবছর ধরে আমরাও এ ব্যাপারে ভাবছি। আমাদের একটা বানানরীতি হওয়া অবশ্যই দরকার। কিন্তু নানাবিধ সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার কারণে এই কাজে আমরা নামতে সাহস পাচ্ছি না। বানানরীতি প্রণয়ন করলে সেটা অন্তত ইসলামি অঙ্গন কতটা সাদরে গ্রহণ করবে, এ নিয়ে আমরা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নই।

জহির উদ্দীন বাবর বলেন, কাজটা অনেক পরিশ্রমসাধ্য, এখন অনেক খাটাখাটুনি করে কাজটা দাঁড় করানোর পর সেটার ব্যাপারে যদি ভালো সাড়া না পাওয়া যায়, তাহলে খারাপ লাগবে। তাই বানানরীতি প্রণয়নের দাবিটা আরও জোরালো এবং এর প্রয়োজনীয়তা আরও ব্যাপক হবার অপেক্ষায় আছি আমরা।

আগের সংবাদবাংলাদেশী বাংলা : আজমের তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক মোকাবেলা
পরবর্তি সংবাদআসামের ভাষা আন্দোলন : ফিরে দেখা ইতিহাস