ইসলামি সভ্যতায় পাগল ও পাগলামি

রাকিবুল হাসান :

অষ্টম শতাব্দির শুরুতে ইসলামি ইতিহাসে সর্বপ্রথম মানসিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক (মৃ: ৯৫ হি.)। ইউরোপ তখন মানসিক সেবার জন্য হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসার কথা ভাবতেই পারেনি। ইউরোপ তো এই সেদিন, পনেরো শ’ শতাব্দিতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। ইউরোপের মধ্যে সর্বপ্রথম ফ্রান্সে মিসরের ‘বিমারিস্তান কালাউন’ (১২৮৪ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত)-এর আদলে মানসিক রোগীদের আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে ওঠে।

আরবরা কেবল পাগলদেরই আশ্রয় দিত না, বরং তাদের পাগলামির ঘটনাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য তৈরী করেছিল সুনির্দিষ্ট কিছু মেথড। তারা একত্রিত করেছিল পাগলদের বচন, কবিতা এবং মৌখিক বক্তব্য। সুক্ষ্ম বিশ্লেষণে তারা আলাদা করেছিলেন—কোনটা জন্মগত পাগলামি আর কোনটা বিভ্রান্তি, ভুল ধারণা, প্রেম, হতাশা ইত্যাদি থেকে সৃষ্ট পাগলামি। কাঠিন্য নয়, তারা পাগলদের প্রতি দেখিয়েছিলেন উদারতা, সহানুভূতি। আপন জীবন নিয়ে বেঁচে থাকার নির্বিঘ্ন অধিকার দিয়েছিলেন তারা।

অন্যদিকে অন্যান্য সভ্যতায় পাগলদের ভাবতো হিংস্র। পাগলামিকে ভাবতো শয়তানি প্রভাব। হয়তো তাদের নির্বাসন দিত নয়তো পাঠিয়ে দিত সমাজ থেকে দূরে কোথাও। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর পাশ্চাত্যে পাগলদের ইতিহাস নিয়ে রচিত একটি গবেষণা গ্রন্থে এই বর্ণনাগুলো উঠে এসেছে। ইসলামি সভ্যতায় পাগলদের কার্যকলাপ কেমন বিবেচিত হত, পাগলদের মূল হাকিকত কী—এই বিষয়ে সামান্য আলোকপাতের চেষ্টা করব এই প্রবন্ধে।

‘পাগল’ শব্দটি

পাগল এবং পাগলামি নিয়ে মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গির সবচে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল ‘কোরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি’। ‘পাগল’ শব্দটি কোরআনে ১১ বার ব্যবহৃত হয়েছে এবং প্রায়শই এই শব্দটি রাসূলদের বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যারা রাসূলদের রিসালাত ও নবুওয়ত অস্বীকার করতো, তারা রাসূলদের বলতো পাগল। ইমাম আবুল কাসেম বিন হাবিব নিশাপুরী (মৃ:৪০৬ হি.) তার ‘ উকালাউল মাজানিন বা পাগলদের মধ্যে বুদ্ধিমান যারা’ গ্রন্থে বলেন, ‘মানুষেরা রাসূলদের পাগল বলত, কারণ রাসূলগণ এসে তাদের স্বার্থে আঘাত হানত এবং তাদের ভেতরে যে কদাচার, তার বিরুদ্ধে কথা বলত।’

বুখারি এবং মুসলিম শরিফে ‘পাগল’ কিংবা ‘পাগলামি’ শব্দটি ২১ বার এসেছে।

আরবি ভাষায় ‘মাজনুন’ (পাগল) শব্দের প্রতিশব্দ প্রচুর। গবেষক আহমদ খাসূসী তার ”হুমুক ওয়া জুনুন বা বোকামি ও পাগলামি” গ্রন্থে বলেছেন, ‘লিসানুল আরবে ‘জুনুন’ তথা পাগলামির প্রতিশব্দ রয়েছে প্রায় ৮০টি। ‘হুমুক’ তথা বোকামির প্রতিশব্দ এবং তার থেকে উদগত শব্দ রয়েছে প্রায় ৪০০টি। ‘

পাগলামি এবং বোকামি দুটোর মাঝে কিছু বিষয় এক থাকলেও ‘বোকামি’ শব্দটি ‘পাগলামি’ শব্দ থেকে ব্যাপক। ইমাম ইবনুল জাওযি তার ‘বোকা এবং ভবঘুরেদের গল্প’ গ্রন্থে বোকা এবং পাগলের সংজ্ঞা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ যার উদ্দেশ্য সঠিক, কিন্তু সেই উদ্দেশ্যে পৌঁছার পথ ও পদ্ধতি সঠিক না, সে বোকা। আর যার উদ্দেশ্য এবং উদ্দেশ্যে পৌঁছার পথ দুটোই সঠিক নয়, সে পাগল।’ তারপর তিনি লিখেছেন, ‘ পাগলামি হলো রোগ এবং বোকামি হল চিন্তা ও মস্তিষ্কের দুর্বলতা।’

পাগলদের নিয়ে গ্রন্থ

‘আল ফাহারসাত’- এর লেখক আবুল ফরজ আন নাদিম (মৃ: ৩৮৪ হি.), পাগলামি এবং বোকামি নিয়ে মুসলিম গ্রন্থ রচয়িতাদের অনুসন্ধানে বলেছেন, ‘ঐতিহাসিক আবুল হাসান মাদাঈনী (মৃ:২২৫ হি.) ‘কিতাবুল হামকা বা বোকাদের গ্রন্থ’ নামে একটি বই লিখেছেন। সম্ভবত এই বিষয়ে লিখিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে এটিই সর্বপ্রথম লেখা গ্রন্থ।’

নাদিম এবং নিশাপুরী আরও কিছু গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেছেন। জাহিয (মৃ:২৫৫ হি.) পাগলদের নিয়ে বিশেষ গ্রন্থ লিখেছেন। ইবনে আবিদ দুনিয়া( মৃ:২৮১ হি.) লিখেছেন ‘হুকামাউল মাজানীন বা পাগলদের মধ্যে জ্ঞানী যারা’। এই শিরোনামে আরও অনেকেই গ্রন্থ লিখেছেন; আবু বকর ইবনে আবুল আজহার (মৃ:৩২৫ হি.), ইসমাইল জাররাব মিসরী (মৃ:৩৯২ হি.)।

‘পাগলদের মধ্যে বুদ্ধিমান’ এবং ‘পাগলদের মধ্যে জ্ঞানী’ পরিভাষাটি বেশি পরিলক্ষিত হয় জীবনীগ্রন্থ, ইতিহাস এবং সাহিত্য বিষয়ে রচিত গ্রন্থগুলোতে। উদাহরস্বরূপ আল্লামা খতীব বাগদাদীর ‘তারিখে বাগদাদ’ গ্রন্থে এসেছে, ‘আব্বাস বিন মুহাম্মদ বিন জাহহাক আশহালি (মৃ: ২৬৩হি.) তার পিতা থেকে পাগল বুদ্ধিমানদের ঘটনাবলী বর্ণনা করেছেন।’ ইবনুল জাওযি (মৃ:৫৯৭ হি.) তার ‘সাফওয়াতুস সাফওয়া’ গ্রন্থে ‘উকালাউল মাজানিন বিল বাসরাতি’ (বসরার পাগল বুদ্ধিমানদের থেকে) শিরোনামে একটি অধ্যায় নির্মাণ করেছেন। আল্লামা যাহাবি ‘তারিখুল ইসলাম ওয়া ওফায়াতুল মাশাহিরিল আ’লাম’ গ্রন্থে হারফুশ আব্দুল্লাহ আল ফাতুলা হালবির জীবনীতে বলেছেন, ‘তার জানাযা ছিলো ঐতিহাসিক। হয়তো মানুষ তাকে পাগলদের মধ্যে একজন বুদ্ধিমান ভাবতো।’ বোকাদের শ্রেণিবিভাগ নিয়ে কাতানজির একটি গ্রন্থ রয়েছে ‘বোকা এবং অপরিপক্কতার গ্রন্থ’।

পাগলদের নিয়ে মুসলমানদের আগ্রহ

ইসলামি ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের আলেমগণ পাগলদের মানস গঠনের বিষয়টি নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। এ বিষয়ে প্রচুর কিতাব রচিত হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম ইমাম শাফেয়ী রহ. (মৃ:২০৪ হি.)। ইমাম বায়হাকি ‘মানাকিবুশ,শাফেয়ী’তে এবং ইমাম নববি ‘তাহযিবুল আসমা ওয়াল লুগাতে’ বলেছেন, ‘ইমাম শাফেয়ীর ছাত্র মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল হাকাম বলেছেন, শাফেয়ী রহমাতুল্লাহি আলায়হিকে বলতে শুনেছি, ‘আমি ৩০০ পাগল কবির বচন এবং কবিতা বর্ণনা করেছি।’

ইবনু আবদি রাব্বিহি পাগলদের কবিতা সম্পর্কে বলেন, ‘শ্রোতারা এগুলো শুনে আরাম পায়, আত্মার প্রশান্তি পায়’। তিনি পাগলদের দুর্লভ কিছু বাণী একত্রিত করেছেন, যা সাধারণত শুনতে পাওয়া যায় না। যেমন—’প্রভু নিক্ষেপকারী ছাড়াও নিক্ষেপ করতে পারেন’, ‘নিজস্ব উৎস ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে বেরিয়ে গেলেই একটি জিনিস আশ্চর্যজনক হয়ে যায়’, ‘যেটা মুগ্ধ করে, সেটাই তুলনাহীন’।

যুক্তি এবং পাগলামি

আশ্চর্যের বিষয় হল—মু’তাযিলারা যুক্তির পূজা করলেও তারা পাগলদের বচন, দুর্লভ কবিতা সংগ্রহে দারুণ উদ্যোগী। নিশাপুরী মু’তাযিলাদের শায়খ আবুল হুজাইল আল্লাফ (মৃ: ২৩৫হি.) এর একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। আল্লাফ একদিন একটি সরাইখানায় গেলেন। সেখানের এক পাগল আল্লাফের সাথে তর্কে লেগে গেল। তার প্রশ্নের বাহার দেখে আল্লাফ বললেন, তুমি পাগল কেন, আল্লাফ হয়ে যাও।

ভাষাবিদ আবুল আব্বাস মুবাররাদ (মৃ: ২৮৫হি.)-যিনি মু’তাযিলা বলে চিহ্নিত- পাগলদের মজলিসে বারবার যেতেন। একদিন তাকে তার এক সহকর্মী জিজ্ঞেস করল, তুমি আমাদের আসর ছেড়ে পাগলদের আসরে এত বেশি যাও কেন? মুবাররাদ বললেন, ‘তাদের কাছে হাস্যরসাত্মক অনেক কথা পাওয়া যায়।’

আবু ইসহাক কুতবি (মৃ:৭১৮হি.) বলেন, ‘মু’তাযিলার ইমাম সামামা ইবনে আশরাস বলেন, ” হারুনুর রশিদ আমাকে মানসিক হাসপাতালে পাঠালেন তাদের সেবা করার জন্য। পাগলদের আড্ডায় সেখানে আমার অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে।” সামামা আমাদের পাগলদের কিছু হাস্যরসের কথা শুনিয়েছিলেন।’

মূলত আরবরা শুরু থেকেই পাগল শ্রেণী থেকে উদ্ভূত সাহিত্য এবং শিল্পের যত্ন নিয়েছেন। ফলতই দেখা যায় আল্লাম যমখশরী (মৃ:৫৩৯হি.) তার একটি গল্পের নাম দিয়েছিলেন ‘পাগলামিই শিল্প, শিল্পই পাগলামি’। জাহিয বলেছেন, ‘মসজিদিয়্যিন নামে খ্যাত একটি দল মনে করত, যারা পাগলদের কবিতা বর্ণনা করে না, তারা আসলে কোনো বর্ণনাকারীর মধ্যেই পড়ে না।

ভাষাবিদ ছাড়াও হাদিসের ইমামগণও এই বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। আল্লামা যাহাবির কথা এখানে বলতে পারি। তিনি এই বিষয়ে পড়েছেন, পাঠ দিয়েছেন, এটাকে কোনো অনর্থক কাজ ভাবেননি। বরং যাহাবি রহ. তৃতীয় শতাব্দী হিজরির প্রসিদ্ধ একজন পাগল আবুল আবর হাশেমি সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি ছিলেন একজন আলেম জ্ঞানী।’ অথচ যাহাবি রহ. খুব কম মানুষের ক্ষেত্রে এই বিশেষণটি ব্যবহার করতেন।

প্রয়োজনীয় পাগলামি

সব পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর জন্য কখনো কখনো পাগলামিটা অবলম্বন হয়ে উঠে। আমাদের সাধারণ মানুষদের হয়তো সে চিন্তাটা দারুণ অসঙ্গত, অরুচিকর ঠেকতে পারে। খতিব বাগদাদি তার ‘আল জামে’ লি-আখলাকির রাবি ওয়াস সামে’ গ্রন্থে একটি গল্প বর্ণনা করেছেন।

উসমান ওরাক একদিন কবি আতাবিকে দেখলেন রাস্তায় দাঁড়িয়ে রুটি খাচ্ছে। উসমান বললেন, রাস্তায় দাঁড়িয়ে খেতে লজ্জা করছে না? কবি বললেন, গরুর সামনে দাঁড়িয়ে খেতে তোমার লজ্জা করে এই ভেবে যে, গরু তোমাকে দেখছে? উসমান বললেন, না। কবি তখন হেসে বললেন, দাঁড়াও। আমি এখুনি প্রমাণ করে দিচ্ছি এরা মানুষ না গরু।

কবি দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিতে লাগলেন। অনেক মানুষের জমায়েত হয়ে গেলো তার বক্তব্যের চারপাশে। ঝোপ বুঝে এবার কোপ মেরে কবি বললেন, অনেকেই একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন, ‘যে ব্যক্তির জিহ্বা নাকের অগ্রভাগ ছুঁতে পারবে, সে জাহান্নামে যাবে না।’ এই কথা শুনে উপস্থিত সবাই জিভ বের করে নাক ছুঁতে চাওয়ার চেষ্টায় রত হল। জমায়েত যখন শেষ হল, কবি উসমানের দিকে তাকিয়ে বললেন, প্রমাণ পেলেন তো ওরা সবাই গরু! এইজন্যই লজ্জা পাই না আমি।

নিশাপুরী পুরষ্কার বঞ্চিত এক কবির গল্প বলেছেন। কবি যখন ভালো লিখেও পুরষ্কার পাচ্ছিলেন না, তখন তিনি পাগলামি করতে লাগলেন, কবিতা হাস্যরস দিয়ে টইটম্বুর করে তুললেন। ঠিকই এরপর একদিন কবি পুরষ্কার পেয়ে গেলেন।

ঐতিহাসিক ইবনে খাল্লিকান (মৃ:৬৪১হি.) এমনই আরেকটি ঘটনা বলেছেন; আবুল আবর হাশেমি শুরুতে যোগ্যতাসম্পন্ন একজন কবি ছিলেন। কিন্তু তিনি দেখলেন ভালো কবিতা দিয়ে উপার্জন করতে পারছেন না আবু তামাম এবং বুহতারির মত। অনেক ভেবেচিন্তে তিনি তখন কবিতায় ইনক্লুড করতে লাগলেন তরল হাস্যরস। বোকা বোকা বচন। সত্যিই তখন তরতর করে বাড়তে লাগল হাশেমির উপার্জন। আবুল আবর বলেছেন, ‘জীবীকা এবং অর্থ উপার্জনের নিমিত্তেই আমি বোকাদের মত হাস্যরসগুলো কবিতায় তুলে এনেছি।’

পাগলের অভিনয়

কবিরা যেমন তাদের কবিতার কাটতি বাড়ানোর জন্য বোকা সাজতেন, তেমনি ইসলামি ইতিহাসে সত্য কথা বলতে গিয়ে রাষ্ট্রের আক্রোশ থেকে বাঁচার জন্য অনেকে পাগলের অভিনয় করতেন। কারণ পাগলদের কথা বলা এবং মন্তব্য করার স্বাধীনতা অবাধ। এই অবাধ স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে অনেকে পাগল সেজে রাষ্ট্র এবং সরকারের সমালোচনা করতেন। দু’একটা গল্প বললে বিষয়টা স্পষ্ট হবে।

উমাইয়া গভর্নর হাজ্জাজ সাকাফি (মৃ:৯৫ হি.) একদিন বেড়াতে বেরিয়েছেন। হাঁটতে হাঁটতে দেখা হলো একজন শায়খের সঙ্গে। হাজ্জাজ জিজ্ঞেস করলেন, সরকারী কর্মচারীদের নিয়ে আপনার মতামত কী? শায়খ বললেন, ‘এরা সবাই বদ; মানুষের ওপর অত্যাচার করে এবং তাদের সম্পদ লুটে নেয়।’ হাজ্জাজ এবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘হাজ্জাজকে কেমন লাগে আপনার?’ শায়খ বললেন, ‘ইরাকের সবচে নিকৃষ্ট গভর্নর। আল্লাহ তাকে এবং যে তাকে নিয়োগ দিয়েছে উভয়কে ধ্বংস করুক।’ হাজ্জাজ দাঁত কটমট করে বললেন, আমি কে চিনেন? শায়খ না সূচক মাথা নাড়লেন। হাজ্জাজ নিজের পরিচয় দিলে শায়খ তার আচরণই বদলে ফেললেন। পাগলের অঙ্গভঙ্গি করে বললেন, ‘আপনি জানেন আমি কে?’ হাজ্জাজ বলল, ‘না।’ শায়খ বললেন, ‘আমি বনি আজালের পাগল। প্রতিদিন দু’বার করে পাগল হই।’ হাজ্জাজ হেসে ফেললেন এবং শায়খকে পুরষ্কারও দিলেন।

শায়খ যা বলেছেন সত্যি বলেছেন। কিন্তু অবস্থা বেগতিক দেখে পাগলের ভান করেছিলেন।

আব্বাসি খেলাফতের সময় অনেক এমন লোক ছিল, যারা পাগলের মত কথা বলতেন। যেন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলাও তাদের জন্য বৈধ হয়ে যায়। খলিফা মাহদির কালে (মৃ: ১৬৯ হি.) এমনি একজন লোকের উদয় হয়েছিল। প্রতি সোম এবং বৃহস্পতিবার ঘোড়া হাঁকিয়ে মাঠে আসতেন। তাকে দেখার জন্য অনেক মানুষের জমায়েত হত মাঠে। তিনি খলিফাদের অবদান, ন্যায়বিচারের গল্প শুনাতেন। উপস্থিত জনতার মাঝে কাউকে বানাতেন আবু বকর, উমর, উসমান, আলী। তাদের সুকীর্তি বর্ণনার পর উমাইয়া শাসকদের এক একজন করে প্রতীক বানিয়ে তাদের সমালোচনা করতেন। সরাসরি সমালোচনা করলে আক্রোশে পড়ার ভয়, তাই তিনি পাগলের মতো সেজে প্রতীক বানিয়ে নিজে নিজে সমালোচনা করতেন।

প্রেম, পাগলামি, তাসাউফ

জন্মগত কিংবা ইচ্ছেকৃত পাগলামির বাইরে ‘প্রেম-পাগলামি’ বলে একটি পাগলামি আছে। অন্তরে কবিতা থাকলেও মস্তিষ্ক দখল করে ইশক, মুহাব্বত। ইশক ছাড়া পৃথিবীর আরকিছু তখন ঠুনকো। নিশাপুরী তার ‘পাগলদের মধ্যে বুদ্ধিমান যারা’ গ্রন্থে এইসব মানুষদের কথাও তুলে এনেছেন। এমনকি কবি কায়স বনি আমর এবং তার বঞ্চিত প্রেমের বেদনা নিয়ে আলাদা একটি অধ্যায়ও নির্মাণ করেছেন। কায়স সম্পর্কে আবু তাইয়্যেব ওশশা (মৃ: ৩২৫ হি.) বলেন, ‘তার কোনো জ্ঞানই ছিল না। শুধু যখন লায়লার আলোচনা উঠত, তখনই তার জ্ঞান ফিরে আসত।’

ইবনে হাজাম (মৃ: ৪৫৬ হি.) তার ‘তুকুল হামামাহ’ গ্রন্থে এমন ইশক পাগলদের অনেক গল্প করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই রোগটি অনেক বড় বড় আলেমকেও আক্রান্ত করেছে। মানসিক ডাক্তার আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে বাকি আমাদের এমন একজন আলেমের কথা বলেছেন, যার নাম মুখে আনলেও আপনারা চিনে ফেলবেন, তার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছিল। এমনকি মানসিক হাসপাতালেও দীর্ঘ সময় কাটিয়েছিলেন।’

ইবনে হাজাম তার গ্রন্থে কেবল পাগলদের গল্পগুলোই বলেননি বরং পাগলদের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণও করেছেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, ‘চিন্তার আসক্তি থেকে প্রেমের জন্ম। চিন্তা যখন আরও বেড়ে যায়, কিন্তু চিকিৎসা নেয়া হয় না, তখন সেটা পাগলামিতে রূপান্তরিত হয়।’

এর বাইরে ইশক ও মুহব্বতের আরও একটি রূপ হল—আল্লাহর ইশক। এখানেও পাগলামি আছে, নিবেদন ও সমর্পণ আছে। এটাকে বলি আমরা তাসাউফ।

শেষকথা

মিশেল ফুকো তার ‘ক্লাসিকাল যুগে পাগলামি’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ইসলামি সভ্যতা পাগলদের জন্য হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র তৈরী করেছে। বিশেষ করে বাগদাদ, কায়রোতে এবং উন্দুলুসে। ইসলামি সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্র উন্দুলুস থেকেই ইউরোপে এসেছে মানসিক হাসপাতাল। অন্যদিকে ইউরোপ পাগলদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। তাদেরকে অশুভ শয়তানের ছায়া মনে করে জনবসতি থেকে দূরে কোথাও তাদের রেখে এসেছে।

পাগলদের এই সমাজে থাকার অধিকার নেই—ইউরোপের এমন চিন্তার উদ্ভাবক দেকার্ত। দেকার্ত বলেছিলেন, ‘আমি চিন্তা করি, তাই আমিই বেঁচে থাকব।’ অর্থাৎ আমি চিন্তা করতে পারি, তাই বেঁচে থাকার অধিকার কেবল আমারই আছে। পাগলরা যেহেতু চিন্তা করতে পারে না, তাই তাদের জন্য স্পেস কিংবা কোনো সুযোগ নেই এই সমাজে।

এই জায়গায় এসে ইউরোপের সঙ্গে ইসলামি সভ্যতার বিরোধ ঘটে। ইসলামি সভ্যতা বুদ্ধির বিপর্যয় ঘটলেই অস্তিত্বকে নাই করে দিতে হবে—এই টার্মে বিশ্বাসী না। ইবনে খালদুনের মতে, ‘ পাগল জ্ঞানী মানে যার পার্থিব ভেদ বুদ্ধির জ্ঞান হারিয়ে গেছে, তবে এর মানে এই নয় যে, তার জীবন শেষ হয়ে গেছে।

সুতরাং সে যেহেতু বেঁচে আছে, এই সমাজে বাস করার এবং কথা বলার অধিকারও তার আছে। হয়ত দায়িত্ব নেয়ার মত জ্ঞান তার নেই, কিন্তু নিজেকে বুঝার জ্ঞান তার আছে। এইজন্যই ইসলামি সভ্যতায় সর্বপ্রথম নির্মিত হয়েছিল মানসিক হাসপাতাল। পাগলদের যেন বেঁচে থাকাকে অর্থবহ এবং সুস্থ করে তোলা যায়।

(আব্দুল্লাহ তহাবির গবেষণা অবলম্বনে)

আগের সংবাদমসজিদুল হারামের নতুন ইমাম শায়খ ইয়াসির বিন রশিদ
পরবর্তি সংবাদআগামী সপ্তাহে আল্লামা আযহার আলি আনোয়ার শাহ’র অপারেশন