ইসলামি সভ্যতায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা

মুনশী নাঈম

ইসলামি সভ্যতা মানুষের আত্মার পরিচর্যা যেমন করেছে, ঠিক তেমনি মানুষের দেহের পরিচর্যাও করেছে। আত্মার পরিচর্যার জন্য তারা গড়ে তুলেছে মসজিদ-খানকা, দেহের পরিচর্যার জন্য গড়ে তুলেছে হাসপাতাল। হাসপাতাল-বিদ্যার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় সভ্যতা ইসলামি সভ্যতা থেকে প্রায় নয়শ বছর পিছিয়ে ছিল। সর্বপ্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছিল মুসলিমরা। আজকের ইউরোপীয় হাসপাতালের এই উন্নত ব্যবস্থাপনা, মূলত ইসলামি সভ্যতার ওই হাসপাতালগুলির নিউ মডেল। মহামারী সংক্রমণ রোধে হোম কোয়ারেন্টিন কিংবা আইসোলেশনের ধারণা ইউরোপের নয়, ইসলামি সভ্যতার। এই প্রক্রিয়াগুলো সেই উমাইয়া-আব্বাসি খেলাফতের যুগে, মুসলমানদের গড়ে তোলা হাসপাতালে-ই বাস্তবায়িত হয়েছে।

এই লেখায় ইসলামি সভ্যতায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কেমন ছিল, তা-ই দেখাবার চেষ্টা করবো।

হাসপাতালের ধরণ ও প্রকার

ইসলামি সভ্যতায় হাসপাতালগুলো ‘বিমারিস্তান’ নামে প্রসিদ্ধ ছিল। অধিকাংশ হাসপাতাল গড়ে উঠত মুসলিম শাসকদের প্রণোদনায়। মানুষের সুবিধা ও অসুবিধার কথা চিন্তা করে তারা দু ধরণের হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন; স্থায়ী হাসপাতাল এবং ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল।

ইসলামি সভ্যতায় পৃথিবীর সর্বপ্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল উমাইয়া খলিফা আল-ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের রাজত্বকালে। তার রাজত্বকাল ছিল ৮৬হি./৭০৫ ঈ. থেকে ৯৬হি/৭১৫ ঈ. পর্যন্ত। এটি ছিল কুষ্ঠরোগের বিশেষায়িত হাসপাতাল। তারপর প্রতিষ্ঠিত বড় বড় স্থায়ী হাসপাতালগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—বাগদাদের বিখ্যাত হুমেরাল হাসপাতাল। ৩১১হি./৯৮১ঈ. হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেন ইবনে বোয়াইহ। ২১১ হিজরিতে মিসরের কায়রোতে আহমদ ইবনে তুলুন প্রতিষ্ঠা করেন ইবনে তুলুন হসপাতাল। এটি তৈরিতে ব্যয় হয়েছিল ৬০ হাজার দিরহাম। ৫৪৯হি./১১৫৪ঈ. সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদ প্রতিষ্ঠা করেন দামেস্কের গ্রেট নূরী হসপিটাল। ৬৮৩হি./১২৮৪ঈ. মিসরে মানসুর সাইফুদ্দিন কালাউন প্রতিষ্ঠা করেন গ্রেট মনসৌরি হসপিটাল। শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতার অবাক উদাহরণ ছিল হাসপাতালটি। এতবড় ছিল হাসপাতালটি—এক দিনে চার হাজারের বেশি রোগী এতে চিকিৎসা নিত। মনসুর আবু ইউসুফ ইয়াকুবের রাজত্বকালে (৫৮০-৯৫হি.) মরক্কোতে প্রতিষ্ঠিত হয় মারাকাশেশ হাসপিটাল। শুধু কর্ডোভাতেই ছিল পঞ্চাশটির বেশি হাসপাতাল।

সুলতান মাহমুদ সেলজুকির রাজত্বকালে (৫১১-৫২৫ হি.) ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালের দেখা পাওয়া যায়। তখন প্রায় চল্লিশটি উট এই ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল বহন করতো। এতে থাকতো চিকিৎসার ঔষধ, যন্ত্রপাতি, রোগীর খাবার ইত্যাদি। সঙ্গে থাকতো বেশ কয়েকজন চিকিৎসক। সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত গ্রাম, মরুভূমি, পাহাড়-পর্বত ঘুরে ঘুরে মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দিত চিকিৎসা সেবা। দীর্ঘ পথ সফর করে নির্দিষ্ট স্থায়ী হাসপাতালে আসাটা অনেকেরই দুঃসাধ্য হয়ে যেতো। তাদের কথা মাথায় রেখেই ভ্রাম্যমাণ এই হাসপাতালের আয়োজন করেছিল মুসলিমরা।

উন্নত হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা

ইসলামি সভ্যতায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার দিকে লক্ষ্য করলেই মুসলিমদের স্বাস্থ্যসচেতনতার বিষয়টি টের পাওয়া যায়। এখানে ৩১১ হিজরিতে প্রতিষ্ঠিত বাগদাদের বিখ্যাত হুমেরাল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা চিত্রটি তুলে ধরলেই সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে।

হুমেরাল হাসপাতাল ছিল সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অনন্য এক উদাহরণ। বিভিন্ন রোগের জন্য এখানে আলাদা আলাদা বিভাগ ছিল। যেমন—সার্জারি বিভাগ, চক্ষু বিভাগ, অর্থোপেডিক্স বিভাগ, স্কিনকেয়ার বিভাগ। চব্বিশজন চিকিৎসক নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল হাসপাতালটি। ক্রমান্বয়ে চিকিৎসক বেড়েছে। ডাক্তার, নার্স, পরিচ্ছন্নতাকর্মী সবার জন্য ছিল আলাদা আলাদা দায়িত্ব । এই হাসপাতালে রান্নাঘর ছিল। রোগীদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার দেয়া হতো এখান থেকে। প্রতিটি ইউনিটে ছিল নরম বিছানা থেকে শুরু করে বিলাসবহুল বাথরুমসহ যাবতীয় ব্যবস্থাপনা। হাসপাতালের তাপ, বাতাস, আর্দ্রতা ছিল নিয়ন্ত্রিত।

দুটি অংশে বিভিক্ত ছিল হাসপাতালটি। একটি অংশ পুরুষদের, অন্যটি নারীদের। পুরো হাসপাতালের একজন মহাব্যবস্থাপক ছিলেন। প্রতিটি বিভাগের একজন করে প্রধান ব্যবস্থাপক এবং প্রধান চিকিৎসক থাকতেন। তারপরও পুরুষদের জন্য থাকতেন একজন জিএম, মহিলাদের জন্য একজন জিএম। চিকিৎসকদের বিভিন্ন পদবিও ছিল—যেমন প্রধান চিকিৎসক, সার্জারি প্রধান, চিফ সার্জন ইত্যাদি। ডাক্তারদের জন্য ছিল চেম্বার। চেম্বারে রোগী দেখে তারা প্রেসক্রিপশন লিখে দিতেন। তার পাশেই থাকতো ফার্মেসি। প্রেসক্রিপশন দেখালে ফার্মেসি থেকে ঔষধ দেয়া হতো।

হাসপাতালে কোনো রোগী ভর্তি হতে চাইলে সর্বপ্রথম তাকে হাসপাতাল থেকে পরিচ্ছন্ন কাপড় দেয়া হতো। বাইরে থেকে পরে আসা কাপড় খুলে হাসপাতালের কাপড় পরতে হতো। তারপর তাকে একটি কেবিনে নিয়ে যাওয়া হতো। এক কেবিনে একজন করে রোগীই থাকতো। একজন রোগীর সঙ্গে আরেকজন রোগীর মেলামেশার কোনো সুযোগই থাকতো না। হাসপাতাল থেকে খাবার দেয়া হতো। সুস্থ হলে আবার তার কাপড় তাকে ফেরত দেয়া হতো।

কিন্তু আঠারো শতকে ইউরোপে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর ইউরোপীয়রা এই সেবাটুকু দিতে পারেনি। জার্মান প্রাচ্যবিদ ম্যাক্স মায়রহফ বলেছেন, ‘এক কেবিনে তারা চার থেকে পাঁচজন রোগীও রাখতো। রোগীদের জন্যও আলাদা বিভাগ ছিলো না। এমনও দেখা যেতো—একই কেবিনে প্রসূতি মায়ের সঙ্গে রাখা হয়েছে অর্থোপেডিক্সের রোগী কিংবা চর্মরোগী।’ ইসলামি সভ্যতায় মুসলিমরা যতটুকুই চিকিৎসা দিয়েছে, যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েই দিয়েছে। মানুষকে মূল্য দিয়ে সর্বোচ্চ চিকিৎসাটুকু দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। উপরে শুধু একটি হাসপাতালের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ঠিক এমনি চিত্র দেখা যেতো ইবনে তুলুন হাসপাতালে, মারাকাশেশ হসপিটালে, গ্রেট নূরী হাসপাতালসহ আরও অনেক হাসপাতালে।

হাসপাতালের পরিবেশ ও আবহাওয়া

ইসলামি সভ্যতায় মুসলিমরা হাসপাতালে চিকিৎসার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাই কেবল করেননি, বরং কোন জায়গায় হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে, সে সম্পর্কেও ছিল তাদের সুচিন্তিত মতামত। সবচে মনোরম আবহাওয়া এবং পরিবেশে তারা হাসপাতাল গড়ে তুলতেন। যেন বিশুদ্ধ বায়ু এবং নির্মল আবহাওয়া রোগীদের সুস্থ হতে দ্রুত সাহায্য করে। হাসপাতাল নির্মাণের ক্ষেত্রে সাধারণত তারা তিনটি জায়গা খুব গুরুত্ব দিতেন। এক. মসজিদ লাগোয়া স্থান। দুই. কোনো বিল্ডিং, তার চারপাশে তারা গড়ে তুলতেন বাগান, সরোবর। তিন. নদীর পাড়।

মসজিদ এবং তার আঙ্গিনা যেহেতু সবসময় পরিচ্ছন্ন থাকে, তাই তারা মসজিদের লাগোয়া হাসপাতাল গড়ে তুলতেন। মিশরে সর্বপ্রথম হাসপাতাল নির্মিত হয় উমাইয়া শাসনামলে এবং হাসপাতালটি নির্মিত হয় উমাইয়া মসজিদের পাশে। মিসরে ইবনে তুলুন হাসপাতাল যে জায়গায় নির্মাণ করা হয়, তার চারপাশে ছিল উদ্যান, স্বচ্ছ জলের সরোবর। ঐতিহাসিক আল মাকরিজি বলেছেন, ‘তৎকালীন মিসরের রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে হাসপাতালটি নির্মিত হয়েছিল।’ আব্বাসি খেলাফত আমলে আস সায়্যিদা হাসপাতাল নির্মিত হয়েছিল দজলা নদীর তীরে। বিখ্যাত চিকিৎসক আবু বকর রাযীর পরামর্শে বাগদাদের হুমেরাল হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছিল দজলা নদীর পশ্চিম তীরে। মিষ্টি আবহাওয়া, শুদ্ধ বাতাস এবং প্রাকৃতিক নির্মলতায় বাগদাদের সবচে উৎকৃষ্ট জায়গা ছিল এটি। গ্রেট নূরী হাসপাতাল যেখানে তৈরী করা হয়েছিল, তার পাশেই ছিল তারফাইন নামক একটি জলাশয়। সর্বশেষ মরক্কোর মারাকেশেশ হাসপাতালের কথা বলতে হয়। এই হাসপাতালে সবধরণের জাঁকজমকপূর্ণ ব্যবস্থা ছিল। হাসপাতালের আঙিনায় বিভিন্ন ধরণের গাছপালা এবং চারটি সরোবর ছিল।

হাসপাতালের অভ্যন্তরীন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সঙ্গে বাইরের পরিবেশ ও আবহাওয়ার দিকেও তারা তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন। হাসপাতাল লাগোয়া জমিতে তারা চাষ করতেন বিভিন্ন ঔষধি গাছ এবং হাসপাতালের সঙ্গে তারা গড়ে তুলতেন বিশাল বড় লাইব্রেরী। এতে থাকতো চিকিৎসাবিদ্যার শত শত বই। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মিসরের ইবনে তুলুন হাসপাতালের লাইব্রেরীতে ছিল এক হাজারেরও বেশি চিকিৎসা সংক্রান্ত বই।

বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে জুবায়ের ৫৮০হি./১১৮৪ঈ. বাগদাদ ভ্রমণ করেন। তিনি বলেন, ‘বাগদাদে ছোট্ট গ্রামের মতো একটি জায়গা দেখতে পাই। সেখানে বিভিন্ন গাছ-গাছালি পরিবেষ্টিত একটি বিলাসবহুল প্রাসাদ। তার চারপাশে আরও কয়েকটি ঘর। এটি মূলত একটি হাসপাতাল। ডাক্তার, ফার্মাসিস্ট এবং শিক্ষার্থীদের পদচারণায় সবসময় মুখর। এসব হাসপাতাল চলে মূলত মুসলিম শাসকদের প্রণোদনা এবং গরিব-মিসকিনদের জন্য ধনীদের গড়ে তোলা ফান্ডের ওপর ভিত্তি করে।’

পশ্চিমারা কী বলেন?

ইউরোপ আজ চিকিৎসা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা যতই উন্নতি করুক, ইসলামি সভ্যতার অবদান কখনোই অস্বীকার করতে পারবে না। জার্মান প্রাচ্যবিদ ম্যাক্স মায়রহফ নিজেও স্বীকার করেছেন ইউরোপের প্রাথমিক হাসপাতালের দুরবস্থার কথা। উপরে তার বর্ণনা উল্লেখ করেছি। ডা. ম্যাক্স এটাও বলেছেন, ইসলামি সভ্যতার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার মূল্য আমরা কখনোই দিতে পারব না। সতেরো শতাব্দী পর্যন্ত আমাদের হাসপাতালই ছিল না। যার যার বাড়িতেই চিকিৎসা করা হতো। আঠারো শতকে এসে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা হয়েছে।’ সিগ্রিড হানক বলেছেন, ‘বর্তমানের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, টেস্ট ল্যাব, ফার্মেসি ইত্যাদি মূলত আরব প্রতিভাদের স্মৃতিসৌধ। এগুলো মনে করিয়ে দেয় আরবদের অবদান।’

সূত্র: কিসসাতুল উলুমিত তিব্বিয়্যাহ ফিল হাজারাতিল ইসলামিয়্যাহ। রাগেব সারজানী। 

আগের সংবাদমুসলিম সভ্যতায় চিকিৎসাবিদ্যা : ওয়াকফ ও চিকিৎসা অর্থনীতি
পরবর্তি সংবাদইবনুন নাফিস : বিস্মৃত মুসলিম চিকিৎসক