
সাজ্জাদ আকবর :
মুসলিম জাহানের মহামান্য খলিফা হজরত আলী ইবনে আবু তালেব (রা.) নিজে বাদী হয়ে এলেন কাজির দরবারে। বিবাদী একজন ইহুদি। আলী রা. দাবি করলেন, ইহুদির কাছে থাকা বর্মটা তার, ইহুদির নয়। কাজি সাক্ষী চাইলেন খলিফার কাছে। খলিফা সাক্ষী হিসেবে আপন পুত্র আর গোলামকে পেশ করলেন। কিন্তু সাথে সাথে কাজি মামলাটি খারিজ করে দিলেন। কারণ, মালিকের পক্ষে দাসের সাক্ষ্য ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। ইহুদির পক্ষেই গেল বিচার। ঠিক তখনই ওই ইহুদি কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলেন। এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আসলে ওই বর্ম আমার ছিল না। খলিফাতুল মুসলিমীন আলীর বর্মই কুড়িয়ে পেয়েছিলাম আমি। এতদ্সত্ত্বেও বাহ্যিক সাক্ষ্যের অভাবে প্রধান শাসনকর্তার বিরুদ্ধে ফয়সালা দেওয়া হয় যে আদর্শে, রাজায় প্রজায় ন্যায়ভিত্তিক সাম্য প্রতিষ্ঠা যে ধর্মের অনুশাসন, সে ধর্ম স্বাভাবিকভাবেই আমার হৃদয়-গভীরে জায়গা করে নিয়েছে।
হ্যা, এভাবেই ইসলাম সংখ্যালঘু ইহুদির বিচারিক অধিকার নিশ্চিত করেছে। ধর্মকর্মের দিয়েছে পূর্ণ স্বাধীনতা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘দ্বীন সম্পর্কে কোনো জবরদস্তি নেই। সত্য পথ ভ্রান্ত পথ থেকে সুস্পষ্ট হয়েছে। যে তাগুতকে অস্বীকার করবে এবং আল্লাহকে বিশ্বাস করবে, সে এমন এক হাতল ধরবে যা কখনো ভাঙবে না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৫৬)
ইসলাম ধর্মে শাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন কোনো অবস্থাতেই রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু অমুসলিম নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা লাভের অধিকার বিঘ্নিত না হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রদত্ত জনকল্যাণময় নীতিমালার আলোকে যাতে অমুসলিমরাও ইহকালীন জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা লাভে ধন্য হতে পারে। কেননা সংখ্যালঘু অমুসলিমদের জানমাল মুসলমানদের নিজের জানমালের মতো পবিত্র আমানত ও নিরাপত্তাযোগ্য। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘তাদের রক্ত আমাদের রক্তের মতো এবং তাদের ধনসম্পদ আমাদের ধনসম্পদের মতো।’
রাসূলে কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘জেনে রাখো, যে মুসলমান কোনো চুক্তিবদ্ধ (অর্থাৎ অমুসলিম) নাগরিকের ওপর জুলুম করবে, কিংবা তার অধিকার হরণ করবে, কিংবা তার ওপর সামর্থ্যের চেয়ে বেশি বোঝা চাপিয়ে দেবে, কিংবা তার কোনো জিনিস জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেবে, সেই মুসলমানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত অভিযোগে আমি আল্লাহর আদালতে অমুসলিম নাগরিকের পক্ষে দাঁড়াব। ’ (আবু দাউদ)
মদিনা সনদে যে উম্মাহর কথা বলা হয়েছে, তা শুধু মুসলমান সমন্বয়ে সংগঠিত নয়, বরং তা সর্বধর্মের সমন্বয়ে গঠিত। সনদের ২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বনু আউফের ইহুদিরা মুমিনদের সঙ্গে একই উম্মাহ। ইহুদিদের জন্য তাদের ধর্ম আর মুসলমানদের জন্য তাদের ধর্ম, তাদের মাওয়ালি বা আশ্রিত এবং তারা নিজেরাও। অবশ্য যে অন্যায় বা অপরাধ করবে সে নিজের এবং তার পরিবার-পরিজনের ক্ষতিই করবে।’
আজ থেকে কয়েকশো বছর আগে সারা পৃথিবীতে ইসলাম যখন প্রবল প্রতাপে প্রতিষ্ঠিত ছিলো, চারদিকে মুসলিমদের ছিলো জয়-ঝংকার, তখনও ইসলামের এই রাজনৈতিক সামাজিক ব্যবস্থা অমুসলিমদের পীড়িত করেনি। কারণ ইসলামের ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় উদারতা ও সহনশীলতা মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রের চরিত্রে পরিণত হয়। অমুসলিম প্রজারা নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তার উদ্যানে উপনীত হয়। মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রে দয়া, অনুগ্রহ ও সহমর্মিতার অবারিত বুকে তারা লাভ করে আশ্রয়। ইসলামের যে রাষ্ট্র, সমাজ ও সভ্যতা তার ভিত্তিমূলে নিহিত মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও দায়িত্ব। তার আত্মায় প্রবাহিত ঐশ্বরিক মহিমা ও কল্যাণবোধ। এর জীবনচর্চায় ঘৃণা নয়, আছে খোদার সকল সৃষ্টির প্রতি প্রেম। বিদ্বেষ নয়, আছে সার্বজনীন ঐক্য। বিভেদ নয়, আছে সহযোগিতা ও কল্যাণী যৌথতা। বৈষম্য নয়, আছে অবধারিত সাম্য।
এখানে খলিফা ওমর রা. জিযিয়া দিতে অক্ষম বৃদ্ধ ইহুদিকে ভিক্ষা করতে দেখে ব্যথিত হন। নিজের ঘরে নিয়ে নিজ হাতে খাওয়ান তাকে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আদেশ করেন, জিযিয়া দিতে অক্ষম অমুসলিম নাগরিকদের ভাতা দেয়ার জন্য, যা তাদের পরিবারের প্রয়োজন পুরণে যথেষ্ট হয়।
এখানে একই বর্মের মামলায় ছিনতাইকারী ইহুদির সাথে সমানভাব আদালতে দাঁড়াতে হয় বর্মের মালিক খলিফা আলী রা.-কে। খলিফা হবার কারণে আলাদা অনুকম্পা তিনি পাননি, চাননি৷
ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্র যেভাবে সংখ্যালঘুর অধিকার নিশ্চিত করে, তেমনি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির পথও রুদ্ধ করে দেয় কঠোরভাবে। ভিন্নধর্মের মানুষের প্রতি হীনতা আবিস্কার, হিংস্রতা, ও উৎপীড়নের ওপর জারি করে নিষেধাজ্ঞা। তাদের জানমাল ও ইজ্জতের মূল্যকে ও মর্যাদাকে করে প্রতিষ্ঠিত। এ ভিত্তিতে ইসলামি সভ্যতার সোনালি সময় হয়েছে অতিক্রান্ত। শত শত বছর ধরে শান্তি ও নিরাপত্তার চাতালে মুসলিম সভ্যতা আশ্রয় দিয়েছে অমুসলিম জনগোষ্ঠীকে। দিয়েছে আবাস ও আশ্রয়। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে সংখ্যালঘু মুসলিমরা শুধু অধিকার বঞ্চিত নয়, বরং গণহত্যার শিকার। ইতিহাসের বর্বরতম সাংস্কৃতিক নিধনযজ্ঞের শিকার উইঘুর মুসলিমরা। মানবতাবাদী ইউরোপের নব্য ক্রসেডাররা তক্কে তক্কে আছে কীভাবে মুসলিম শূন্য পৃথিবী গড়া যায়। হিন্দুত্ববাদী ভারত পশুর হিংস্রতা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ছে সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর।
মোটকথা, সারা পৃথিবীটাই সংখ্যালঘু মুসলিমদের জন্য হিংসার লেলিহান গোলকে পরিণত হয়েছে। জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ ও শত্রুতা অগ্নিশিখার মতো জ্বলছে। দেশে দেশে সীমান্তে সীমান্তে উন্মাদনার আগুন, ধুম্রপুঞ্জ। ভাষিক, ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতার বোধ থেকে তৈরি হচ্ছে দেয়ালের পর দেয়াল। ধর্মের নামে চলছে অধর্মের রাজত্ব। ধ্বংস, উচ্ছেদ, জাতিগত নিধন ও অব্যাহত অবিচার চলছে ধর্মকে কেন্দ্রে রেখে। বিকৃত হওয়া ধর্ম দিয়ে যুদ্ধবিমানের তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। কোনো জাতির মানুষের চেয়ে গরু কিংবা কুকুর যেন অধিক মূল্যবান। আর কোনো জাতির যে-কোনো একজনের জীবন অপর জাতির হাজারো জীবনের চেয়ে যেন দামি। ধর্মতাড়িত ঘৃণা ও বর্ণবাদ-নির্দেশিত এই অবিচার বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠা নিয়েই আজ বিদ্যমান। প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য সর্বত্রে একই ধ্বংসযাত্রা।
আজকের পৃথিবীতে যখন অবৈধ দখলদার ইসরাইল পবিত্র আল আকসা গ্রাস করে দখলদারিত্ব আর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে, তখন আল আকসার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গির্জা আর প্যাগোডাগুলো সাক্ষ্য দিচ্ছে মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির। মুসলিম শাসকরা ফিলিস্তিনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা সত্ত্বেও সবাইকে আপন ধর্মকর্মে স্বাধীনতা দিয়েছেন। দিয়েছেন আল আকসায় ধর্মীয় উপাসনার অবারিত সুযোগ। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে আমরা কী দেখছি? আমরা দেখছি, মানবাধিকারকে লাশে পরিণত করে তার কবর খোড়া হচ্ছে মহাউৎসবে। শহিদি রক্তে ভিজে উঠছে বার বার পৃথিবীর মাটি। এক কথায় অশান্ত উদ্ভ্রান্ত এই পৃথিবীর জন্য বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বনই যেন বাকি নেই। মানবতার জন্য নেই নিরাপদ কোনো ঠিকানা। পৃথিবী তাই হতাশ। ইথারে ইথারে নিরাশার বিবৃতি।
কিন্তু নিরাশার এই চাদর দীর্ণ করে একটি আওয়াজ বারবার বেজে উঠছে। মৃত্যু উপত্যকায় বারবার ছুটে আসছে একটি আহ্বান জীবনের আশ্বাস নিয়ে। একটি আহ্বান গোলাবারুদ আর ধ্বংসের রাজত্বে ভ্রাতৃত্ব্যের সৌরভ বিতরণ করছে। সেই আহ্বানে কলকল করে ধ্বনিত হচ্ছে প্রেম, সৌহার্দ্য, সাম্য-সম্প্রীতির সংরাগ। এ আহ্বান যুগে যুগে পৃথিবীকে বাঁচিয়েছে বার বার। মানবতাকে বার বার দিয়েছে নিরাপদ ঠিকানা। সেই আহ্বান ক্রমাগত ধ্বনিত হচ্ছে নির্জন নিভৃত হেরা গুহা থেকে। যে আহ্বান ভাষা পেয়েছে এই বলে- ‘ওয়াকুনু ইবাদাল্লাহি ইখাওয়ানা’ অর্থাৎ হে লোকসকল এক আল্লাহর বান্দা হিসেবে তোমরা সবাই ভাই ভাই হয়ে যাও। জীবনের উদ্বোধন থেকে পবিত্র এই আহ্বান জানিয়ে এসেছে ইসলাম। তৃতীয় বিশ্বের মানুষ সত্যিকারার্থে যদি শান্তি চায়, মুক্তি চায় তবে মনুষ্যত্ব ও মানবতার পবিত্র সেই আহ্বানে সাড়া দিতেই হবে; এতে কোনো সন্দেহ নেই।
