উইলিয়াম কেরি : যার হাতে বাংলা ভাষা ‘সম্ভ্রম’ হারিয়েছে

কাজী মাহবুবুর রহমান

বাংলা গদ্যরীতির প্রবর্তক ও প্রমিত বাংলার জনক হিসেবে উইলিয়াম কেরিকে পরিচিত করা হয় আমাদের কাছে। তাঁর প্রবর্তিত প্রমিত প্রথম প্রতিষ্ঠা পায় কলকাতায়। কলকাতার বর্তমান বাংলাটা কিন্তু প্রমিত বাংলা হিসেবে প্রাকৃতিক গতিতে গড়ে ওঠেনি। সাহেব উইলিয়াম কেরিরা এই বাংলাটা কিছুটা তৈরি করে নিয়েছিলেন, কিছুটা শিখেছিলেন ও চালু করেছিলেন। তো উইলিয়াম কেরি আসলেই কি বাংলার জন্য নিবেদিত-প্রাণ ছিলেন, সত্যিকার অর্থেই কি তিনি বাংলাভাষা কল্যাণে কাজ করেছিলেন, নাকি প্রমিত গদ্যরীতি প্রণয়ণের নামে আমাদের প্রাণের এ ভাষাটির বারোটা বাজিয়েছিলেন, সে-বিশ্লেষণে যাবার আগে আসুন আমরা তার জীবনীটা একটু ঘেটে নিই।

১৭৬১ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই আগষ্ট উত্তর ইংল্যাণ্ডের নর্থহ্যাম্পটনডায়ার-এর একটি দরিদ্র তাঁতী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন উইলিয়াম কেরি। তাঁর বাবার নাম এডমুন্ড কেরি এবং মায়ের নাম এলিজাবেথ।

১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি হ্যাকেল্টন-এ ক্লার্ক নিকোলাস নামক এক মুচির অধীনে কাজ শেখা শুরু করেন। এখানে থাকাবস্থায় তিনি চার্চ অফ ইংল্যান্ড ত্যাগ করে হ্যাকেল্টনের নিকটবর্তী Congregational church চার্চের সাথে যুক্ত হন।

১৭৭৯ খ্রিষ্টাব্দে ক্লার্ক নিকোলাস-এর মৃত্যুর পর তিনি স্থানীয় জুতা প্রস্তুতকারক থমাস ওল্ড-এর অধীনে চাকরি নেন। ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে থমাস ওল্ড-এর শালী ডরোথি প্যাকেট-কে বিবাহ করেন। তাঁদের বিবাহ হয়েছিল চার্চ অফ সেন্ট জন ব্যাপটিষ্ট গির্জায়। এঁদের মোট ৫টি পুত্র ও ২টি কন্যা-সন্তান জন্মেছিলে। কন্যা দুটো শৈশবে মৃত্যুবরণ করে। আর পিটার নামক পুত্রটি মারা যায় ৫ বছর বয়সে। এর কিছুদিনের ভিতরে থমাস ওল্ড মৃত্যুবরণ করলে, কেরি তাঁর ব্যবসার সকল দায়িত্ব গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, থমাস ওল্ড হিব্রুভাষা-সহ ইউরোপের অনেকগুলো ভাষা জানতেন। জুতা তৈরির ফাঁকে ফাঁকে তিনি কেরিকে শিখিয়েছিলেন হিব্রু, ইতালিয়ান, ডাচ এবং ফরাসি ভাষা।

এইভাবে স্বশিক্ষিত হয়ে ওঠার কারণে স্থানীয় মিশনারিদের সাথে সখ্য গড়ে উঠে কেরির। মাঝে মাঝে তাঁকে স্থানীয় গির্জায় ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানোও হতো। ১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দে মৌল্টন স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পান তিনি। এই চাকরির পাশাপাশি প্যাস্টর হিসেবে গির্জায় ভাষণও দিতেন। এই সময় তিনি গির্জা ও স্কুলের সূত্রে নানা ধরনের বই পড়ার সুযোগ পান।

১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি Harvey Lane Baptist Church in Leicester-এ পূর্ণকালীন প্যাস্টর পদ পান। এই সময় জুতো তৈরির কাজ ছেড়ে দিয়ে পূর্ণদমে মিশনারির কাজ শুরু করেন। ১৭৯২ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় তাঁর লিখিত পাঁচখণ্ডের গ্রন্থ An Enquiry into the Obligations of Christians to use Means for the Conversion of the Heathens। এই বৎসরের অক্টোবর মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় the Particular Baptist Society for the Propagation of the Gospel Amongst the Heathen। এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ভারতে ধর্ম প্রচারের জন্য তাঁকে নির্বাচন করা হয়।

১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে জাহাজযোগে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেন কেরি।

১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে তিনি কলকাতায় আসেন। কলকাতায় এসে স্থানীয় লোকদের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের জন্য, রামরাম বসুর কাছে বাংলা শিখতে আরম্ভ করেন। এই সময় দুটি নীলকুঠির মালিক ছিলেন কেরির বন্ধু থমাসের অপর এক বন্ধু। এই কুঠির ম্যানেজার হিসেবে তিনি চাকরি নেন এবং পুত্র ও পুত্রবধূদের নিয়ে মেদেনীপুরে চলে আসেন। পরবর্তী ছয় বছর এই কুঠিতে কাজ করেন এবং বাংলা ভাষায় বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্ট অনুবাদ করেন।

ইতিমধ্যে মূল মিশনারি কমিটি ভারতে আরও মিশানারি পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেই সূত্রে জন ফাউন্টেইন নামক একজন নতুন বৃটিশ মিশনারি হিসেবে আসেন এবং মেদেনীপুরে স্কুল চালু করেন। এরপর ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে আসেন উইলিয়াম ওয়ার্ড, ডেভিড ব্রুনসডন, জশুয়া মার্শম্যান ও উইলিয়াম গ্র্যান্ড। এই সময় ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি খ্রিষ্টধর্ম প্রচারে বাধা দিত। তাই মার্শম্যান এবং ওয়ার্ড ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ফাঁকি দিয়ে একটি মার্কিন জাহাজে এসেছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাঁদের আসল উদ্দেশ্যের খবর পেয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করতে যায়। সেজন্যে তাঁরা কলকাতার অদূরে ডেনিশ মিশন শ্রীরামপুরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই জানুয়ারি কেরি এসে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। তাদের প্রচেষ্টায় শ্রীরামপুরে একটি মিশন গড়ে ওঠে। ধর্মপ্রচার ও শিক্ষা প্রসারের তাঁর একটি ছাপাখানা স্থাপন করেন। এই প্রেস থেকে কেরির অনূদিত বাইবেলের ছাপা শুরু হয়। এই বছরেই ফাউন্টেইন মারা যান। এবং উইলিয়াম কেরিসহ অন্যরা প্রথমবারের মত কৃষ্ণ পাল নামক খ্রিষ্টান বানাতে সক্ষম হন।

উইলিয়াম কেরিকে আমাদের সামনে যতটা মহৎ করে উপস্থাপন করা হয়, বাস্তবতা এর সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ, কেরির জীবন বিশ্লেষণ করলে এই প্রশ্ন থেকেই যায়৷ কেরি মালদা থেকে যেসব চিঠিপত্র লিখেছেন, সেগুলো পড়লে আর সন্দেহের কোনো কারণই থাকে না যে তিনি বাংলা ভাষাকে প্রায় ঘৃণাই করতেন। বাংলা ভাষার স্বাভাবিক গতি-প্রকৃতির প্রতি ছিল তাঁর অন্তঃর্গত অসন্তোষ। তাঁর প্রধান নালিশ ছিল–এ ভাষাটির কোনো প্রামাণিক আকার নেই। এবং নদীর প্রত্যেকটি বাঁকে এ ভাষা আলাদা।

বাংলা ভাষার অপ্রমিত স্বাভাবিকতাকে তিনি ভেবেছিলেন ভাষার দুর্বলতা। মালদা থেকে এসে তিনি যখন নদীয়ার দিকে নৌকোয় ঘুরছিলেন এবং এক-একটা বিষয় নিয়ে লোকজনের কথাবার্তার উদাহরণ সংগ্রহ করছিলেন। তখন তিনি এই ভাষার স্বাভাবিকতার ওপর একটা শৃঙ্খলা আরোপ করতে লাগলেন। শৃঙ্খলা আরোপের প্রধানতম দুটি উপায় হচ্ছে, ক্রিয়াপদের ও বিশেষ্যের সংখ্যা যদ্দূর সম্ভব কমিয়ে আনা ও মুখের কথার অর্থ-বৈচিত্র্যকে একটিমাত্র অর্থের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়া। এই দুই সরলীকরণের ফলে, যাকে আমরা প্রমিত বাংলা বলে পরে চিনে নিয়েছি, তার জন্ম হয়।

কেরি ও শ্রীরামপুরের পাদ্রিরা বাংলা ভাষাটা শিখতে চাইছিলেন মুখের ভাষা থেকে; তাছাড়া তাঁদের কোনো উপায় ছিল না। যে বিপুল আকারের বাংলা সাহিত্য সারা বাংলার গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে ছিল সেগুলো তাঁরা পড়তেই পারতেন না। তাঁদের কাজ ছিল লোকের মুখ থেকে একটা বাংলা ভাষা তৈরি করে সেই ভাষার ওপর বাইবেল চাপিয়ে দেয়া। তথাকথিত বাংলা প্রমিত গদ্যের জন্ম-ইতিহাস এটাই।

ফলে, উনিশ শতকজুড়ে ক্রম-শিক্ষিত সমাজ কলকাতায় বাংলা চর্চা করতে লাগলেন এবং প্রমিত বাংলা ভাষার আকার স্থির করতে লাগলেন–এই ধারণাটিই প্রচলিত। কার্যত এটা সম্পূর্ণ ভুল একটি ধারণা। উনিশ শতকের শেষ ৬০ বছরে, মানে ১৯৪০ থেকে সংবাদ-সাময়িকপত্রে যে বাংলা গদ্য তৈরি হচ্ছিল তা তখনকার প্রচলিত ‘প্রমিত বাংলা’ নয়। ‘প্রমিত’ বলতে আমরা বুঝে থাকি মুখের ভাষা ও সেই সুবাদে লেখার ভাষাও। যে গদ্যভাষা বাংলায় উনিশ শতক জুড়ে তৈরি হয়েছে তা সাধুভাষা। মুখের অধিক প্রচলিত ভাষাকে যদি প্রমিত ভাষা হিসেবে ধরে নিইও তার লিখিত রূপে অনিবার্য কিছু পরিবর্তনসহ, এবং যদি সেই ভাষাকেই লেখার বা বলার ভাষা বলে মেনে নিই, তা হলে সাধুভাষাকেই বাংলার প্রমিত ভাষা বলে মানতে হয়। উনিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’, সত্তরের দশকে রবীন্দ্রনাথের ‘য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র’ এবং স্বামী বিবেকানন্দ’র কিছু রচনা কথ্যভাষায় লেখা হলেও সেই ভাষা কিন্তু তখনকার আদর্শ অনুযায়ী ‘প্রমিত বাংলা’ হিসেবে গ্রাহ্য হয়নি। বিস্ময়করভাবে লক্ষনীয়, স্যার উইলিয়াম কেরির এই ভাষা গ্রাহ্য হলো এবং টিকেও গেল। এইখানে যতটা না বাংলাভাষার সহজিকরণের প্রয়াস, তার চেয়ে বেশী রয়েছে সাহেবিকরণের রাজনীতি।

বস্তুত কোনো ভাষার একটা ‘প্রমিত’ রূপের ধারণাটাই ইউরোপীয় দেশগুলোর কলোনি-বিস্তারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষত ইংরেজির সঙ্গে। ইংরেজির আগ্রাসনমুক্ত কোনো ভাষায়ই স্ট্যান্ডার্ডের প্রচলন নেই। আরবরা তাদের বহুভাষা এবং তুলনামূলক কম প্রচলিত ভাষা নিয়েও মনের কোথাও এক গোপন গর্ব পুষে রাখে। অন্যকে জানাতে আগ্রহ বোধ করে। কিন্তু ইংরেজিতে ‘স্ট্যান্ডার্ড ইংলিশ’ ধারণা ও ব্যবহার খুবই চলে। ইংরেজি অনুগত ভাষাতেও তার প্রচলন করা হয়েছে। সুতরাং উইলিয়াম কেরিদের জন্য নিরংকুশ ভালবাসা আরেক তুলাদণ্ডে উত্তোলনের দাবি রাখে।

আগের সংবাদ‘জাতীয়তার চেয়ে জাতিসত্তার পরিচয় বড় : মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি নয়’
পরবর্তি সংবাদপ্রশ্নফাঁসের অভিযোগে দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা বাতিল, পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন হাইয়াতুল উলইয়ার