মুজাহিদুল ইসলাম:
যুগে যুগে সকল সভ্যতা নদী ও সমুদ্রকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। পৃথিবীজুড়ে আদর্শ, প্রভাব ও জয়-পরাজয়ের মানদণ্ড নির্ধারিত হয়ে আসছে সমুদ্রে আধ্যিপত্যের মাত্রানুসারে। চতুর্দশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত উসমানী খিলাফত প্রতিষ্ঠার চব্বিশ বছর পর সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা ও বিস্তৃতি কল্পে ১৩২৩ সালে সুলতান গাজীর তত্ত্বাবধানে নৌবাহিনী গঠন করা হয়। এ শতাব্দীর শেষ দশকে তুরস্কের গালিপলি দ্বীপ হতে অবিবাহিত যুবকদের নিয়ে বিশেষ নৌশক্তি গঠিত হয়। এ দ্বীপের মানুষ সম্পর্কে উসমানী সালতানাতের প্রধান মুফতি বলেন, ‘সমুদ্রে এরা কচ্ছপের মতো বাস করে। নৌকা এদের পরিবার। সমুদ্র আর জাহাজ রাতদিন তাদের হুমকি দেয়।’
আরও পড়ুন : মুসলিম সভ্যতায় নৌবাণিজ্য: সমর ও অর্থনীতিতে সমুদ্র জয়ের ভূমিকা
তবে এ নৌশক্তি তৎকালীন ভ্যানিসের শক্তির তুলনায় যথেষ্ঠ ছিল না। পঞ্চদশ শতাব্দীতে সুলতান মুরাদ বিভিন্ন ধরনের ১৫০টি যুদ্ধ জাহাজের বহর গড়ে তোলেন। পরবর্তী শতাব্দীতে সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ সে নৌবহরের সুফল ভোগ করেন। তার হাতেই রাসূল সা. এর ভবিষ্যৎবাণীর কন্সটান্টিনোপল বিজিত হয়। এ অঞ্চলের মুসলিমরা নিরাপদে এশিয়ার সাথে সরাসরি বাণিজ্যের পথ খুঁজে পায়।
আরও পড়ুন : ইসলামি সভ্যতায় ভূগোলবিদ্যা : সমুদ্র জয়ে মুসলমানদের অবদান
উসমানী খিলাফতের নৌবহর মুসলিমদের জন্য সবচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সুলতান প্রথম সেলিমের সময়। তিনি ইউরোপের আতংক আলজেরিয়ার গভর্নর খায়রুদ্দিনকে আন্দালুসের রাজ্যহারা ও খ্রিস্টানদের গণহত্যার হুমকিতে থাকা নির্যাতিত মুসলিমদের উদ্ধারে নির্দেশ পাঠান। স্পেন, পর্তুগাল ও ইতালির সম্মিলিত বাহিনী সমুদ্রে কড়া নজর রাখার কারণে খুবই সতর্কতার সাথে খায়রুদ্দিনকে স্পেনে যেতে হয়। ক্যাথলিক গির্জার তৈরী করা মাটির নিচের নির্যাতন-কেন্দ্র থেকে রাতারাতিই তিনি মুসলমানদের বের করে আনেন। ১৫২৯ সালে ৩৬ টি জাহাজে পরপর সাতবার মোট ৭০ হাজার মুসলিমকে উদ্ধার করে আলজেরিয়ায় নিরাপদে নিয়ে আসে।
পর্তুগিজরা লোহিত সাগরের তীরবর্তী মুসলমানদেরকে হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি মুসলমানদের পুণ্যভূমি হারামাইন শরীফকে (মক্কা ও মদিনা) ধ্বংস করে দিবে বলেও হুমকি দেয়। তাদের এই হুমকির জবাবে কানুনী সুলতান সুলায়মান ১৫৩৮ সালে তার মিশরের গভর্নর হাদিম সুলায়মানকে পাঠান তাদের এই দুঃসাহসকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য। অতীতে ভারতীয় মুসলমানদেরকে হুমকি প্রদানকারী পর্তুগিজদেরকে উসমানী নৌবাহিনী যেভাবে সালমান রইসের নেতৃত্বে নাস্তানাবুদ করে দিয়েছিল, এবারও তারা হাদিম সুলায়মানের নেতৃত্বে লোহিত সাগরের তীরবর্তী মুসলমানদের এবং হারামাইন শরীফের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ইস্তানবুলে ফিরে আসেন।
সেই সময়ের বিখ্যাত নাবিক বারবারসকে ইস্তানবুলে আমন্ত্রণ করে তাকে খায়রুদ্দিন উপাধিতে ভূষিত করেন সুলতান। এবং খায়রুদ্দিন যেভাবে চায়, সেভাবে যেন জাহাজ নির্মাণ করতে পারে সেজন্য তাকে সকল ধরণের সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়।
সমুদ্রের এই অপরাজেয় উসমানী পরাশক্তিকে নিয়ে তখন ইউরোপের মাথাব্যথার শেষ নেই। স্পেন, পর্তুগাল ও ইতালিসহ সবাই এ শক্তিকে চ্যালেঞ্জ দেয়ার প্রস্ততি নিতে থাকে। কিন্তু আল্লাহর যা ইচ্ছা, তাই বাস্তবায়িত হয়। পাশ্চাত্য এখনো উসমানীদের হাতে পরাজয়ের তিক্ততা ভুলতে পারেনি।
ইউরোপীয় ঐতিহাসিক হার্ভাড ইউনিভার্সিটির প্রাচ্যবিদ উইলফ্রেড ক্যান্টউল বলেন, ‘ইউরোপ এখনো ঐ ভয়ংকর ভীতি ভুলতে পারছে না, পাঁচশ শতাব্দী অব্দি যা তাদের মনে ঘুরেফিরে আসছে। অথচ ইসলাম এখনো তাদের সাথে লড়াই করছে।’ কিভাবে মুসলিম নৌসেনাপতি খায়রুদ্দিন বারবারস স্পেনের অ্যাডমিরাল অ্যান্ডেরা দরিয়া (Andera Doria)’র নেতৃত্বে সম্মিলিত খ্রিস্টান বাহিনীর বিরুদ্ধে ১৫৩৮ সালে প্রিভিজার যুদ্ধে বিজয় লাভ করে, মাত্র পাঁচ ঘন্টায় মুসলিম নৌবাহিনী ইউরোপের ৬০০ জাহাজের বিশাল বহরকে পরাজিত করে। কিভাবে মুসলিম বাহিনী তাদের বহরের কোন-ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া ১৩টি জাহাজকে পুরোপুরি ধংস, ৩৬টি জাহাজ ও ৩ হাজারের নৌসেনা আটক করে এই বিজয় লাভ করে, তা আজও পর্যন্ত ইতিহাসের বিস্ময়!
অন্যদিকে ফ্রান্স জল-স্থলের অপ্রতিরোধ্য শক্তি উসমানী খিলাফতের নিকট স্পেনের বিরুদ্ধে সামরিক সহযোগিতা চায়। উসমানীরাও তাদের অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে ফ্রান্সকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। তৎকালীন মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক উসমানী খলিফা ফ্রান্সকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে যে চিঠি পাঠান, তাতে তৎকালীন মুসলিম শক্তির ভার সহজেই বোঝা যায়। সুলতান সুলায়মান তৎকালীন ফ্রান্সের রাজা ফ্রান্সিসকে দেয়া চিঠির ভাষ্য:
‘আমি, যিনি সুলতানদের সুলতান, রাজার রাজা, বিশ্বের বুকে সমস্ত রাজাদের মুকুটদাতা, পৃথিবীতে আল্লাহর ছায়া, শ্বেতসাগর এবং কৃষ্ণসাগর, রুমেলিয়া( বলকান অঞ্চল), আনাতোলিয়া, কারামানিয়া, রুম ভূখণ্ড, জুলকাদ্রিয়া, দিয়ারবেকির, কুর্দিস্তান, আজরাবাইজান, পারস্য, দামেশক, আলেপ্পো, কায়রো, মাগরিব (উত্তর আফ্রিকা), মক্কা, মদিনা, জেরুজালেম, সারা আরব, ইয়ামান, এবং অন্যান্য দেশ যা আমার পূর্বপুরুষদের (আল্লাহ তাদের কবরকে আলোকিত করুন) বাহুবলে জয় করা ভূখণ্ড এবং আমার বীরত্বের পুরস্কার তাদের মহিমময় আল্লাহর দান করা ভূখণ্ডের সর্বময় কর্তা, আমি সুলতান সুলায়মান খান, সুলতান সেলিম খানের পুত্র, সুলতান বায়েজিদ খানের পৌত্র, তোমার উদ্দেশ্যে, ফ্রান্সের রাজা ফ্রান্সিস।’
সুলতানের আদেশে নৌসেনাপতি খায়রুদ্দিন বারবারস একশত জাহাজ ও ত্রিশ হাজার সৈন্যের বহর নিয়ে স্পেনের হাত থেকে ফ্রান্সের নিস শহর উদ্ধার করেন। এবং ইতালি ও রোমান সৈন্যদের ওপর জয়লাভ করেন। ফ্রান্স নিজেদের প্রতিরক্ষার স্বার্থে উসমানীদের ফ্রান্সের তুলোন শহরে থেকে যাওয়ার আবেদন জানায়। এরপর একাধারে তিন শতাব্দী উসমানী সালতানাত ও ফ্রান্সের ভেতর সুসম্পর্ক ছিলো। কিন্তু নেপোলিয়নের মিসর আক্রম্রণের মাধ্যমে এর সমাপ্তি ঘটে এবং চূড়ান্ত শত্রুতার সম্পর্ক সূচিত হয়।
বহু ধর্ম, বর্ণ এবং ভাষার উসমানী সালতানাতের কর্ণধারদের বিলাসিতা, শিল্প ও ফরাসী বিপ্লবের ধাক্কা, বলকান অঞ্চলে ইউরোপ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অটোমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং বহিঃশক্তির সংস্কারের চাপ অটোমানদের হাপিয়ে তুলে। আবার বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তরুণ তুর্কিদের জাতীয়তাবাদের তীব্র দাবির প্রেক্ষাপটে প্রতিকীভাবে অটোমান সালতানাত অবশিষ্ট থাকে। আর ইউরোপ থেকে মুসলিম অটোমান বিতাড়িত করার ৫০০ বছরের লালিত স্বপ্নতো তৎকালীন পরাশক্তিদের ছিলই!
এমন সময়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠে, অটোমান সাম্রাজ্য জার্মানির সাথে সন্ধি চুক্তি করে। এবং নির্দিষ্ট সময়ে যুদ্ধে যোগ দিয়ে পরাজিত হয়। যুদ্ধের মাঝেই অটোমানের আরব অঞ্চলগুলো বিদ্রোহ করে বসে। এবং সবশেষে পরাজিত অটোমান তাদের সাম্রাজ্য সম্পুর্ণভাবে হারায়। অটোমান শাসিত অঞ্চল দখল করে নেয় ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ বিজয়ী শক্তি। আর এভাবেই সমুদ্রচারী এই মুসলিম শক্তি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।
