ঊনিশের ইসলামি আন্দোলন : গুরুত্বপূর্ণ ১০ দাবি

ঊনিশের ইসলামি আন্দোলন : গুরুত্বপূর্ণ ১০ দাবি

রাগিব রব্বানি:

ঘটনা বহুল ২০১৯ বিদায় নিচ্ছে, শুরু হচ্ছে নতুন বছর। ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের পুরো সময়টাতেই রাজনৈতিক স্থবিরতা বিরাজমান ছিল। ১৮ সালের একদম শেষ দিকে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন বিমূঢ় করে তুলেছিল দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে। সেই বিমূঢ়তা বছরের শেষ অবধিও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এই তুলনায় ইসলামি আন্দোলন-সংগ্রামের ময়দান ২০১৯-এ বেশ সরব ছিল বলা চলে। বছরের শুরু থেকে নানা সময়ে নানাভাবে এ দেশের ইসলামি মূল্যবোধ ও মুসলিম সমাজের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আঘাত এসেছে। আঘাতের মুকাবেলায় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, মিছিল ও বিক্ষোভও প্রদর্শিত হয়েছে। তবে একটি ঘটনা বাদ দিলে আঘাতগুলো সরাসরি সরকারের তরফ থেকে আসেনি, এসেছে ইসলাম-বিদ্বেষী পক্ষগুলোর তরফ থেকে। এইসব আঘাতের যথাযথ প্রতিক্রিয়াও এসেছে আলেম নেতৃত্বের পক্ষ থেকে। এসেছে নানা দাবি-দাওয়াও। এগুলোর মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি দাবি আমরা দেখে নেবো এক নজরে।

১. টঙ্গী হামলায় সাদপন্থীদের বিচার দাবি

বছরের শুরুই হয়েছিল তাবলিগ সংকট নিয়ে। আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১ ডিসেম্বর টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে ইজতেমার মাঠ প্রস্তুতির কাজে অবস্থানরত আলেম, ছাত্র ও সাধারণ তাবলিগিদের ওপর সাদপন্থী তাবলিগিদের ন্যাক্কারজনক হামলার প্রতিবাদে পুরো দেশই উত্তাল হয়ে উঠেছিল। শীর্ষ আলেমদের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছিল, সাদপন্থী নেতা ওয়াসিফুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন নাসিম গংসহ হামলার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

১ ডিসেম্বরের হামলার প্রেক্ষিতে একই সঙ্গে দাবি জানানো হয়েছিল সাদপন্থী নেতা, যাদের ইন্ধনে টঙ্গী হামলা সংঘটিত হয়েছিল, সৈয়দ ওয়াসিফুল আমিন, শাহাবুদ্দিন নাসিমসহ কাকরাইলের নেতা পর্যায়ের সাদপন্থী মুকিমদেরকে কাকরাইল থেকে স্থায়ীভাবে বহিস্কার করতে হবে।

শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম এ দাবিও জানিয়েছিলেন যে তাবলিগের মূল সাথিরা (শুরাপন্থী) ওলামায়ে কেরামের সঙ্গে আছেন, সিংহভাগ তাবলিগিও আছেন তাঁদের সাথে, আর তাবলিগ যুগ যুগ ধরে ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হয়ে আসছে, অতএব ইজতেমা আয়োজনের দায়-দায়িত্ব শুরাপন্থী তাবলিগিদের হাতে হস্তান্তর করতে হবে।

তাবলিগের এই সংকট নিরসনে বছর দুয়েক আগ থেকেই সরকার পক্ষ জড়িত ছিল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে দফায় বৈঠকও হয়েছে তাবলিগের দুপক্ষের সঙ্গে, তাই এই দাবিগুলো সরকারের কাছেই করা হয়েছিল। ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের কারণে বেশ কিছুদিন এই আলাপ স্থগিত থাকে। নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ পুনরায় সরকার গঠন করলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ধর্ম মন্ত্রণালয়ও জড়িত হয়। সরকার পক্ষ দফায় দফায় বিবাদমান উভয় পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে। শেষমেষ এই ৩ দাবিকে এক পাশে রেখে উভয় পক্ষের মধ্যে শর্তের ভিত্তিতে ইজতেমার কাজ ভাগ করে দেয়। দাবি দাবির জায়গায়ই পড়ে থাকে। নানাদিক বিবেচনায় উলামায়ে কেরাম সরকার পক্ষের এই সন্ধি মেনে নিতে বাধ্য হন।

২. মেননের উস্কানিমূলক বক্তব্য, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি

৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ওয়ার্কাস পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ইসলামি অনুশাসনকে ‘মোল্লাতন্ত্র’ আখ্যা, মাদরাসাশিক্ষাকে বিষবৃক্ষের সাথে তুলনা এবং আল্লামা শাহ আহমদ শফীসহ আলেম সমাজকে কটাক্ষ করে বক্তব্য প্রদান করে। এই বক্তব্যের প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলামসহ দেশের ধর্মীয় অঙ্গন দফায় বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ মিছিল করে। আলেম সমাজের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়, মেননের ধৃষ্টতাপূর্ণ এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তাঁর সংসদ সদস্য পদ যেন বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত করার অপরাধে তাঁকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিও ওঠে।

১১ মার্চ জাতীয় সংসদে মেননের ওই বক্তব্যকে উস্কানিমূলক আখ্যায়িত করে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সরকার দলীয় এমপি ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নিজামুদ্দিন নদভি এই বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান স্পিকারের কাছে। একই সঙ্গে তিনি এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদও জানান। তার আগের দিন ঢাকা-৬ আসন থেকে নির্বাচিত জাতীয় পার্টির এমপি কাজী ফিরোজ রশীদও সংসদ অধিবেশনে একই দাবি জানান স্পিকারের কাছে।

কিন্তু মেননের এই বক্তব্য ইস্যুতে সরকার শেষমেশ কোনো সাড়াই দেয়নি। ওলামায়ে কেরামের দাবি যেমন অপূরণীয় থাকে, তেম্নি দুই এমপি’র এক্সপাঞ্জের দাবিও থেকে যায় উপেক্ষিত।

৩. পঞ্চগড়ের কাদিয়ানি ইজতেমা বন্ধের দাবি

ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে হঠাৎ করেই জানা যায়, পঞ্চগড়ে কাদিয়ানি সম্প্রদায় ‘ইজতেমা নাম দিয়ে ২৩, ২৪ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে যাচ্ছে। ওলামায়ে কেরাম ইজতেমা নাম দিয়ে এরকম অনুষ্ঠান করার তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁরা বলেন, কাদিয়ানিরা অমুসলিম, মুসলমানদের কোনো পরিভাষা ব্যবহার করে তারা কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারবে না, এতে সাধারণ মুসলিমরা বিভ্রান্তিতে পড়বেন।

পঞ্চগড়ের স্থানীয় ওলামায়ে কেরাম প্রথমে এ ইজতেমা বন্ধের প্রতিবাদে মিছিল ও বিক্ষোভ করেন। পরে ৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতেও সম্মিলিত খতমে নবুওত পরিষদের ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল করেন শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম। ওলামায়ে কেরাম স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আহ্বান জানান এ ইজতেমা যাতে না হয় সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। কিন্তু প্রশাসন এ ব্যাপারে কোনো কর্ণপাত করেনি। অবশেষে ১২ ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড়ে স্থানীয় তৌহিদি জনতা ও ওলামায়ে কেরামের সমন্বয়ে আবারও বিক্ষোভ মিছিল হলে সেখানে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাঁধে। সংঘর্ষে অর্ধ শতাধিক মুসল্লি আহত হন। এরই প্রেক্ষিতে প্রশাসন তৌহিদি জনতার দাবি মেনে নেয় এবং জানায় পঞ্চগড়ে ইজতেমার নাম দিয়ে কাদিয়ানিদের সেই অনুষ্ঠান তারা হতে দেবে না।

৪. কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা

কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবি অনেক পুরনো। পঞ্চগড়ের ওই ইস্যুর সূত্র ধরে দাবিটি জোরালোভাবে আবারও সামনে আসে। প্রায় পুরো বছর জুড়েই এই দাবিটি আলোচনায় রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় খতমে নবুওত ও শানে রেসালত সম্মেলনে আল্লামা শাহ আহমদ শফী, আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম এ দাবি জানাচ্ছেন সরকারের কাছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে খতমে নবুওত আন্দোলনের নেতারা দাবি আদায়ের জন্য মিটিংও করেছেন।

সর্বশেষ চলতি মাসে বেফাকের সহসভাপতি আল্লামা আশরাফ আলী অসুস্থ হয়ে হসপিটালে ভর্তি হলে তাঁকে দেখতে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। সেসময় হসপিটালের বেডে শুয়ে আল্লামা আশরাফ আলী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করেন কাদিয়ানিদের যেন অমুসলিম ঘোষণা করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন তাঁকে আশ্বস্ত করে জানান, তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একান্তভাবে বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করবেন।

৫. পাঠ্যপুস্তক থেকে বিবর্তনবাদের পাঠ বাদ দিতে হবে

জাতীয় শিক্ষাধারার চলতি পাঠ্যক্রমে নবম-দশম শ্রেণি থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত বিবর্তনবাদের পাঠ অন্তর্ভুক্ত করায় জুলাই মাসে ওলামায়ে কেরামের তরফ থেকে তীব্র প্রতিবাদ আসে। বিবর্তনবাদকে কুফরি মতবাদ আখ্যা দিয়ে তাঁরা দাবি জানান, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের দেশে পাঠ্যপুস্তকে কুফরি মতবাদের পাঠ কোনোভাবেই থাকতে পারে না। তাই অবিলম্বে বিবর্তনবাদের পাঠগুলো পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দিতে হবে।

৯ জুলাই জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কাউন্সিল অধিবেশন থেকে এবং ১৮ জুলাই বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের একটি প্রোগ্রাম থেকে এ দাবি জানান যথাক্রমে আল্লামা নুর হোসাইন কাসিমি ও মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জি। এরপরে বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও মাহফিলের মঞ্চ থেকেও সর্বস্তরের ওলামায়ে কেরাম এই দাবিকে জোরালো করেন। কিন্তু জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে নীরব। আলেমদের এ দাবির ব্যাপারে এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

৬. সম্প্রীতি বাংলাদেশের ইসলাম-বিদ্বেষ: পিযূষ বন্দোপাধ্যায়ের শাস্তি দাবি

মে মাসের শুরুর দিকে সম্প্রীতি বাংলাদেশ নামের একটি এনজিও সংগঠন সন্দেহভাজন জঙ্গিসদস্য সনাক্তকরণের নিয়ামকসমূহ শিরোনামে জাতীয় দৈনিকগুলোতে একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। জঙ্গিসদস্য সনাক্তকরণের আলামত হিসেবে এ বিজ্ঞাপনে এমন সব বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি ঘটায়, যা এ দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের দৈনন্দিন আমল ও বিশ্বাসের অপরিহার্য অংশ।

সম্প্রীতি বাংলাদেশের এ বিজ্ঞাপন প্রকাশের পর ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ থেকে নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গ। হেফাজতে ইসলামসহ ইসলামি দলগুলো বিভিন্নভাবে বিক্ষোভ করে। সম্প্রীতি বাংলাদেশের প্রধান পিযূষ বন্দোপাধ্যায়কে ধর্ম অবমাননা ও ইসলাম-বিদ্বেষ ছড়ানোর দায়ে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাবার দাবি ওঠে এসব বিক্ষোভ থেকে। ১৭ মে ইসলামী ঐক্যজোট এ দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে।

অবশেষে ১৬ মে পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ তাদের নামে প্রচারিত ইসলামবিদ্বেষী বিজ্ঞাপনের কথা অস্বীকার করে জাতীয় দৈনিকে পাল্টা বিজ্ঞাপন দেয়। পাশাপাশি সাংবাদিক সম্মেলন করে তারা এই বিজ্ঞাপনের দায় অস্বীকার করে বলে, এর সাথে তাদের কোনো রকমের সংশ্লিষ্টতা নেই।

ফলে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ এখানেই স্থিমিত হয়ে যায়।

৭. গুম ও কারাগারে বন্দী আলেমদের নিঃশর্ত ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি

চলতি বছরে দেশের নানা জায়গায় বেশ কয়েকজন আলেমকে গুম করা হয়েছে। তাদের অনেককে গুম করার বেশ কিছুদিন পর জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। অনেকের খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি। এই প্রেক্ষিতে গত মাসে আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী পৃথক বিবৃতি প্রদান এবং একাধিক মাহফিলে বয়ানের মধ্যে সরকারের কাছে দাবি জানান, আলেমদেরকে গুম করার ভয়ানক প্রক্রিয়া যেন বন্ধ করার ব্যাপারে সরকার যেন উদ্যোগী হয়। পাশাপাশি যে সমস্ত আলেমকে জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদেরকে যেন নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হয়। কারণ, তাঁরা প্রত্যেকেই কওমি মাদরাসার শিক্ষক। আর কওমি মাদরাসায় এ ধরনের কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হয় না।

সরকারের তরফ থেকে এই দাবির ব্যাপারে এখনও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। গ্রেপ্তার আলেমদের মুক্তির ব্যাপারেও কোনো কথা বলেনি প্রশাসন।

৮. ভোলা হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি

২০ অক্টোবর ভোলার বুরহানুদ্দিন উপজেলায় এক হিন্দু যুবকের ফেসবুক আইডি থেকে ইসলাম ও নবিজিকে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদে স্থানীয় তৌহিদি জনতার সমাবেশে পুলিশ নির্বিচার গুলি চালিয়েছিল। এতে কিশোর মাদরাসাছাত্রসহ ৪ মুসল্লি নির্মমভাবে শাহাদত বরণ করেছিলেন। আহত হয়েছিলেন আরও শতাধিক। এই ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। হেফাজতে ইসলামসহ সকল ইসলামি রাজনৈতিক দল এই হত্যাকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছিল। দাবিতে ছিল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাবার কথাও। কিন্তু দাবির দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে প্রশাসন আরও খড়গহস্ত হয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে ভোলার সব আন্দোলন-সংগ্রাম। বেনামি মামলা দিয়েছে ২০ তারিখের সমাবেশে অংশগ্রহণকারী ৫ হাজার লোকের বিরুদ্ধে।

৯. ব্লাসফেমি আইন

ভোলা হত্যাকাণ্ডের পর ব্লাসফেমি আইনের পুরনো দাবি আবারও সামনে চলে আসে। হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী বিক্ষোভ সমাবেশগুলোতে হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবির পাশাপাশি পুরনো এই দাবিটিও তোলা হয়। ইসলাম ও মহানবিকে নিয়ে কটাক্ষকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে সংসদে আইন পাশের জোর দাবি জানানো হয়। বিভিন্ন মাহফিল ও সমাবেশেও ওয়ায়েজিন ওলামায়ে কেরাম জোরালোভাবে এই দাবি সামনে নিয়ে আসেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এ দাবির ব্যাপারে এখনও কোনো সাড়া লক্ষ্য করা যায়নি।

১০. যমুনা টিভির ক্ষমা প্রার্থনা

নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টিভির একটি প্রতিবেদনে শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হককে জঙ্গিনেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ১ ডিসেম্বর ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর এ নিয়ে একটা রিপোর্ট প্রকাশ করলে ধর্মীয় অঙ্গনে তুমুল ক্ষোভ দেখা দেয়। ২ ও ৩ ডিসেম্বর দেশের বিভিন্ন স্থানে যমুনা টিভির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। ৪ ডিসেম্বর পুরানা পল্টনে শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম সংবাদ সম্মেলন করে দাবি জানান, যমুনা টিভিকে এই মিথ্যাচারের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে, অন্যথায় দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ওলামায়ে কেরামের এই দাবির একদিনের মাথায় ৫ ডিসেম্বর বিকালে এই ঘটনার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা-পূর্বক আনুষ্ঠানিক দুঃখপ্রকাশ করে যমুনা টিভি কর্তৃপক্ষ। যমুনা টিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক ফাহিম আহমদ পুরানা পল্টনস্থ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কার্যালয়ে এসে শায়খুল হাদীসের দুই ছেলে মুফতী মাহফুজুল হক ও মাওলানা মামুনুল হকসহ মজলিসের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে দেশবাসীর কাছে দুঃখপ্রকাশ করেন। যমুনা টিভির সন্ধ্যার খবরে দুঃখপ্রকাশের এই চিত্র প্রচারিত হয়।

আগের সংবাদ‘মাউতুল আলম’ : এ বছর যে আলেমরা গত হয়েছেন
পরবর্তি সংবাদফিরে দেখা বছর : ঊনিশের দশ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা