কওমি মাদরাসা আধুনিকায়নের খসড়া প্রস্তাবে কী আছে?

হামমাদ রাগিব

বাংলাদেশের বৃহত্তম কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়াহ কওমি মাদরাসার নেসাবে তালিমকে (শিক্ষা সিলেবাস) যুগোপযোগী, মানসম্মত ও আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে একটি খসড়া প্রস্তাবনা তৈরি করেছে। গতকাল (২৭ জুলাই, শনিবার) রাজধানীর ফরিদাবাদ মাদরাসায় বোর্ডটির চেয়ারম্যান আল্লামা শাহ আহমদ শফীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মজলিসে শুরার বৈঠকে এ প্রস্তাবনার ওপর আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজন পূর্বক পরবর্তী বৈঠকে এ প্রস্তাবনা পাশ করা হবে।

কী আছে খসড়া প্রস্তাবনায়?

কওমি মাদরাসার ৬ স্তর বিশিষ্ট বর্তমান ১২/১৩ বছর মেয়াদী সিলেবাসকে আংশিক পরিবর্তন-পরিবর্ধনের মাধ্যমে পুরুষদের জন্য ১৬ বছর মেয়াদী করার প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে এই খসড়ায়। তবে মুতাওয়াসসিতাহ মারহালার (নিম্ন মাধ্যমিক) প্রথম বর্ষ (৬ষ্ঠ শ্রেণি, খুসুসি জামাত) স্কুল থেকে ৫ম শ্রেণি পাশ করা বা হিফজ-ফারেগ ছাত্রদের জন্য বিশেষায়িত করা হয়েছে। সাধারণ ও নিয়মিত ছাত্রদেরকে এ ক্লাস পড়তে হবে না। ফলে সিলেবাস ১৬ বছরের হলেও সাধারণ ও নিয়মিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাকাল থাকছে মোট ১৫ বছর।

এদিকে মেয়েদের জন্য কেবল বোর্ডপরীক্ষার জামাতগুলোর পরিমার্জিত পাঠ্যতালিকার বিবরণ আছে খসড়ায়, নেই তাদের শিক্ষাকালের মেয়াদ নিয়ে বিস্তারিত কোনো রূপরেখা।

পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্য পূর্বের মতো ইবতিদাইয়্যাহ মারহালা (প্রাথমিক স্তর) পাঁচ বছর মেয়াদী, মুতাওয়াসসিতাহ মারহালা (নিম্ন মাধ্যমিক; খুসুসি, মিজান, নাহবেমির) তিন বছর মেয়াদী এবং সানাবিয়্যাহ আম্মাহ মারহালা (মাধ্যমিক; হেদায়াতুননাহু, কাফিয়া) দুই বছর মেয়াদী রাখা হয়েছে।

তবে শরহে জামি জামাতকে কাফিয়া জামাত থেকে আলাদা করে শরহে জামি ও শরহে বেকায়া—এ দুটো জামাতকে দুই বছর মেয়াদী সানাবিয়্যাহ খাসসাহ মারহালার (উচ্চ মাধ্যমিক) মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

জালালাইন ও মেশকাত জামাতের মাঝে নতুন একটি জামাত খুলে ফজিলত মারহালাকে (স্নাতক) দুই বছরের পরিবর্তে তিন বছর মেয়াদী করা হয়েছে। এবং মারাহালাতুত তাকমিলকে (মাস্টার্স; দাওরায়ে হাদিস) পূর্বের মতো একবছর মেয়াদীই রাখা হয়েছে।

ইবতেদাইয়্যাহ (প্রাথমিক) মারহালায় নতুন প্রস্তাবনা

ইবতিদাইয়্যাহ মারহালার সর্বোচ্চ ক্লাস ৫ম শ্রেণির সিলেবাসে খানিকটা পরিবর্তন আনা হয়েছে প্রস্তাবনায়। উর্দু কি তেসরি কিতাবের সঙ্গে যোগ করা হয়েছে আসান কাওয়ায়েদে উর্দু। ইংরেজি ও ফারসি উভয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে মেয়েদের বেলায় এ বাধ্যবাধকতার উল্লেখ নেই। ইতিহাস, ভূগোল ও ইংরেজির সিলেবাস কমানো হয়েছে। এ ছাড়া বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এ মারহালার পরীক্ষায় মোট মার্ক ৭০০ থেকে বাড়িয়ে ৮০০ করা হয়েছে।

মুতাওয়াসসিতাহ ৩য় বর্ষের জন্য (নাহবেমির) নতুন প্রস্তাবনা

মুতাওয়াসসিতাহ ৩য় বর্ষকে ৮ম শ্রেণির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এ প্রস্তাবনায়। জামাতের মূল কিতাব নাহবেমিরের সঙ্গে খোলাসা, তাতিম্মা, জুমাল যোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাকে বাধ্যতামূলক করে ফারসি ও ইংরেজির ওপর খেয়ার রাখা হয়েছে। তবে মেয়েদের জন্য ফারসির পরিবর্তে খেয়ার দেওয়া হয়েছে ইংরেজি ও উর্দুর মধ্যে।

সানাবিয়্যাহ আম্মাহ ২য় বর্ষে (কাফিয়া) বোর্ডপরীক্ষা প্রবর্তন

সানাবিয়্যাহ আম্মাহ মারহালার ২য় বর্ষ (কাফিয়া জামাত)-কে শরহে জামি থেকে পৃথক করে একে দশম শ্রেণির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এবং এ জামাতে ছেলেদের জন্য বোর্ডপরীক্ষা প্রবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বাংলা, ইংরেজি এবং শরহে জামির ফে’ল ও হরফ অধ্যায় সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বোর্ড পরীক্ষায় এসবের পরীক্ষা নেওয়া হবে না।

সানাবিয়্যাহ খাসসাহ দ্বিতীয় বর্ষের (শরহে বেকায়া) জন্য নতুন প্রস্তাবনা

সানাবিয়্যাহ খাসসাহ ২য় বর্ষকে (শরহে বেকায়া) এইচএসসি/আলিম সমমর্যাদায় ধরে পূর্বের মতো বোর্ডপরীক্ষা গ্রহণ করা হবে। তবে সিলেবাসে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। কুরআন তরজমা ১ থেকে ১৫ পারার বদলে ১২ পারায় নিয়ে আসা হয়েছে। আরবি সাহিত্য বিষয়ে আত-তরিক ইলাল ইনশা কিতাবের বদলে মুআল্লিমুল ইনশা ৩য় খণ্ড নেসাবভুক্ত করা হয়েছে। ছেলে ও মেয়ে উভয় ধারার শিক্ষার্থীদের জন্য এ পরিবর্তন দুটো প্রযোজ্য।

যোগ করা হয়েছে হাদিসের পাঠও। হাদিস বিষয়ে কিতাব নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আসারুস সুনান’ (নিমুভি)। ছেলেদের ক্ষেত্রে এ কিতাবের পূর্ণপাঠের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক ৫০ হাদিস মুখস্থ করা লাগবে আর মেয়েদের জন্য আসারুস সুনান পূর্ণ কিতাবের পাশাপাশি ইসলামি আকিদা বিষয়ে ‘রদ্দে ফেরাকে বাতেলা’ যোগ করা হয়েছে। হাদিস ও আকায়েদ মিলিয়ে বোর্ডপরীক্ষায় ১০০ মার্কের পরীক্ষা হবে তাদের।

ছেলেদের ক্ষেত্রে সিরাজি কিতাব মুনাসাখা-এর পূর্ব পর্যন্ত থেকে পরিবর্তন করে পূর্ণ কিতাব নেসাবের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

জালালাইন ও মেশকাতের মাঝখানে নতুন জামাতের রূপরেখা

ফজিলত মারহালার মেয়াদ দুই বছর থেকে তিন বছরে উন্নীত করে জালালাইন ও মেশকাতের মাঝখানে নতুন একটি জামাত খোলার প্রস্তাব রয়েছে খসড়ায়। তাফসির, উসুলে তাফসির, হাদিস, উসুলে হাদিস, আরবি সাহিত্য, উসুলে ফেকাহ, ফালসাফা এবং ইলমে হাইয়্যাত—এই মোট আটটি বিষয়ে পাঠদান করা হবে এ জামাতে।

তাফসির বিষয়ে আল্লামা সাবুনি লিখিত সফওয়াতুত তাফাসির, উসুলে তাফসির বিষয়ে সালাহউদ্দিন আরকাদান লিখিত মুখতাসারুল ইতকান ফি উলুমিল কুরআন, হাদিস বিষয়ে রিয়াজুস সালিহিন, উসুলে হাদিস বিষয়ে মাহমুদ তাহহানের তাইসিরু মুসতালাহিল হাদিস, আরবি সাহিত্য বিষয়ে মুখতারাত ও সাবয়ে মুয়াল্লাকাতের দুই মুয়াল্লাকা, উসুলে ফিকহ বিষয়ে মুসাল্লামুস সুবুত ও তাওজিহ, ফালসাফা বিষয়ে মাবাদিউল ফালসাফা ও মায়বুজি এবং ইলমে হাইআত বিষয়ে মাওলানা মুসা খান বাজি লিখিত আল ফালাকিয়াতুল জাদিদাহ কিতাব পাঠদান করা হবে।

ফজিলত ৩য় বর্ষের (মেশকাত) জন্য নতুন প্রস্তাবনা

এ জামাতের বোর্ডপরীক্ষায় তাহরিকে দারুল উলুম দেওবন্দ ও রদ্দে ফেরাকে বাতেলা—এ দুটি কিতাব মিলিয়ে ১০০ নম্বর এবং শরহে আকায়েদে স্বতন্ত্রভাবে ১০০ নম্বর থাকবে। হাটহাজারী ও তদসংশ্লিষ্ট মাদরাসাসমূহের জন্য বায়জাবি শরিফ এবং তাহরিকে দেওবন্দ ও রদ্দে ফেরাকে বাতেলার বদলে তাফসিরে জালালাইন ১ম ও ২য় খণ্ড পরীক্ষা হবে। এ জামাতে মেয়েদের নেসাবে কোনো রদবদলের উল্লেখ নেই। অনুরূপ দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষাও পূর্বের নেসাবে হবে।

আগের সংবাদইসরায়েলকে যারাই সমর্থন দেবে তুরস্ক তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে
পরবর্তি সংবাদকাশ্মীরে নতুন করে আরও ১০ হাজার ভারতীয় সেনা মোতায়েন