করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় ডিএমপির নতুন ‘রোড ম্যাপ’

ফাতেহ ডেস্ক:

দরজায় কড়া নাড়ছে শীত। যদিও অন্য বছরের তুলনায় এবারের শীত মৌসুম শুরু হচ্ছে করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানার আতঙ্ক নিয়ে। বাংলাদেশে মাঝখানে মহামারী পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এখন আবার বাড়তে শুরু করেছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা। জনসাধারণের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার অনীহাসহ নানা কারণে এই পরিস্থিতি শীতে আরও খারাপ আকার ধারণ করতে পারে বলে বারবার হুশিয়ার করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে করোনার সম্ভাব্য দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার।

প্রথম ঢেউয়ের ভুলত্রুটি বিশ্লেষণ করে প্রণয়ন করা হচ্ছে নতুন কর্মপরিকল্পনা। সব বিভাগকে বলা হয়েছে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণের। এরই অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যা বাস্তবায়নে হার্ডলাইনে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ নীতিসহ আরও কার্যক্রম। এ উদ্যোগে সাড়া দিয়ে করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় নতুন ‘রোড ম্যাপ’ প্রস্তুত করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

ডিএমপি সূত্র জানায়, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা প্রস্তুতি কার্যক্রমকে আরও ত্বরান্বিত করতে বাহিনীর বিভিন্ন বিভাগ ও ইউনিটকে উত্তর ও দক্ষিণ অংশে ভাগ করা হয়েছে। উত্তর অংশে রয়েছে- পিওএম পুলিশ লাইন্সের ব্যারাক, ট্রাফিক (উত্তরা, গুলশান, মিরপুর, তেজগাঁও) অপরাধ বিভাগের মধ্যে গুলশান, মিরপুর, তেজগাঁও, ডিপ্লোমেটিক সিকিউরিটি বিভাগ।

আর দক্ষিণ অংশে রয়েছে- রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স ব্যারাক, ট্রাফিক (রমনা, মতিঝিল, ওয়ারী, লালবাগ) অপরাধ বিভাগের মধ্যে রমনা, মতিঝিল, ওয়ারী, লালবাগ, প্রটেকশন, ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্স, ডিবি-সব, সিটি-সব বিভাগ। ফোকাল পয়েন্টে নিযুক্ত করা হয়েছে বিভিন্ন ইউনিট-বিভাগের ৩৫ জন কর্মকর্তাকে। সর্বক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট ১৩ নির্দেশনা মানতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ফোকাল পয়েন্টে নিযুক্ত কর্মকর্তাদের। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর এ পর্যন্ত ডিএমপির ২৪ জন সদস্য এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ডিএমপি সদর দপ্তরে আয়োজিত আসন্ন শীতে করোনা ভাইরাসের অধিকতর সংক্রমণ রোধকল্পে ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক আলোচনাসভায় এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ সময় ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা নিয়োগ ও তাদের দায়িত্ববণ্টন, আবাসন, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসাসেবা, খাবার ব্যবস্থাপনাসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। আলোচনায় সভাপতির বক্তব্যে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অ্যাডমিন) মীর রেজাউল আলম করোনার দ্বিতীয় ঢেউকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, এখন থেকে মাস্ক পরা ও হাত ধোয়ার মতো অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি সবাইকে কঠোরভাবে মানতে হবে। অবশ্যই দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে ফোকাল পয়েন্টে নিযুক্ত কর্মকর্তাদের। কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে তাদের যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করতে হবে।

সভা সূত্রে জানা গেছে, আলোচনায় ১৫টি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। সেগুলো হলো- ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তাদের কার্যপরিধি বণ্টন, কোয়ারেন্টিন সেন্টার তত্ত্বাবধায়ন ও তথ্য সংগ্রহের জন্য কমিটি গঠন এবং বিভাগ/ইউনিটগুলোকে দুই ভাগে বিভক্তকরণ (উত্তর অংশ ও দক্ষিণ অংশ), কোভিড-১৯ আক্রান্ত পুলিশ ও নন-পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, খাবার ব্যবস্থাপনা. আবাসন ব্যবস্থাপনা (ব্যারাকসমূহ), বিকল্প আবাসন ব্যবস্থাপনা (স্কুল, কলেজ, অডিটরিয়াম, হোটেল ইত্যাদি), আক্রান্ত ও কোয়ারেন্টিনে অবস্থানরতদের তথ্য সংরক্ষণ ও প্রেরণ, সেন্ট্রাল ডাটাবেজ সংরক্ষণ ও দৈনিক আপডেট, আক্রান্ত পুলিশ ও নন-পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, রিকভারি সেন্টার ব্যবস্থাপনা, ডিসইনফেকট্যান্ট টিম গঠন ও লজিস্টিক সাপোর্ট প্রদান, করোনা পজিটিভ রোগীদের দালিলিক তথ্য সংরক্ষণ ও প্রেরণ, ডিএমপির অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনা, জরুরি প্রয়োজনে করণীয় ইত্যাদি।

সভায় ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তাদের স্ব-স্ব বিভাগ ও ইউনিটের কার্যপরিধির বিষয়ে বলা হয়- কোনো পুলিশ ও নন-পুলিশ সদস্যের জ্বর ও কাশির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট পরিলক্ষিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে ইউনিটের ইনচার্জকে জানাতে হবে। ইউনিট ইনচার্জ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে তাকে চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন করবেন। সন্দেহজনক করোনা আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে পরীক্ষা এবং তাতে পজিটিভ হলে তার চিকিৎসার তদারকি করতে হবে। ছুটি কাটিয়ে আসা প্রত্যেক পুলিশ ও নন-পুলিশ সদস্যের নিশ্চিত করতে হবে কোয়ারেন্টিন। আক্রান্ত পুলিশ ও নন-পুলিশ সদস্য এবং রোগীদের সংস্পর্শে আসা অন্য পুলিশ সদস্যদের যথাযথ সহায়তা প্রদানকল্পে কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।

আক্রান্ত রোগীর স্বাস্থ্যের বিষয়ে হালনাগাদ তথ্যাদির জন্য চিকিৎসকের সঙ্গে রাখতে হবে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ। আক্রান্ত রোগীদের সংস্পর্শে যেসব পুলিশ সদস্য আসবে তাদের নামের তালিকা প্রস্তুত করে এবং তাদের কোয়ারেন্টিন সেন্টারে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। কোয়ারেন্টিনে থাকা রোগীদের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও প্রতিনিধি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে মাস্ক, গ্লাভস ও পিপিই ব্যবহার করে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করবেন।

সন্দেহভাজন রোগীদের সংস্পর্শে আসার ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। আক্রান্ত পুলিশ ও নন-পুলিশ সদস্যদের হাসপাতালে নেওয়া এবং আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা অথবা করোনার উপসর্গ আছে এমন সদস্যদের কোয়ারেন্টিন সেন্টারে আনা-নেওয়া এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং পদ্ধতি (এসওপি) অনুযায়ী ডিএমপির উত্তর অংশের জন্য (উত্তরা, গুলশান, মিরপুর, তেজগাঁও, ট্রাফিক উত্তরা, টাফিক-গুলশান, ট্রাফিক-মিরপুর, ট্রাফিক-তেজগাঁও) উপ-পুলিশ কমিশনার (পিওএম-উত্তর) খোন্দকার নজমুল হাসান এবং দক্ষিণ অংশের জন্য মতিঝিল, রমনা, ওয়ারী, লালবাগ, ট্রাফিক-মতিঝিল, ট্রাফিক রমনা, ট্রাফিক ওয়ারি, ট্রাফিক লালবাগ) উপ-পুলিশ কমিশনার ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ফোর্স) মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন ভূঁঞার সঙ্গে সমন্বয়পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এ বিষয়ে প্রাত্যহিক রিপোর্ট পাঠাতে হবে ডিএমপি কল্যাণ শাখায়। রোগীর সেবা নিশ্চিতে ডিএমপির এডিসি (ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড স্পোর্টস) এবং এসির (ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড স্পোর্টস) সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবেন। নিজ নিজ বিভাগের করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন পুলিশ ও নন-পুলিশ সদস্যদের ফোনের মাধ্যমে খোঁজখবর রাখা এবং বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হলে এডিসি (ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড স্পোর্টস), এবং এসির (ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড স্পোর্টস) সঙ্গে যোগাযোগ করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। ইতোমধ্যে আক্রান্ত রোগীদের তথ্যাদি আদান-প্রদানে ডিএমপি সদর দপ্তরে অতিরিক্ত উপ-কমিশনারের (ইন্টারনাল ওভারসাইট) তত্ত্বাবধানে একটি কন্ট্রোলরুম স্থাপন করা হয়েছে।

এর হটলাইন নম্বরগুলোতে (০১৩২০-০৩৮৬৫২, ০১৩২০-০৩৮৬৫৩, ০১৩২০-০৩৮৬৫৪, ০১৩২০-০৩৮৬৫৫) প্রাপ্ত তথ্যাদির ব্যাপারে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে হবে। অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ইন্টারনাল ওভারসাইট) বিভাগ অনুযায়ী তথ্যাদি সংগ্রহপূর্বক প্রাপ্ত তথ্য সমন্বয় ও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

আগের সংবাদকচুয়ায় নবীজির ব্যাঙ্গচিত্রের প্রতিবাদ মিছিলে হামলা, আহত ৫০
পরবর্তি সংবাদসাবেক এমপিকে গুলি করে হত্যা করেন দ্বিতীয় স্ত্রী