আলিয়া মাদরাসা ও বাংলার মুসলমানদের শিক্ষাচিন্তা

কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা ও বাঙ্গালী মুসলমানদের শিক্ষাচিন্তা

আশরাফ উদ্দীন খান :

বাংলা অঞ্চলের মুসলমানদের শিক্ষাভাবনা ও সচেতনতার ক্রমধারা অনুসন্ধান করলে আমাদের সামনে ব্যবহারিকভাবে বা প্রয়োগিকভাবে দুই ধরণের শিক্ষাভাবনা প্রকাশ পায়। এক. ধর্মীয় শিক্ষাচিন্তা দুই. সাধারণ শিক্ষাচিন্তা। উপরে ‘ব্যবহারিক বা প্রয়োগিকভাবে’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করার উদ্দেশ্য এই দিকে ইঙ্গিত করা যে নীতিগতভাবে বা তাত্ত্বিকভাবে ইলম বা শিক্ষাকে ‘ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষা’ হিসাবে বিভাজনের বিষয়টি আমাদের সাধারণ চিন্তায় বিদ্যমান অবস্থা থেকে যে মূলত ভিন্ন সেই দিকে ইঙ্গিত করা। ধর্মীয় শিক্ষাভাবনা এই অঞ্চলের সাধারণ ধর্মপ্রাণ ও শিক্ষিত মুসলমান শ্রেণীর সাথে ইসলাম ধর্মকে কেন্দ্র করেই জড়িত। দেখা যায় যখনই এই অঞ্চলের অধিবাসীগণ ইসলামের আলোর পরশ পেয়েছেন তখনই এখানে ইসলাম শিক্ষার প্রচার-প্রসারের জন্যে শিক্ষাকেন্দ্র বা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কুরআন শিক্ষার সাথে সাথে ইসলামের মৌলিক বিষয়ের শিক্ষা প্রদান করার উদ্দেশ্যে মক্তব, মাদ্রাসা, খানকাহ গড়ে উঠেছে এই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে। সামনে আমরা এই অঞ্চলের মুসলমানদের শিক্ষার বিষয়ে চিন্তাভাবনা নিয়ে অতি সংক্ষেপে আলোচনা পেশ করবো ইনশা আল্লাহ।

ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা

ভারত উপমহাদেশ ও এই বাংলা অঞ্চলের মুসলমানদের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাদীক্ষা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘ভারতীয় মুসলমানদের অতীত ইতিহাস আলোচনা করলে জানা যায় যে, যখন কোন সন্তানের বয়স চার বৎসর চার মাস ও চার দিন হতো, তখন তার বিদ্যাশিক্ষার সূচনা করা হতো। একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের কিছু অংশ শিশুকে পাঠ করে শুনানো হতো এবং শিশু তা পুনরাবৃত্তি করতো। এ ছিল প্রতিটি মুসলিম পরিবারের অপরিহার্য প্রথা। মিঃ স্মিথ এই ধরণের অনুষ্ঠান ১৮০১ সালে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে স্বচক্ষে দেখেছেন যা তিনি তাঁর ‘চাহার দরবেশ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।’ (বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, পৃঃ ১৪০)

যেখানে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল বেশী, সেখানে প্রাথমিক শিক্ষার জন্যে মক্তব খোলা হতো এবং মুসলিম শিশুরা সেখানে আরবী, ফার্সি ও ইসলামী শিক্ষা লাভ করতো। বিশেষ করে বাংলার সুলতানগণ বিদ্যাশিক্ষার প্রতি অধিকতর অনুরাগী ছিলেন এবং শিক্ষা প্রসারের জন্যে তারা সর্বতোভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতেন। বিদ্যাশিক্ষার জন্যে রাজ্যের বিভিন্নস্থানে প্রভূত পরিমাণ লাখেরাজ ভুসম্পদ দান করা হতো। এমন কোন মসজিদ অথবা ইমামবাড়ী ছিল না যেখানে আরবী ও ফার্সি ভাষার অধ্যাপকগণ অধ্যাপনায় নিয়োজিত ছিলেন না। সম্ভ্রান্ত মুসলিম প্রধানগণ তাদের নিজ নিজ এলাকায় মক্তব, মাদরাসা কায়েম করতেন এবং এসবের ব্যয়ভার বহনের জন্য প্রভূত ধনসম্পদ ও জমিজমা দান করতেন।

মুসলিম শাসনামলে (১২০৩-১৭৫৭) দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যাশিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা জন্যে যেসব অগণিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মক্তব, মাদ্রাসা, কলেজ প্রভৃতি ছিল, তার সঠিক বিবরণ পাওয়া বড়ই দুস্কর। মুসলিম শাসনের অবসানের পর সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রায় বিলুপ্ত হয় যায়। ছিটে ফোঁটা যা বিদ্যমান ছিল তার কিঞ্চিত বিবরণ পাওয়া যায় বুকানন হ্যামিন্টন ও ডাব্লিউ এডাম কর্তৃক প্রণীত শিক্ষা সম্পর্কিত রিপোর্টে যা তারা প্রণয়ন করেন যথাক্রমে ১৮০৭ থেকে ১৮১৪ সালের মধ্যে এবং ১৮৩৫ থেকে ১৮৩৮ সালের মধ্যে।

ডাব্লিউ এডাম বলেন, রাজশাহী জেলার কসবা বাঘাতে বিয়াল্লিশটি গ্রাম দান করা হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনসেবামূলক কাজের জন্যে। কসবা বাঘার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেসব ছাত্র পড়াশুনা করতো তাদের যাবতীয় খরচপত্রাদি, যথা বাসস্থান, আহার, পোশাক-পরিচ্ছদ, কালি-কলম প্রভৃতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বহন করা হতো।

কুরআন-হাদীস ও ইসলামী শিক্ষাদান পুণ্যকাজ বলে বিবেচনা করা হতো এবং প্রায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির সমুদয় ব্যয়ভার এক ব্যক্তি বহন করতেন, সরাসরিভাবে দান, ওয়াকফ বা ট্রাস্টের মাধ্যমে। এভাবে মুসলমানদের বহু বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল যেসবের ব্যয়ভার বহন করতেন বিত্তশালী ও দানশীল ব্যক্তিগণ। শিক্ষকমণ্ডলী ও এসব মহানুভব দানশীল ব্যক্তিদের এ দৃষ্টিভংগি বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যেতো যে, শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য জীবিকা অর্জন ছিল না, বরং তাদের উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে জাতির ধর্মীয় ও নৈতিক মান উন্নয়ন করা।

ডাব্লিউ এডামের রিপোর্টে এ কথাও সুস্পষ্টরুপে জানা যায় যে, সেকালে প্রতিটি মসজিদ ছিল মুসলিম জনগণের কেন্দ্রীয় আকর্ষণস্থল এবং মসজিদে মসজিদে যেসব মাদ্রাসা ছিল, সেখানে যে কেউ বিনে পয়সায় লেখাপড়া শিখতে পারতো। ইংরেজদের আগমনের পর খৃষ্টান মিশনারী স্কুলসমূহে ইংরেজী শিক্ষা দেওয়া হতো। সেখানে কেউ বিনা বেতনে পড়াশুনা করতে পারতো না। কেউ খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করলে –তার সন্তানাদির বিনা বেতনে পড়াশুনার সুযোগ দেওয়া হতো। মুসলমানদের এই যে বিনা পয়সায় অথবা অতি অল্প খরচে বিদ্যাশিক্ষার সুযোগ ছিল –তার একমাত্র কারণ হলো মুসলমান শাসকগণ এবং বিত্তশালী মুসলমানগণ বিদ্যাশিক্ষার উদ্দেশ্যে অকারতে ধনসম্পদ জমিজমা প্রভৃতি দান করতেন”। (বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, পৃঃ ১৪১-১৪৪)

“ইংরেজি আমলে এডওয়ার্ড এডাম প্রাচীন বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে রিপোর্ট তৈরির সময় রাজশাহীর বাঘা থানায় যান এবং মাদ্রাসা সম্পর্কে কিছু তথ্য প্রদান করেন। তিনি বলেনঃ এ সময় মাদ্রাসায় ফার্সি ও আরবী উভয় ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হতো। ফার্সি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন নিসার আলী, আরবী শিক্ষক ছিলেন আব্দুল আযীম। ফার্সি বিভাগে ছাত্র ছিল ৪৮ জন, তাদের মধ্যে ১২ জন বাঘার আর বাকি ৩৬ জন অন্য স্থান থেকে আগত। ফার্সি বিভাগে ছাত্ররা অক্ষরজ্ঞান থেকে শুরু করে কুরআন পাঠ, পদ্মনামা, আদমনাম, গুলিস্তাঁ, বস্তা, ইউসুফ জুলেখা, জামি-উল-কওয়ানীন, ইনশা-ই-ইয়ার মুহাম্মদ, সিকান্দরনামা, বাহার দানিশমান্দ ও আবুল ফজল রচিত পুস্তকাদি পাঠ করত। অন্যদিকে আরবী বিভাগের ছাত্র ছিল মাত্র ৭ জন, দুই জন বাঘা গ্রামের আর অন্যরা অন্য স্থান থেকে আগত। আরবীর ছাত্রদের পাঠ্যপুস্তক ছিলঃ মিজান, মুনশায়িব, সরফ মীর, শরহে মিয়াতে আমিল। তবে ছাত্রদের শ্রেণীবদ্ধ কোন নিয়ম ছিল না। প্রত্যেকেই পৃথক পৃথক পাঠ গ্রহণ করত”। (বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা ও সমাজ জীবনে তার প্রভাব, পৃঃ ১১২-১১৩)।

বাংলাদেশের প্রথম কওমী মাদ্রাসা

১৮৬৬ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯০১ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে কোন কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের অনেকেই ভারতে গিয়ে দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা গ্রহন করে দেশে এসে দ্বীনের খেদমত শুরু করেন। বাংলাদেশের প্রথম কওমী মাদ্রাসা যাদের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয় তারা দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত আলেম ছিলেন।

“বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ১৯০১ সালে স্থায়িভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় চট্রগ্রাম শহরের ১২ কিলোমিটার উত্তরে দারুল উলুম মুইনুল ইসলাম মাদ্রাসা। এ মাদ্রাসার প্রথম মোহতামেম মাওলানা হাবিবুল্লাহ সহ মাওলানা আব্দুল ওয়াহেদ (১৮৫০-১৯০৫), মাওলানা সুফী আজিজুর রহমান (১৮৬২-১৯২৯), মাওলানা আব্দুল হামিদ (১৮৬৯-১৯২০), তারা সবাই মিলে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। এ মহৎ ব্যক্তিদের প্রথম দুজন দারুল উলুম দেওবন্দের ছাত্র এবং শেষের দুজন চট্রগ্রাম মোহাসেনিয়া আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র হলেও দেওবন্দের ইলমের সাথে তাদের পরিচয় ছিল। দারুল উলুম মাইনুল ইসলাম মাদ্রাসার প্রথম মোহতামেম মাওলানা হাবিবুল্লাহ ১৮৯৭ সালে চট্রগ্রাম জেলার হাটহাজারী থানা সদর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে চারিয়া গ্রামে প্রথমে মক্তব আকারে এ মাদ্রাসার কার্যক্রম শুরু করেন। তিনি মাওলানা আব্দুল ওয়াহেদ ও মাওলানা সুফী আজিজুর রহমানের পরামর্শে হাটহাজারী বাজারের ফকির মসজিদের পাশে মিঠাহাটায় ১৮৯৯ সালে স্থানান্তর করেন, কিন্তু সেখানে এ মাদ্রাসা বেশি দিন চলতে পারেনি। পরবর্তীতে তাদের সাথে যোগ দেন মাওলানা আব্দুল হামিদ, তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠায় চট্রগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়কের পাশে বর্তমান মাদ্রাসার অবস্থানে মরহুম গুলবদন জমাদারের স্ত্রী-পুত্রদের দেয়া জমিতে ১৯০১ সালে স্থায়িভাবে দারুল উলুম মাইনুল ইসলাম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন”। (বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা ও সমাজ জীবনে তার প্রভাব, পৃঃ ৩৬৩)।

এই অঞ্চলের ধর্মীয় শিক্ষার ইতিহাস-ঐতিহ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এই অঞ্চলের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে সমৃদ্ধ ছিল, মুসলমানগণ এইসব প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারাকে নিজেদের দায়িত্ব ও সৌভাগ্য মনে করতেন। ধর্মীয় শিক্ষা সম্পর্কে আমরা এখানে আর বেশী কিছু আলোচনা না করে, সামনে আমরা এই অঞ্চলের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা পেশ করবো।

সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা

ইংরেজরা যখন এই অঞ্চলে উপনিবেশ কায়েম করে তখন এখানে তাদের নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থাপনায় গড়া প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল ‘কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা’। প্রথমে তারা এই প্রতিষ্ঠানকে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সনাতন পদ্ধতি ও রুপেই চালু করে। ধীরে ধীরে সেখানে পরিবর্তন ঘটানোর চিন্তা করে।
ইংরেজরা এই অঞ্চলের শিক্ষাক্ষেত্রে দুই ভাবে পরিবর্তন সৃষ্টি করে। এক এই অঞ্চলে বিদ্যমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার আদি রুপে সৃষ্টি করে তার মধ্যে নতুন ধারা সৃষ্টি করার চেষ্টা করা, আর দ্বিতীয় রুপ ছিল নতুন করে নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেমন ‘এংলো ইন্ডিয়ান কলেজ’, ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’ ইত্যাদি।

ইংরেজদের পক্ষ থেকে যখন আলিয়া মাদ্রাসায় সংস্কার ও পরিবর্তনের চেষ্ঠা করা হয় তখন মুসলিম সমাজের পক্ষ থেকে তার বিরোধিতা করা হয়। মাদ্রাসায় ইংরেজি শিক্ষা চালু, বা প্রাচীন ফালসাফা ও হিকমতের কিতাব বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সহজেই মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট ছাত্র-শিক্ষক ও চিন্তাশীল সমাজ মেনে নেননি, যার ফলে প্রথম দিকে পরিবর্তন প্রক্রিয়া বাঁধা প্রাপ্ত হয়।

এক পর্যায়ে আলিয়া মাদ্রাসায় ইংরেজি ক্লাস চালু হয়। সামান্য কিছু সংখ্যক মুসলমান সেই ইংরেজি ক্লাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে ও উপকৃত হয়। সাধারণ শিক্ষার ব্যাপারে, বাঙ্গালী মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের শিক্ষা চিন্তা এখান থেকে শুরু হয় বলে আমাদের মনে হয়। যারা ইংরেজি শিক্ষা অর্জন করে উপকৃত হয়েছিলেন –বস্তুগত ভাবে বা চাকুরি লাভ করতে- তারা মুসলিম সমাজকে বুঝাতে শুরু করেন যে, ইংরেজি শিক্ষা করা আমাদের জন্য জরুরী এবং এই শিক্ষা আমরা অবহেলা করতে পারি না। ১৮৫৩ সালে নবাব আব্দুল লতিফ একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন যার শিরোনাম ছিল ‘মুসলিম ছাত্রদের ইংরেজি শিক্ষার উপকার’। সমগ্র দেশ ব্যাপী এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজি শিক্ষার ব্যাপারে মুসলিম সমাজে সচেতনতার সৃষ্টি করা।

এর দশ বছর পরে “১৮৬৩ সালে তিনি (খান বাহাদুর আব্দুল লতিফ) ‘মোহামেডান লিটারারী সোসাইটি’ নামে একটি সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই সোসাইটি মাঝে মাঝে মুসলমানদের চলমান শিক্ষা ও বিভিন্ন প্রকার সামাজিক সমস্যার উপর সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করতো। ফলে আধুনিক শিক্ষা ও ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি সচেতনতার সৃষ্টি হয়। এছাড়া বাঙালী মুসলমানদের বিচ্ছিন্নতাবাদের অপবাদ থেকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে ও মুসলমানদের সার্বিক উন্নতির জন্য সোসাইটি প্রতি বছর কলিকাতা টাউন হলে আলোচনা সভার আয়োজন করতো। বৃটিশ শাসকবর্গ নবাব আব্দুল লতিফের এরুপ আয়োজনকে স্বাগত জানায় এবং তাঁর প্রস্তাবিত সমস্যাবলীকে গুরুত্বের সাথে দেখার আশ্বাস দেয়”। (বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষা, পৃঃ ১৪৫)

বিস্তারিত ভাবে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা-ভাবনার কিছু নমুনা পাওয়া যায় ১৮৮২ সালে হান্টার শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে। সেই রিপোর্টে বাংলা অঞ্চলের দুই জন বিশিষ্ট নাগরিকের মতামত জানতে চাওয়া হয়। যারা ছিলেন নবাব আব্দুল লতিফ ও সৈয়দ আমীর আলী। সামনে আমরা সেই মতামত থেকে কিছু অংশ পেশ করছি :

“১৮৮২ সালে লর্ড রিপন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। এই কমিশন বৃটিশ ইন্ডিয়ার সামগ্রিক শিক্ষা, বিশেষভাবে মুসলমানদের শিক্ষা পরিস্থিতি সম্পর্কে পর্যালোচনা করবেন। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও ‘আওয়ার ইন্ডিয়ান মুসলমান’ গ্রন্থের লেখক ডব্লু ডব্লু হান্টারকে এই কমিশনের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। কমিশন বাংলাদেশের শিক্ষা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য ডব্লু ক্রাফট এর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটি এই দেশের শিক্ষা প্রসঙ্গে দুইজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সেই দুইজন ছিলেন নওয়াব আব্দুল লতিফ খান বাহাদুর সি, আই, এ ও সৈয়দ আমীর আলী। এই অঞ্চলের মুসলমানদের শিক্ষা ও বিশেষকরে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষা সম্পর্কে তাদের চিন্তাধারা পেশ করা হলঃ
নওয়াব আব্দুল লতিফের শিক্ষাচিন্তার কিছু নমুনা:

মক্তব

“মক্তবে মূলত কুরআন শরীফ পড়ানো হয়। এই মক্তবে নিম্নবিত্তদের চেয়ে মধ্যবিত্তের ছেলেপিলেরা বেশী পড়াশুনা করে। অতএব এই মক্তবে সরকারী সাহায্য মঞ্জুর করা হলে মধ্যবিত্তের মাঝে শিক্ষা বিস্তার ও শিক্ষা সম্প্রসারণ বৃদ্ধি পাবে, কিন্তু নিম্নবিত্তরা এর মাধ্যমে মোটেই উপকৃত হবে না। এ ব্যাপারেও আমরা পুরাপুরি ধারণা পাই যে, বাংলার মামুলী পাঠশালা ব্যবস্থা সাধারণ মুসলমান কৃষকদের পক্ষে কতটুকু উপকারী হবে? কেননা, এই সব পাঠশালা বা চন্ডিমন্ডপে হিন্দুদের পদ্ধতি ও রীতি-রেওয়াজের প্রাধান্যই বেশী। এইসব পাঠশালার গুরু হিন্দুরাই থাকেন। ছাত্ররাও বেশির ভাগ হিন্দু, অতএব এই পাঠশালা মুসলমানদের ছেলেপিলেদের জন্য উপযোগী নয়। ‘ইন্ডিয়ান মুসলমান’ গ্রন্থেরর লেখক তাঁর পুস্তকের ১৭৮ পৃষ্ঠায় এর একটি চমৎকার চিত্র তুলে ধরেছেন :

মুসলমানদের তিনটি প্রধান ভাবাবেগের দরুন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পদে পদে ব্যর্থ হতে চলেছে। প্রথমত শিক্ষার মাধ্যম যেহেতু বাংলা চালু করা হয়েছে, এইজন্য মুসলমানরা এই ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করেন, কেননা শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান মুসলমানরা এটা খুবই অপছন্দ করেন। দ্বিতীয়ত এইসব স্কুলের শিক্ষকরা প্রায় সকলেই হিন্দু। এইসব স্কুল শিক্ষকরা যখন মুসলমান ছাত্রদের সাথে জোড়াতালি দিয়ে উর্দু বলার চেষ্ঠা করেন তখন এক হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তৃতীয়ত হিন্দু শিক্ষকদের ব্যবহার ও শিক্ষা পদ্ধতি মুসলমান ছাত্রদের মনে শ্রদ্ধার চেয়ে বরং অশ্রদ্ধার সৃষ্টিই বেশী করা। কিছু দিন আগে একজন মুসলমান কৃষক জনৈক ইংরেজি অফিসারকে জানায় যে, দুনিয়ার এমন কোন শক্তি নেই যে মুসলমানদেরকে হিন্দু শিক্ষকদের কাছে পড়তে বাধ্য করতে পারে”।

প্রাইমারী স্কুল

“শিক্ষা কর্তৃপক্ষের ১৮৮০-৮১ সালের রিপোর্টের ১০৭ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছিল যে, বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার প্রাইমারী স্কুলগুলির ছাত্রসংখ্যা ১,৫৬,০৮১ অথচ মুসলমানদের সর্বমোট জনসংখ্যা ২ কোটি ১০ লক্ষের কাছাকাছি। এখন স্কুলের সংখ্যাসাম্য সম্পর্কে আপনারাই বিবেচনা করুন। আমার মতে বাংলাদেশের কৃষক-মজুর শ্রেণীর জন্য সত্যিকার অর্থে কোন প্রাইমারী স্কুল নাই”।

“প্রাইমারী শিক্ষা বাংলা ভাষার মাধ্যমে হওয়া উচিত। কিন্তু সেই বাংলা কি তথাকথিত পাঠশালার সংস্কৃত ঘেঁষা বাংলা? সংস্কৃত ঘেঁষা বাংলা হিন্দুদের চিন্তা, ধ্যান-ধারণা ও মানসিকতার ফসল। এইসব পাঠশালার ভাষা এমন ধরণের বাংলা হতে হবে যে, তা সংস্কৃত ও পুঁথির মাঝামাঝি পর্যায়ের হবে। কেননা পুঁথি সাহিত্যে আরবি-ফার্সি শব্দ ও প্রবাদাদি রয়েছে। আরবি-ফার্সির সংমিশ্রণে তৈরি মাঝারি ধরণের বাংলাভাষা হিন্দু-মুসলিম উভয়ের বোধগম্য হয়। এবং এটাই যেন প্রকৃত মাতৃভাষায় পরিণত হয়েছে। কাজেই মুসলমানদের পাঠশালাতে সংস্কৃত ঘেঁষা কোন বাংলা পুস্তক যেন না থাকতে পারে”।
“মুসলমান ছাত্রদের শিক্ষা বিস্তারের জন্য এখন হতে মুসলমান ট্রেনিংপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়োগ করতে হবে। ১৮৮০-৮১ সালের শিক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, নর্মাল স্কুলগুলিতে (যা লেঃ গভর্নরের অধীনস্থ) ৩০ জন মুসলমান, ৫৩৭ জন হিন্দু ও ৭৫ জন অন্যান্য ধর্মাবলম্বী শিক্ষক ছিলেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, বাংলাদেশের মুসলমানদের সংখ্যা খুবই কম”।

প্রাইমারী শিক্ষা উন্নতির উপায়

ড. হান্টার এই ব্যাপারেও তাঁর গ্রন্থের ২০৫ পৃষ্ঠায় বিশদ আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন যে, বাংলাদেশের নিম্নস্তরের লোকদের কাছেও প্রাইমারী শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে হবে। কিন্তু মুসলমানদের সম্পর্কে তিনি যে মন্তব্য করেছেন আমি তার সাথে একমত নয়। তিনি বলেনঃ “… এতদসত্ত্বেও আমার একান্ত বিশ্বাস যে, সরকার অতি অল্প খরচে সকল পর্যায়ের মুসলমানদের জন্য বেশ ভাল শিক্ষার বন্দোবস্ত করতে পারবেন। এই শিক্ষায় উত্তম, মধ্যম ও নিম্নমান –এই তিন ধরণের বন্দোবস্ত থাকবে। এই ক্ষেত্রে অর্থ ব্যয় করার ততখানি প্রয়োজন নাই যতখানি মুসলমানদের অন্যান্য বিশেষ ক্ষেত্রগুলির জন্য প্রয়োজন রয়েছে। সরকার এই কথা ঘোষণা করে অত্যান্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন যে, প্রতি পাঁচ মাইল অন্তর একটি স্কুল থাকতে হবে। পাঁচ মাইলের মধ্যে কোন স্কুল থাকলে সরকার তাতে সাহায্য করবনে না। কেননা এই ধরণের খরচে মূলত সরকারের ক্ষতি হবে এবং অনর্থক জোট তৈরির সুযোগ হবে।

চতুর হিন্দুরা এই ক্ষেত্রেও অন্যান্য ব্যাপারের মত অগ্রগামী। তারা সারা দেশের আনাচে-কানাচে ব্যাঙের ছাতার মত এমন সব স্কুল পত্তন করেছে যে, তাতে তাদেরই প্রয়োজন সাধিত হবে এবং পক্ষান্তরে মুসলমানরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই এই পাঁচ মাইলের আইনকে কিছুটা শিথিল করা উচিত, যাতে মুসলমানদের স্কুলগুলি গ্রান্ট লাভ করতে পারে। এই স্কুল যত ব্যবধানের মাঝখানেই হোক না কেন, যেখানে আলাদা স্কুলের প্রয়োজন নেই সেখানে সরকার মুসলমানদের বিশেষ বন্দোবস্ত করতে পারেন। ওখানকার হিন্দু স্কুলগুলিতে একজন স্বল্প বেতনের মুসলমান শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। সাপ্তাহে পাঁচ শিলিং এর বিনিময়ে এই ধরণের মুসলমান শিক্ষক পাওয়া যাবে।

পুর্বাঞ্চলের জেলাগুলির প্রাইমারী শিক্ষা সম্পর্কে আমরা বক্তব্য হচ্ছে, মুসলমান কৃষক মহল পর্যন্ত যোগসুত্র স্থাপনের জন্য সরকার একটি বিভাগের পত্তন করবেন। এক সময় হিন্দুদের জন্যেও এই ধরণের সংস্থার প্রয়োজন ছিল। এই সময় লর্ড হার্ডিংজ বিভিন্ন জেলাতে অসংখ্য সরকারী স্কুলের পত্তন করেন। স্থানীয় লোকেরা এই ধরণের স্কুল নিজেদের খরচে চালাতে পারত না। ১৮৬৬ সালে এই ধরণের প্রায় ৩৮টি স্কুল আমার পরিচালনাধীন ছিল। এইসব স্কুলে সরকারের বার্ষিক ১১ শত পাউন্ড খরচ হত। যদিও এইসব স্কুল স্থানীয় জনগণের একক প্রচেষ্ঠায় চলতে পারত না, তবুও এই স্কুল প্রতিষ্ঠায় যে উপকার হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। সেখানেই কৃষক শ্রেণী গরীব, অসহায় ও শিক্ষাক্ষেত্রে নিতান্ত গোঁড়া ছিল সেখানে অস্থায়ীভাবে একটি হার্ডিংজ ইন্সটিটিউটের পত্তন করা হত এবং প্রথম দিকে গ্রাম্য লোকেরা বিনা পয়সায় শিক্ষালাভ করত। এরপর যখন তারা শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পরত, তখন তাদের কাছ থেকে ফিসও আদায় করা হত। এরপর কয়েক বছরের একটি সাহায্যমূলক স্কুলের বদলে একটি হাই স্কুল জন্ম লাভ করত। অতঃপর এই হার্ডিংজ স্কুল দেশের অন্য অনুন্নত অঞ্চলের জন্য স্থানান্তর করা হত। এইভাবে বাংলা দেশের পশ্চিম-দক্ষিণাঞ্চলের অজপাড়া গাঁয়েও ক্রমশ শিক্ষা বিস্তার লাভ করে। ১৮৬৫-৬৬ সালে এতদঞ্চালে ২৮০টি স্কুল ছিল এই সব স্কুলের সর্বমোট ছাত্র সংখ্যা ছিল ১৬,০৪৩ জন।

উত্তরাধিকার সুত্রে সরকার এবং প্রচলিত শিক্ষার বিরোধিতা পোষণকারী এই গোঁড়া এবং আদিম লোকদের মধ্যে গ্রান্ট ইন এইড কোনরকম কার্যকরী হতে পারে না। তবে সস্তা ধরণের গোটা দশেক স্কুলের পত্তন করে তাতে স্বল্প বেতনের মুসলমান শিক্ষক নিয়োগ করলে এবং এর বেশির ভাগ ব্যয় যদি সরকার বহন করতেন তাহলে পুর্ব বাংলার লোকদের মনোভাব এক পুরুষের আমলেই পরিবর্তিত হত। এই ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রথমত তেমন সাফল্য লাভ করতে পারবে না। কিন্তু আস্তে আস্তে মুসলমান কৃষক শ্রেণীর যুবকদের মন এতে আকৃষ্ট হবে। এবং স্বল্প বেতনভোগী মুসলমান শিক্ষকদের প্রতিও তারা অনুরক্ত হয়ে যাবে। এইভাবে আমরা আমাদের বিরোধিতা পোষণকারী এই জাতিকে অতি সহজেই আয়ত্তে আনতে পারি”।

“আমাকে প্রাইমারী শিক্ষার সমস্যাদি সম্পর্কে পুরাপুরি ব্যাখ্যা করতে হলে, এর রাজনৈতিক দিকও পর্যালোচনা করতে হবে। পাক-ভারতের ওহাবী আন্দোলন বাংলাদেশের কৃষক-মজুরদের মনে কি প্রভাব বিস্তার করেছে সেই সম্পর্কে ড. হান্টার তাঁর গ্রন্থের ১৪৭ পৃষ্ঠায় বলেছেনঃ এই ধ্বংসাত্মক আন্দোলন মুসলমানদের কৃষক শ্রেণীর মাঝে যে প্রভাব বিস্তার করেছে, এর কারণ তাদের শিক্ষার প্রতি ব্রিটিশ সরকারের অন্যায়মূলক অমনোযোগিতা”।
“আমি গত বিশ বছরে এই ব্যাপারে প্রচুর গবেষণা করেছি এবং প্রায় এই একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। যদিও বিপ্লবের সকল দাবানল সরকারী প্রচেষ্ঠা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ যেমন মাওলানা কেরামত আলী ও তাঁর পুত্র মৌলবী হাফেজ আহমদের উপদেশ ও বক্তৃতার গুণে চাপা পরিয়াছে, কিন্তু জনসাধারণ যদি এইভাবে ভ্রান্ত পথেই অগ্রসর হতে থাকে (খান বাহাদুর আব্দুল লাতিফের মন্তব্য) তাহলে সব সময় রাজনৈতিক বিশৃংখলার আশংকা থাকবে”।

মাধ্যমিক শিক্ষা

“বাংলার মধ্যবিত্তদের শিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতি এবং ছাত্র সংখ্যা সম্পর্কে জনশিক্ষা বিভাগের রিপোর্টে একটি পরিসংখ্যান প্রদান করা হয়েছে। আমার মতে এইসব স্কুল দ্বারা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছাত্ররা যথাযথভাবে উপকৃত হতে পারে না দুটি কারণেঃ প্রথমত বেতন দানের অক্ষমতা, দ্বিতীয়ত স্কুলের দূরত্ব।

সেই সাথে এটাও মনে রাখার বিষয় যে, সাধারণ স্কুল মুসলমানদের উদ্দেশ্যমূলক বিষয়াদি শিক্ষা দিতে পারে না। ইংরেজি তো মুসলমানরা অবশ্যই শিখবে –এই ব্যাপারে আর কোন কথার অবকাশ নেই। কেননা অন্য কোন উপকার থাকুক বা না থাকুক জীবিকা ও চাকুরীর প্রশ্নে মুসলমানদের ইংরেজি শিখতে হবে। বিশেষভাবে বাংলাদেশের মুসলমানদেরকে বাংলাও শিখতে হবে। কেননা এই ভাষা তাদের নিত্যকার ভাষা। আবার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনে মুসলমানদেরকে উর্দুতে ভাল দক্ষতা ও ফার্সিতে বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে হবে এবং সম্ভব হলে কিছু আরবীও শিখতে হবে”।

উচ্চ শিক্ষা

“মুসলমানদের মাঝে উচ্চ শিক্ষার পরিস্থিতি খুবই নগণ্য। মাধ্যমিক শিক্ষাও তেমন সন্তোষজনক নয়। কেননা মাধ্যমিক পড়ার পর খুব কম ছাত্রই উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চায়। ইংরেজি পড়াশুনা করেছে এমন মুসলমান ছাত্র বিরল। অধিকাংশ ছাত্রই দারিদ্র ও অনাটনের দরুন আর এদিকে অগ্রসর হতে পারে না। হালে লেঃ গভর্নর মুসলমান ছাত্রদের বেতনের দুই-তৃতীয়াংশ মোহসীন ফান্ড হতে দেওয়ার যে নির্দেশ দিয়েছেন তা মুসলমানদের উচ্চ শিক্ষার দিকে ধাবিত করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এতদসত্ত্বেও অধিকাংশ ছাত্র নিজেদের খরচ বহন করতে সম্পুর্ণ অপারগ। কলিকাতা শহরে থাকা-খাওয়া ও বইপুস্তক কিনে পড়ার মতো আর্ধিক সামর্থ্য এই সব ছাত্রদের নেই। এই কথা অনস্বীকার্য যে, উচ্চ শিক্ষাই উচ্চ পদস্থ সরকারী চাকুরীর একমাত্র পথ। অতএব উচ্চ শিক্ষার প্রতি মুসলমানদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার বন্দোবস্ত করতে হবে”।
সৈয়দ আমীর আলীর শিক্ষাচিন্তার কিছু নমুনা:

মাদ্রাসা শিক্ষা

“আমার মতে শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলমানদের এই অনগ্রসরতাকে শুধু রাজনৈতিক কারসাজীর ফলশ্রুতি বলা যেতে পারে না। আজ হতে পঁচিশ বছর আগে মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষাক্ষেত্রে ততখানি আগ্রহশীল ছিলেন না, যতখানি বর্তমানে দৃষ্ট হয়। মুসলমানরা শুধু আরবী ও ফার্সির জন্যই উৎসর্গ প্রাণ, ইংরেজির প্রতি তাদের কোন টান ছিল না। সেকালে এই অঞ্চলে মাত্র দুটি মাদ্রাসা ছিল। একটি কলিকাতায় ও অপরটি হুগলীতে। শুধু দ্বীনী শিক্ষা লাভের মানসেই যে এই ছাত্ররা এই দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসে ভর্তি হত, তা নয়, বরং এতে একটি পার্থিব উদ্দেশ্য নিহিত ছিল। কেননা, ছাত্ররা সিনিয়র স্কলারশীপ পাস করার পর মুসান্নিফ বা ছদরুল ইয়ামিন মতো দুটি বড় পদে চাকুরি লাভ করতে পারত। দূর-দুরান্তের ছাত্ররা হুগলী বা কলিকাতায় শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে আসলে, স্থানীয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করতেন। যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘জাগীর’ বলা হত। এই ধরণের ছাত্রদেরকে মাদ্রাসার ফিসও দিতে হত না। শতকরা পঞ্চাশ জন ছাত্রই তাদের শিক্ষা জীবনের খরচ এইভাবে নির্বাহ করত। ব্রিটিশ সরকারের রেকর্ড হতে জানা যায় যে, মাদ্রাসার শিক্ষাপ্রাপ্ত এ ধরণের শতকরা পচিশ জন ছাত্রই জীবিকা ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হতে পারত এবং ভাল সরকারী পদে চাকুরি ভাল করত। এই মাদ্রাসার ছাত্রদের তুলনায় ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের ছাত্ররা চাকুরীর ক্ষেত্রে তেমন সুবিধা করতে পারতেন না।

প্রাইমারী শিক্ষা

তদানীন্তন প্রাইমারী শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল ভিন্ন ধরণের। প্রত্যেক মসজিদ সংলগ্ন একটি মক্তব থাকত। মসজিদের মোল্লা বা খতিব সকাল-বিকাল পাড়া-প্রতিবেশির ছেলেপিলে বা যেসব ছাত্র মসজিদে থাকত তাদেরক পড়াতেন। এইভাবে স্থানীয় মুসলমান ছাত্রদের প্রাথমিক শিক্ষার সূত্রপাত হত। সাধারণত এইসব মক্তবে আরবী বর্ণশিক্ষা, কুরআন শরিফের আমপারা, গুলিস্তাঁ, বোস্তা অবধি পড়ানো হত। এখন আরবী-ফার্সির গুরুত্ব বহুলাংশে কমে এসেছে। ইংরেজি শিক্ষা ব্যাপারে সবাই আজকাল উৎকণ্ঠিত। এবং এই পরিবর্তনের পাশাপাশি মুসলমানদের সর্বস্তরে দারিদ্রের কালোছায়া নেমে এসেছে। পুর্বে যেসব মধ্যবিত্ত ও অবস্থাপন্ন মুসলমান মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে জাগীর রাখতেন, বর্তমানে তাদের অবস্থা এতই শোচনীয় যে, তাদের পক্ষে জাগীর রাখার ক্ষমতা নেই।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা

প্রকৃতপক্ষে ইংরেজি শিক্ষার জন্য সরকার যেসব সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেছেন, তা খুবই উল্লেখযোগ্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও মুসলমানরা যে শুধু বিজাতীয় ভাষা হিসাবে ইংরেজি শিক্ষা হতে বিরত রয়েছে তা নয়। বরং এর পিছনে আরো অন্য কারণ আছে। পুর্বেকার লোকেরা অবশ্য এই কারণেই শিক্ষালাভ করেন নি, কিন্তু আজকাল সেই মানসিকতা অনেকাংশে বদলে গেছে। এখন সকলেই ইংরেজি শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট, কিন্তু তা সত্ত্বেও এই ব্যাপারে মুসলমানদের অনগ্রসরতার প্রধান কারণ হল তাদের দারিদ্র ও অসচ্ছলতা। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হতে দেখেছি যে, বহু বিদ্যোৎসাহী ও মেধাবী ছাত্র বিপুল প্রতিশ্রুতি নিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রসর হয়ে সামনে চলতে থাকে, কিন্তু ঠিক উচ্চ শিক্ষার দ্বারপ্রান্তে এসে নাটকীয় ভাবে তারা পড়াশুনা ক্ষ্যান্ত দিতে বাধ্য হয়। কারণ, বাবা-মা তাদের খরচ চালাতে পারেন না। এইভাবে প্রতিটি মেধাবী ছাত্র জীবনের যাত্রাপথে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়।
ইংরেজির প্রতি ঔদাসীন্যের অন্যান্য কারণ:

ইংরেজির প্রতি মুসলমানদের ঔদাসীন্যের কারণ এটাও যে, জেলা স্কুলগুলিতে হিন্দু শিক্ষকদের প্রাধান্যও। তাছাড়া শিক্ষা বিভাগীয় দফতরেও মুসলমানদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। যার ফলে এইসব স্কুলে বাংলাভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান করা হয়। কিছুদিন পুর্বেও কোন জেলা স্কুলে আরবী-ফার্সির বন্দোবস্ত ছিল না। আরবী-ফার্সির বন্দোবস্ত না থাকায় মুসলমানরা বহুকাল এইসব স্কুল হতে দূরে ছিল। এই দীর্ঘদিনের ব্যবধানে মুসলমানরা হিন্দুদের তুলনায় অনেকখানি পিছিয়ে পরেছে। কিন্তু মুসলমানরা এখন জাগ্রত হয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি ধাবিত হচ্ছে”।

উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা

“জর্জ ক্যাম্পবেল পুর্ব বাংলায় বিশুদ্ধ ইসলামী শিক্ষা প্রবর্তনের জন্য যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন তা সম্পুর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। অতএব সরকারকে বর্তমানে দুইটির যে কোন একটি পন্থা অবলম্বন করতে হবে। রাজশাহী ও চট্রগ্রামের মাদ্রাসার শিক্ষার মান কমিয়ে দিতে হবে, অথবা এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে জেলা স্কুলের সাথে একীভূত করে দিতে হবে।

আমার মতে মিডল স্কুল, হাই স্কুল ও কলেজগুলিতে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এদেশের লোকদের ইংরেজি বাদ দিয়ে শুধু প্রাচ্য দেশীয় শিক্ষা দেওয়ার ফল খুবই খারাপ হবে। শুধু এই ধরণের পড়াশুনায় কোন চাকুরি বা জীবিকার সংস্থান হয় না।

দ্বিতীয়ত আলিয়া মাদ্রাসাকে কলেজের পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। দুর্ভাগ্য বলতে হবে যে, হুগলী মাদ্রাসার শিক্ষা-দীক্ষার পদ্ধতি মুসলমানদের সীমারেখার বাইরে চলে গেছে। আমার মতে মুসলমানী বিষয়ের শিক্ষা আর মাদ্রাসায় না রাখাই ভালো। হুগলীর মাদ্রাসা বন্ধ করে দিলে অনেক টাকা বেঁচে যাবে। এই টাকা হতে হুগলী কলেজ, কলিকাতা কলেজ ও শিরপুরের কলেজের মুসলমান ছাত্রদের জন্য বৃত্তি বরাদ্দ করা যেতে পারে”। (আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস, পৃঃ ১২৮-১৪২)।

বাংলার কয়েকটি হাইস্কুল ও কলেজ

উন-বিংশ শতাব্দীর মধ্যে বাংলা অঞ্চলে বেশ কিছু হাইস্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়, উদাহরণ হিসাবে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল (১৮২৮), বরিশাল জিলা স্কুল (১৮২৯), ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল (১৮৩৫)
অন্যদিকে বাংলার প্রথম তিন কলেজও প্রায় এই সময়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়, ঢাকা কলেজ, ১৮৪১ সালে উপমহাদেশের প্রথম আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চট্রগ্রাম কলেজ, ১৮৬৯ সাল, রাজশাহী কলেজ, ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়

এখানে উল্লেখ্য যে, হাইস্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে দেখা যায় যে, সেখানে মুসলমান ছাত্রদের চেয়ে হিন্দু ও খৃস্টান ছাত্রদের সংখ্যা অনেক বেশী ছিল। এর একাধিক কারণের মধ্যে একটি কারণ এই ছিল যে, এই সকল প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রে খৃষ্টান মিশনারির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হত, এবং এখানে বেশির ভাগ শিক্ষক হিন্দু অথবা খৃস্টান ছিল।

তাছাড়া ব্রিটিশ ভারতে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই অঞ্চলের মানুষের শিক্ষা নিয়ে আলাদা ভাবে চিন্তা শুরু প্রথম দিকে করা হয়নি, তাই দেখা যায় যে, প্রথম দিকে হয়ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে আগের নিজের অবস্থার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, অথবা খৃস্টান ধর্মের প্রচার-প্রসারের উদ্দেশ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে।

‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক শিক্ষা সমিতি’ ১৯০৩ সাল

বিংশ শতাব্দীর আগ থেকেই বাংলা অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা সহ সকল ক্ষেত্রে সংস্কার ও সচেতনতামূলক চিন্তা গভীর ভাবে প্রকাশ পায়। যা বিভিন্ন ধরণের সমিতি, সোসাইটি, সংঘটনের রুপে প্রকাশ পেতে শুরু করে। বাঙ্গালী মুসলমানদের শিক্ষা নিয়ে সচেতনতা ও সংস্কারমূলক কাজ করার উদ্দেশ্যে ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক শিক্ষা সমিতি’ নামে একটি সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। “১৯০৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির বিচারপতি আমীর আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘ক্যালকাটা মোহামেডান ইউনিয়ন’ এর বার্ষিক অধিবেশনে ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক শিক্ষা সমিতি’ নামে বাংলার মুসলমানদের শিক্ষা সংস্কার ও উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি সমিতি গঠন করা হয়”।

‘ক্যালকাটা মোহামেডান ইউনিয়ন’ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রেক্ষাপট ছিল এই যে, বঙ্গভঙ্গ হওয়ার পর, পুর্ব বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা দেখা-শোনার জন্য মিঃ সার্পকে প্রধান করে, পৃথক ডাইরেক্টরী গঠন করা হয়। পুর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কারবাদীরা পৃথকভাবে এদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কারে তৎপর হয়। তাদের সেই তৎপরতার পদক্ষেপ হিসাবে এই ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেই ইউনিয়নের প্রথম বার্ষিক অধিবেশনে ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক শিক্ষা সমিতি’ গঠন করা হয়।

“১৯০৪ সালের ২রা ও ৩রা এপ্রিল রাজশাহী কলেজ প্রাঙ্গণে এই সমিতির প্রথম বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে বাংলাদেশের ঢাকা, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্রগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, যশোর, রংপুর সহ বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় চার হাজার প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। এই অধিবেশনে ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলমান শিক্ষা সমিতি’কে স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তার পৃষ্ঠপোষকসহ একটি কার্যকমিটি গঠন করা হয়।
বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলমান শিক্ষা সমিতির ১৯০৪ সালের অনুষ্ঠিত রাজশাহীর সন্মেলনে কার্যনির্বাহী কমিটি ছাড়াও, বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য ১৫ দফা কর্মসুচির প্রস্তাব গৃহীত হয়। উক্ত প্রস্তাবাবলীর শিরোনাম ছিলঃ
গরীব ছাত্রদের সাহায্যের উদ্দেশ্যে প্রতি জেলায় শিক্ষা তহবিল গঠন
কৃষি শিক্ষায় উৎসাহ প্রদান
সাধারণ শিক্ষার সাথে ধর্ম শিক্ষার সংযুক্তকরণ
শারীরিক শিক্ষার প্রচলন
নারী শিক্ষার প্রচারণা জোরদার করা
সহজ বাংলায় পাঠ্যপুস্তক লেখা ও ছাত্রদের হাতে পৌঁছানোর পদ্ধতি সহজীকরণ
মক্তব মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার করে আধুনিক মানে উন্নীত করা

সর্বোপরি এই সন্মেলনে বাংলাদেশে শিক্ষাকে একটি মৌলিক অধিকার, সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক বিকাশের আন্দোলনে পরিণত করা হয়।
১৯০৫ সালের ২১ ও ২২শে এপ্রিল বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলমান শিক্ষা সমিতির পরবর্তী অধিবেশন কুমিল্লা জেলার লাকসামের পশ্চিম গাঁয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে সর্ব সম্মতভাবে ১৯০৪ সালের সম্মেলনের প্রস্তাবসমূহের সাথে আরও কিছু নতুন প্রস্তাব সন্নিবেশ করা হয়। এতে নিম্ন শ্রেণীসমূহে বাংলায় শিক্ষাদান ও দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে মাদ্রাসার উচ্চ শ্রেণীসমূহে ইংরেজি শিক্ষাদান, মুসলমান ছাত্রদের ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষাদান, সরকারী-আধাসরকারী মক্তব মাদ্রাসায় ট্রান্সফার সার্টিফিকেটের নিয়ম প্রবর্তন, মক্তব মাদ্রাসার জন্য পরিদর্শক মাদ্রাসার পড়ুয়াদের মধ্য থেকে নিয়োগ দান, এছাড়া একটি ইউনানী মেডিক্যাল স্কুল স্থাপন উল্লেখযোগ্য ছিল।

‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলমান শিক্ষা সমিতি’ বঙ্গভঙ্গের পর, ‘পুর্ব বঙ্গ ও আসাম মুসলমান শিক্ষা সমিতি’ হিসাবে তার কার্যক্রম পরিচালনা করে। বাংলাদেশে এই সমিতির তৃতীয় অধিবেশন ১৯০৬ সালের ১৪ ও ১৫ এপ্রিল ঢাকার শাহবাগে অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন নওয়াব বাহাদুর খাজা সালিমুল্লাহ। এই সম্মেলনে মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা, চাকরি-বাকরির সুযোগ-সুবিধা, ওয়াকফ সম্মত্তির ব্যবহার, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, উর্দু শিক্ষা, বোডিং ঘর, মুসলিম নারী শিক্ষা, কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসার জন্য সার্বক্ষণিক অধ্যক্ষ নিয়োগ, ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন পরীক্ষায় আরবী শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা প্রভৃতি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সম্মেলনে ২০ দফা দাবীর একটি রেজুলেশন গৃহীত হয়। উক্ত ২০ দফার উল্লেখযোগ্য

দফাসমূহ নিম্নরুপ

বিদ্যা শিক্ষা করে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করার বিষয়ে মুসলমানদের অতীতের ভুল বুঝতে পারা এবং তাদের মধ্যে ক্রমাগত জাগরণের অনুভূতি জাগায় এই সমিতি আনন্দ প্রকাশ করছে
সমিতি মনে করে প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে বর্তমান ব্যবহৃত বাংলা পাঠ্যপুস্তকের বিষয়ে ও ভাষার দিক থেকে মুসলমান ছাত্রদের জন্য সম্পুর্ণ অনুপযুক্ত। কাজেই মুসলিম মনীষীদের জীবন ও কর্ম নিয়ে লিখিত অসাম্প্রদায়িক প্রকৃতির পাঠ্য পুস্তক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু করার জন্য সরকারের নিকট আবেদন করা হোক
ইংরেজি বিষয় বাধ্যতামূলক করে মিডল মাদ্রাসা স্থাপনের প্রস্তাবাবলী প্রস্তুতের জন্য একটি কমিটি গঠন করা এবং দক্ষ শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে মিঞাজীদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি বিশেষ ক্লাস খোলা
এই রেজুলেশন অনুযায়ী কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ড, ই, ডি রসকে চেয়ারম্যান ও ঢাকা মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট আবু নছর মুহাম্মাদ ওহীদকে সেক্রেটারি করে ৯ সদস্য বিশিষ্ট একটি কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়।

‘পুর্ব বাংলা ও আসাম প্রাদেশিক শিক্ষা সমিতি’র দ্বিতীয় অধিবেশন ১৯০৮ সালের ১৮ ও ১৯শে এপ্রিল ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে এই অঞ্চলের মুসলমানদের শিক্ষা-দীক্ষার পশ্চাৎপদতার সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে এর নিরসন ও অগ্রগতির লক্ষ্যে ২২ দফা প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ২২ দফার উল্লেখযোগ্য কিছু দফা ছিল নিম্মরুপ:

বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলমান শিক্ষা সমিতির প্রথম বার্ষিক অধিবেশনে গৃহীত প্রস্তাবাদি বাস্তবায়নের জন্য একটি সাব-কমিটি গঠিত হবে। এই কমিটি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও মক্তবের জন্য মুসলমান ছাত্রদের প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকসমূহ নিরীক্ষা করে এর উপযুক্ততা যাচাইসহ নতুন পাঠ উপযোগী পুস্তক নির্বাচন করা হোক
মাধ্যমিক বা মিডল মাদ্রাসার শিক্ষা মুসলমানদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তাই প্রত্যেক জেলায় বিপুল সংখ্যক মাদ্রাসায় উদারভাবে সাহায্য করার জন্য সরকারকে অনুরোধ করা হোক
উচ্চমানের ইংরেজি স্কুলসমূহে নিম্ন শ্রেণীর ঐচ্ছিক হিসাবে উর্দু পড়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য সরকারকে অনুরোধ করা হোক

ইতিপুর্বে গঠিত জেলা পর্যায়ের ‘শিক্ষা তহবিল’ প্রাদেশিক পর্যায়ে উন্নীত করে, এই তহবিল হতে উপযুক্ত মুসলমান ছাত্রদের বৈষয়িক শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, কিংবা বিশেষ কোন বিষয়ে মৌলিক গবেষণার জন্য সাহায্য করা হবে

মোহসীন ফান্ডের প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাব বাজেটে উল্লেখ করার জন্য সরকারকে অনুরোধ করা হোক
সরকার নারী শিক্ষা ক্ষেত্রে যে প্রচুর অর্থ দিচ্ছে, তা দিয়ে মুসলিম বালিকাদের জন্য পৃথক মক্তব খোলার চেষ্ঠা করা হোক

মুসলমান ছাত্রদের মানবিক শিক্ষা ও বৃত্তিমুলক শিক্ষা, বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে শিক্ষা দেওয়ার জন্য রাজস্ব হতে প্রচুর সংখ্যক বৃত্তি দেয়ার জন্য সরকারকে অনুরোধ করা হোক
সরকারী ও আধা-সরকারী হাই স্কুলে অতিরিক্ত মৌলবী শিক্ষক নিয়োগ করে মুসলমান ছাত্র-ছাত্রীদের আরবি শিক্ষার ক্ষেত্রে আরও সুযোগ সৃষ্টির জন্য সরকারকে অনুরোধ করা হোক
জেলা স্কুল ও কিছু মিডল ইংরেজি স্কুলে একটি পৃথক ক্লাস খুলে, সেখানে স্থানীয় শিল্প যেমন ছুতারের কাজ, কর্মকারের কাজ, কুমারের কাজ, কৃষিবিদ্যা, কাপড় বুনন, সেলাইয়ের কাজ প্রভৃতি পর্যাপ্ত সাহায্যসহ শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য সরকারকে অনুরোধ করা হোক

সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি বাংলাদেশের বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা যুগোপযোগী করার বেসরকারি উদ্যোগের কার্যক্রম চলতে থাকে। নবাব সলিমুল্লাহ (১৮৭১-১৯১৫), নওয়াব শামসুল হুদা (১৮৪০-১৯২২), নওয়াব আলী চৌধুরী (১৮৬৩-১৯২৯) মাওলানা আবু নছর মুহাম্মাদ ওহীদ প্রমুখ বরেণ্য ব্যক্তি মাদ্রাসা শিক্ষা তথা সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইসলামিক ছাঁচে গড়ে তোলার জন্যে চেষ্ঠা করতে থাকেন। তারা বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন স্থানে সম্মেলন করে এর সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন।

শুধু বাংলাদেশের ওলামা নয়, সুদূর লাখনৌর আল্লামা শিবলী নোমানী, দিল্লীর আল্লামা আব্দুর হক, জৌনপুরের আল্লামা আব্দুল আওয়াল, দিল্লীর আল্লামা নজীর আহমদ প্রমুখ ইসলামী চিন্তাবিদের বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার রুপরেখা আলোচনা ও মতামতের জন্য বিভিন্ন সম্মেলনে আনা হয়। আগত মুসলিম সুধী সমাজ মাদ্রাসা শিক্ষাকে আমূল সংস্কার করে অধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের উপযোগী করে গড়ে তোলার ব্যাপারে মতামত প্রদান করেন”। (মাদ্রাসা শিক্ষা, পৃঃ ১৬২-১৬৯)

এই সময়ে বাংলার কিছু উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল (১৯০৫)

আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষার উদ্দেশ্যে বেশ বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। বর্তমান বুয়েট (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) ১৯০৫ সালে খাজা আহসানউল্লাহ বিশেষ অনুদানে প্রতিষ্ঠিত হয়। “১৯০৫ সালে ঢাকার তৎকালীন খাজা আহসানউল্লাহ এ বিদ্যালয়ের প্রতি (এই বিদ্যালয়টি প্রথমত ১৮৭৬ সালে ‘ঢাকা সার্ভে স্কুল’ নামে ব্রিটিশ সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল) আগ্রহী হন এবং মুসলমানদের শিক্ষাদীক্ষায় অগ্রগতির জন্য বিদ্যালয়ে ১.১২ লক্ষ টাকা দান করেন। তার মহৎ অনুদানে এটি পরবর্তীতে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষালয় হিসেবে প্রসার লাভ করে এবং তার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯০৮ সালে বিদ্যায়নটির নামকরণ করা হয় আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল। আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল তিন বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা কোর্স দিতে শুরু করে পুরকৌশল, তড়িৎকৌশল, এবং যন্ত্রকৌশল বিভাগে। (উইকিপিডিয়া/বাংলাদেশ_প্রকৌশল_বিশ্ববিদ্যালয়)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১)

১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ। এর মাত্র তিন দিন পূর্বে ভাইসরয় এর সাথে সাক্ষাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আবেদন জানিয়ে ছিলেন ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ, ধনবাড়ীর নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

ব্যারিস্টার আর. নাথানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়, ১৯১৩ সালে প্রকাশিত হয় নাথান কমিটির ইতিবাচক রিপোর্ট এবং সে বছরই ডিসেম্বর মাসে সেটি অনুমোদিত হয়। ১৯১৭ সালে গঠিত স্যাডলার কমিশনও ইতিবাচক প্রস্তাব দিলে ১৯২০ সালের ১৩ মার্চ ভারতীয় আইন সভা পাশ করে ‘দি ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট (অ্যাক্ট নং-১৩) ১৯২০’। নাথান কমিটি রমনা অঞ্চলে ৪৫০ একর জায়গায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব দেয়।

১৯১৭ সালের মার্চ মাসে ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী সরকারের কাছে অবিলম্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল পেশের আহ্বান জানান। ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ গভর্নর জেনারেল এ বিলে সম্মতি দেন। এ আইনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ভিত্তি। এ আইনের বাস্তবায়নের ফলাফল হিসেবে ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে।

ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার উন্মুক্ত হয় ১৯২১ সালের ১ জুলাই। সে সময়ের ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত রমনা এলাকায় প্রায় ৬০০ একর জমির উপর পূর্ববঙ্গ এবং আসাম প্রদেশের পরিত্যক্ত ভবনাদি এবং ঢাকা কলেজের (বর্তমান কার্জন হল) ভবনসমূহের সমন্বয়ে মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। (উইকিপিডিয়া, ঢাকা_বিশ্ববিদ্যালয়)

এই সকল সোসাইটি, সমিতি, পরিষদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বুঝা যায় যে, বাংলার মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক সচেতনতার পাশাপাশি শিক্ষা-সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক সচেতনতার প্রকাশ পরিপুর্ণরুপে প্রকাশ পায়। নিজেদেরকে একটি শিক্ষিত, সচেতন ও আধুনিক জাতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে শুরু করেন। একটি মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজের পরিপুর্ণ বিকাশ ঘটতে শুরু করে।

আগের সংবাদআগ্রার নাম বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে যোগী সরকার
পরবর্তি সংবাদলিবিয়ার রাজধানীতে বিমান হামলা, নিহত ৫ বাংলাদেশি শ্রমিক