আশরাফ উদ্দীন খান :
১. আতাউর রহমান খান শিক্ষা কমিটি ১৯৫৭
২. এস এম শরীফ কমিশন ১৯৫৮
৩. ইসলামিক এরাবিক বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৩-৬৪
৪. বিচারপতি হামিদুর রহমান কমিশন ১৯৬৬
৫. নুরখান কমিশন ১৯৬৯
আমরা এই আলোচনার গত পর্বে ‘সৈয়দ মুয়াজ্জেম উদ্দীন কমিটি ১৯৪৬’, ‘মাওলানা আকরম খাঁ কমিটি ১৯৪৯’ ও ‘আশরাফ উদ্দীন চৌধুরী কমিটি ১৯৫৫’ এই তিনটি শিক্ষা কমিটি নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এই ধারাবাহিকতায় আরো বেশ কিছু কমিশন ও কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এখানে সেই সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হবে। সেই কমিটি বা কমিশন ছিল নিম্নরূপ:
আতাউর রহমান শিক্ষা পুনর্গঠন কমিশন ১৯৫৭ সাল
১৯৫৭ সালের ৩রা জানুয়ারি পুর্ব পাকিস্তানের চীফ মিনিষ্টার আতাউর রহমান খানকে চেয়ারম্যান করে ‘শিক্ষা পুনর্গঠন কমিশন’ গঠিত হয়েছিল। এই কমিশনের কাজ ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন সম্পর্কে পরামর্শমূলক রিপোর্ট তৈরি করা। ৬ মাস কাজ করার পরে কমিশন তাদের রিপোর্ট পেশ করে। তাদের সুপারিশে বলা হয়–পূর্ব পাকিস্তানে মাদ্রাসা শিক্ষা দুটি ধারায় গঠিত ছিল–
১. পুনর্গঠিত মাদ্রাসা (নিউ স্কীমঃ হাই মাদ্রাসা বা ইসলামিক ইন্টারমেডিয়েট কলেজ)
২. ওল্ড স্কীম মাদ্রাসা
উক্ত কমিশন উভয় প্রকার শিক্ষাধারার জন্যে নিম্নোক্ত সুপারিশ পেশ করে–
* নিউ স্কীম মাদ্রাসা শিক্ষাধারা মাধ্যমিক শিক্ষাধারার সাথে একত্রিত হয়ে যাবে। তবে বিশেষভাবে ইসলামিক বিষয়সমূহ যেমন আরবি, ফিকাহ, ফারায়েজ, আকাইদ ঐচ্ছিক বিষয় হিসাবে থাকবে।
* ওল্ড স্কীম মাদ্রাসা শিক্ষাধারা ১৯৫২ সালের ‘শিক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন কমিটি’ (education system reconstruction committee) ও ‘মাদ্রাসা শিক্ষা এডভাইজারী কমিটি ১৯৫৫-৫৬’ সালের সুপারিশ অনুযায়ী থাকবে। ওল্ড স্কীম মাদ্রাসায় সিনিয়র হাই স্কুল মানের ইংরেজি, বাংলা, গণিত পাঠ্যভুক্ত হবে, যাতে আগ্রহী ছাত্ররা পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি হতে পারে
* মাদ্রাসার ছাত্রদের সাধারণ শিক্ষায় স্থানান্তরের ব্যাপারে সহজ নীতিমালা রাখা হবে
* একটি বিশেষজ্ঞ দল নিয়োগ করে উপরোক্ত সুপারিশের আলোকে মাদ্রাসার জন্য বাস্তবভিত্তিক শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচী প্রণয়ন করার সুপারিশ করা হল
* অযোগ্যতার জন্য ওল্ড স্কীম মাদ্রাসাকে সরকার উৎসাহিত করছে না। মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে প্রচলিত ওল্ড স্কীম মাদ্রাসার বর্তমান অবস্থার অযোগ্যতা ও অপ্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু তৃণমূল পর্যায়ে পরিমার্জন করে উন্নয়নের কাজে হাত দিতে হবে
* মাদ্রাসা-ই-আলিয়াকে উন্নত করে বর্তমান মিশর ও অন্যান্য মুসলিম দেশের ইসলামিক শিক্ষার অনুকরণে একটি উন্নতমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রুপান্তরিত করতে হবে। এখানে ইসলামিক শিক্ষার উপর গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থাকবে
এই কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে, ১৯৫৮ সাল থেকে নিউ স্কীম মাদ্রাসাসমূহ সাধারণ শিক্ষার সাথে একত্রিত হয়ে গেল। একত্রিত হওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারী অনুদান ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অনেক গুণ বেড়ে গেল। অন্যদিকে ওল্ড স্কীম মাদ্রাসার ইবতেদায়ী স্তর সাধারণ শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে একত্রিত হলো। ফলে ওল্ড স্কীম মাদ্রাসার শিক্ষাক্রম প্রাথমিক শিক্ষার পরের ধাপ থেকে শুরু হলো। ১৯৫৮ সাল থেকে ওল্ড স্কীম মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত কোর্স কার্যকর করা হল।
মাদ্রাসা-ই-আলিয়া ঢাকাকে একটি ভাল ও উচ্চমানের ইন্সটিটিউশন ও ইসলামিক শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্রে উন্নীত করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, এবং এই জন্য আর্থিক চাহিদা অনুসারে স্কলারশীপের পরিমাণ ৩০,০০০ টাকায় উন্নীত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।
কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। কলিকাতা থেকে স্থানান্তরিত আলিয়া মাদ্রাসা সেই সময়ে, ডাফরিন হোস্টেলের বারান্দায় ‘প্রবাসীর’ মত জীবন নিয়ে বিরাজ করছিল। আলিয়া মাদ্রাসার উন্নতির ব্যাপারে কোন কাজ হল না, বরং আতাউর রহমান খান কমিটির প্রস্তাব ও সুপারিশের মাধ্যমে, নিউ স্কীমের হাই মাদ্রাসা ও ইসলামিক ইন্টারমেডিয়েট কলেজসমূহকে সাধারণ শিক্ষায় হজম করে ফেলা হল। এই সকল কারণে আলেম ও ছাত্র সমাজ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন, রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে উঠল। ছাত্র-শিক্ষক ও ধর্মপ্রাণ মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যে আরেকটি শিক্ষা কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হল, যা ছিল ‘এস, এম, শরীফ কমিশন’ নামে পরিচিত। (মাদরাসা শিক্ষা, পৃঃ ২৩৬-২৩৯)
জাতীয় শিক্ষা কমিশন ১৯৫৯ সাল এস. এম. শরীফ কমিশন
১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর পাকিস্তান সরকার জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। উক্ত কমিশন (শরীফ কমিশন) সমগ্র পাকিস্তানের শিক্ষা উন্নয়নের জন্য একটি বিস্তারিত সুপারিশ ১৯৫৯ সালের জানুয়ারি মাসে সরকারের নিকট পেশ করেন। উক্ত কমিশন মাদ্রাসা ও মক্তব সম্পর্কে যে সুপারিশমালা প্রস্তুত করেন তার সারমর্ম ছিল নিম্নরূপ:
১. মাদ্রাসা, মক্তব এবং দারুল উলুম হচ্ছে একটি ঐতিহ্যগত শিক্ষা পদ্ধতির অন্তর্গত। ইসলামী বিষয় সম্পর্কে শিক্ষাদানের মধ্যেই এই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য সীমাবদ্ধ। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় একেবারে প্রারম্ভ থেকেই আরবী শিক্ষা দেওয়া হয়। কুরআন, তাফসীর, হাদিস এবং ফিকাহ শিক্ষাদানও এর অন্তর্গত। এই শিক্ষার মুখ্য উদ্দেশ্য ইসলাম সম্পর্কে শিক্ষা দান, তার উপলব্ধি ও এ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দানের ক্ষেত্রে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাহায্য খুব অল্পই গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
২.এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই পুর্ব পাকিস্থানে অবস্থিত। এগুলো নিয়মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং এদের নির্দিষ্ট পাঠ্যসূচী রয়েছে ও পাঠ্যসূচীর বিভিন্ন স্তরের মধ্যে ক্রমিক পর্যায়ও আছে। এই শিক্ষা কয়েকটি স্তরে বিন্যস্ত, যেমন ইবতেদায়ি, দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল।
৩. ১৯১৫-১৬ সালে সাধারণ বিদ্যালয়ের পাঠ্য বিষয়সমূহ যখন মাদ্রাসাতে প্রবর্তিত হয়, তখন সাধারণ শিক্ষার সাথে মাদ্রাসার শিক্ষার একত্রীকরণের প্রচেষ্ঠা করা হয়। কিছু মাদ্রাসায় এই সংস্কার প্রবর্তিত হয় আর কিছু মাদ্রাসা পুরাতন পাঠ্যসূচী অনুসরণ করতে থাকে। ফলে দেশে দুই ধরণের শিক্ষা চালু হয়ঃ ওল্ড স্কীম মাদ্রাসা ও নিউ স্কীম মাদ্রাসা। নিউ স্কীম মাদ্রাসাগুলো ক্রমে ক্রমে প্রচলিত সাধারণ শিক্ষার কাছাকাছি এসে পরেছে এবং প্রাদেশিক সরকার সম্প্রতি পুনর্গঠিত মাদ্রাসাগুলোকে স্কুলের প্রচলিত সাধারণ পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
৪. ওল্ড স্কীম মাদ্রাসাসমূহও তাদের শিক্ষা পদ্ধতিকে আধুনিক জীবনের চাহিদা অনুযায়ী গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে। ফলে তাদের শিক্ষাধারায় সাধারণ শিক্ষার গণিত, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, ইংরেজি ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত শুরু করেছে। তবে এখনও এই সব প্রতিষ্ঠানে ইসলামিক শিক্ষার উপর জোর অধিক। ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষার জন্য শতকরা ৭৫ ভাগ সময় নির্দিষ্ট রাখা হয়। ফলে মাদ্রাসা শিক্ষা উচ্চতর স্তরসমূহেও অন্যান্য বিষয়ের অর্জিত জ্ঞান প্রবেশিকা স্তরের বেশী হয় না। ফলে মাদ্রাসা শিক্ষার উচ্চতর স্তরসমূহ অতিক্রম করতে ১৫/১৭ বছর সময়ের প্রয়োজন হয়।
৫. যখন সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষার প্রচলন ছিল না, সেই সময় মাদ্রাসা, মক্তব এবং দারুল উলুম মাদ্রাসাসমূহের মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। পাকিস্তান বর্তমানে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং ধর্মীয় শিক্ষা প্রবর্তন করা হয়েছে। এই রিপোর্টে আমরা একদিকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় শিক্ষা আর অন্যদিকে আধুনিক সমাজের জন্যে প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় শিক্ষাদানের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছি। ধর্মীয় শিক্ষা সম্পর্কিত অধ্যায়ে আমরা সুপারিশ করেছি যে, শিক্ষার প্রথম ৮ বছরের জন্যে ধর্মীয় শিক্ষা হবে বাধ্যতামূলক, এবং নবম শ্রেণী হতে উপরের দিকে এটা হবে ইচ্ছাধীন, আর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইসলামী বিষয় সম্পর্কে শিক্ষা ও গবেষণার ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষা ও গবেষণা উন্নয়নের ব্যাপারে নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে।
৬. মাদ্রাসা, মক্তব ও দারুল উলুমসমূহের শিক্ষা পদ্ধতি একমুখী, কারণ এই শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলাম সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের শিক্ষা প্রদান করা। অথচ প্রয়োজন বোধেই প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার ভিত্তিকে ব্যাপক ও বহুমুখী করতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলে-মেয়েদের মেধা, বুদ্ধি, প্রবণতা সঠিকভাবে উপলব্ধি করা যায় না, তাই কোন শিশু কোন বিশেষ ধরণের পেশা বা শিক্ষার জন্য উপযুক্ত তা নির্ধারণের উপযুক্ত সময় এটা নয়। ধর্ম শিক্ষাকে প্রাথমিক শিক্ষার অবিভাজ্য অংশরুপে গণ্য করে, অন্যান্য বহু বিষয় রয়েছে যেগুলোকেও বিবেচনা করতে হবে। ছাত্রদেরকে জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের উপযুক্ত করে তোলার জন্য সেগুলোর উপরও যথাযথ গুরুত্বারোপ করা উচিত। অথচ মাদ্রাসা ও মক্তবসমূহে এই ধরণের বহুমুখী প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা নেই।
৭. উচ্চতর পর্যায়ে মাদ্রাসাসমূহকে অবশ্যই ইসলাম ধর্মকে একটি গতিশীল ও প্রগতিপন্থী আন্দোলন হিসাবে উপস্থাপন করতে হবে, যা সময় ও সমাজের পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে টিকে থাকতে সক্ষম হয়। যুগে যুগে বিজ্ঞান, দর্শন, অর্থশাস্ত্র ও সমসাময়িক ইতিহাসের আধুনিকতম অগ্রগতির আলোকে ইসলামকে উপস্থাপন করতে পারলেই, মাদ্রাসার ছাত্রগণ এর গতিশীল তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারবে।
৮. এটা একটি আশার লক্ষণ যে, আধুনিক জীবনের জন্য আবশ্যকীয় এরুপ বিষয়সমূহ মাদ্রাসায় শিক্ষাদানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা যাচ্ছে। এটা সঠিক পথে চলার একটি সুন্দর প্রচেষ্ঠা। ধর্মীয় বিষয় ছাড়াও অন্যান্য বিষয়কে বাস্তব জীবনের প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বদান করা এবং ইসলামের উপলব্ধি ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আধুনিক চিন্তাধারার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করা উচিত।
৯. প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার ভিত্তি অবশ্যই ব্যাপক করতে হবে। মক্তব-মাদ্রাসা ও দারুল উলুমসমূহের কারিকুলামে এমন ধরণের বিষয় সন্নিবেশিত হওয়া উচিত যা ছাত্রগণের পরবর্তী জীবনে বৃত্তিমূলক বা পেশাগত শিক্ষার ব্যাপারে কিছুটা সহায়ক হতে পারে। মক্তব, মাদ্রাসা ও দারুল উলুমসমূহের কারিকুলাম ধর্মীয় ও অনুরূপ বিষয় সম্পর্কিত পাঠ্যসূচী দ্বারা ভারাক্রান্ত করে রাখা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় অংক, বিজ্ঞান, সামাজিক ও মানবিক বিষয়সমূহ শিক্ষাদানের প্রয়োজনীয়তার প্রতি কোনরূপ দৃষ্টি প্রদান করা হয়নি।
ধর্মীয় শিক্ষা সম্পর্কে এই রিপোর্টে আরোও বলা হয়–
১. মানব জাতির ইতিহাসে ধর্মই সভ্যতার প্রধান জীবনী শক্তিরুপে কাজ করে এসেছে। ধর্ম বিশ্বাসই মানুষকে সততা ও পুণ্য পথের দিকে পরিচালিত করেছে। ধর্মই একমাত্র শক্তি যা সমাজকে একটি সুসংহত রুপে গড়ে তুলতে পারে।
২. মানুষের দেহ ও আত্মার পুর্নাজ্ঞ ও সুষম উন্নয়নই শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য। কাজেই যে মৌলিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ মানব সভ্যতার ভিত্তি, শিক্ষার মধ্য দিয়ে তার বিকাশ হওয়া জরুরী।
৩. ধর্ম ও তার মহান নৈতিক সুফল থেকে যে অনুপ্রেরণা ও নির্দেশ পাওয়া যায়, পাকিস্তানে তার একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানকে তার বিবেক ও আত্মার কাছে পরিচ্ছন্ন থাকতে হলে তাকে ইসলাম ও তার নীতি-আদর্শকে গ্রহণ করতেই হবে।
৪. বয়স ও শিক্ষার স্তরের সাথে সাথে ছেলে-মেয়েদের নৈতিক ও বুদ্ধি-বৃত্তিগত বিকাশেরও পরিবর্তন হয়। তাই সকল স্তরের প্রয়োজন মিটাবার উপযোগী ভাবে আমরা সুপারিশ পেশ করেছি।
ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপারে আমাদের সুপারিশ হবে নিম্নরূপ– ধর্মীয় শিক্ষাদানের তিনটি স্পষ্ট স্তর থাকবে–
*বাধ্যতামূলক স্তর
*ইচ্ছাধীন স্তর
*গবেষণা স্তর
১) প্রথম শ্রেণী হতে ৮ম শ্রেণী পর্যন্তঃ প্রথম ৮ বছর মুসলমান ছাত্রের জন্যে ইসলামিয়াত শিক্ষা হবে বাধ্যতামুলক। এখানে সিলাবাস হবে এমন যাতে প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রী পবিত্র কুরআন (নাজেরা) পাঠ করতে পারে, কালেমা, নামাজ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা লাভ করে, সিরাত, মুসলিম ইতিহাস, শিক্ষা সাহিত্য থেকে গৃহীত উপন্যাস ও উপদেশপুর্ণ গল্প ইত্যাদি ইসলামিয়াত সম্পর্কিত পুস্তকে সন্নিবেশ করতে হবে, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা থাকবে, সামাজিক গুণাবলীর শিক্ষা দেওয়া হবে।
২) ৯ম ও ১০ম শ্রেণীতে ধর্ম শিক্ষাকে ইচ্ছাধীন বিষয় হিসাবে প্রবর্তন করা হবে।
৩) একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে ধর্ম শিক্ষা ইসলামিক স্টাডিজ-এর অঙ্গীভূত হবে, যা ইচ্ছাধীন বিষয় হিসাবে শিক্ষা দেওয়া হবে।
৪) বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইসলামিক শিক্ষাকে ইচ্ছাধীন বিষয় হিসাবে গণ্য করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হলো জ্ঞান বৃদ্ধি ও গবেষণার উন্নয়ন, তাই বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে ইসলামিক শিক্ষার সর্বোৎকৃষ্ট শ্রেণীর আলিম সৃষ্টি করতে হবে, যারা ইসলামের ব্যাখ্যা দানে ও আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জের মুকাবিলা ও আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজের প্রয়োজন মেটানোর উপযোগী চিন্তাধারা হিসাবে ইসলামকে পেশ করতে সক্ষম হবে। তাই অন্যান্য বিষয়ের মত ধর্মীয় বিষয়েও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে সর্বোৎকৃষ্ঠ শ্রেণীর আলিম সৃষ্টির কাজ করতে হবে। তারা মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনে ধর্ম কি ভূমিকা গ্রহণ করেছে, তা তাদের সামনে শক্তিশালীভাবে পেশ করতে সক্ষম হবেন।
ইসলামী শিক্ষাকে বাস্তব জীবনের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আনার উপর আমরা সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছি। প্রকৃতিক ধর্ম হিসাবে ইসলামের বৈজ্ঞানিক আবিস্কার ও উদ্ভাবন থেকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার অগ্রগতি, প্রাকৃতিক নিয়মের উদঘাটন ব্যতীত আর কিছুই নয়। ইসলামের তাৎপর্য শাশ্বত ও অবিনশ্বর। যুগে যুগে স্বাভাবিক প্রয়োজনে এর নতুন রূপ ও নতুন উপলব্ধির সন্ধান করতেই হবে। (মাদরাসা শিক্ষা, পৃঃ ২৩৯-২৪৮)
ইসলামিক অ্যারাবিক বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন ১৯৬৩-৬৪ সাল
তদানীন্তন পুর্ব পাকিস্থানের মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, আলিম-উলামা ও ইসলামী চিন্তাবিদদের দাবী-দাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে, পুর্ব পাকিস্থান সরকারী মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়ন এবং ইসলামী শিক্ষা ও গবেষণার জন্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ডঃ এস, এম, হোসাইন কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন ১৯৬৪ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর, কর্তৃপক্ষের নিকট রিপোর্ট পেশ করেন। কমিটির কর্ম পরিধির আলোকে তদানীন্তন পুর্ব পাকিস্থানে একটি ইসলামিক এরাবিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশসমূহের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল নিম্নরূপ–
*এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হবে ‘ইসলামিক এরাবিক বিশ্ববিদ্যালয়।
*এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ধরণ হবে পাঠ দানকারী, অনুমোদন দানকারী ও আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়।
*যতদিন ইসলামিক এরাবিক বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব বাসস্থান, আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা না হবে, ততদিন আরবী ও ইসলামিক স্টাডিজের কার্যক্রম মাদরাসা-ই-আলিয়ায় চালু করা যেতে পারে। বাকি অনুষদসমূহ নিজস্ব ক্যাম্পাসে গেলে খোলা হবে।
*ইসলামিক এরাবিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাথমিকভাবে ৪টি অনুষদ খোলা হবেঃ আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ, কলা ও বাণিজ্য অনুষদ, বিজ্ঞান অনুষদ, শিক্ষা অনুষদ।
*প্রস্তাবিত ইসলামিক এরাবিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হবে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, যেমন মিশরের আজ আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, বৃটেনের অক্সফোর্ড প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোগত চিন্তা-চেতনা নিয়ে এমনভাবে উহার শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচী সমৃদ্ধ করা, যা অধ্যয়নে শিক্ষার্থীরা আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সাথে ইসলামিক জ্ঞানের সমন্বয় করতে পারবে।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই কমিশন আলোর মুখ দেখতে পায়নি। এদিকে মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকগণ তাদের বিভিন্ন দাবী-দাওয়া নিয়ে রাজপথে অবস্থান নেন। রাজপথ ক্রমান্বয়ে আরও উত্তপ্ত হতে থাকে। ছাত্রদের সমস্যার সাথে জাতীয় সমস্যা যোগ হতে থাকে। আন্দোলনের এক পর্যায়ে ছাত্র-জনতা ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী পুলিশের সাথে সমগ্র পাকিস্থানে কমবেশি সংঘর্ষ শুরু হয়। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ছাত্রদের সমস্যা নিরসনকল্পে, সরকার আরও একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয়”। (মাদ্রাসা শিক্ষা, পৃঃ ২৪৯-২৫০)
বিচারপতি হামিদুর রহমান কমিশন ১৯৬৬ সাল
১৯৬৪ সালে ছাত্রদের সমস্যা ও তাদের কল্যাণ তথ্যানুসন্ধান ও সুপারিশের জন্য, পাকিস্থান সরকার একটি কমিশন নিয়োগ করেন ‘The Commission on Students Problems and Welfare 1966’ ‘ছাত্র সমস্যা ও কল্যাণ কমিশন ১৯৬৬’। এই কমিশন ছাত্রদের সমস্যাবলী তদন্ত করে সরকারের নিকট একটি রিপোর্ট পেশ করেন ১৯৬৬ সালে।
উক্ত রিপোর্টে মাদ্রাসা শিক্ষা সম্পর্কে যে আলোচনা এসেছে তার কিছু অংশ ছিল নিম্মরুপঃ “পুর্ব পাকিস্তানে কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে মাদ্রাসা নামে পরিচিত। মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে সেগুলোতে ইসলামিক বিষয়াদি পড়ানো হয়ে থাকে। বিভিন্ন সময়ে এই মাদ্রাসাসমূহের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচীর পরিবর্তন হয়ে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। বর্তমানে একটি স্কীম মাদ্রাসাসমূহকে সাধারণ স্কুল শিক্ষার সাথে একত্র করার চেষ্ঠা চলছে। এমনকি ওল্ড স্কীম মাদ্রাসাসমূহে গণিত, ইতিহাস, ভূগোল, পদার্থ বিজ্ঞান, ইংরেজি ও বাংলা বর্তমানে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যদিও এই শিক্ষার অনেকাংশই এখনও ইসলামী বিষয় রয়েছে। এই সুযোগে কিছু শিক্ষার্থী আলিম, ফাজিল পাস করে উচ্চ শিক্ষা লাভের পর সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। পশ্চিম পাকিস্থানে প্রাথমিক কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলোকে মক্তব বলে অভিহিত করা হয় এবং আরবী ও ইসলামী বিষয়সমূহ গোড়া থেকেই পড়ানো হয়ে থাকে। সেখানে কিছু উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্র আছে। যেগুলোকে দারুল উলুম বলা হয়। এই প্রতিষ্ঠানসমূহের বৈশিষ্ট এই যে, এখান থেকে পাঠ শেষে খাতিব, ইমাম ও ধর্মীয় প্রশিক্ষক বের হয়। কিছু লোক আমাদের পুর্বে বলেছিল এই দুই ধারার শিক্ষা একত্র করে সাড়া দেশে একই শিক্ষা চালু করার জন্য। জাতীয় শিক্ষা কমিশন শিক্ষা পুনর্গঠনের সুপারিশের প্রথমেই বলেছিল ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং এরপর থেকেই ধর্মীয় শিক্ষা ঐচ্ছিক বিষয় হিসাবে থাকবে। পরবর্তী উচ্চ শিক্ষা গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বা দারুল উলুম করতে পারে।
আমাদের নিজস্ব মতামত হল (শিক্ষা কমিশন), সমগ্র দেশের প্রাথমিক শিক্ষা একইভাবে প্রবর্তিত হবে। জাতীয় চেতনা, বিশ্বাস ও বিশ্ব অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রাথমিক শিক্ষা গঠিত হবে। পুনর্গঠিত মাদ্রাসা শিক্ষার কিছু নির্দেশনা এই স্কীমে এসেছে, কিন্তু এটা সম্পুর্ণরুপে একীভূত নয়। প্রাথমিক শিক্ষার জন্যে মাদ্রাসা/মক্তবের প্রয়োজনীয়তা নেই। শুধু এই পর্যায়ে যে, যদি দেশের জনসাধারণ পছন্দ করে তবে তা থাকবে। অতিরিক্ত হিসাবে ধর্মীয় বিষয় মাধ্যমিক পর্যায়ে অনুমোদন দেওয়া যায় এবং জাতীয় ভাষা দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে মাদ্রাসা পর্যায়ে থাকবে পারে।
আমাদের ধর্মীয় ব্যক্তিগণ অবশ্যই দুরদর্শী এবং বিশ্ব সম্পর্কে অবগত আছেন এবং এই বিষয়ে অগ্রসর মানব জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যক্রম সম্পর্কেও জানেন। কমপক্ষে তারা জানেন এবং বুঝেন যে, তাদের শিক্ষা অসম্পুর্ণ ও মতবাদ সর্বস্ব। (মাদরাসা শিক্ষা, পৃঃ ২৫১-২৫৩)
নতুন শিক্ষানীতি ১৯৬৯, নুরখান কমিশন
এই অঞ্চল দখল করার পর, বৃটিশ শাসকরা তাদের সংকীর্ণ উদ্দেশ্যে যে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছিল, তা এই সময় পর্যন্ত চলছিল, যদিও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সময় উন্নয়নের প্রয়োজনে তা পুনর্গগঠনের চেষ্ঠা করা হয়। অশিক্ষা খুব শক্তভাবে দখল করেছিল এবং এটা ছিল সরল জ্ঞানের প্রতি অসঙ্গত ঝোঁক। কারিগরি ও ভকেশনাল শিক্ষার সুযোগ খুব কঠিন ছিল। এই বিষয়ে বিভাগীয় কোন পরিকল্পনা ও শিক্ষাক্রমের সমন্বয় ছিল না। এছাড়া শিক্ষা পদ্ধতির উন্নয়ন ও বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার অসামঞ্জস্য দূরীকরণ, সমন্বয় সাধন, সুযোগ-সুবিধার নিশ্চ্যতার জন্য দেশব্যাপী দাবী উঠেছিল। পাকিস্থান সরকার এসব বিষয় নিস্পত্তি করে একটি নতুন শিক্ষানীতির ঘোষণা দেয়। নতুন এই শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল এম, নুর খান।
১৯৬৯ সালে দেশের সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা, একদল বিশেষজ্ঞ দ্বারা পরীক্ষা করানো হয়। ফলে এই নিরীক্ষণ প্রতিবেদন দ্বারা একটি নতুন শিক্ষা নীতির সূচনা হয়।
এই শিক্ষানীতির লক্ষ্য ছিল জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষা পুনরুদ্ধার এবং বিভিন্ন মুখী শিক্ষাধারার মধ্যে সমন্বয় বিধান করে মান উন্নয়ন করা। নতুন শিক্ষানীতিতে আন্তর্জাতিক অবস্থার আলোকে প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষা পুনর্বিন্যাস ও গণমুখী করা হয়েছে। বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার উপর বড় ধরণের পরিবর্তন আনা হয়েছে। সাধারণ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও মানবিক শিক্ষার মধ্যে সমতা বিধানের কথা বলা হয়েছে। এই প্রস্তাবনায় একটি জাতীয় গবেষণা কেন্দ্র খোলা এবং উদ্যমী ও যুবক শ্রেণীর বিজ্ঞানীদের গুরুত্বপুর্ণ বিষয়াদি নিয়ে গবেষণার জন্য ফেলোশীপের কথা বলা হয়েছে। ইসলামাবাদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দুটি জাতীয় আধুনিক ভাষা ইন্সটিটিউট স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়, যাতে আধুনিক শিক্ষা ও শিক্ষকতায় ভাষা ব্যবহারের নতুন টেকনিক আবিস্কার করা যায়।
ধর্মীয় শিক্ষা সম্পর্কে এই রিপোর্টে বলা হয়ঃ আমাদের দেশে দুটি শিক্ষাধারা পাশাপাশি চলছে। একটি স্কুলের সাধারণ শিক্ষাধারা অন্যটি মাদ্রাসার ধর্মীয় শিক্ষাধারা। এই দুটি ধারার সমন্বয় করা যেতে পারে। দশম শ্রেণী পর্যন্ত স্কুলের সাধারণ শিক্ষা ধারায় ইসলামিয়াত আবশ্যিক বিষয় হিসাবে নির্ধারণ করে, মাদ্রাসা শিক্ষাক্রমে গণিত ও বিজ্ঞান আবশ্যিক হিসাবে নির্ধারণ করে, নতুন শিক্ষানীতিতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইসলামিক গবেষণার জন্যে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ নতুন শিক্ষানীতির লক্ষ্য হলো জাতীয় পর্যায়ে বিদেশি মিশনারীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যা সাধারণ শিক্ষাকে উৎসাহিত করছে তাদেরকে সম্পুর্ণরুপে উচ্ছেদ করা।
এই রিপোর্টে মাদ্রাসা শিক্ষা সম্পর্কে আরো বলা হয়ঃ পুর্ব পাকিস্তানে ৪ হাজারের উপরে মাদ্রাসা আছে। এর মধ্যে ৩ হাজারের মত শুধু প্রথমিক শিক্ষার জন্যে, ১ হাজারের মত মাধ্যমিক পর্যায়ের এবং অল্প কিছু মাদ্রাসায় উচ্চ মাধ্যমিক ও কামিল পর্যায়ের কোর্স পড়ানো হয়।
প্রত্যেক প্রদেশে মাদ্রাসা পরিচালনার জন্যে আইনসম্মত প্রশাসনিক বোর্ড গঠন করে মাদ্রাসার শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচী, পরীক্ষা পদ্ধতি, পাঠ্যপুস্তক তৈরি ইত্যাদি কাজ সম্পন্ন করে মাদ্রাসা শিক্ষার পুনর্গঠন ও দ্রুত উন্নয়নের জন্য পরামর্শ ও নির্দেশনা প্রদান করেন।
এই কমিটির প্রস্তাবিত বিধিমালা নিরীক্ষণের জন্য সাধারণ শিক্ষা ও উলামা কেরাম উভয় পর্যায়ের প্রতিনিধি আহবান করা হয়। তারা বিভিন্ন বিষয়ে একমত হয়েই এই শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচী অনুমোদন করেন। বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষা বিধিবদ্ধ হলো, এখন থেকে মাদ্রাসা বোর্ডকে সেকেন্ডারি বোর্ডের মর্যাদা দেওয়া হলো। এই বোর্ড নতুন মাদ্রাসার মঞ্জুরি ও পরীক্ষা পরিচালনা করবে।
যখন মাদ্রাসা শিক্ষার পুনর্গঠন ও উন্নতির জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমগুরুত্ব পেল, তখন সাধারণ শিক্ষার দশম শ্রেণী পর্যন্ত আবশ্যিক বিষয়সমূহ ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আবশ্যিক করা হলো।
উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ শক্তিশালী করতে হবে। যাতে ইসলামী শিক্ষায় যোগ্য লোক তৈরি হতে পারে। এই বিভাগের যোগ্য লোকেরা যেন জ্ঞান-বিজ্ঞানে আধুনিক বিশ্বের যে কোন চ্যালেঞ্জ মুকাবিলা করতে সক্ষম হয়। এই প্রস্তাব করা হয়েছে নির্ধারিত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য। যেখানে ইসলামিক স্টাডিজের পূর্ণাংগ ইন্সিটিটিউশন, প্রশিক্ষণ কর্মসুচি, গবেষণা ও উন্তমানের প্রকাশনার ব্যবস্থা থাকবে।
ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই সাধারণ শিক্ষাধারার সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ অবস্থানে রাখতে হবে। শিক্ষাক্রমকে পুনঃপরিকল্পনা নিয়ে তৈরি করতে হবে, যাতে ইসলামী শিক্ষার প্রতিফলন ঘটে, ইসলামী ঐক্য-সংহতির গতি সঞ্চার হয়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রাণিত হয়।
উচ্চ পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে এই বিভাগ থেকে তৈরি ব্যক্তি শুধু ধর্ম সম্পর্কে মহাজ্ঞানী না হয়, বরং সেই সাথে সমকালীন বিশ্ব চ্যালেঞ্জের মুকাবিলায় সে মুসলমানদের পক্ষে পরিপুর্ণ প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। নির্ধারিত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ ইসলামিক স্টাডিজের পরিপুর্ণ ইন্সটিটিউট ও তাতে প্রশিক্ষণ কর্মসুচি, গবেষণা ও উন্নতমানের প্রকাশনা থাকবে।
তবে আফসোসের বিষয় যে, এই ধরণের কমিটি/কমিশনের টানাপড়েনে পাকিস্থানের ২৪ বছর কেটে গেল। প্রতিটি কমিটি বা কমিশনেই মাদ্রাসা শিক্ষা মান উন্নয়নের কিছু যুক্তিসঙ্গত প্রস্তাব থাকলেও, তা বাস্তবায়নের কোন পদক্ষেপের পরিবর্তে আরও একটি কমিটি গঠন করে দায়িত্ববান ব্যক্তি সেজে বসেছিল। ফলে পাকিস্থানের ২৪ বছর মাদ্রাসা শিক্ষার যাত্রা যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, অনেক পথ ঘুরেফিরে আবার সেখানেই ফিরে এসেছিল। (মাদরাসা শিক্ষা, পৃঃ ২৫৩-২৫৮)
শিক্ষা কমিশনসমূহের মূলকথা
ব্রিটিশ আমলের পরে ও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে, পাকিস্তান আমলের স্থায়িত্ব ছিল ২৪ বছর। এই সময়ের মধ্যে তুলনামূলক ভাবে অনেক শিক্ষা কমিটি/কমিশন গঠিত হয়, যেমন–
১. সৈয়দ মুয়াজ্জেম উদ্দীন কমিটি ১৯৪৬
২. মাওলানা আকরম খা কমিটি ১৯৪৯
৩. আশরাফ উদ্দীন চৌধুরি কমিটি ১৯৫৫
৪. আতাউর রহমান খান শিক্ষা কমিটি ১৯৫৭
৫. এস এম শরীফ কমিশন ১৯৫৮ সাল
৬. ইসলামিক এরাবিক বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৩-৬৪
৭. বিচারপতি হামিদুর রহমান কমিশন ১৯৬৬
৮. নুরখান কমিশন ১৯৬৯
এই সকল শিক্ষা কমিশনের কর্মকান্ডের পর্যালোচনা করলে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য উপযুক্ত ও উপকারী সুপারিশ যেমন পাওয়া যায় তেমনি ইসলামী শিক্ষার জন্য নেতিবাচক সুপারিশও সেখানে দেখা যায়।
সৈয়দ মুয়াজ্জেম উদ্দীন কমিটির সুপারিশে একটি মসুলিম ইউনিভারসিটি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি, ‘মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেঙ্গল’ নামে একটি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও ‘বেঙ্গল টেক্সট বুক বোর্ড’এর অধীনে একটি সাব-কমিটি গঠন করে মাদ্রাসার জন্য নতুন পাঠ্য পুস্তক নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এবং মাদ্রাসার শিক্ষকদেরকে যোগ্য ও দক্ষ করে তোলার উদ্দেশে ট্রেনিং কলেজ স্থাপন ও উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে অন্যান্য মুসলিম দেশে শিক্ষকদের পাঠানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে সেই সাথে ওল্ড স্কীম ও নিউ স্কীম মাদ্রাস্র প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের সিলেবাস সমন্বয় করে তা প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে ন্যস্ত করার প্রস্তাবও করা হয়েছিল।
মাওলানা আকরাম খাঁ কমিটি দেশে বিদ্যমান তিন ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থা অর্থাৎ সাধারণ, ওল্ড স্কীম ও নিউ স্কীম মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে, ওল্ড স্কীম মাদ্রাস শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা এইভাবে নির্ধারণ করেছিলেনঃ দেশের রাষ্ট্রভাষা যখন ফার্সি, তখন ওল্ড স্কীম মাদ্রাসা শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে দেশের প্রশাসনের জন্য ছাত্রদের গড়ে তোলা হতো, কিন্তু যখন ইংরেজি ভাষা ফার্সির স্থলাভিষিক্ত হল, তখন মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার সেই আলোকে করা হল না। শুধুমাত্র ধর্মের প্রতি অনুরাগ থাকার কারণেই এই এই শিক্ষা অব্যাহত থাকল। এই শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অসুবিধা হলো, এর সাথে বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষার কোন সম্পর্ক ছিল না। যদি বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ততা থাকত তাহলে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিতরা নিজের ও সমাজের আরো বেশী উপকারে আসতে পারতো।
এই শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে এটা স্বীকার করা হয় যে, একটি ইসলামিক রাষ্ট্র হিসাবে (পাকিস্থান) শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারণ হওয়া উচিত ছিল। কারণ হিসাবে বলা হয় যে, দেশ বিভাগের পুর্বে, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্র দেওবন্দ, রামপুর, লাখনৌ, দিল্লী, সাহারানপুর সহ উত্তর ভারত ও অন্যান্য স্থানে উচ্চ শিক্ষার জন্য যাতায়াত করতো। কিন্তু বিদেশি এলাকায় আমাদের স্কলারদের পড়াশুনা সহজসাধ্য ছিল না।
এই রিপোর্টে সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষার সাথে ওল্ড স্কীম মাদ্রাসা শিক্ষার সমন্বয়ের ব্যাপারে বলা হয় যে, শিক্ষার্থীর বয়স ১৪ বছর পর্যন্ত বা জুনিয়র স্কুল স্টেজ (৮ম শ্রেণী) পর্যন্ত শিক্ষা হবে এক ধরণের। জুনিয়র স্কুল স্টেজ পাসের পর ছাত্ররা তাদের নিজ বুদ্ধির প্রকাশ ঘটাতে পারবে। যদি সে ইসলামী শিক্ষা পছন্দ করে তবে ইসলামী শিক্ষার উপর উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে লাভবান হতে পারবে।
মাদ্রাসার ছাত্রদের স্বাবলম্বী এবং স্ব-উপার্জিত জীবন যাপনে উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে, সর্বপ্রথম মাদ্রাসা শিক্ষায় ভকেশনাল বিষয় যেমন তিব্বিয়া, দর্জি বিজ্ঞান, কার্পেন্টারি, সোপ মেকিং ইত্যাদি যুক্ত করা হয়। তবে এই রিপোর্টে বলা হয় যে, জনগণের চাহিদা অনুযায়ী জনপ্রিয় কারিগরি বিষয় যেমন উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, সেই সকল বিষ এখানে স্থান পায়নি, বরং এখানে ক্যালিওগ্রাফি, কম্পোজিটরশীপ ও সাংবাদিকতা এই তিনটি বিষয়ের প্রস্তাব করা হয়।
আতাউর রহমান শিক্ষা পুনর্গঠন কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে, ১৯৫৮ সাল থেকে নিউ স্কীম মাদ্রাসাসমূহ সাধারণ শিক্ষার সাথে একত্রিত হয়ে গেল। একত্রিত হওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারী অনুদান ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অনেক গুণ বেড়ে গেল। অন্যদিকে ওল্ড স্কীম মাদ্রাসার ইবতেদায়ী স্তর সাধারণ শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে একত্রিত হলো। ফলে ওল্ড স্কীম মাদ্রাসার শিক্ষাক্রম প্রাথমিক শিক্ষার পরের ধাপ থেকে শুরু হলো। ১৯৫৮ সাল থেকে ওল্ড স্কীম মাদ্রাসার পাঠ্যসুচিতে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত কোর্স কার্যকরি করা হল।
জাতীয় শিক্ষা কমিশন ১৯৫৯ সাল এস. এম. শরীফ কমিশনের ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপারে এই কমিশনের সুপারিশে ধর্মীয় শিক্ষাদানের তিনটি স্তর উল্লেখ করা হয়। যা ছিল যথাক্রমে বাধ্যতামূলক স্তর, ইচ্ছাধীন স্তর ও গবেষণা স্তর। প্রথম শ্রেণী হতে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত এই ৮ বছর মুসলমান ছাত্রের জন্যে ইসলামিয়াত শিক্ষা হবে বাধ্যতামুলক। এরপরে, ৯ম ও ১০ম শ্রেণীতে ধর্ম শিক্ষাকে ইচ্ছাধীন বিষয় হিসাবে প্রবর্তন করা হবে। ১১শ ও ১২শ শ্রেণীতে ধর্ম শিক্ষা ইসলামিক স্টাডিজ-এর অঙ্গীভূত হবে, যা ইচ্ছাধীন বিষয় হিসাবে শিক্ষা দেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইসলামিক শিক্ষাকে ইচ্ছাধীন বিষয় হিসাবে গণ্য করতে হবে। এবং সেখানে ইসলামিক শিক্ষাকে গবেষণামূলক করতে হবে।
১৯৬৩ সালের ইসলামিক এরাবিক বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সুপারিশে একটি ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় চালু করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। যেখানে ৪টি অনুষদ খোলা হবেঃ আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ, কলা ও বাণিজ্য অনুষদ, বিজ্ঞান অনুষদ, শিক্ষা অনুষদ। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে এই কমিশনের প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হতে পারে নি।
এছাড়া আরো কিছু শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ ও প্রস্তাবনা প্রায় এই ধরণেরই ছিল। এই সকল সুপারিশ ও প্রস্তাবনার ব্যাপারে শেষ কথা হিসাবে যা বলা যায় সেটা অনেকটা এমনঃ “প্রতিটি কমিটি বা কমিশনেই মাদ্রাসা শিক্ষা মান উন্নয়নের কিছু যুক্তিসঙ্গত প্রস্তাব থাকলেও, তা বাস্তবায়নের কোন পদক্ষেপের পরিবর্তে আরও একটি কমিটি গঠন করে দায়িত্ববান ব্যক্তি সেজে বসেছিল। ফলে পাকিস্থানের ২৪ বছর মাদ্রাসা শিক্ষার যাত্রা যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, অনেক পথ ঘুরেফিরে আবার সেখানেই ফিরে এসেছিল”।
