
আবদুল্লাহিল বাকি:
কুরবানি ইসলামের বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি। একজন মুসলমান নির্দিষ্ট পশু কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার চেষ্টা করে। কুরবানির সময় থাকে ঈদের প্রথম দিন থেকে নিয়ে আইয়ামুত তাশরিকের শেষ দিন পর্যন্ত। কুরবানির বিধানের ক্ষেত্রে সকল মাযহাবের ওলামায়ে কেরামের ঐক্যমত্য অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মধ্যে শাফেয়ী, মালিকি ও হাম্বলী মাযহাবে কুরবানিকে বলা হয় সুন্নতে মুয়াক্কাদা। আর হানাফী মাযহাবে বলা হয় ওয়াজিব। ইবনে তাইমিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহিওকুরবানিকে ওয়াজিব বলেছেন। ইমাম আহমদ ও ইমাম মালিক বিন আনাস থেকেও ওয়াজিব হওয়ার পক্ষে একটি মত বর্ণিত রয়েছে। আর শিয়ারা মনে করে, কুরবানি মুস্তাহাবে মুআক্কাদ। এটা তাদের একটা পরিভাষা, এটা দ্বারা সাধারণত তারা সুন্নিদের ‘সুন্নাতে যায়েদা’ পরিভাষা বুঝাতে চায়।
কুরবানির ছয়টি মৌলিক উদ্দেশ্য
‘আল আযহার ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিটাল ফতওয়া’র সাইটে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে কুরবানির ছয়টি হিকমত উল্লেখ করা হয়েছে—
১. কুরবানি হলো ধন ও প্রাণের নেয়ামতের ক্ষেত্রে আল্লাহর শোকর আদায় করা।
২. কুরবানি হলো ইসলামের একটি চিহ্ন বা বৈশিষ্ট্য। আল্লাহর নৈকট্যলাভ ও মোনাজাতের জন্য কুরবানির বিধান দেয়া হয়েছে।
৩. কুরবানি হলো নিজে, নিজের পরিবার ও গরিব মিসকিনদের উপর বদান্যতা। আত্মীয়তার সম্পর্ক দৃঢ় করা, মেহমানকে সম্মান করা, প্রতিবেশীকে ভালোবাসা ও দরিদ্রদেরকে সাদাকা আদায়—কুরবানির মাধ্যমেও সম্পন্ন হয়।
৪. কুরবানি হলো হযরত ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ আলাইহিস সালামের সুন্নতের পুনরুজ্জীবন।
৫. কুরবানি আল্লাহর ভালোবাসার কাছে নিজের প্রবৃত্তি ভালোবাসা ও কামনা-বাসনার বিসর্জন।
৬. কুরবানি ইসলামের এমন একটা বৈশিষ্ট্য, যার মাধ্যমে মুমিন সবরের পাঠ নিতে পারে। কুরবানির সময় ইব্রাহিম ও ইসমাইল আলাইহিমাস সালামের সবর, আত্মত্যাগ ও আল্লাহর ভালোবাসার কথা মনে পড়ে যায় একজন খাঁটি মুমিনের। তাই সে সবরের চাদরে আবৃত হয়ে ওঠে।
হিকমত বর্ণনার প্রাসঙ্গিকতা
ইসলামের সকল বিধি বিধানের পেছনে একটা মহৎ উদ্দেশ্য লুকায়িত। অনেক ক্ষেত্রে কোরান ও হাদিসে বিভিন্ন হুকুম আহকাম বর্ণনার সময় তার ফায়দা উল্লেখ করা হয়েছে, যেন দুর্বল বান্দা বিধি বিধান পালনে আগ্রহ বোধ করে।
মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিকগণও আল্লাহ-প্রদত্ত জ্ঞানের আলোকে বিভিন্ন বিধি বিধানের উপযোগিতা ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করার প্রয়াস চালিয়েছেন। উদ্দেশ্য ছিল, মুসলমানদেরকে বিধি বিধান পালনে আগ্রহী করে তোলা আর অবিশ্বাসীদের মনে যেন বিশ্বাসের আলো জ্বলে উঠে।
বিভিন্ন বিধি বিধানের উদ্দেশ্য বর্ণনার ক্ষেত্রে অনেকে প্রান্তিকতার সম্মুখিন হয়েছেন। ইসলামের মৌলিক ও সামগ্রিক ধারণার বাইরে গিয়ে তারা উদ্দেশ্যের ব্যাখ্যা করেছেন। এতে ভুল বোঝাবুঝির সংকট তৈরি হয়েছে। মূলধারার আলেমগণ সাধারণত ইসলামের সামগ্রিক দিক, মৌলিক রূহ ও মেজায রক্ষা করেই উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন।
সালাফ বলতে আমরা পারিভাষিক অর্থে যাদেরকে বুঝি, অর্থাৎ- সাহাবা, তাবেঈন, তাবে’ তাবেঈন–তারা কখনোই শরীয়ার বিভিন্ন হুকুম আহকামের উদ্দেশ্য ও উপযোগিতা বর্ণনা করতে আগ্রহী হননি। তারা এটাকে বিভিন্ন কারণে আশংকাজনক বিষয় হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে ইসলামের বিশ্বাস ও বিধি বিধানের উপর যিন্দিক, নাস্তিক ও গ্রীকপন্থী দার্শনিকদের হামলার কারণে আলেমগণ এপথে এগুতে বাধ্য হয়েছেন। বিশ্বাসের উত্তর প্রদান ও উপযোগিতা বর্ণনার জন্য ইলমে কালামের অস্তিত্ব হলো। আর বিধি বিধানের উদ্দেশ্য বর্ণনার জন্য গঠিত হল ‘মাকাসিদুশ শারিয়া’।
কুরআনে কুরবানির পরিভাষা
কুরআনুল কারিমে পশুর কুরবানি বোঝাতে কয়েকটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ১. কুরবান, ২. মানসাক, ৩. নাহর।
কুরবান শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে সূরা মায়েদার ২৭ নং আয়াতে। আল্লাহ বলেছেন,
وَ اتۡلُ عَلَیۡہِمۡ نَبَاَ ابۡنَیۡ اٰدَمَ بِالۡحَقِّ ۘ اِذۡ قَرَّبَا قُرۡبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنۡ اَحَدِہِمَا وَ لَمۡ یُتَقَبَّلۡ مِنَ الۡاٰخَرِ ؕ قَالَ لَاَقۡتُلَنَّکَ ؕ قَالَ اِنَّمَا یَتَقَبَّلُ اللّٰہُ مِنَ الۡمُتَّقِیۡنَ ﴿۲۷
অর্থ: তুমি তাদেরকে (আহলে কিতাবদেরকে) আদমের পুত্রদ্বয়ের (হাবীল ও কাবীলের) ঘটনা সঠিকভাবে পাঠ করে শুনিয়ে দাও; যখন তারা উভয়েই এক একটি কুরবানি উপস্থিত করল এবং তন্মধ্য হতে একজনের (হাবীলের) কুরবানি কবুল হল এবং অপরজনের কবুল হলনা। অপরজন বলতে লাগল, আমি তোমাকে নিশ্চয়ই হত্যা করব; প্রথমজন বলল, আল্লাহ আল্লাহভীরুদের আমলই কবুল করে থাকেন।
মানসাক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে সূরা হাজের ৩৪ নং আয়াতে। আল্লাহ বলেছেন,
وَ لِکُلِّ اُمَّۃٍ جَعَلۡنَا مَنۡسَکًا لِّیَذۡکُرُوا اسۡمَ اللّٰہِ عَلٰی مَا رَزَقَہُمۡ مِّنۡۢ بَہِیۡمَۃِ الۡاَنۡعَامِ ؕ فَاِلٰـہُکُمۡ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ فَلَہٗۤ اَسۡلِمُوۡا ؕ وَ بَشِّرِ الۡمُخۡبِتِیۡنَ ﴿ۙ۳۴﴾
অর্থ: প্রত্যেক জাতির জন্য আমি কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি; যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে, যে সমস্ত জন্তু তিনি রিয্ক হিসেবে দিয়েছেন তার উপর। তোমাদের ইলাহ তো এক ইলাহ; অতএব তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ কর; আর অনুগতদেরকে সুসংবাদ দাও।
নাহর শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে সূরা কাওসারে। আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْأَبْتَرُ
অর্থ: নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাউসার (বা প্রভূত কল্যাণ) দান করেছি। অতএব আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামায আদায় পড়ুন এবং কুরবানি করুন। নিশ্চয় আপনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীই লেজকাটা, নির্বংশ।
ইসলামের কুরবানির ধারণা একটা উচ্চতর পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতার জানান দেয়। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানি নামক সুন্নতে ইব্রাহিমীর যে চিত্র আমাদের সামনে ফুটিয়ে দিয়েছেন, তাতে করে ইখলাস ও তাকওয়ার গুরুত্ব উঠে আসে। কুরবানি ও তাকওয়া পরস্পর পরস্পরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রতিটি মুসলমান কুরবানির দিবসে স্মরণ করে ইব্রাহিম ও ইসমাইল আলাইহিমাস সালামের আত্মত্যাগের কথা। মানবতা ও মহানুভবতায় নুয়ে পড়ে তাদের অন্তর।
কুরবানির উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি আদায়। শয়তানি শক্তিকে পরাভূত করা। কুরবানির মৌলিক সঞ্জীবনী হলো, মানুষকে তাকওয়ার পাঠ দান। কুরআনের মুখে আমরা জানতে পারি— আল্লাহর কাছে কুরবানির গোশত ও রক্ত পৌঁছে না। তার কাছে বরং পৌঁছে মানুষদের পক্ষ থেকে কেবল তাকওয়া।
সূরা হজের ৩৭ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় মাওলানা আমিন ইহসান ইসলাহী লিখেছেন— ‘যেই কুরবানি মানুষ পেশ করে, তা কেবলই তার নিজের হেদায়েতের উদ্দেশ্যে। আল্লাহর কাছে এর গোশত ও রক্ত গিয়ে পৌঁছে না। এগুলো মানুষের কাছেই থাকে। আল্লাহর কাছে মানুষের মনে লুকিয়ে থাকা পরহেজগারী ও তাকওয়া পৌঁছে। এটার উদাহরণ হল— যেমন কোন বাদশার পায়ের সামনে গিয়ে তার আদেশে কেউ মাথা লুটালো। কিন্তু বাদশা সম্মানের সাথে তার মাথাকে উঠিয়ে দিলো। কেবল সেই মানুষের মনের আকুতিটুকু গ্রহণ করে নিল বাদশাহ।’ (তাদাব্বুরে কুরআন)
হজের সাথে কুরবানির প্রাসঙ্গিকতা
সূরা হজের ২৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন— ‘যাতে তারা তাদের জন্য (এখানে রাখা দুনিয়া ও আখিরাতের) কল্যাণগুলো প্রত্যক্ষ করতে পারে আর তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যে রিযক দান করেছেন, নির্দিষ্ট দিনগুলোতে তার উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে। কাজেই তোমরা (নিজেরা) তাত্থেকে খাও আর দুঃস্থ অভাবীদের খাওয়াও।’
অর্থাৎ দূর-দূরান্ত পথ অতিক্রম করে তাদের এই উপস্থিতি তাদেরই উপকারের নিমিত্ত। এখানে منافع শব্দটি نكرة ব্যবহার করে ব্যাপক অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তন্মধ্যে দ্বীনি উপকার তো অসংখ্য আছেই; পার্থিব উপকারও অনেক প্রত্যক্ষ করা হয়। চিন্তা করলে এ বিষয়টি সাধারণভাবে প্রত্যক্ষ করা যাবে যে, হজের দ্বীনি কল্যাণ অনেক; তন্মধ্যে নিম্নে বর্ণিত কল্যাণটি কোন অংশে কম নয়। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য হজ্জ করে এবং তাতে অশ্লীল ও গোনাহর কার্যাদি থেকে বেঁচে থাকে, সে হজ্জ থেকে এমতাবস্থায় ফিরে আসে যেন আজই মায়ের গর্ভ থেকে বের হয়েছে”; [বুখারীঃ ১৪৪৯, ১৭২৩, ১৭২৪, মুসলিমঃ ১৩৫০] অর্থাৎ জন্মের অবস্থায় শিশু যেমন নিষ্পাপ থাকে, সে-ও তদ্রুপই হয়ে যায়।
তাছাড়া আরেকটি উপকার তো তাদের অপেক্ষায় আছে। আর তা হচ্ছে, আল্লাহর সন্তুষ্টি। [ইবন কাসীর] অনুরূপভাবে হজের মধ্যে আরাফাহ, মুযদালিফাহ, ইত্যাদি হজের স্থানে অবস্থান ও দো’আর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ক্ষমা লাভ করা যায়। [কুরতুবী] তবে এখানে কেবলমাত্র দ্বীনি কল্যাণের কথাই বলা হয়নি, এর সাথে পার্থিব কল্যাণও সংযুক্ত রয়েছে। এ হজ্জের বরকতেই আরবের যাবতীয় সন্ত্রাস, বিশৃংখলা ও নিরাপত্তাহীনতা অন্তত চারমাসের জন্য স্থগিত হয়ে যেতো এবং সে সময় এমন ধরনের নিরাপত্তা লাভ করা যেতো। যার মধ্যে দেশের সকল এলাকার লোকেরা সফর করতে পারতো। এবং বাণিজ্য কাফেলাও নিরাপদে চলাফেরা করতে সক্ষম হতো। এজন্য আরবের অর্থনৈতিক জীবনের জন্যও হজ একটি রহমত ছিল। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “তোমাদের রব-এর অনুগ্রহ সন্ধান করাতে তোমাদের কোন পাপ নেই।” [সূরা আল বাকারাহ: ১৯৮] অর্থাৎ ব্যবসা। [কুরতুবী] ইসলামের আগমনের পরে হজের দ্বীনি কল্যাণের সাথে সাথে পার্থিব কল্যাণও কয়েকগুণ বেশী হয়ে গেছে। প্রথমে তা ছিল কেবলমাত্র আরবের জন্য রহমত, এখন হয়ে গেছে। সারা দুনিয়ার তাওহীদবাদীদের জন্য রহমত।
দুৰ্দশাগ্ৰস্ত অভাবীকে আহার করানোর ব্যাপারে যা বলা হয়েছে তার অর্থ এ নয় যে, সচ্ছল বা ধনী ব্যক্তিকে আহার করানো যেতে পারে না। বন্ধু, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন অভাবী না হলেও তাদেরকে কুরবানীর গোশত দেওয়া জয়েয। এ বিষয়টি সাহাবায়ে কেরামের কার্যাবলী থেকে প্রমাণিত। আলকামা বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আমার হাতে কুরবানির পশু পাঠান এবং নির্দেশ দেন, কুরবানির দিন একে যবেহ করবে, নিজে খাবে, মিসকীনদেরকে দেবে এবং আমার ভাইয়ের ঘরে পাঠাবো। [আস-সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী: ১০২৩৮] ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাও একই কথা বলেছেন অর্থাৎ একটি অংশ খাও, একটি অংশ প্রতিবেশীদেরকে দাও এবং একটি অংশ মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করো। (ইবন কাসীর)
কুরবানির মধ্যে আল্লাহর একত্ববাদের শিক্ষাও লুকিয়ে রয়েছে। এজন্যই আল্লাহ সুরা হজের ৩০ নং আয়াতে বলেছেন— ‘এটিই বিধান আর কেউ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত পবিত্র বিষয়সমূহকে সম্মান করলে তার রবের নিকট তা-ই তার জন্য উত্তম। আর তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে চতুষ্পদ জন্তু; তবে যা তোমাদের কাছে পাঠ করা হয় সেগুলি ছাড়া। সুতরাং মূর্তিপূজার অপবিত্রতা থেকে বিরত থাক এবং মিথ্যা কথা পরিহার কর।’
কুরবানিকে বৈশ্বিক ও সামগ্রিক বানানোর প্রেক্ষাপট
হজ ফরজ করার পর প্রথম বছর মক্কার কাফেররা হারামের দরজা বন্ধ করে দেয়। তখন মুসলমানরা এটা মেনে নিতে পারছিল না। নবী সা. তাদের এই বেদনা ও দুঃখকে সাময়িকভাবে ঘুচিয়ে দিতে কুরবানির ঈদের আয়োজন করেন। মক্কা বিজয়ের পর এই কুরবানিকে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। যারা কেবল হজ করবে তাদের মধ্যে কুরবানি সীমাবদ্ধ আর থাকেনা। সকল মুসলমান তখন থেকে পশু কুরবানি দিতে থাকে। হজের বাইরেও উন্মুক্ত হয়ে যায় কুরবানির ইবাদত।
কুরবানির প্রকৃত রূহ
কুরবানির যে পদ্ধতি নবীজি শিখিয়ে গিয়েছেন, সেটা হল ঈদের নামাজের পর কুরবানি করতে হয়। আর কুরবানির আগে বলতে হয়, ‘আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ কেবলই আল্লাহর জন্য।’ এখানে একত্ববাদের বাণী উচ্চারিত হচ্ছে। যেখানে জাহেলী সমাজে কুরবানি দেয়া হত গাইরুল্লাহর জন্য, সেখানে ইসলাম এসে সেটা কেবলই আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। এই কথার মধ্যে এই স্বীকৃতিও রয়েছে যে, শুধুমাত্র আমাদের কুরবানিই নয়, আমাদের সত্ত্বা, দুনিয়ার আরম্ভ ও সমাপ্তি সবই আল্লাহর হাতে। যেই পশু আমরা কুরবানি দিচ্ছি, এটা কেবল তার নেয়ামতের শুকরিয়া।
আধ্যাত্মিক দিক থেকে কুরবানির যৌক্তিকতা
যারা কুরবানি সম্পর্কে ভয় ভীতি বা আশংকার শিকার, তাদের বড় একটা যুক্তি হল, কুরবানিতে বিপুল সম্পদের অপচয় আর ক্ষতি হয়। এ জাতীয় বিপুল অর্থ কুরবানিতে না ব্যয় করে যদি জনকল্যান বা জাতীয় উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ব্যয় করা হয়, তাহলে এতে জাতীয় দারিদ্রতা কমে আসবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, এরকম দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামকে বস্তুবাদী দর্শনে নিরিখের ফল। যে বিষয় কোরআন ও হাদিসের মাধ্যমে সাব্যস্ত, সেটার মধ্যে সম্পদ আর শ্রমের অপচয় দেখা, ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতারই নামান্তর। সম্পদ ও শ্রমের চেয়ে একজন মুসলমানের কাছে তার ঈমান আকিদা রক্ষা করা অতি গুরুত্বপূর্ণ। আর কুরবানির মাধ্যমের পরোক্ষভাবে আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকৃতি ও আল্লাহর ইচ্ছার সামনে নতিস্বীকার করার বিষয়টি জড়িত। জনকল্যান ও জাতীয় সম্পদ রক্ষাও ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শিরিক হতে বেঁচে থাকা মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।
ইসলামের ইবাদতগুলোর যে রূপকাঠামো স্থাপিত হয়েছে আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশে, কোন কিছুই তার প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়। আর্থিক ক্ষয় ক্ষতি বিবেচনা করে যদি বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামের ইবাদতগুলোর বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে কোন ইবাদতই আর স্থির থাকতে পারবে না আপন স্থানে।
হজ সম্পর্কে তখন বলা হবে, হজে প্রচুর অর্থ-বিত্তের ক্ষয়-ক্ষতি, প্রচুর মূল্যবান সময়ের অপচয়, প্রচুর শ্রম নষ্ট। এর পরিবর্তে যদি জাতীয় দারিদ্রতা-বিমোচন ও প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থায় ব্যয় করা হলে এটি উপকারী হতে পারত। এই যুক্তিটা কেবল কল্পিত যুক্তি নয়। উসমানী খেলাফত ধ্বংসের পর নব্য তুর্কিতে এই ধরণের আজগুবি যুক্তির উপর ভিত্তি করে প্রায় পঁচিশ বছর পর্যন্ত হজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।
তেমনিভাবে নামাজে প্রতিদিন সময় অপচয়ের অভিযোগে বন্ধ করে দেয়া হবে নামাজ। একই রকম যুক্তি দেয়া হবে রোজার ক্ষেত্রে। রোজা মানুষের শারীরিক শক্তিতে প্রভাব ফেলে, এই যুক্তিতে বন্ধ হয়ে যাবে রোজা। এভাবে যদি প্রতিটি ইবাদতকে বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে কেউ তাহলে ইসলামের কিছুই আর বাকি থাকবে না।
ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশের পালনই মূল বিষয়। আধ্যাত্মিক দিক থেকে যখন ইসলামের ইবাদতগুলো আদায় করা হয়, তখন সেটার ফলাফল ব্যক্তিগত জীবনে যেমন ইতিবাচক প্রভাব ফেলে তেমনিভাবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নৈতিকতা ও উপযোগিতাকে বর্ধিত করে। এভাবে পরোক্ষভাবে ইসলামের ইবাদতগুলো সামাজিকভাবেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে।
অপচয়ের আশংকা মূলত একটা ধোকা আর একপাক্ষিক দৃষ্টিকোণ ছাড়া আর কিছুই নয়। পৃথিবীতে প্রতিটি জাতিরই কিছু জাতীয় উৎসব ও রেওয়াজ রয়েছে। সেসব সম্মিলিত উদযাপনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। তারা সেটাতে কোন অপচয় দেখে না। কারণ, সাংস্কৃতিক সামাজিক ও নৈতিক দিক থেকে তাদের সমাজ ও জাতির জন্য এই উৎযাপনগুলো অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। আমেরিকার বস্তুবাদ-পূজারী সমাজেও প্রত্যেক বছর ক্রিসমাস অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হচ্ছে। সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেই আয়োজন ও অপচয় করা হয়, সেগুলোর সামনে ঈদুল আজহার সহজ সরল উদযাপন, কিছুই নয়। আবার তাতে আছে আল্লাহর ইচ্ছার সামনে সমর্পণ। তাছাড়া এটি আধ্যাত্মিকতায় পরিপূর্ণ একটি ইবাদত।
এছাড়াও এর মধ্যে বাহ্যিক উপকারও কম নয়, যদিও বাহ্যিক উপকার দেখা আমাদের উদ্দেশ্য নয় কখনোই। আল্লাহ কুরবানি সম্পর্কে বলেছেন, ‘ওয়া লাকুম ফিহা খাইর’ (তোমাদের জন্য তাতে রয়েছে মঙ্গল।) আল্লাহ আরো বলেছেন, ‘কুলু মিনহা ওয়া আতয়িমুল বায়িসাল ফাকির’ (তা থেকে তোমরা নিজেরা আহার করো আর আহার করাও দরিদ্রদের।)
কারণ, কুরবানির মাধ্যমে ধনীদের সম্পদ দরিদ্রদের মাঝেও ভাগাভাগি হয়ে যায়। যারা দুমুঠো অন্ন যোগাতে পথ থেকে পথে ঘুরে ফিরত, তারা বেশ কিছুদিন স্বাচ্ছন্দে দিন কাল যাপন করতে পারে। অপুষ্টিকর খাবার খেয়ে যেই দরিদ্র লোকেরা প্রায়ই বিভিন্ন রোগ ব্যধিতে ভুগে, কুরবানির পর অনেকদিন তারা পুষ্টিকর খাবার পান। মুসলিম সমাজে এমন একজন লোকও পাওয়া যাবে না, যার ঘরে কুরবানির গোশত পৌঁছে না প্রত্যেক বছর।
যারা কুরবানির কারণে পশু আর দুধ, ঘির ঘাটতি নিয়ে বিলাপ করেন, তারা জানেনও না, এসব পশুর ধারাবাহিক ক্রমবর্ধন ঠেকাতে কুরবানির চেয়ে ভাল উপায় আর নেই। খাদ্যযোগ্য উপকারী অসংখ্য গরু হিন্দুত্ববাদী ভারতে যত্মহীন মারা যাচ্ছে। কুকুরের মত অপরিচ্ছন্ন জীবন ধারণ করছে। ভারতে ঠেকানো যাচ্ছে না গরুর ঢল। পাচার হয়ে চলে যাচ্ছে পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে।
যাদেরকে ক্লাসে প্রাণী-বিলুপ্তির ইতিহাস পড়ানো হয়, তারা মনে করে শিকারের কারণেই বুঝি একেকটা প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু গৃহপালিত যেসব পশুকে আল্লাহ কুরবানি করার নির্দেশ দিয়েছেন, সেগুলো আনুপাতিক হারে বেড়েই চলেছে। কোরবানীর কারণে কোন প্রজাতি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, এমন কোন অভিযোগ আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি। বরং যেসব পশুকে বিলুপ্তির ভয়ে শিকার করা থেকে আইনত নিষেধ করা হচ্ছে, সেগুলোর সংখ্যাই কমে যাচ্ছে দিন দিন। এটা হল আল্লাহর বরকতের একটা নমুনা। কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের রিযিকে ও প্রাকৃতিক সম্পদে বরকত দান করেন। সকল কিছুর মধ্যেই আল্লাহর হিকমত ও প্রজ্ঞা লুকায়িত। মানুষের অনুধাবন-ক্ষমতা খুবই কম। এজন্যই বিনা-প্রশ্নে আল্লাহ আদেশ-নিষেধ পালন করে যাওয়াই হল একজন মুমিনের একমাত্র কর্তব্য।
