কুড়িগ্রামে বন্যা: রৌমারী ও রাজিবপুরকে দেখার কেউ নেই

রাকিবুল হাসান নাঈম:

টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হচ্ছে। জিঞ্জিরাম, ধরলা ও হলহলী নদির পানি বৃদ্ধির ফলে রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় ৩৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।। উজানের পাহাড়ি ঢলের লালচে কাদা পানিতে মানুষজন পড়েছেন চরম বিপাকে। দুর্ভোগ বেড়েছে গবাদি পশু-পাখিরও। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, রৌমারী উপজেলায় প্রায় ২২৩ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। কাদামাখা পানিতে তলিয়ে থাকা উঠতি আউশ ধান, পাট, মরিচ, কাউন ও তিলসহ বিভিন্ন সবজি জাতীয় ফসল সম্পূর্ণ নষ্টের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শনিবার (১৮ জুন) পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিস সূত্রে জানা গেছে, ধরলার পানি বিপৎসীমার ২২ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমা ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি ২৩ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ্ আল মামুন জানান, রৌমারী উপজেলায় ২০-২৫ জুনের মধ্যে বড় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল আলম রাসেল জানান, উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এখনো প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি আছে।

রৌমারী উপজেলার কর্তিমারী বাজারের তরুণ আলেম, ব্যবসায়ী, সমাজ সেবক হাফেজ আহমেদ সুলাইমানের সঙ্গে কথা হয়। ফাতেহকে তিনি জানান, কুড়িগ্রামে সবচে অবহেলিত অবস্থায় আছে রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলা। ব্রহ্মপুত্রের এপারে হবার কারণে অধিকাংশ সময় ত্রাণ পৌঁছায় না। যারা ত্রাণ দিতে আসে, তারা ওপারে বিতরণ করেই চলে যায়। কুড়িগ্রামে যারা ত্রাণ বিতরণ করতে যান বলে প্রচারণায় দেখি, তারা মূলত ওপারেই থাকেন। অথচ রৌমারী এবং রাজিবপুরের মানুষ নিদারুণ কষ্টে দিনানিপাত করে। এইযে এখন বন্যা দেখা দিয়েছে, মানুষের এত ফসল সব নষ্ট হয়ে গেছে, তারা খাবে কী। থাকবে কোথায়। বানের জলে ভেসে যাওয়া ছাড়া গতি নেই।

এখানে সরকারি ত্রাণ এসেছে কিনা জানতে চাইলে হাফেজ আহমেদ সুলাইমান বলেন, বৃহস্পতিবার দুপুরে রৌমারী উপজেলায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন এমপি, রৌমারী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল্ল্যাহসহ উপজেলা প্রশাসনের লোকজন শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অল্প।

এই দুই উপজেলায় সমাজসেবায় আলেমদের সামর্থ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই উপজেলা এমনিতেই অবহেলিত জনপদ। এখানের আলেমরা অন্য জেলায় মসজিদ-মাদরাসায় খেদমত করেন। বন্যা হলে তাদের পরিবারেই আগে ত্রাণ দিতে হয়। তারা কাউকে বলতে পারেন না তাদের সঙ্কট। এখানে আলেমদের দুটি সংগঠন আছে। এই দুটি সংগঠনের ব্যানারে আগে অল্প ত্রাণ বিতরণ করেছি। কিন্তু এবার ত্রাণ বিতরণের ব্যবস্থা করতে পারব না বলে মনে হচ্ছে। তবুও দোয়া করছি, আল্লাহ যেন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করে দেন।

রৌমারীর তরুণ এই আলেম আলেমদের দাতব্য সংস্থা আসসুন্নাহ এবং পিসবের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, তাদের কাছে আবেদন থাকবে, তারা যেন এই দুই উপজেলায় আসেন। একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

কথা হয় পিসবের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মাওলানা ইমরান হুসাইনের সঙ্গে। ফাতেহকে তিনি জানান, রৌমারী-রাজিবপুরে আমরা ২০১৭-১৮ সালে গিয়েছি। এরপর আর যাওয়া হয়নি। এবারের বন্যায় চেষ্টা করবেন যাওয়ার জন্য। ইতোমধ্যে একটি টিম প্রস্তুত করছেন কুড়িগ্রামে পাঠানোর জন্য। তবে ইমরান হুসাইন জানান, সবচে বড় সমস্যা হচ্ছে ফান্ডিং। ফান্ডিং না থাকলে অতদূর ইচ্ছে হলেও যেতে পারেন না। রমজানে ত্রাণ দিয়েছেন, রমজানের পর সিলেটে বন্যা হলো, সীতাকুণ্ডে আগুন লাগলো। সব জায়গাতেই পিসব কাজ করেছে। এখন সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় ভয়াবহ বন্যা। ফান্ডিং সঙ্কট নিয়েই পথে নেমেছেন তিনি। চেষ্টা করবেন সবার পাশে দাঁড়ানোর।

উল্লেখ্য, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বন্যা বাড়ার প্রেক্ষিতে প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পূণর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাই সরকার জানান, সরকারিভাবে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় ৯হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়েছে বলে তথ্য পেয়েছি। এজন্য ওই উপজেলায় ১০ মেট্রিক টন চাল ও দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও আপদকালিন ৪শ’ মেট্রিক টন চাল ও ২০ লাখ টাকা আমাদের কাছে মজুদ রয়েছে। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম জানান, বন্যা দুর্গতদের উদ্ধারে প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্পিড বোট, নৌকা এবং আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উপজেলাগুলোতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দসহ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আগের সংবাদসুনামগঞ্জের পর সিলেটও বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন
পরবর্তি সংবাদসিলেটে বন্যায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যুবলীগ নেতা টিটু চৌধুরীর মৃত্যু