রাগিব রব্বানি:
গত ৫ জানুয়ারি ২০২০ রোববার না ফেরার দেশে চলে গেলেন দেশের প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ও মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জি রহ.। একাধারে ছয় দশকের মতো সময় তিনি দেশের বিভিন্ন মাদরাসায় হাদিসের অধ্যাপনা করেছেন, শীত মওসুমে অনুষ্ঠিত মাহফিলগুলোতে সাধারণ মানুষের উদ্দেশে কুরআনের তাফসির করেছেন, বুখারি শরিফের দরস প্রদান করেছেন অর্ধ শতাব্দী কালের মতো সময়। এ ছাড়াও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নে অংশগ্রহণ এবং ইসলামি আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনীতিতে নেতৃত্ব প্রদান করেছেন গত কয়েক দশক ধরে। পেয়েছেন ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশের আকাবির উলামায়ে কেরামের সান্নিধ্য ও স্নেহাশীষ।
দীনের বহুমুখী তৎপরতার সঙ্গে জীবনভর সম্পৃক্ত থাকা এ মনীষী মহীরুহ আলেমের জীবনাচার কেমন ছিল, কেমন ছিল তাঁর প্রজ্ঞার প্রখরতা এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় সিক্ত একান্ত ‘আমার আমি’, এ বিষয়ে জানতে কথা হয়েছিল তাঁর অন্যতম মাজায ও একান্ত সান্নিধ্যপ্রাপ্ত আলেম কবি ও ইতিহাস-বিশ্লেষক মাওলানা মুসা আল হাফিজের সঙ্গে। মাওলানা মুসা আল হাফিজ আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জির সান্নিধ্য ও স্নেহপরশে সিক্ত হয়েছেন দীর্ঘ একটা সময়। আত্মশুদ্ধিমূলক সম্পর্ক ছিল মৃত্যুর আগ অবধি। সেই সুবাদে আল্লামা হবিগঞ্জিকে একান্ত কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে তাঁর।
মাওলানা মুসা আল হাফিজ বলেন, আল্লামা হবিগঞ্জি রহ. ছিলেন ‘জামে শাখসিয়াত’—বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় দীন ইসলামের সবগুলো প্রয়োজন ও কর্মতৎপরতায় তাঁর সমন্বিত অংশগ্রহণ ছিল। প্রতিটি শাখায় তিনি কাজ করেছেন প্রজ্ঞা ও দক্ষতার সঙ্গে।
তালীম, তাকওয়া ও নিয়মানুবর্তিতা
মাওলানা মুসা আল হাফিজ বলেন, আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জি রহ. জীবনভর প্রধানত তালীম-তাআল্লুমের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ষাট বছরের মতো সময় হাদিস পড়িয়েছেন, বুখারি পঞ্চাশ বছর। এমনকি ইন্তেকালের দিন পর্যন্ত তিনি বুখারির দরস দিয়েছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত হবিগঞ্জের জামিয়া শারইয়্যাহ মহিলা মাদরাসা এবং জামিয়া আরাবিয়া উমেদনগরে তিরিশ পারা বুখারি তিনি একাই পড়াতেন। এই বৃদ্ধ বয়সেও দরসের ধারাবাহিকতা তিনি নষ্ট হতে দিতেন না। প্রতিদিন ফজরের পর বুখারির দরস প্রদান শুরু করতেন। এই নিয়মে কোনো ব্যত্যয় ঘটত না। শীত মওসুমে ওয়াজ মাহফিলের একাধিক প্রোগ্রাম থাকত, যেতেন, ফিরতে ফিরতে রাত অনেক হয়ে যেত, কখনো ফজর হয়ে যেত, কিন্তু এত দেরি করে ফেরার পরও তিনি দরসের কোনো ব্যত্যয় ঘটতে দিতেন না। ফজরের পরপরই তাঁকে দরসে হাদিসের মসনদে পাওয়া যেত। নির্ঘুম রাত কাটানোর ক্লান্তি তাঁর হাদিসের দরসে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারত না৷
জীবনভর শিক্ষকতা করেছেন, তাকওয়ার এতো উঁচু স্তরে তাঁর অবস্থান ছিল, কখনোই কোনো মাদরাসা থেকে সম্মানী গ্রহণ করেননি। খান্দানি বংশের লোক ছিলেন বিধায় ছাত্রাবস্থায় লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের খাবার গ্রহণ করেননি কখনো। হাটহাজারী যখন পড়তেন, খাবার কিনে খাওয়ার মতো টাকা ছিল না তাঁর কাছে, তারপরও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের খাবার খাননি। ছাতু খেয়ে দিন পার করেছেন।
রাজনীতি ও প্রজ্ঞা
মুসা আল হাফিজ বলেন, আল্লামা হবিগঞ্জি রাজনীতিতে ব্যতিক্রমীভাবে সরব ও সক্রিয় ছিলেন। তবে রাজনীতিকে মূল লক্ষ্য হিসেবে নেননি, বরং দরস-তাদরিস ও সাধারণ মানুষের হেদায়েতের বিষয়টাকেই বেশি প্রাধান্য দিতেন। কিন্তু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সবসময় তিনি ওয়াকিবহাল থাকতেন। দেশের প্রতিটা ঈমানী আন্দোলনে তাঁর সরব ভূমিকা থাকত।
আকিদার প্রশ্নে তিনি আপোষহীন ছিলেন। একদিকে বিদআতীদের ফেতনা অপরদিকে লা মাযহাবি ফেতনা—সবগুলোর মোকাবেলা তিনি প্রজ্ঞার সাথে করেছেন।
সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। তাঁর উস্তাদ আল্লামা আবদুল্লাহ দরখাস্তি রহ.-এর প্রতিষ্ঠিত খুদ্দামুদ্দীন সংস্থার তিনি ছিলেন বাংলাদেশ অংশের প্রধান। এ সংস্থার ব্যানারে তিনি অনেক কাজ করেছেন। এ ছাড়া হবিগঞ্জে সামাজিক তৎপরতায় তিনি এতই সক্রিয় ছিলেন, প্রশাসন নিয়মিত তাঁর পরামর্শ নিতো। হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক যিনিই থাকেন, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে তাঁর পরামর্শ নিতেন।
দাওয়াহ ও আধ্যাত্মিক সাধনা
মুসা আল হাফিজ বলেন, আল্লামা হবিগঞ্জি আধ্যাত্মিক সাধনা বা ইবাদত-বন্দেগিতে কতটা পাবন্দ ছিলেন, তা কাছের লোকেরাও সহজে ধরতে পারতেন না। তাঁর নফল আমলগুলো ছিল গোপনে, চুপিসারে। গতানুগতিক কোনো পীরালি ছিল না তাঁর মাঝে, কিন্তু তিনি ছিলেন উঁচুমাপের বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব। এ ক্ষেত্রে হজরত হোসাইন আহমদ মাদানি ও আবদুল্লাহ দরখাস্তিকে তিনি আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
ওয়াজের ময়দানে আল্লামা হবিগঞ্জির পরিচিতি এতোটাই ব্যাপৃত ছিল যে, অনেক মানুষ তাঁকে ওয়ায়েজ হিসেবেই চেনে। অথচ ওয়ায়েজের চেয়ে তাঁর বড় পরিচয় তিনি একজন অভিজ্ঞ হাদিস বিশারদ এবং গত শতাব্দীর আকাবির-আসলাফের প্রতিচ্ছবি। ওয়াজের ময়দানে তিনি এসেছিলেন তাঁর উস্তাদ আবদুল্লাহ দরখাস্তির নির্দেশে। এসে এখানে এক বিপ্লব সাধন করেছিলেন। ওয়াজের রূপই পাল্টে দিয়েছিলেন। তাফসিরুল কুরআন মাহফিল নামে এর আগে তেমন কোনো প্রোগ্রাম হতো না, আল্লামা হবিগঞ্জি ওয়াজের ময়দানে আসার পর তাফসির মাহফিলের ব্যাপকতা আনেন। গৎবাঁধা কেচ্ছা-কাহিনি থেকে বেরিয়ে কুরআন-হাদিসের ঘটনাবলি এবং আয়াত ও হাদিসের সহজ ব্যাখ্যা গণমানুষের বোধগম্য ভাষায় মাহফিলগুলোতে উপস্থাপন করতে থাকেন। ওয়াজের মাহফিলগুলোতে তাঁর এই ব্যতিক্রমী বয়ানে নতুন এক পরিবর্তন আসে। বিগত ৫০ বছরে যা আরও বিকশিত ও ঋদ্ধ হয়।
