মুসান্না মেহবুব :
দীর্ঘ সাড়ে চার বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত ও অনির্দিষ্ট খতিব দিয়ে চলছে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সালাতুল জুমা। বার্ধ্যক্যজনিত অসুস্থতার কারণে মসজিদটির নির্ধারিত খতিব মাওলানা সালাহউদ্দিনের অনুপস্থিতিতে সিনিয়র পেশ ইমাম ও পেশ ইমামগণ পালাক্রমে জুমার নামাজে খুতবা প্রদানের দায়িত্ব পালন করছেন। এই প্রেক্ষিতে নতুন খতিব নিয়োগের ব্যাপারে আভ্যন্তরীণভাবে একটা তোড়জোড় শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে স্পষ্ট করে এখনও কিছু জানা যাচ্ছে না।
সম্প্রতি ধর্ম মন্ত্রণালয়ে খতিব নিয়োগের ব্যাপারটি নিয়ে আভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে গণমাধ্যমের খবরে এসেছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাওলানা সালাহউদ্দিনের অসুস্থতার কারণে ২০১৬ সালেই নতুন খতিব নিয়োগ দেয়ার একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। বেশ কয়েকজনের নাম আলোচনায়ও এসেছিল। তখন নতুন খতিব নিয়োগের ব্যাপারে কোনো কোনো মহল থেকে আপত্তি তুলে বলা হয়, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে খতীবগণ আমৃত্যু খতীব থাকার রেওয়াজ রয়েছে। ফলে বর্তমান খতীব জীবিত থাকাবস্থায় নতুন খতিব নিয়োগ দেয়া ঠিক হবে না। তবে এ ব্যাপারে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিয়োগবিধিতে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সর্বশেষ সরকারি নিরীক্ষায়ও বিষয়টি আসার পর ধর্ম মন্ত্রণালয়ে নতুন খতিব নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে বলে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। নতুন বছরের শুরুতে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হতে পারে বলে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আভাস দিয়েছেন।
কে হচ্ছেন খতীব?
জাতীয় মসজিদের খতীব নিয়োগ বিষয়টি গত কয়েক বছরে বেশ কয়েক বারই আলোচনায় এসেছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে হেফাজতে ইসলামের কাছে আলেমদের একটি তালিকা চেয়েছিল ধর্ম মন্ত্রণালয়, যাঁরা বায়তুল মোকাররমের খতীব হবার যোগ্যতা রাখেন। হেফাজত থেকে তখন যে তালিকাটি প্রদান করা হয়েছিল, সেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দারুল আরকাম মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা সাজিদুর রহমান, মাওলানা ইমদাদুল হক হবিগঞ্জী, কিশোরগঞ্জ জামিয়া ইমদাদিয়ার মুহতামিম মাওলানা আনোয়ার শাহ এবং চট্টগ্রামের ড. আ ফ ম খালিদ হোসাইনের নামও ছিল।
তবে পরবর্তীতে এ তালিকা নিয়ে মন্ত্রণালয়ে কতটা আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে, তা আর জানা যায়নি। ২০১৬ সালে আবারও খতীব নিয়োগের বিষয়টি আলোচনায় আসে। গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদনও হয় এ নিয়ে। কে হতে পারেন নতুন খতীব, এ ব্যাপারে বেশ কিছু নামও আলোচনায় এসেছিল। তাঁদের মধ্যে যাত্রাবাড়ি বড় মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ এবং গওহরডাঙ্গা মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা রুহুল আমিন অন্যতম।
সম্প্রতি ধর্ম মন্ত্রণালয়ে নতুন খতীব নিয়োগের ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে আবারও এ কয়টি নাম সামনে এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আলোচিত এই কয়জন আলেমের যেকোনো একজনকেই খতীব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।
তাঁদের মধ্যে মাওলানা মাহমুদুল হাসান গুলশান আজদ মসজিদের দীর্ঘ দিনের খতীব। এ মসজিদের মুসল্লি সরকারের উচ্চস্তরের অনেক দায়িত্বশীল। ফলে মাওলানা মাহমুদুল হাসান সম্পর্কে তাঁদের ভালো জানাশোনা আছে। এই জানাশোনাটা বায়তুল মোকাররমের খতীব হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তিতে গুরুত্বপূর্ণ সহায়কের ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ কওমি ঘরানায় বহুল সমালোচিত ব্যক্তি হলেও জামায়াত-বিরোধিতা, জঙ্গিবাদ-বিরোধী ফতোয়া এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের কারণে আওয়ামী লীগ ও সরকারের অনেক ঘনিষ্ঠজন বলেই তিনি সর্বমহলে পরিচিত। বায়তুল মোকাররমের নতুন খতীব নিয়োগে তাঁর নাম উঠে আসার সম্ভাবনা অনেক বেশি বলে জানাচ্ছেন বিশ্লেষক মহল।
এ ছাড়া ফরিদপুরের গওহরডাঙ্গা মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা রুহুল আমীনের নামও আছে আলোচনায়। তিনি হজরত শামছুল হক ফরিদপুরীর ছেলে হবার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। বিগত সংসদ নির্বাচনে নৌকা মার্কার মনোনয়ন প্রত্যাশীও ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধী দিয়ে সরকারের বেশ প্রশংসাও কুঁড়িয়েছিলেন। এসব কারণ বিবেচনা করলে বায়তুল মোকাররমের নতুন খতীব নিয়োগে তাঁর নাম প্রথম দিকেই বিবেচনার জন্য আলোচিত হতে পারে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
এ ছাড়া বর্তমানে বায়তুল মোকাররমে একজন সিনিয়র পেশ ইমাম ও তিনজন পেশ ইমাম দায়িত্ব পালন করছেন। সিনিয়র পেশ ইমাম হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন মুফতি মাওলানা মিজানুর রহমান। পেশ ইমাম হিসেবে রয়েছেন মুফতি মাওলানা মুহিবুল্লাহিল বাকী নদভী, মাওলানা মুহাম্মদ এহসানুল হক জিলানী ও মাওলানা মুহাম্মদ মহিউদ্দিন কাসেম। বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন খতীব নিয়োগে এঁদের যে-কোনোজনকেও মনোনীত করবার সম্ভাবনা রয়েছে।
