রাকিবুল হাসান :
গত ১৭ জানুয়ারি শুক্রবার মুসলমানদের প্রথম কেবলা ফিলিস্তিনের মসজিদে আকসায় জুমার খুতবায় ইজরাইলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কথা বলায় খতিব শায়খ ইকরমা সাবরিকে এক সপ্তাহের জন্য নিষিদ্ধ করেছে ইজরাইল। ১৯-২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। তবে ইজরাইলি কর্তৃপক্ষের জিজ্ঞাসাবাদের পর এই নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়তে পারে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সূত্রে জানা গেছে।
আল আকসা মসজিদের সম্মানিত এই খতিব সবসময়ই ছিলেন ইজরাইলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে। এর আগেও কয়েকবার তিনি নিষিদ্ধ এবং জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়েছেন। এমনকি আল আকসায় ইজরাইলের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধও হয়েছেন তিনি। তাকে দমিয়ে দেয়া মানে ইজরাইলের বিরুদ্ধে একটি শক্ত কণ্ঠস্বর দমিয়ে দেয়া। তিনি তো কেবল খতিব নন, বরং তিনি একাধারে লেখক, গবেষক, শিক্ষক, চিন্তক, সংগঠক। তিনি অনেকের উৎসাহ, আদর্শ, অনুকরণীয়। তার জীবনের রঙিন একটা বায়োডাটা আমরা তুলে ধরছি।
জন্ম ও পড়াশুনা
১৯৩৬ সালে কুলকিল্যা শহরে জন্মগ্রগণ করেন আল আকসার খতিব শায়খ ইকরমা সাবরি। শিক্ষা এবং ধর্ম পালনের দিক দিয়ে তার পরিবার ছিল বিখ্যাত। পিতা শায়খ সাইদ সাবরি একজন আইজীবি ছিলেন। সর্বশেষ তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন কুদসের শরিয়া আপিল কোর্টে। এরপর তিনি অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন আল আকসার খতিব পদে।
নাবলুসের মাদরাসায়ে সালাহিয়্যাতে মাধ্যমিক পড়াশুনা শেষ করেন ইকরমা সাবরি। এরপর ১৯৬৩ সালে বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামি শরিয়া এবং আরবি ভাষায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৯ সালে নাবলুসের আন নাজাহ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থেকে আইন বিষয়ে এমএ করেন। এখানে তার থিসিসের বিষয় ছিল—’ইসলামিক বিচারবিভাগে অধিকার।’ এবং ২০০১ সালে মিশরের শরিয়া ও আইন অনুষদ থেকে ডক্টরেট লাভ করেন। এখানে থিসিসের বিষয় ছিল—’ইসলামি ওয়াকফ : তত্ত্ব ও অনুশীলন ।’
কর্মজীবন
কুদস শহরে আল আকসা শরিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে ১৯৬৩ সালে তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেন। এই মাদরাসায় তিনি ১৯৬৩-৮৬ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন এবং মাঝে ১৯৬৭-৭৪ পর্যন্ত পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন। এরপর ১৯৭৪-৯৪ সাল পর্যন্ত ‘আল ওয়াজ ওয়াল ইরশাদে’র প্রধান এবং ১৯৯৪-২০০৬ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনের গ্র্যান্ড মুফতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আল আকসা মসজিদে খতিবের পদে দায়িত্ব পালন করছেন ১৯৭৩ সাল থেকে। ২০০০ সাল থেকে ইজরাইলি কর্তৃপক্ষের বিষবাণে বারবার বিদ্ধ হচ্ছেন তিনি।
এ ছাড়াও আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন। এরমধ্যে অন্যতম হলো— কুদসের ইসলামি সাইন্স বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ অফ ল, কুরআন ও ইসলামিক স্টাডিজ কলেজ, ইব্রাহিমি কলেজ, রামাল্লার মর্ডান কলেজ ইত্যাদি।
জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক কার্যক্রম
জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে তিনি জড়িয়ে ছিলেন এবং আছেন। তার এই বিশাল কর্ম-সংযোগ দেখেও তার ব্যক্তিত্বের ওজন টের পাওয়া যায়। তার কর্ম-সংযোগের একটি খতিয়ান হলো—তিনি আল আকসা মসজিদের খতিব, কুদসের সর্বোচ্চ ইসলামি পরিষদের প্রধান, আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রদের আন্তর্জাতিক সংঘের সদস্য এবং ফিলিস্তিন অ্যাসোসিয়েশনের স্থায়ী সদস্য, ফিলিস্তিনের আলেম ও দাঈ সমিতির সদস্য, আন্তর্জাতিক ইসলাম অনলাইন এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, মক্কা মুকাররমার আন্তর্জাতিক ইসলামি মসজিদ সম্মেলনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, কুদসের বৃদ্ধদের জন্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক হাউস অফ চ্যারিটির সভাপতি, ওয়াশিংটনের কাউন্সিল অফ ইসলামিক জুরিস্টের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কমিশনের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান, মিশরের রিসালাহ পত্রিকার পরামর্শক বোর্ডের সদস্য, শাম স্কলারস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন অফ মুসলিম আলেমের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ইত্যাদি। এছাড়াও আরও অনেক কার্যক্রমে তার অংশগ্রহণ রয়েছে।
গ্রন্থ ও গবেষণাপত্র
ইকরমা সাবরি তার এই জীবনে অনেক গবেষণাপত্র এবং গ্রন্থ লিখেছেন। মুসলিম উম্মাহর কল্যানে কলম ধরেছেন অনেক। গ্রন্থ রচনার পাশাপাশি যেহেতু তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিতেন, তাই প্রয়োজনে গবেষণাপত্রও তৈরী করতে হয়েছে। নিম্নে গবেষণাপত্র এবং স্বতন্ত্র গ্রন্থের কিছু নাম উল্লেখ করা হলো।
গবেষণাপত্রের কিছু শিরোনাম—
ইসলামে কুদসের মর্যাদা, ইসলাম ও জন্ম নিয়ন্ত্রণ, ইসলামে শিক্ষার অধিকার, মুসলিম এবং বিশ্বায়ন, ফিলিস্তিন : মানুষ ও পৃথিবী, সভ্যতার পরিভাষাগুলো, ইসলামে যৌনতা ও শৈশব, দখলদারিত্বের কবলে ফিলিস্তিনের পবিত্র স্থান ও সম্পদসমূহ, কুদস দখলমুক্ত করতে মুসলমানদের কর্তব্য, নারীদের উত্তরাধিকার ও আদালতে তাদের স্বাক্ষ্য, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি, ইসলামি সভ্যতার মানবতা, ফিলিস্তিনে বিনিয়োগ বাস্তবতা, মুসলিমদের সাথে অন্যদের সহাবস্থান বিষয়ে ইসলামের অবস্থান, মানব পাচার সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি।
তার রচিত কিছু গ্রন্থের নাম— ‘ইসলামি ওয়াকফ : তত্ত্ব ও অনুশীলন, ইসলামিক বিচার বিভাগে অধিকার, আকিদা ও তাফসিরে আলোকপাত, উসুলুল ফিকহের সংক্ষিপ্ত নোট, কুরআনুল কারীমের মুজেযা, ফিলিস্তিনে আমাদের অধিকার এবং উসুলুল হাদিস বিষয়ে তার গ্রন্থ ‘হাদিস নিয়ে আলোচনা’ বেশ প্রসিদ্ধ। এছাড়াও আরও অনেক বই রয়েছে তার।
শেষকথা
শায়খ ইকরমা সাবরি ইজরাইলের দখলদারিত্বের ঘোর বিরোধী। মসজিদে আকসায় মুসল্লিদের ওপর চালানো প্রতিটি হামলার নিন্দা জানিয়েছেন তিনি। ভয়ে চুপসে থাকেননি আর কারও মতো। তিনি বলেন, ইহুদিরা যদিও দাবি করে কুদস তাদের নিকট পবিত্র, কিন্তু এখানে রক্তপাত ঘটিয়ে তারা বারবার প্রমাণ করছে, এটা তাদের কাছে পবিত্র জায়গা নয়। কোথাও মুসলমানদের সামান্য জমায়েত দেখলেই ইহুদিরা মনে করে, তাদের তাড়ানের আয়োজন বোধহয় হচ্ছে। তাই তারা আক্রমণ শুরু করে।
মসজিদে আকসার এই খতিব মনে করেন, ইজরাইল যত কঠোর হবে, ফিলিস্তিনিরা তত গর্জে উঠবে। কখনোই ইহুদিরা আল আকসা সম্পূর্ণভাবে দখল করতে পারবে না। তিনি স্পষ্টবাদী, আল আকসার অতন্দ্র প্রহরী এক। জিজ্ঞাসাবাদ এবং নিষেধাজ্ঞা তাকে দমাতে পারেনি। ইজরাইলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে তিনি জাগ্রত কণ্ঠস্বর।
