গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়া : নৈরাজ্য আর অরাজকতাই যেখানে নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে

ফাতেহ ডেস্ক

আফ্রিকার অন্যতম তেল-সমৃদ্ধ দেশ লিবিয়ায় আরব বসন্তের জোয়ারে পতন ঘটেছিল দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির। মুয়াম্মারের দীর্ঘ শাসনে যদিও সেখানকার মানুষ রাষ্ট্রীয় কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারত না, কিন্তু জীবনমানের দিক থেকে তারা ছিল আফ্রিকার অন্যসব দেশ থেকে উন্নত ও সমৃদ্ধ। তাদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার যাবতীয় খরচ ও দায়িত্ব পুরোপুরিভাবে গাদ্দাফি সরকার বহন করত। বিদ্যুৎ বিলেরও কোনো বালাই ছিল না, সরকারিভাবে ফ্রি সরবরাহ করা হতো।

হ্যাঁ, তারপরও স্বৈরতন্ত্রের একটা সংকট ছিল লিবিয়ান মানুষের জীবনে। জীবিকার নিরাপত্তা থাকলেও জীবন যাপনে একটা ভয়ের ভেতর দিয়ে যেতে হতো তাদের। কিন্তু সেই ভয় কাটাতে গিয়ে গাদ্দাফির পতন ঘটিয়ে এখন কতটা সুখে আছে লিবিয়ার জনগণ? ২০১১ সালের পর থেকে সে দেশের রাজনীতি যেমন অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে, তেম্নি গৃহযুদ্ধে জর্জরিত হচ্ছে সেখানকার প্রতিটা মানুষ। গাদ্দাফির পতনে তাদের জীবিকার নিরাপত্তা যেমন হারিয়ে গেছে, তেম্নি জীবন যাপনেও নেমে এসেছে তুমুল শঙ্কা। এর চেয়ে কি গাদ্দাফির শাসনামলই তাদের জন্য ভালো ছিল না?

গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়ায় এখন চলছে সীমাহীন নৈরাজ্য আর অরাজকতা। এমনকি রাজধানী ত্রিপোলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন নতুন করে শুরু হয়েছে লড়াই। ফলে লিবিয়া পুনর্গঠনের জন্য এমাসে একটি জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে।

লিবিয়ায় কারও কি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে?
লিবিয়ায় এখন নানা মত ও পথের অসংখ্য সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী তৎপর। দেশের পূর্বে এবং পশ্চিমে রয়েছে দুটো ভিন্ন রাজনৈতিক শাসন কেন্দ্র । কিছু মিলিশিয়া দল পূর্বের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুগত, কিছু আবার সমর্থন করে পশ্চিমের অর্থাৎ ত্রিপোলি নিয়ন্ত্রণকারী প্রশাসনকে।

ত্রিপোলির সরকার
রাজধানী ত্রিপোলি নিয়ন্ত্রণ করছে যে সরকার সেটি জাতীয় ঐক্যমত্যের সরকার (জিএনএ) নামে পরিচিত। জাতিসঙ্ঘ এই সরকারকে লিবিয়ার বৈধ সরকার হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফায়েজ সারাজ নামে একজন প্রকৌশলী এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় ঐক্যমত্যের সরকার গঠনে জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগে একটি চুক্তির চার মাস পর ২০১৬ সালের মার্চে তিনি ত্রিপোলিতে আসেন।

গত তিন বছর ধরে সারাজ বিভিন্ন মিলিশিয়া এবং রাজনীতিকদের সমর্থন আদায়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন, কিন্তু পুরো দেশের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এমনকি তার প্রশাসনের যে সেনাবাহিনী রয়েছে, তার ওপরও তার পূর্ণ কর্তৃত্ব নেই।

তবরুক সরকার
২০১৪ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের পর যে পার্লামেন্ট গঠিত হয় তাদের নিয়ে শুরু হয় এই সরকার। কিন্তু সেসময় যারা রাজধানী ত্রিপোলি নিয়ন্ত্রণ করছিল তারা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। ঐ এমপিরা তখন ১০০০ কিলোমিটার দূরে বন্দর শহর তবরুকে চলে যান।

২০১৫ সালে এই এমপিদের কেউ কেউ জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের চুক্তি সমর্থন করেন। কিন্তু ২০১৪ সালের পার্লামেন্ট এখন পর্যন্ত ওই সরকারকে সমর্থন দেয়নি।

এই সংসদ নতুন একটি নির্বাচনের প্রস্তাবও মানতে চাইছে না, কারণ তারা নিশ্চয়তা চাইছে যে ভবিষ্যতের যে কোনো সরকারে লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি বা এনএলএ নামের মিলিশিয়া বাহিনীর প্রধান জেনারেল খালিফা হাফতারকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দিতে হবে। ওই সংসদের এমপিদের অনেকেই খোলাখুলি বলেন যে, জেনারেল হাফতারকেই ক্ষমতা দিতে হবে।

কে এই জেনারেল হাফতার?
১৯৬৯ সালে সেনা অভ্যুত্থানে কর্নেল গাদ্দাফিকে সমর্থন করেছিলেন জেনারেল খালিফা হাফতার। কিন্তু ১৯৮০র দশকে এসে তার সাথে গাদ্দাফির সম্পর্ক চটে গেলে তিনি স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান। এরপর গাদ্দাফিকে উৎখাতের জন্য লড়াই শুরু হওয়ার পর তিনি দেশে এসে বিদ্রোহে যোগ দেন।

পরের তিন বছর ধরে তিনি বেনগাজিতে আল কায়দার সাথে সংশ্লিষ্ট কট্টর ইসলামপন্থী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়েছেন। তবে জেনারেল হাফতারের সমালোচকরা বলেন, যারাই তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে তাদেরকেই তিনি নির্বিচারে ‘সন্ত্রাসীর’ কাতারে ফেলে দেন।

বেনগাজি দখলের পর তিনি লিবিয়ার সর্বেসর্বা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। কিন্তু বিরোধ তৈরি হয় জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তির একটি শর্ত নিয়ে, যাতে বলা হয়েছে কোনো সামরিক ব্যক্তিত্বকে সরকারের উঁচু পদে নিয়োগ করা যাবে না।

তবে জাতীয় ঐক্যের ওই চুক্তির বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করেন না জেনারেল হাফতার। জানুয়ারিতে তার অনুগত বাহিনী দক্ষিণাঞ্চলের দুটো তেলক্ষেত্র দখল করে নেয়। বলা হয়, লিবিয়ার তেলের খনিগুলোর সিংহভাগই এখন নিয়ন্ত্রণ করছেন জেনারেল হাফতার।

আন্তর্জাতিক সমর্থন কি তার রয়েছে?
মিসর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত অনেকদিন ধরেই জেনারেল হাফতারকে সমর্থন করছে। এ মাসে ত্রিপোলি দখলের অভিযান শুরুর এক সপ্তাহ আগে তিনি সৌদি আরব সফর করে এসেছেন।

এছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে তিনি কয়েকবার রাশিয়ায় গেছেন। লিবিয়ার উপকূলের কাছে একটি রুশ বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজে তাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এ মাসেই ত্রিপোলিতে অভিযানের নিন্দা করে নিরাপত্তা পরিষদে এক প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে রাশিয়া।

ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ প্রথম কোনো পশ্চিমা নেতা যিনি জেনারেল হাফতারকে লিবিয়ায় শান্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানান। ফেব্রুয়ারিতে তার বাহিনীর সমর্থনে লিবিয়ায় বিমান হামরা চালায় ফ্রান্স।

তবে অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ সমর্থন করছে ত্রিপোলির জাতীয় ঐক্যের সরকারকে।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, নতুন একটি নির্বাচনের প্রস্তাব নিয়ে জাতিসঙ্ঘ গাদামেস শহরে ১৪ এপ্রিল থেকে তিন দিনের যে জাতীয় সংলাপের আয়োজন করে, তার আগে নিজের শক্তি প্রমাণের জন্য জেনারেল হাফতার ত্রিপোলি দখলের এই অভিযান শুরু করেন। তিনি মনে করছেন, যত বেশি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে থাকবে, ভবিষ্যতের মীমাংসা আলোচনায় তার তত সুবিধা হবে।

তার জনপ্রিয়তা কতটা?
লিবিয়ায় তার গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু- বলা মুশকিল, কিন্তু তার ত্রিপোলি অভিযানের আগে লিবিয়ায় পশ্চিমাঞ্চলেও অনেকেই তার পক্ষে কথা বলতে শুরু করেন।

দুর্বল শাসন ব্যবস্থা, নিরাপত্তার অভাব এবং রাজধানীর নিয়ন্ত্রণে থাকা মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দুর্নীতির কারণে বহু মানুষ ক্ষুব্ধ। তারা আশা করছে, জেনারেল হাফতারের মতো শক্ত কোনো নেতা এলে পরিস্থিতি হয়তো কিছুটা ভালো হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে জেনারেল হাফতার দক্ষিণের এবং পশ্চিমের বেশ কিছু মিলিশিয়া গোষ্ঠী এবং উপজাতীয় কিছু নেতার আনুগত্য অর্জন করতে সমর্থন হয়েছেন।

লিবিয়াতে এখন যার হাতে যত বেশি অস্ত্র , তার শক্তি এবং প্রভাবও তত বেশি। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন লিবিয়া এখন অস্ত্রের বাজারে পরিণত হয়েছে। গাদ্দাফি সরকারের অস্ত্রভাণ্ডার থেকে লুট হওয়া অস্ত্রে ছেয়ে গেছে লিবিয়া। আশপাশের একেকটি দেশ একেকটি মিলিশিয়া গোষ্ঠীকে সমর্থন করছে, অস্ত্র যোগাচ্ছে। এসব মিলিশিয়ারা নিজেদের সুবিধামত সময়ে সময়ে আনুগত্য পরিবর্তন করছে।

একসময় এরা সবাই কি মিত্র ছিল না?
গাদ্দাফির বিরোধিতার প্রশ্নে এই মিলিশিয়াদের সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিল। কিন্তু আর কোনো কিছুতেই তাদের মধ্যে মতের মিল ছিল না। গাদ্দাফিকে হঠানোর লড়াইও কোনো একটি গোষ্ঠীর নেতৃত্বে হয়নি। একেকটি শহরে ছিল একেক মিলিশিয়া বাহিনী। তারা তাদের নিজের নিজের স্বার্থ রক্ষায় লড়াই করছিলো।

স্বার্থ ছাড়াও আদর্শগতভাবেও তারা বিভক্ত ছিল। কেউ কেউ ছিল ইসলামপন্থী, কেউ বিচ্ছিন্নতাবাদী, কেউ ছিল রাজতন্ত্রের পক্ষে, আবার কেউ ছিল রাজনৈতিকভাবে উদারপন্থী। এসব মিলিশিয়াদের কোনো কোনোটির কাছে আবার নেহাতই আঞ্চলিক এবং জাতি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ রক্ষাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। সব মিলিয়ে জটিল এক জালে জড়িয়ে গেছে লিবিয়া।

প্রধান প্রধান মিলিশিয়া গোষ্ঠী
জেনারেল হাফতারের স্বঘোষিত লিবিয়া ন্যাশনাল আর্মি (এনএলএ) বর্তমানে লিবিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর মিলিশিয়া গোষ্ঠী। লিবিয়ার সাবেক সেনাবাহিনীর বেশ কিছু ইউনিট রয়েছে এই বাহিনীতে। তবরুক-ভিত্তিক সরকার এনএলএ-কে সমর্থন করে। এই বাহিনীর প্রধান ঘাঁটি পূর্বাঞ্চলীয় শহর বেনগাজিতে। দক্ষিণের বিভিন্ন উপজাতীয় গোষ্ঠী এবং রক্ষণশীল সালাফি মিলিশিয়াদের সমর্থন পাচ্ছে তারা।

ত্রিপোলি নিয়ন্ত্রণকারী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সহাবস্থান এবং সহযোগিতার সম্পর্ক থাকলেও বিভিন্ন সময়ে তাদের মধ্যে অর্ন্তকলহ তীব্র লড়াইয়ের রূপ নিয়েছে।

ত্রিপোলিতে তৎপর মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়টির নাম ত্রিপোলি প্রটেকশন ফোর্স। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে এটি আত্মপ্রকাশ করে। প্রধানত চারটি মিলিশিয়া গোষ্ঠী মিলে এটি তৈরি হয়েছে : ত্রিপলি রেভল্যুশনারি, আবু সালিম সেন্ট্রাল সিকিউরিটি ফোর্সেস, নাওয়াসি ব্যাটালিয়ন এবং স্পেশাল ডেটারেন্স ফোর্সেস।

ত্রিপোলিভিত্তিক সব গোষ্ঠীই সেখানকার বর্তমান সরকারকে সমর্থন করে না। তাদের একটি সালাহ আল-বুরকি ব্রিগেড। তবে তারা জেনারেল হাফতারের ঘোরতর বিরোধী।

মিসরাতাকেন্দ্রিক ৩১০তম ব্রিগেড- যারা কর্নেল গাদ্দাফি এবং পরবর্তীতে আইএসকে উৎখাতের লড়াইতে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছিল- তারা জেনারেল হাফতারের এলএনএ-কে ঠেকানোর জন্য ত্রিপোলিতে যোদ্ধা পাঠিয়েছে।

ত্রিপলির আশপাশের শহরগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই ভিন্ন ভিন্ন মিলিশিয়া দল রয়েছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিধর হচ্ছে তারহুনা সেভেনথ ব্রিগেড। তারাই এলএনএ-র হাতে ত্রিপোলির পতন ঠেকাতে মুখ্য ভূমিকা রাখছে, এলএনএ বিরোধী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমন্বয় করছে।

জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে কীভাবে?
নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইতে লিবিয়ায় তেলের উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। লিবিয়াতে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা আয়ত্তে এসেছে। কালোবাজারি অনেকটা বাগে এসেছে।তবে হাসপাতালগুলোতে ওষুধপত্রের অভাব প্রকট। মানুষ সর্বক্ষণ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। বিশেষ করে মেয়েরা বাইরে যেতে ভয় পায়। অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা অহরহ ঘটে।

এক অঞ্চলের মানুষের পক্ষে অন্য অঞ্চলে যাওয়া খুবই বিপজ্জনক। ফলে, জাতিসঙ্ঘের হিসাবে এখনো লিবিয়ায় কমপক্ষে ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করতে হচ্ছে।

বর্তমানে ত্রিপোলিতে যে লড়াই শুরু হয়েছে তাতে এখন পর্যন্ত কম-বেশি তিন হাজার লোক তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।

উৎস : বিবিসি

আগের সংবাদচার জেলায় গোলাগুলিতে নিহত ৪
পরবর্তি সংবাদগ্রেপ্তার হলেন উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ