চামড়ার বাজারে ধস : মাদরাসার অর্থায়নে কতটা প্রভাব পড়বে?

মুসান্না মেহবুব

গত কয়েক বছর ধরে কোরবানির পশুর চামড়ার কম মূল্যের কারণে ক্রমাগতভাবে ধস নামতে থাকা দেশীয় চামড়ার বাজার এ বছর পুরোপুরি ধসে পড়েছে। এতে মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তারচেয়ে ঢের বেশি বঞ্চনার শিকার হয়েছেন দেশের এতিম গরিব ও দুস্থ মানুষজন। বিশেষ করে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে সাধারণ জনগণের অর্থায়নে পরিচালিত দেশের কওমি মাদরাসাগুলোর লিল্লাহ বোর্ডিং ও গোরাবা খাত।

বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোর লিল্লাহবোর্ডিং ও গোরাবা ফান্ডের বড় একটি আয়ের উৎস কোরবানির পশুর চামড়া থেকে আহরিত অর্থ। প্রতিবছর কোরবানির ঈদে জনসাধারণের কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করে বিক্রি, বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থের পুরোটা বা আংশিক একটা অংক সংগ্রহ করেই লিল্লাহ বোর্ডিং ও গোরাবা ফান্ডের কয়েক মাসের ব্যয় সংকুলান করা হয়। কিন্তু এ বছর কোরবানির পশু চামড়ার দাম না থাকায় ওই সব প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। কারণ এবারে কোরবানিতে চামড়ার দরপতনে সেসব চামড়া পানির দামে বিক্রি করতে হয়েছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে। এতে তাদের শিক্ষার্থীদের এক মাসেরও খাবারের যোগান দেওয়া সম্ভব হবে না।

এ নিয়ে নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের রুহুল ইসলাম মাদরাসার পরিচালক মাওলানা মোহাম্মদ হারুন রেয়াজীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, শহরের প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় সাড়ে ৪ শ শিক্ষার্থী দীনি শিক্ষা গ্রহণ করছে। এদের মধ্যে প্রায় আড়াই শ আবাসিক শিক্ষার্থী। যাদের তিনবেলা খাবার সরবরাহ করা হয়ে থাকে মাদরাসা থেকে।

মাওলানা রেয়াজী বলেন, প্রতিবছর কোরবানির ঈদে এলাকার লোকজন কয়েক শ পশুর চামড়া মাদরাসায় দান করেন। আর ওই চামড়া বিক্রির অর্থে মাদরাসা লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে থাকা আবাসিক শিক্ষার্থী প্রায় ৬ মাসের খাবার সংস্থান হয়। এবারে কোরবানি ঈদে মাদরাসায় ৩৯৯ পিস গরুর চামড়া এবং ১৮১ পিস ছাগলের চামড়া মিলেছে। কিন্তু এবারের বিক্রিত চামড়ার অর্থে লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের ছাত্রদের এক মাসেরও খাবার সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় বছরের বাকি মাসগুলো লিল্লাহ বোর্ডিং কিভাবে পরিচালনা করবেন তা নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।

শহরের কাজীপাড়ায় অবস্থিত আল-জামিআতুল আরাবিয়া আল ইসলামিয়া মাদরাসা মুহতামিম মাওলানা আবুল কালাম কাসেমীর সঙ্গে কথা হলে তিনিও একই রকম মন্তব্য করেন। তিনি জানান, তাঁর মাদারাসায় প্রায় ৬ শ শিক্ষার্থী ইসলামী শিক্ষা গ্রহণ করছেন। তারা সকলেই আবাসিক শিক্ষার্থী। এবারের কোরবানিতে মাদরাসায় ২৯২ পিস গরুর এবং ৭০ পিস ছাগলের চামড়া পাওয়া গেছে। যা বিক্রি করে মিলেছে ৭৪ হাজার ৪০০ টাকা। ওই অর্থে আাবাসিক ছাত্রদের এক দেড় মাসের খাবার চালানো যাবে। বছরের অন্যান্য মাসগুলো কিভাবে চলবে এ চিন্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন তিনি। তিনি জানান, কওমি মাদরাসাগুরোর আয়ের অন্যতম উৎস হচ্ছে কোরবানির চামড়া। সেই চামড়ার এবারের দাম নেই।

তিনি বলেন, অন্যান্য বছরগুলোতে চামড়ার জন্য শহরের ব্যবসায়ীরা সকাল থেকে মাদরাসায় এসে ধরনা দেয়। কিন্তু এবারে চামড়ার মূল্য না থাকায় মাদরাসার জন্য পাওয়া চামড়াগুলো নিতে রাত পর্যন্ত কোনো চামড়া ব্যবসায়ী আসেননি। আর তারা কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াকরণের পদ্ধতিও জানেন না। এ অবস্থায় প্রচণ্ড গরমে চামড়াগুলো নষ্ট হওয়ার উপক্রম হচ্ছিল। অবশেষে শহরের গোলাহাট এলাকার চামড়া ব্যবসায়ী মো. মেরাজের কাছে গিয়ে অনেক অনুরোধ করে পানির দরে চামড়াগুলো তুলে দেন।

মাওলানা কাসেমী বলেন, শেষ পর্যন্ত সরকারিভাবে কাঁচা চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো। কিন্তু সরকার যদি ওই সিদ্ধান্ত কয়েক দিন আগেই নিতেন তাহলেও চামড়ার কিছুটা মূল্য পাওয়া যেত। আমরাও প্রতিষ্ঠানগতভাবে সমস্যার সম্মুখীন হতাম না।

চামড়ার বাজারে এই ধসের কারণে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোর অর্থব্যবস্থায় কতটা প্রভাব পড়বে, জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম চট্টগ্রামের বিশিষ্ট দাঈ আলেম ড. আ ফ ম খলিদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, মাদরাসাগুলোতে মৌসুমি চাঁদার সুবাদে চামড়া কালেকশনের রেওয়াজ অনেক পুরনো। চামড়া কালেকশন থেকে বড় অংকের অর্থ সংগ্রহ করা হয়। তবে এ অর্থ ঢালাওভাবে মাদরাসার সব খাতে ব্যয় করা হয় না, কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটা খাতে খরচ করা হয়, যেগুলো থেকে গরিব ও এতিম শিক্ষার্থীদের ভরণপোষণ ও শিক্ষাউপকরণের ব্যবস্থা করা হয়, অর্থাৎ লিল্লাহ বোর্ডিং ও গোরাবা ফান্ড। কিন্তু এ ফান্ডগুলোর সব খরচই যে কুরবানির চামড়া থেকে আসে, এমন না। বরং আংশিক কিছু জরুরত পূরণ হয়। মাদরাসা ভেদে কোনো জায়গায় এক মাস কোনো জায়গায় দুই মাস, সর্বোচ্চ পাঁচ ছয় মাস কুরবানির চামড়া থেকে আহরিত অর্থ দিয়ে লিল্লাহ বোর্ডিং পরিচালিত হয়। তাই চামড়ার বাজারে ধসের কারণে যে ব্যাপকভাবে মাদরাসাগুলো বড় অংকের আর্থিক টানাপোড়েনে পড়বে, ব্যাপারটা এমন না। কারণ, মাদরাসাগুলো ব্যাপকভাবে কুরবানির কালেকশনের ওপর নির্ভরশীল না। জাকাত, ফিতরাহ, ধর্মপ্রাণ মানুষজনের দান-সদকা থেকেও বড় অংকের একটা অ্যামাউন্ট আসে।

ড. খালিদ বলেন, সর্বোপরি কওমি মাদরাসাগুলো একমাত্র আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করেই চলে। তাই কোনো ষড়যন্ত্র বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই মাদরাসাগুলোকে আর্থিকভাবে পর্যুদস্ত করা সম্ভব না। হ্যাঁ, চামড়ার দরপতনের কারণে, মাদরাসার লিল্লাহ বোর্ডিংগুলো বাহ্যত দুই/চারমাসের লোকসানে পড়েছে ঠিক, কিন্তু এ লোকসান প্রতিটা মাদরাসাই অন্য যেকোনোভাবে পোষিয়ে নিতে পারবে ইনশাআল্লাহ। কিন্তু দরপতনের কারণে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ দেশের গরিব গোরাবারা। তাদের পেটে আমি বলব লাথি মারা হয়েছে চামড়া শিল্পের ধস নামিয়ে।

ড. খালিদ বলেন, গরিব-গোরাবার ক্ষতির পাশাপাশি আমাদের দেশের অর্থব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মারাত্মকভাবে। প্রতি বছর অন্তত ৫ শো কোটি টাকার ব্যবসা হতো চামড়া শিল্প খাতে। এটা সরকারি হিসাব। বেসরকারি হিসেবে আরও বেশি হবে। কিন্তু আমাদের সরকারের যথাযথ ব্যবস্থাগ্রহণের অভাবে চামড়া শিল্প আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ১৬ বছর হয়ে গেছে, রাজধানীর অভ্যন্তর থেকে ট্যানারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাভারে স্থানান্তর করা হয়েছে, কিন্তু আজ অবধি সেখানে চামড়ার জন্য মানসম্মত কোনো শিল্পনগরী গড়ে তোলা হয়নি। নেই বর্জ্যশোধনাগারের ব্যবস্থাও। ফলে বাইরের দেশের চামড়া ব্যবসায়ীরা আমাদের কাছ থেকে চামড়া নিতে অনাগ্রহী হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, চামড়ার বাজারে আজকের এই ধসের কারণে কেবল যে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট দায়ী, এমন না, বরং রাষ্ট্রপক্ষেরও তদারকির যথেষ্ট অভাব আছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারত রাষ্ট্র, যেখানে গরু জবাই আইনত নিষিদ্ধ, তারপরও রাষ্ট্রটি প্রতি বছর ৯৫ হাজার কোটি টাকা ব্যবসা করে বহির্বিশ্বের সঙ্গে কেবল এই চামড়া রপ্তানি খাতে। অথচ আমরা প্রতিবছর ব্যবসা দূরে থাক, লোকসান গুণি। তাই আমি বলব, চামড়ার বাজারে ধসের কারণে কেবল যে মাদরাসার লিল্লাহ বোর্ডিং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ব্যাপারটা এমন না, বরং আমাদের পুরো দেশ বঞ্চিত হচ্ছে সম্ভাবনাময় একটা বাণিজ্যখাতের মাধ্যমে যথাযথ মুনাফা অর্জন থেকে।

আগের সংবাদকাশ্মীরে যা ঘটছে তার সিকিভাগও প্রকাশ করতে দেওয়া হচ্ছে না
পরবর্তি সংবাদপিরোজপুরে ৬ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করল দুই সন্তানের জনক