চ্যালেঞ্জে নিউ সাফাভি রুল : গণক্ষমতার মুখোমুখি ইরানের মিলিশিয়া শক্তি

চ্যালেঞ্জে নিউ সাফাভি রুল : গণক্ষমতার মুখোমুখি ইরানের মিলিশিয়া শক্তি

মুজাহিদুল ইসলাম:

ষোল শতকের সাফাভি শাসনের নিউ ভার্সন ইরানের শিয়াতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা তার সম্প্রসারণবাদের অংশ হিসেবে সিরিয়া, ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনে মিলিশিয়া শক্তির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের কৌশল গ্রহণ করেছে। মৌলিকভাবে বর্তমানে সরাসরি কোনো শক্তি দেশ দখলে আগ্রহী হয় না। বরং এ সময়ে আদর্শ, পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে কোন দেশকে অনুগামী করাকে বেশ যথেষ্ঠ মনে করা হয়। তবে এক্ষেত্রে ইরান আরো একধাপ এগিয়ে। আদর্শ বাস্তবায়নে শিয়া মিলিশিয়ার মাধ্যমে এ-সব দেশে ইরান তার সম্প্রসারণবাদে প্রাথমিকভাবে কিছুটা সফলতা পেলেও বর্তমানে খোদ অস্তিত্ব সংকটের চিত্র ফুটে উঠছে।

তালেবান বনাম ইরান

২০০১ সালে তালেবান সরকারের পতনে যুক্তরাষ্টকে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি উত্তর ফ্রন্টে যুক্তরাষ্টকে সহযোগিতা করেন। তালেবান নেতাদের গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয় ইরান। সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তানের রাজধানী বাদে অধিকাংশ স্থান তালেবানের নিয়ন্ত্রনে আসা এবং আমেরিকাসহ বিশ্বশক্তিগুলো মুখরক্ষার জন্য আলোচনার মাধ্যমে আফগান ছাড়ার প্রয়াস ইরানের সাম্প্রসারণবাদের জন্য স্বভাবতই হুমকি। এমনকি ইরান তালেবানের সাথে বারবার আলোচনার চেষ্টা করছে আগামীর পথ কিছুটা হলেও রক্ষা করার জন্য।

ইরাক

ইরানী শিয়াতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ক্ষমতায় আসার পর হতেই ইরাক-ইরান যুদ্ধ শুরু হয়। অনেক ইরাকী শিয়া ইরানে আশ্রয় গ্রহন করে। সাদ্দামের পতনের যুক্তরাষ্ট্র লিবাননের আদলে প্রশাসনে শিয়া, সুন্নী ও কুর্দি সকলের অংশগ্রহন নিশ্চিত করার চেষ্টাও করে। তবে সাদ্দামের সুন্নী প্রভাবিত প্রশাসন উৎখাতে শিয়াদের ভূমিকা বেশী হওয়ায় এবং ইরানে থাকা ইরাকী শিয়ারা এসে প্রশাসনের উচ্চপদ গ্রহন করার মাধ্যমে ইরানী বলয় পূর্ন মাত্রায় শুরু হয়। ইসলামিক স্টেট দমনে ইরাক ও ইরানের পূর্ণ তত্বাবধানে শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী হাশদ আশশাবী গঠনের মাধ্যমে তা আরো প্রবল হয়।

তবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে ইরাকী জনগনের স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে ইরান-প্রভাবিত ইস্যুতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ইরাকী প্রশাসন। জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষায় চরম ব্যর্থতা, প্রশাসনে ব্যপক দুর্নীতি এবং দলনিরপেক্ষ শিয়াদের প্রতিও বৈষম্য ব্যাপক আকার ধারণ করে। শুরু হয় চরম অসন্তেষ। সেনাবাহিনী থেকে মিলিশিয়া বাহিনীর অধিক কর্তৃত্ব, যেন সমান্তরাল বাহিনী। সর্বশেষ তা চরম আকার ধারণ করে ইরাকের শিয়াসুন্নী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ সকলের আস্থাভাজন সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনীর প্রধান শিয়া জেনারেল কে পদচ্যুত করেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী। নিজের ও ইরানের স্বার্থের জন্য হুমকি মনে করেই এই কাজ তিনি করেছেন বলে বোদ্ধা মহল মনে করেন। যিনি হাশদ আশশাবীকে নিয়ে স্টেটের অঞ্চলে অভিযান চলাকালে সম্প্রদায়ের পতাকার বদলে ইরাকী পতাকা ধারন করেন। এবং আইন বহির্ভূতভাবে হাশদ আশশাবীকে সশস্রায়নের বিরোধী ছিলেন।

শুরু হয় শিয়াপ্রভাবিত চরম বিক্ষোভ। সাথে যুক্ত হয় সুন্নীরাও। মূলত এ আন্দেলন প্রধানত যুবকদের অংশগ্রহণেই পরিচালিত হচ্ছে। এখানে ট্রাডিশনাল কোন দলের লিড নেই। বিক্ষোভকারীরা নজীরবিহীনভাবে ইরানী পতাকা, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খমিনীর ছবি এবং সাম্প্রতি মার্কিন হামলায় নিহত কাসেম সোলায়মানীর ছবি আগুনে পোড়ায়। আন্দোলন হতে ইরাকের ধর্মীয় নেতাদেরও সমালোচনা করা হয়। ইরাক সরকার আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে। ইরান সরকার বারবার সোলাইমানীকে পাঠিয়ে আন্দোলন স্তমিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রতিবাদকারীরা আন্দোলনে দমনপীড়নের জন্য ইরান ও কুদস ফোর্সকে অভিযুক্ত করেন।

ছাত্র ও সুশীল সমাজের সদস্যরাসহ প্রায় সর্বস্তরের মানুষ এ বিক্ষোভে যোগ দেয়। তারা এখন ইরাক সরকারের পতন চাইছে। তারা আসলে গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপরই ক্ষুব্ধ। তারা দেখছে, একের পর এক নির্বাচন হচ্ছে এবং নতুন নতুন নেতা ক্ষমতায় বসছেন, কিন্তু নাগরিকদের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন আসছে না। এটি এখন ইরাকের আধুনিক ইতিহাসে তৃণমূলদের বৃহত্তম সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে, এ বিক্ষোভ নতুন অসাম্প্রদায়িক চিহ্ন এবং প্রতিবাদের একটি ভাষা তৈরি করেছে। গণক্ষমতার মুখোমুখি ইরানের মিলিশিয়া শক্তি কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়ে গেছে।

সিরিয়া

সিরিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সুন্নী হওয়া সত্বেও আলাবী শিয়া কর্তৃক সিরিয়া শাসিত হয়ে আসছে। ২০১১ সালে আরব বসন্তের ঢেউ যখন সিরিয়ায় পৌঁছায়। সিরীয় বিদ্রোহীদের দ্বারা যখন ২০১৩ সালে বাসার আলআসাদ সরকার পতনের মুখে, তখন ইরান পবিত্র স্থান রক্ষার অজুহাতে ত্রাতার ভূমিকায় আবির্ভূত হয়। শিয়াইজম প্রতিষ্ঠার মতলবে সিরিয়ায় বিপ্লবী গার্ডের কুর্দস ফোর্সের প্রধান কাসিম সোলাইমানীর নেতৃত্বে খানশাইখুন, দিরায়া ও হালবসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সকল-ধরণের মানবিকতার উর্ধে উঠে শিয়াইজম প্রতিষ্ঠায় পোড়ামাটি-নীতি অবলম্বন করেন। এমনকি ইরানের পরামর্শে সিরিয়া রাশিয়াকে সিরিয়ায় আহবান করে। তারপরই যুদ্ধের মোড় বদলে যায়। রাশিয়ার বিমান সাপোর্টে বিদ্রোহীরা পিছু হটে।

কিন্তু ২০১৯ সালে শুরু হতেই সিরিয়াতে ইরানের প্রভাব হুমকির মুখে পড়ে। রাশিয়া সিরিয়া থেকে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের প্রভাব কমাতে রাশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলের পুলিশ মোতায়েন, ইরানের সাথে পরামর্শ ছাড়াই সিরিয়ার বিভিন্ন নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা হতে ইরানপন্থী কর্মকর্তাদের অপসারণ, ইরান এমনকি সিরিয়ার সাথে পরামর্শ ছাড়াই তুরস্কের সাথে চুক্তি ও বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির সাথে চুক্তি করেন। তাছাড়া ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের অবস্থানে হামলার জন্য সিরিয়ার আকাশে ইসরাইলী যুদ্ধবিমানকে অবাধে চলার সুযোগ রাশিয়াই করে দিচ্ছে। অন্যদিকে সিরিয়া পূনর্নিমানে অংশ নিতে রাশিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্টের শর্তই হলো ইরানী সৈন্যদের বের করে দেয়া। তাই বলা যায়, সাম্প্রতিক সিরিয়া-বিষয়ে বিভিন্ন বক্তব্যে ইরানের হতাশা ফুটে উঠছে।

লেবানন

শিয়া, সুন্নী ও খ্রিস্টান অধ্যুষিত লেবাননে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে সুন্নী সাদ হারিরীর মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়, যে মন্ত্রীসভায় হিযবুল্লাহও অংশ নেয়। ট্যাংক, কামান ও ড্রোনের মতো সরন্জামাদি সজ্জিত হিজবুল্লাহের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরান। হিজবুল্লাহের প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ নিজেকে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমিনীর পূর্ণ অনুসারী হিসেবে নিজেকে গৌরববোধ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে লেবাননে দুর্নীতি ও অব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হতে সরকার পতনের আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রী হারিরী পদত্যাগে হিজবুল্লাহ বাধা প্রদান করে। এমনকি বিক্ষোভকারীদের ওপর সশস্র হামলার অভিযোগ রয়েছে হিজবুল্লাহর ওপর।

সরকারে কর্তৃত্ব করার পাশাপাশি সশস্র বাহিনী ও সরকারী প্রতিষ্ঠানে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের জন্য সেনাবাহিনীসহ জনগণ চরমভাবে হিজবুল্লাহর ওপর বিক্ষুদ্ধ হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো লেবাননেও বিক্ষোভকারীরা ইরান ও হিজবুল্লাহর ভুমিকার সমালোচনা করেন। হারিরীর পদত্যাগের পর বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবি, নতুন দলনিরপেক্ষ সরকার গঠন, যেখানে হিজবুল্লাহের সাথে কোন সম্পর্ক আছে এমন কাউকে রাখা যাবে না। আশির দশক হতে হিজবুল্লাহ এতো বড় সংকটে পড়েনি। ইরান হিজবুল্লাহের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরক ক্ষেত্রে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে, যা এখন হুমকির মুখে। ফরেন পলিসির মতে ইরান লেবাননে তার সমর্থিত শক্তির মাধ্যমে সামরিক ও রাজনৈতিক ভূমিকার মাধ্যমে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে।

ইরানী জনগণের মুখোমুখি

ইরাক, লেবানন ও সিরিয়ার পাশাপাশি নিজ ঘর সামলানোই ইরানের জন্য আরেক চ্যালেঞ্জ। দেশের গতানুগতিক সেনাবাহিনীকে শহরের বাহিরে রেখে ভেতরে মিলিশিয়া বাহিনীকে ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করা, বিপ্লবী গার্ডকে সেনাবাহিনী হতে বেশী প্রাধান্য এমনকি সর্বোচ্চ নেতার সাথে সেনাপ্রধানের সাক্ষাতের জন্য সেনাপ্রধানকে বিপ্লবী গার্ডের অনুমোদন নিতে হয়। অন্যদিকে বিশ্বরাজনীতিতে বেশী মনোযোগ দিয়ে ঘরের অর্থনৈতিক অবস্থাকে নাজুক করে তোলা, মানুষের স্বাধীনতার উপর ক্রমাগত রাষ্ট্রীয় এবং ধর্মীয় হস্তক্ষেপের জন্য জনগন মোল্লাকেন্দ্রিক শাসনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়। সর্বশেষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সোলাইমানীর হত্যাও নিংসন্দেহে আরো একটি আঘাত। আগামী সময়ই বলে দিবে, ইরাক কি এবার নিজের ঘর রক্ষায় মনোযোগ দিবে, নাকি সম্প্রসারণবাদ নীতি অবলম্বন করতে গিয়ে দুই কুলে ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

আগের সংবাদঅনতিবিলম্বে বাংলাদেশে ইসকন নিষিদ্ধ করতে হবে: আল্লামা বাবুনগরী
পরবর্তি সংবাদসফট শিয়াইজম: মুসলিম দেশগুলোতে ইরানের সাংস্কৃতিক প্রভাব