ছাত্রদের মধ্যে বাড়ছে দলান্ধ সহিংসতা, ধর্মীয় শিক্ষায় জোর দিচ্ছেন আলেম সমাজ

রাগিব রব্বানি

দেশের পাবলিক ভার্সিটিগুলোতে ছাত্রদের মধ্যে দলান্ধ সহিংসতা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্ররাজনীতির নেতাকর্মী এবং ক্যাডার গ্রুপ নানাভাবে নষ্ট করছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মৌলিক পরিবেশ। দলীয় ও আন্তর্দলীয় দ্বন্দ্বে সহিংসতা ছড়ানো ছাড়াও এসব কর্মকাণ্ডে নানা ধরনের হুমকি, নিরাপত্তাহীনতা ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এমনকি নৃশংস হত্যার শিকারও হচ্ছেন কেউ কেউ। যার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের নির্মম শাহাদাত।

শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, সহিংসতা ও নানামাত্রিক এসব অন্যায় প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা কার্যকর ও বিস্তারের ওপর জোর দিচ্ছেন দেশের সচেতন আলেম সমাজ। তাঁরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ধর্ম ও মানবিকতার অ্যাকাডেমিক চর্চা না থাকার কারণে ছাত্রদের বড় একটি অংশ এসব অন্যায়, অপরাধ ও সহিংসতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষাঙ্গনকে উত্তরণের জন্য একমাত্র ধর্মীয় শিক্ষা ও মানবিকতার পাঠই কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। কেউ কেউ শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিও তুলছেন।

ইসলামী ঐক্যজোটের যুগ্ম মহাসচিব মুফতী মাওলানা তৈয়ব ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলছেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রদের যে সহিংস আচরণ বর্তমানে প্রকট আকার ধারণ করেছে, এর মূলে রয়েছে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব।

তিনি বলেন, দেশের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অ্যাকাডেমিক কোনো গুরুত্ব নেই। প্রাইমারি ও মাধ্যমিক লেভেলে ধর্মশিক্ষার যে ক্লাস থাকে, সেটা কেবলই নামকাওয়াস্তে। ছাত্ররা এখান থেকে কার্যকরী কোনো সবক হাসিল করতে পারে না। আর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষায়ও ধর্মের কোনো পাঠ নেই। নেই নৈতিক শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা। ফলে শিক্ষার্থীরা জাগতিক ও বৈষয়িক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও ধর্ম ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে তাঁদের বড় একটি অংশের অবস্থান শূন্যের কোঠায়।

মুফতী তৈয়ব বলেন, একজন মানুষের মধ্যে যখন ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অনুপস্থিতি থাকবে, তখন সে যেকোনো ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়তে দ্বিধা করবে না। আর বর্তমান বাংলাদেশে এমনটাই হচ্ছে। তাই আমি মনে করি প্রাথমিক, মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক—সকল স্তরে ধর্মীয় শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া আবশ্যক। এসব স্তরে ধর্মবিষয়ক নামকাওয়াস্তে যে ক্লাসগুলো আছে, সেগুলোকে অনান্য বিষয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা হোক। পাশাপাশি ভার্সিটিগুলোতেও ছাত্রদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাদানের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ সবিশেষ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করুক।

তবে রাজধানীর তেজগাঁও রেলওয়ে মাদরাসার শায়খুল হাদিস ও বিশিষ্ট আলেম ড. মুশতাক আহমদ বলছেন, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ছাত্রদেরকে একদম শুরু থেকেই মানবিকতার পাঠ দেওয়া আবশ্যক।

তিনি বলেন, একজন মানুষের সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে মনুষ্যত্ববোধ। আমাদের সাধারণ শিক্ষাঙ্গনগুলোতে মনুষ্যত্ববোধের অ্যাকাডেমিক চর্চা একদম অনুপস্থিত বললেই চলে। আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীতে এসেছিলেনই মানুষকে ঈমান ও ইনসানিয়্যাতের (মানবতা) শিক্ষা দেওয়ার জন্য। এই শিক্ষা যখন মানুষ পেল, পৃথিবী তখন অন্য এক রূপ লাভ করেছিল। আজ এই শিক্ষার অভাবেই এতটা অবক্ষয় এবং অশান্তি। শুধু শিক্ষাঙ্গন কেন, সমাজের প্রতিটা স্তরেই অন্যায় এবং অমানবিকতা বিদ্যমান।

ড. মুশতাক আরও বলেন, ধর্মীয় শিক্ষার আগে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে মানবিকতার পাঠ চালু করা আবশ্যক। শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো হোক, যাতে একজন শিক্ষার্থী তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে এই তাড়নায় সর্বদা তাড়িত থাকে যে, আমাকে মানুষ হতে হবে। আর মনুষ্যত্ববোধের তাড়না যার ভেতরে জাগরুক থাকবে, সে ধর্মীয় অনুশাসনের ব্যাপারেও সচেতন ও নিষ্ঠাবান থাকবে। তার পক্ষে তখন আর অন্যায় ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া সম্ভব হবে না।

এদিকে শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় ও মানবিকতার পাঠ কর্যকর করা আবশ্যক বলে একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন রাজধানীর শীর্ষস্থানীয় আলেম ও শায়খ জাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক মুফতী মিজানুর রহমান সাঈদ। তবে এসবের পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গন থেকে সবধরনের রাজনীতির চর্চা নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

মুফতী মিজান বলেন, শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির চর্চার ফলে অসাধু ও দুষ্ট একটি চক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ফলেই মূলত শিক্ষাঙ্গনের এই করুণ পরিস্থিতি। তাই এসব বন্ধে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করাই যুক্তিযুক্ত।

তিনি বলেন, হ্যাঁ, রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামি বা সুস্থধারার রাজনীতিও বন্ধ হয়ে যাবে। হোক, ইসলামি ধারায় রাজনীতি করা ফরজে কেফায়া। সমাজের একদল মানুষ তা আদায় করে নিলে সবাই দায়িত্বমুক্ত হয়ে যায়। আর ভার্সিটিগুলোতে সবধরনের রাজনীতির সঙ্গে ইসলামি রাজনীতি বন্ধ হলে বিশেষ কোনো ক্ষতি হবার আশঙ্কা নাই। বরং রাজনীতি নিষিদ্ধের ফলে যদি শিক্ষাঙ্গনের সন্ত্রাস ও অরাজকতা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ছাত্রদের মধ্যে অন্য যেকোনো পন্থায় ইসলামের দাওয়াত দেওয়া আরও সহজ এবং অবাধ হবে।

আগের সংবাদস্টকহোমের গির্জায় ক্বারি সাদ নোমানির তিলাওয়াতে মুগ্ধ খ্রিস্টান ও যাজকরা
পরবর্তি সংবাদপ্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎপ্রত্যাশায় গণভবনে শহিদ আবরারের মা-বাবা