ছিনকে লেঙ্গে আজাদি : অপরাজিত শাহীনবাগ

আবদুল্লাহ মারুফ :

‘বেটি, আয়েশা কো সাত লে চলো…’ মাথার স্কার্ফ ঠিক করতে করতে বৃদ্ধা ফারজানা নাহিদ তার মেয়েকে নির্দেশ করেন, যেনো, তার পাঁচ বছরের নাতনী আয়েশাকেও শাহীনবাগে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর ছোট্ট আয়েশাকে সাজিয়ে, মা মেয়ে নাতনী, তিনপ্রজন্মের তিনজন সদস্য হাতধরে এগিয়ে চলেন শাহীনবাগে।

শাহীনবাগের এই চিত্র এখন প্রতিনিয়ত। সারাদেশ থেকে পানিভাঙার মতোন মায়েরা আসছেন; পৌঢ়া বৃদ্ধা তরুণী, বাদ নেই ছোটরাওㅡ সবার হাতে হাতে প্লেকার্ডㅡ এনআরসির এই আইন মানি না, নাগরিকত্ব আইন বাতিল চাই; বাতিল করো, সরকার!

রাত নেই, দিন নেই; বিরামহীন প্রতিবাদ করে চলছেন মায়েরা। তাদের চেহারায় ক্লান্তির বিন্দুমাত্রও ছাপ নেই। তবে কপালের খাঁজে খাঁজে শঙ্কা, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তারা আগত দিনগুলো নিয়ে চিন্তিত। যদি এই বৈষম্যপূর্ণ নাগরিকত্ব আইন বাতিল না করা হয়, তাহলে দেশে পরিবেশ অত্যন্ত বিষাক্ত হয়ে উঠবে। সেই বিষাক্ত পরিবেশে তাদের নাতিনাতকুররা বাঁচতে পারবে না; তাইতো প্রতিটি মুহূর্তে তারা সদা জাগ্রতㅡ প্রতিবাদ করছে চলছেন। এবং রাজ্যের বাকি মহিলাদের কানে কানে নীরব বার্তা পৌঁছে দিয়েছেনㅡ ‘উঠো সাথিয়ো, আভি জাগ যাও; নেহি-তো ডিটেনশন ক্যাম্প মে আখ খুলেগি। অভি জাগ নে কা সহি ওয়াক্ত হ্যায়।’

এই সহিহ ওয়াক্তে জাগতে, শাহীনবাগের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতে, প্রতিনিয়ত ভীড় বাড়ছেই; যেনো দুধের সর জমে জমে আরো গাঢ় হচ্ছে। বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়া এই শাহীনবাগের মায়েদের আন্দোলনের সূচনাটা কিন্তু আকস্মিক হয়েছিল, কোনো প্ল্যানপ্রোগ্রোম ছাড়াই।

মিছিল থেকে শুরু

সেদিন ছিল ডিসেম্বরের পনেরো তারিখ, দুহাজার উনিশ। নব্য বিতর্কিত আইনের প্রতিবাদে সারাদেশ মুখরিত, জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়ার আঙিনাও উত্তাল। পড়ুয়ারা প্রতিবাদ করছে। নাখোশী প্রকাশ করছে ওরা, এই আইন কার্যকর হতে পারে না ; এটি বাতিল করতে হবে।

হঠাৎ কি হলো, কয়েকজন উগ্র পুলিশসদস্য জামিয়ার ক্যাম্পাসে ঢুকে এলোপাথাড়ি গুলি শুরু করে! পুলিশের ছোঁড়া গুলিতে পড়ুয়াদের অনেকেই আহত হয়, রক্তাক্ত হয়। ওদিকে চেয়ার-টেবিল ভেঙেচুরে পাঠাগারের দরজা-জানালা তছনছ করে দেয় সন্ত্রাসীরা। ছাত্রীরা নির্যাতিত হয়। বইখাতা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে থাকে এখানে-ওখানে।

এই ঘটনায় ফুঁসে ওঠে সারাদেশের মানুষ। ক্যাম্পাসের ভেতর বর্বর তাণ্ডব এবং ছেলেমেয়েদের এভাবে নির্যাতনের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসেন কয়েকজন মা, শাহীনবাগে। তারা প্রতিবাদ করেন। তাদের পিছুপিছু আসে আরো কয়েকজন। তারপর আরো কয়েকজন। এই করে করে একটি মিছিল, তারপর ক্ষুদ্র এই মিছিলটিই রুপান্তরিত হয় মহাজনসমারোহে।

সীমানা পেরিয়ে সর্বত্র

তারপর এই জমায়েত গণজমায়েতে পরিণত হয়। ধীরে ধীরে স্ফীত হতে থাকে আন্দোলনের শরীর, তবে, এর মূল কমাণ্ডে থাকেন মুসলিম মায়েরাই, তারাই নেতৃত্ব দেন। তারা নিজেদের দ্রোহ এবং ক্ষোভের কথাগুলো বলতে থাকেন। বয়ানে বক্তব্যে, ছন্দে গানে তারা রোষের কথা বলতে থাকেন। তাদের সঙ্গে বিভিন্ন কবিসাহিত্যিক, শিল্পী-গীতিকার, তারাও এসে শামেল হন। সুরছন্দে তারা জনতাকে উদ্দীপ্ত করতে থাকেন। ওদিকে রাজনৈতিক লিডাররাও এসে সংহতি প্রকাশ করেন। তারা জনতার সঙ্গে গলা মিলিয়ে মিলিয়ে বলেনㅡ

‘ইয়ে মুলক হামারি আপ কা
নেহি কিসি কে বাপ কা

ইয়ে সড়কে হামারি আপ কি
নেহি কিসিকে বাপ কি”

প্রথমদিকে বিজেপির নেতাগণ শাহীনবাগকে আমলে না নিলেও তারপর তাদের কলিজায় কাঁপন তোলে, তখন মায়েদের এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে দমিয়ে দিতে তারা মরিয়া হয়ে ওঠে। বিজেপি নেতাগণ প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে থাকেন, আন্দোলনকারীরা পাকিস্তানপন্থী, ওদেরতে গুলি করে মারা উচিত!

উত্তরপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী যোগী অদিত্যনাথ এক সভায় বলেন, “কেউ যদি যুক্তি শুনতে না চায়, তাহলে বুলেট দিয়েই তাকে বোঝাতে হবে।”

এর আগে বিজেপিনেতা ও কেন্দ্রীয়মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুরও বলেছিলেন ‘বেইমানদের’ গুলি করে মারার কথা।

ফলত এই হয়েছে, বিজেপি নেতাদের এসব উষ্কানিতে অনুচররা হাতে বন্দুক তুলে নেয়। দুহাজার বিশের পহেলা ফেব্রুয়ারি বিকেলে, আন্দোলনের প্রায় এক মাস গত হবার পর, শাহীনবাগের বিহার সাইট ব্যারিকেড দিয়ে বন্দুক উঁচিয়ে প্রবেশ করে কপিল গুজ্জর নামের এক উগ্র হিন্দুযুবক। সে মুখে ‘জয় শ্রীরাম’ শ্লোগান তুলে শাহিনবাগের মায়েদের উপর গুলি চালায়; পরপর দু’বার!

তার এই উগ্র আচরণে স্তব্ধ পুরো বিশ্ব, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় তুমুল সমালোচনা। যদিও মেইন স্ট্রীম মিডিয়াগুলো এসব খবর করবে না, করেও নি; তাই শাহীনবাগের লড়াইটা প্রথম পাতায় জায়গা পায়নি। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত সরব ছিলো শাহীনবাগ।

বিদেশি পত্রিকাগুলোও এরপর চোখ ফেলে শাহীনবাগে, মুসলিম মায়েরা আলোচনায় আসেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ শাহিনবাগের এইসব ‘শাহীনদের’ নিয়ে সচিত্র একটি প্রতিবেদন করে, সেখানে তুলে ধরে শাহীনবাগের বিক্ষোভ, অহিংস্রতা এবং প্রশাসনের কদর্যতা । ছড়িয়ে পড়ে শাহীনবাগের খবর, সর্বত্র।

ভেতরের হালচাল

কেউ শাহীনবাগে গেলেই অবস্থানকারী মহিলারা তাকে জিজ্ঞেস করছেন, “আপ কুছ খায়ে হো, ইয়া নেহি? আপ ইতনে দূর সে আয়ে হো হামারাসাথ দেনে-কে লিয়ে, কুছ খা লো পেহলে।”

হ্যাঁ, এই সম্ভাষণেই পরম আদরে গ্রহণ করে নিচ্ছেন প্রতিটি নতুন সদস্যকে। তারা বিভিন্ন দল উপদলে সেচ্ছাশ্রমের কাজটি আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। আন্দোলনের স্বার্থে তৈরী হয়েছে কমিউনিটি কিচেন, এখানে তারা নিজেরাই পালা করে রান্নাবান্না করছেন।

ওদিকে দিল্লীর বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা পাহারা দিচ্ছে শাহীনবাগ। তারা পোস্টার এঁকে দিচ্ছেন, স্লোগানে লিড দেওয়া শিখিয়ে দিচ্ছেন। আর যারা চাকুরীজীবি মহিলা, তারা অফিস শেষে রাতে এসে অবস্থান নিচ্ছেন শাহীনবাগে। এমন করে রাতদিন প্রতিবাদমুখর শাহীনবাগ।

মুষ্টিবদ্ধ উত্থিত হাত

২০ দিনের ছোট্ট হাবিবা থেকে শুরু করে ৯২ বছর বয়সী বৃদ্ধা সবার হতোই মুঠোবদ্ধ! হাবিবা হয়তো না বুঝেই হাত মুঠোবদ্ধ করে রেখেছে। কিন্তু ৯২ বছর বয়সী বৃদ্ধা শাহনাজ, তিনি থুরথুরে শরীরে নিয়েই মুঠোবদ্ধ হাতখানা শক্ত করে উঁচিয়ে রাখতে চাইছেন।

তাকে প্রশ্ন করা হলো, এই দুর্বল শরীরে এখানে এসেছেন কেন? জবাবে তিনি চোখমুখ কঠিন করে বলেন, এই ভারত আমাদের। ভারতে আমাদের জন্ম, এখানেই আমাদের সব। জীবনের এতোগুলো বছর আমরা হিন্দু মুসলিম একত্রে বসবাস করলাম, এখন শুনছি মুসলিমরা এই দেশের কেউ নয়! আশ্চর্য, এই ঘৃণ্যআইন আমাকে অপমানিত করছে, নতুন নাগরিকত্ব আইনের আওতা থেকে মুসলিমদের বাদ দেয়াটা দেশের সংবিধানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হচ্ছে, তাই ঘরে আর বসে থাকতে পারলাম না; চলে এলাম তোমাদের সঙ্গে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ভারতকে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ বানানোর যে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, এর বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আন্দোলন করতে হবে। আর ঠিক এই কাজটিই করছে শাহীনবাগ।’

‘তো, কয়দিন হলো আপনি এখানে এসেছেন?’

‘মেলা দিন, সেই ডিসেম্বরেই তো এসেছি। মাঝখানে একটুখানি দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম বলে কিছুদিন আসি নি, জোর করে বাড়িতে নিয়ে গেছিল বৌমা; এই আবার এসেছি। মেয়েদের রাস্তায় ফেলে ঘরে কি করে থাকা যায়, বলো! ভালো লাগে? লাগে না। তাই আবার চলে এসেছি।’

‘আজকে তো মার্চের তেরো তারিখ, প্রায় তিন মাসের মতো হয়ে যাচ্ছে আন্দোলনের ব্যাপ্তি; আর কতোদিন থাকবে এই আন্দোলন বা কবে থামবে বলে মনে করেন?’

‘দেখো, আমি এসব কিছুই জানি না। তোমার যদি এগুলো জানতে ইচ্ছে হয় তাহলে মঞ্চে ফারজানা নাহিদ আরো দায়িত্বশীলগণ আছেন, ওদের কাছে যাও। আমি অতো কিছু জানি না। আমি শুধু জানি, এই আন্দোলন চলতেই থাকবে, চলতে থাকতে হবে। আইন বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কোনো গত্যন্তর নেই। আমাদের কোনো ঘর নেই। শাহীনবাগই আমাদের ঘর। আমাদের ঠিকানা।’

‘আন্দোলনের শুরুটা তো করেছিল মুসলমান কয়েকজন মহিলা, তাই না?’

‘হ্যাঁ, তো কি?’

‘না, মানে এই কাজটা…’

সাংবাদিক আরো কিছু প্রশ্ন করতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু বৃদ্ধা শাহনাজ তাকে থামিয়ে দেন, বলেনㅡ ‘দেখো, আমাকে এখন ছাড়ো! আমি ওদের সঙ্গে নাড়া লাগাবো!’

এই বলে তিনি সাংবাদিকের থেকে মুখ ফিরিয়ে আবারো হাতদুটো মুঠোবদ্ধ করে উপরে তোলেন; তারপর মঞ্চ থেকে আসা শ্লোগানের সঙ্গে শাহীনবাগের দাদি ভাঙা-ভাঙা স্বরে গলা মিলানㅡ ‘আজাদি, আজাদি; ছিনকে লেঙ্গে আজাদি…’

আগের সংবাদগুজরাট মডেল : দিল্লি গণহত্যার বিশদ বয়ান
পরবর্তি সংবাদগেরুয়া বিদ্বেষের আগুন : আক্রান্ত মাদরাসা মসজিদ