
মুজিব হাসান:
পারদ গলানো রুপোলি হাওরের বুকে বিকেলের সোনাঝরা রোদ জলকিরণের গালিচা পেতে দিয়েছে। এর ওপর দিয়ে তাগা লাগানো সুঁইয়ের মতো ঢেউ সেলাই করতে করতে এগিয়ে চলছে নৌকোটি। বাতাসার মিষ্টতা নিয়ে বইছে হাওরহাওয়া। জলজ ঘ্রাণে ভরিয়ে তুলছে মন। গলুইয়ে বসে জলজীবনের মুগ্ধকর দৃশ্যপট দেখতে দেখতে বাড়ি ফিরছি।
চামটা হাওর পেরিয়ে আমাদের বাড়ি। কিশোরগঞ্জ শহর থেকে ঘণ্টাখানেক সময় লাগে যেতে। এইটুকু পথ অথচ আমি বাড়ি ফিরছি আজ দুমাস পর। এটি আমার অভ্যেসে পরিণত হয়ে গেছে—বাড়ি থেকে যত দূরে থাকি, বাড়ির প্রতি পরানের টান থাকে বজ্র আঁটুনির মতো সুদৃঢ় আর যত কাছেপিঠে থাকি, টান থাকে ফস্কা গেরোর মতো পলকা। আছাত্রজীবন এ অভ্যেস নিয়ে থেকেছি। এখন যে জীবন, এর দাঁড়িপাল্লায় সেই টানের পরিমাপ করলে বাড়ি-আলগার দিকে জোখ থাকবে বেশি। এর কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যাবে, ভাটিয়ালি পাড়াগেঁয়ে জীবনযাপনের চেয়ে মফস্বলে শহুরে জীবনযাপনে অভ্যস্ততার ব্যাপারটি আমার মধ্যে প্রাধান্য পেয়েছে। এভাবে আমাদের জীবনের পালাবদলগুলো খুব গোপনে, মনের অগোচরে ঘটে যায়, আমরা সেগুলোর কোনো ঠারঠোর পাই না।
জলকিরণের গালিচা মাড়িয়ে এগিয়ে চলছে নৌকো। সামনে আমার মায়ায় মোড়ানো কাজল গ্রাম। সেদিকে তাকিয়ে হাওরহাওয়ার কানে কানে এ প্রশ্নটি রাখলাম—ভাটিয়ালি পাড়াগেঁয়ে জীবনযাপনের প্রতি আসলেই কি আমার নিস্পৃহতা চলে এসেছে? ভাবনার হাওরে ডুব দিয়ে পেলাম কাদামাটির গন্ধ। পলির ভেতর থেকে বুদ্বুদ ওঠার মতো উঠে এল এ কথাটি—আমি হাওরের ছেলে। হাওরের জল-ডাঙার বাহারি চিত্রপটে মেলেছে আমার চেতনার রংধনু। জীবনানন্দ দাশের মতো বলতে ইচ্ছে করে—হাওরের জল থেকে আমি পেয়েছি আমার শরীর। এ জলজীবনের মোহন কি এত সহজে ভুলে যেতে পারব?
বেশ মনে আছে, লেখাপড়ার সুবাদে পাড়াগাঁয়ের পরিবেশ ছেড়ে যখন শহরে এলাম—কিশোরগঞ্জ মফস্বল হলেও আমার কাছে শহর—তখন সহপাঠীদের অনেকেই আমাকে ইয়ারকি করে ভাইট্টে বলে ডাকত; এখনো বন্ধুমহলের কেউ কেউ মজা করে এমনটি ডেকে থাকে। তো যারা আমাকে এভাবে ডাকে, তাদের প্রতি পাল্টা ঢিল ছুঁড়ে বলি, ‘শোনো, আমারে ভাইট্টে বলবা না।’ জিজ্ঞেস করে, ‘ভাডির থেইক্কে উইট্টে আইছ, ভাইট্টে কইতাম না তে কিতা কইতাম?’ স্মিতমুখে বলি, ‘মুলকে ভাটির সন্তান বলবা। হাওরের বরপুত্রও বলতে পারো।’ আমার কথায় অনেকেই হাসির তুবড়ি ছোটায়। আমি মুখমণ্ডল দীপ্ত করে রাখি। হৃদয়ের কথাটি বলতে পারায় নিজেকে প্রাণবন্ত লাগে।
হ্যাঁ, আমি মুলকে ভাটির সন্তান, হাওরের বরপুত্র। এখানকার জলমহালের জীবনে বাঁধা পড়ে আছে আমার মন। ভরা বর্ষার হাওরে যেদিকে তাকাই, দেখতে পাই স্রোতের টানে ভেসে চলা পানিকোলার ঝাড়ের সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে আমার থইথই জলশৈশব। শুকনো মরসুমে দিগন্তছেঁড়া ফসলি মাঠের যেদিকে তাকাই, দেখতে পাই ধানখেতের কাঁচা মৌতাতমাখা দখিনা হাওয়ায় দোলায়িত সবুজে আন্দোলিত হচ্ছে আমার দুরন্ত কৈশোর। এই পাড়ভাঙা ধনু গাঙ, ঢালু পাড়ের ঘোড়াউত্রা নদী, গাঙের পেট কেটে বয়ে চলা বেড়া খাল, মাঠের বুক ছিঁড়ে ভেসে ওঠা আগলপা বিল, হিজল, করচ ও নল-খাগড়ার রাংসা বন, হদ্দুরপুর বন্দের মান্ধাতা হিজল গাছ, তিন মোহনা কাটাখালের গুদারাঘাট আর শিমুলবাঁক, নয়াপাড়া ও বড়িবাড়ি গ্রামে গেঁথে আছে আমার অস্তিত্বের শেকড়। এখানেই আমার রাজত্ব। এসব ছেড়ে আমি কীভাবে শহরবাসে যাব?
ঢেউখেলানো হাওরের দিকে ধ্যানমগ্ন হয়ে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ নৌকোর খুব কাছ দিয়ে উড়ে গেল একটি দলছুট পানকৌড়ি। বাতাসের শনশন, ঢেউয়ের কলকল আর ইঞ্জিনের ভটভট আওয়াজ ছাপিয়ে আমার কানে লাগল পাখিটির ডানা ঝাপটানোর শব্দ। মুগ্ধচোখে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলাম তার উড়াল পথের দিকে। হাওরের ঢেউ ছুঁয়ে উড়ে চলছে পাখিটি। কী সুন্দর তার ছুট! কী দারুণ তার পাখাসাট! পাখিটি উড়তে উড়তে অদূরের জলমগ্ন বাঁশের খুঁটির মাথায় গিয়ে বসল। ধ্যানী চোখে তাকিয়ে রইল পানির দিকে; শিকার ধরার আশায়। এ দলছুট পানকৌড়ির জলজীবন দেখে আমার মনজানালায় ভেসে উঠল আব্বার মুখ।
আমার আব্বাও হাওরের বরপুত্র। জলমহালের জীবনে আমাদের সংসার-নৌকোর মাঝি তিনি। তার একহাতে হালের বইঠা, আরেক হাতে পালের দড়ি। উন্মত্ত হাওরে বিপুল উদ্যমে আমাদের নিয়ে তিনি বাইচালি করে চলছেন। আমি বড় ছেলে, আব্বা জানেন এ হাওরে সংসার-নৌকো বাওয়ার মতো শক্তি আমার নেই। তাই তিনি নৌকোটিকে তীরে ভিড়াতে চান। জলমহালের জীবন ছেড়ে আসতে চান শহরে। আব্বার এ অভিপ্রায় আমাকে দারুণ ভাবিত করে। হাওরের জলমহালে বাইচালি করতে করতে তিনি বড্ড ক্লান্ত। তার এখন জিরানো দরকার। কিন্তু আমি কি পারব আব্বাকে এই স্বস্তিটুকু দিতে?
কাজল গ্রামের রেখাটি সবুজ হয়ে উঠছে। গ্রামের কাছাকাছি এসে পড়েছে নৌকো। দিগন্তের দিকে গুটিয়ে যাচ্ছে বিকেল। প্রদীপ্ত সূর্য রশ্নিমালাকে আহ্বান করছে প্রাণকেন্দ্রের দিকে। হাওরহাওয়ায় ফুসফুস ভরে দম নিতে গিয়ে পেলাম একটি ভাবনার খোরাক। তখনই ডায়েরি মেললাম। লেখালেখির সুবাদে আজকাল জীবন নিয়ে প্রায়ই ভাবিত হই। এসময়ে আমি যেহেতু রকমারি গদ্যশীলন করছি, তাই জীবনপাঠের কথাটি এ আন্দাজে লিখে রাখলাম :
‘মানুষের জীবন গদ্যের ফর্মার মতো, যার ধরন হয় লেখকের ভাবনা বিন্যাস অনুযায়ী; একে একশ্বাসে পড়ে শেষ করা যায় না, এখানে মানতে ব্যাকরণের নিয়ম, বিরামচিহ্নের সঠিক ব্যবহার। জীবনগদ্যের বিরামচিহ্নগুলো নানা অনুষঙ্গ ও উপলক্ষ্য নিয়ে আমাদের সামনে আসে, সেগুলোকে যথানিয়মে মেনে নিয়ে চালিয়ে যেতে হয় জীবনের পাঠ।’
গ্রামের কাছারি ঘাটে নৌকো ভিড়ল। সবার আগে নামলাম আমি। জীবনের দাঁড়িকমার হিসেব কষতে কষতে হাঁটা দিলাম বাড়ির দিকে। জামে মসজিদের পেছনে আমাদের বাড়ি। বাড়ির সীমানায় পৌঁছতেই দেখি, দেউড়ির কাছে উন্মুখ মন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আম্মা। তার হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে ভুলে গেলাম আঙুলে গিঁট ধরে হিসেব কষতে থাকা জীবনের দাঁড়িকমাগুলো।
