হামমাদ রাগিব:
নতুন বছর কড়া নাড়ছে, শেষ হচ্ছে ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ। বিদায়ী এই বছরে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত সবকয়টি ইস্যুতে যথাযথ এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ তুলে আনার কোশেশ করেছে। প্রতিটা ইস্যুতেই চেষ্টা করেছে দেশের ধর্মীয় পরিসরের মতামত ও ব্যাখ্যা তুলে ধরার।
ফাতেহ মূলধারার কোনো গণমাধ্যম নয়, বিশেষায়িত সংবাদমাধ্যম মাত্র। আমরা নিরপেক্ষতার দাবি করিনি কখনো, বরাবরই বলে এসেছি আমরা ‘হকের পক্ষে’। নিরপেক্ষতার মুখোশ পরে এ দেশের ধর্মীয় পরিসরের তথ্য ও সংবাদকে বিকৃত ও অসম্পূর্ণভাবে উপস্থাপন কিংবা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। ফাতেহ মূলত এই জায়গাটায় কাজ করছে। বাংলাদেশি মুসলিম সমাজ ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলের সমস্যা ও সম্ভাবনা বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে তুলে আনার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি মোকাবেলা করছে ধর্মীয় পরিসরকে নিয়ে মূলধারার একশ্রেণির গণমাধ্যমের অব্যাহিত প্রোপাগাণ্ডার।
প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের আয়োজন ও সক্ষমতা নানা মাত্রিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক কম। ফলে সবগুলো কাজই ডেস্কে বসে করতে হয়; সরেজমিন বা মাঠ পর্যায়ে গিয়ে সংবাদ বা মতামত তুলে আনা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ বা ধর্মীয় মূল্যবোধ সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতে ধর্মীয় ঘরানার বক্তব্য তুলে আনতে মুঠোফোনের যোগাযোগই আমাদের মূল ভরসা।
এ ক্ষেত্রে ফাতেহ টিমকে বেশ সমস্যা পোহাতে হয়। ফাতেহ টিমের অভিজ্ঞতা থেকে যদি বলি, তাহলে এ কথা স্বীকার করতে হয়, বাংলাদেশের ইসলামি পরিসরের নেতৃত্ব এখনও ওভাবে মিডিয়াবান্ধব হয়ে উঠতে পারেনি। ইসলামি মূল্যবোধ সংশ্লিষ্ট কোনো ইস্যুতে বক্তব্য নিতে গেলে নেতৃস্থানীয়দের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ কথা বলতে রাজি হন না। তাঁদের কেউ কেউ মুঠোফোনে কথা বলতে পারবেন না বলে ওজরখাহি করেন, আবার অনেকে মিডিয়ায় আলাপ করতেই রাজি হন না। এ ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা বুঝতে চান না তাঁরা।
এ ছাড়া ধর্মীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা অনেকে আছেন, যাঁদেরকে ধর্মীয় সমাজ অথোরিটি জ্ঞান করে, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ ও কথা বলা সম্ভব হলেও দেখা যায় সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে গভীর বা বিশ্লেষণ করার মতো জানাশোনা তাঁদের নেই। অথচ ইস্যুটা ধর্মীয় পরিসরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বহুল আলোচিত অনেক ইস্যুতে বক্তব্য নিতে গিয়েও দেখা গেছে তাঁরা ভাসাভাসা মন্তব্য করেন, যা দিয়ে প্রোপাগাণ্ডার মোকাবেলা করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না।
এরকম নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে ধর্মীয় ঘরানার মতামত ও বিশ্লেষণ তুলে আনতে প্রতিনিয়তই ফাতেহ টিমকে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তবে এর বাইরেও অথোরিটি পর্যায়ের বেশ কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁরা শত ব্যস্ততার মধ্যেও সংবাদকর্মীদের সময় দেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মন খুলে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেন বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে। কিন্তু সংখ্যায় তাঁরা একদম হাতেগোনা।
প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রে ফাতেহ আরেকটা বিষয়ে বেশ জোর দেয়। ধর্মীয় পরিসরের শিক্ষামূলক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোর কার্যক্রম তুলে ধরা। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনে যেমন প্রচারণা হয়, তেম্নি তাদের কার্যক্রমের ভালোমন্দ নানা দিক সাধারণ মানুষের দৃষ্টির মধ্যে আসতে পারে। কিন্তু এই বিষয়ে কাজ করতে গিয়েও একাধিকবার দুঃখজনক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে ফাতেহ টিম। বলে রাখা ভালো, এই ধরনের কাজে ফাতেহের আলাদা কোনো লাভ বা স্বার্থ নেই। ধর্মীয় ঘরানার একটা প্রতিষ্ঠানকে জনসমক্ষে তুলে ধরার লক্ষ্য থেকেই ফাতেহ এ কাজগুলো করে থাকে। কিন্তু তথ্য-উপাত্তের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনে যখন যোগাযোগ করা হয়, অনেকেই এটাকে সন্দেহের নজরে দেখেন। অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপেশাদার নানাবিধ প্রশ্নে জর্জরিত করেন। কারও কারও কাছ থেকে দুঃখজনক আচরণও পাওয়া যায়। ফাতেহ টিম ধৈর্যের সঙ্গে এসব মুকাবিলা করে এবং তাদের প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের কার্যক্রমকে আমানতদারিতার সঙ্গে প্রতিবেদনে চিত্রায়িত করে। সব প্রতিষ্ঠানই যে এমন করে, তা বলছি না, বরং একটা শ্রেণির কথা বলাই এখানে উদ্দেশ্য। এ ছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান থেকেই আমরা প্রীতিপূর্ণ এবং আন্তরিক আচরণ পেয়েছি। প্রতিবেদনের সুবাদে ফাতেহ পরিবারের সঙ্গে অনেকের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কও গড়ে উঠেছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত ধর্মীয় সমাজ সংশ্লিষ্ট কোনো ঘটনা বা সংবাদ তুলে আনার ক্ষেত্রেও আমাদের বেশ বেগ পেতে হয়। কারণ, প্রকৃত ঘটনা যাচাই ও যথাযথ সংবাদ উপস্থাপনের জন্য এখানে সরেজমিন প্রতিবেদনের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু আমাদের ছোট মিডিয়া হাউজ এবং কর্মীসংখ্যা অপর্যাপ্ত হবার কারণে সরেজমিন প্রতিবেদন সম্ভব হয়ে ওঠে না। এ দিকে ইসলাম বা মুসলিম স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যু হবার কারণে এ ধরনের ঘটনার সংবাদ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে মূলধারার একশ্রেণির গণমাধ্যম নিজেদের চিরায়ত ‘একচোখা নীতি’ অবলম্বন করে, ফলে তাদের সরেজমিন প্রতিবেদনে ঘটনার সত্যাসত্য অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্মীয় সমাজকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের কোশেশ করে। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম তো সম্পূর্ণ বিপরীত ও প্রোপাগাণ্ডা মূলক আচরণের আশ্রয় নেয়। তাই তাদের সংবাদের ওপরও আমরা ভিত্তি করতে পারি না। বিকল্প হিসেবে এ ক্ষেত্রে আমরা সোর্সের সহায়তা নিই। ঘটনা যে এলাকায় ঘটেছে সেখানকার উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য মুঠোফোনের মাধ্যমে ডেস্কে বসেই আমরা নেওয়ার চেষ্টা করি। এবং এসব বক্তব্য দিয়েই প্রতিবেদন তৈরি করি।
উদাহরণ হিসেবে গেল অক্টোবরে সংঘটিত ভোলার বুরহানুদ্দিনে তৌহিদি জনতার ওপর পুলিশের হামলা ও চার মুসল্লির শাহাদাতের ঘটনা উল্লেখ করা যায়। ঘটনার পরদিন পর্যন্ত সেখানে কী ঘটেছে, কতটা নৃশংসতার শিকার হয়েছেন সাধারণ মানুষ, পুরো গণমাধ্যম এ নিয়ে নীরব ছিল। তারা কেবল প্রশাসনের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে তৌহিদি জনতার ওপর একতরফা দোষ চাপিয়ে আসছিল। ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর ঘটনার পর থেকে সেখানকার সাধারণ মানুষ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। এবং পরদিন দুপুরে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা তুলে ধরে বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শী এসব ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখে পরবর্তী পরিস্থিতিও ফলোআপ করে। যা মূল ধারার কোনো গণমাধ্যমই করেনি। প্রভাবশালী অনেক গণমাধ্যম উল্টো আরও আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর ওপর দোষ চাপানোর অপচেষ্টা চালায়।
ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর নানামাত্রিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ইসলাম ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতে এভাবেই তৎপর থাকার চেষ্টা করছে। চেষ্টা করছে ধর্মীয় সংবাদ প্রচারে ঢালাওভাবে যে প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানো হয় তার যথাসম্ভব মোকাবেলা করতে। ধর্মীয় ঘরানার সার্বিক সহযোগিতার জায়গাটা আরও বিস্তৃত হলে আমরা অনেকদূর পর্যন্ত এগিয়ে যাবার সাহস রাখি, বিতাওফিকিল্লাহ।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর
