ডিভাইড এন্ড রুল : ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের রহস্যময় সম্পর্ক

ডিভাইড এন্ড রুল : ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের রহস্যময় সম্পর্ক

মুনশি নাঈম:

২ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার মার্কিন ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাবশালী সামরিক কমান্ডার কাসেম সুলাইমানি। ইরানের বিশেষ বাহিনী রেভ্যুলশনারি গার্ডের অভিজাত বাহিনী কুদস ফোর্সের প্রধান ছিলেন তিনি। ট্রাম্পের নির্দেশেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ। মুটিভ অব মার্ডার হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুরাতন সেই অস্ত্র ব্যবহার করেছে ৷ ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ—কুদস ফোর্স যুক্তরাষ্ট্রের চোখে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করে। আর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি বলেছেন, কুদস ফোর্স সন্ত্রাসী সংগঠন। অন্যদিকে কাসেম সুলাইমানিকে হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ ও আক্রমণের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। যদিও পরবর্তীতে ইরাকে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটিতে ইরানের সাজানো হামলায় সে ঘোষণার বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।

ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন বাহ্যত দা-কুমড়োর মতোন। বাটে পেলেই যেন এক কোপে কেটে ফেলবে। আপাতত এই সম্পর্ক দেখে মনে হতে পারে দুই দেশ বুঝি চিরশত্রু। কিন্তু আসলেই কি তাই? ইতিহাস কী বলে। বিশ্ব মানচিত্রের পথচলায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের হাত ধরে কতটুকু পথ হেঁটেছে, কোথায় এসে থমকে দাঁড়িয়েছে তারা, কিংবা আসলেই কি থমকে দাঁড়িয়েছে নাকি ভেতরে ভেতরে চলছে মান-অভিমান—তারই একটা সংক্ষিপ্ত বয়ান এখানে তুলে আনছি।

সম্পর্কের সূচনা

১৮৫৬ সালে ইরানের নাসিরুদ্দিন শাহ রাষ্ট্রদূত হিসেবে মির্জা আবুল হাসান শিরাজিকে ওয়াশিংটন পাঠান। এরপর ১৮৮৮ সালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বপ্রথম সরকারি কূটনীতিক দূত হয়ে আসেন স্যামুয়েল বেঞ্জামিন। এভাবে অঘোষিতভাবেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের শুরু। ১৯৪১ সালে ইরানের ক্ষমতায় বসেন মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। তিনি ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের উন্নতি হয়। ১৯৪৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে তার কূটনৈতিক সম্পর্কের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে।

ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরান-যুক্তরাষ্টের কেমিস্ট্রি

রেজা শাহ ছিলেন আমেরিকা ভক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের মতোই পরাশক্তি হিসেবে দাঁড়াতে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন আমেরিকার হাতে। ইরানে তিনি আমেরিকান স্বার্থ সংরক্ষণের নীতি অনুসরণ করেছিলেন। জায়গায় জায়গায় ছাড় দিয়েছিলেন ওয়াশিংটনকে। আমেরিকার স্বার্থ সংরক্ষণের পর্যবেক্ষণে আমেরিকান সামরিক উপদেষ্টাদেরও ডেকে নিয়েছিলেন ইরানে। আমেরিকার সুবিধার দিকে লক্ষ্য করেই তৈরী করেছিলেন এমন ‘বিদেশি আইন’, অপরাধ করেও তারা বিনা প্রশ্নে পার পেয়ে যেত। এমনকি রেজা শাহ সোভিয়েতের ওপর গুপ্তচরবৃত্তির জন্য রাশিয়ান সীমান্তের নিকটে উত্তর ইরানে আমেরিকাকে সেনা-ঘাঁটি স্থাপনেরও অনুমতি দিয়েছিলেন।

১৯৫৩ সালে গণতান্ত্রিকভাবেই নির্বাচিত হয়ে ইরানের ক্ষমতার মসনদ পেয়ে যান ধর্মনিরপেক্ষ নেতা মুহাম্মদ মুসাদ্দেক। ক্ষমতা হারিয়ে ইরান থেকে পালিয়ে যান রেজা শাহ। ঠিক এই সময় রেজা শাহকে উদ্ধারে এগিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্র। সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি তথা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইয়ের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র পাকিয়ে ইরানে সেনা অভ্যুত্থান ঘটায় যুক্তরাষ্ট্র। তারপর আবার ক্ষমতা চলে আসে রেজা শাহের হাতে। রেজা শাহ মুসাদ্দেককে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় তিন বছরের কারাদণ্ড দেন। দণ্ড শেষ হলে ১৯৬৭ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়।

এই সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসার পর বলতে গেলে আমেরিকার পুতুল হিসেবেই ক্ষমতায় ছিলেন রেজা শাহ। এই সময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সমন্বয়ে ওয়াশিংটন প্রতিষ্ঠা করে সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস ‘সাফাক’। এটিই হয়ে উঠে রেজা শাহের মেরুদণ্ড। প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়নে তিনি ছিলেন তৎপর।

ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের রসায়ন

১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের অভ্যুত্থান ঘটলে দেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠে। এসময় রেজা শাহকে ইরানের মাটিতে সরাসরি সাহায্য না করে পিছু হটে যায় যুক্তরাষ্ট্র। ১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের বিজয় হলে আবার পালিয়ে যান রেজা শাহ। ফ্রান্সে নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় আসীন হন আয়াতুল্লাহ খোমেনি। কীভাবে একজন ধর্মীয় বিপ্লবী নেতা ফ্রান্সের মতো দেশে বসে বিপ্লব পরিচালনা করেন, সেই প্রশ্ন থেকে যায়। সেই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় পশ্চিমাদের সাথে ইরানের রহস্যময় সম্পর্ক।

আয়াতুল্লাহ খোমেনির দায়িত্ব গ্রহণের পরই মূলত ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বলে বিতৃষ্ণ হতে শুরু করে। খোমেনির দৃষ্টিতে আমেরিকা ছিল ইসলাম ও মুসলমানদের সর্বশ্রেষ্ঠ শত্রু। এসময় ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠে ইরানের মাটি। এসময় নির্বাসিত রেজা শাহকে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে চাইলে আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠে ইরান। ইরানি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ৪ নভেম্বর, ১৯৭৯ সালে ক্ষুব্ধ হয়ে আমেরেকান দূতাবাসে হামলা চালায়। দূতাবাসে কর্মরত ৫২ আমেরিকান কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং রেজা শাহকে দেশে ফিরে আসতে আহ্বান জানানো হয়।

আমেরিকান দূতাবাসে হামলা এবং তাদের কর্মকর্তাদের আটক করার কারণে আমেরিকারও আঁতে ঘা লাগে। তাই ১৯৮০ সালে ইরানের সঙ্গে যাবতীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয় ওয়াশিংটন। আপাত দৃষ্টিতে শত বছরেরও বেশি স্ট্রং একটা সম্পর্কের ইতি ঘটে। তারপর অবশ্য ১৯৮১ সালের ২০ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগনের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথগ্রহণের দিন এই ৫২ কর্মকর্তাকে মুক্তি দেয় ইরান।

কিন্তু সম্পর্কের তিক্ততা তেমনি বজায় থাকে। ১৯৮৮ সালে আমেরিকান ফ্রিগেট ইরানের একটি বিমান বিধ্বস্ত করে। ফলে ২৯০ জন ইরানি যাত্রী মারা যায়। কিন্তু আমেরিকা সাধারণ দুঃখপ্রকাশও করেনি। বরং সে বছর প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জর্জ ডাব্লিউ বুশ বলেছিলেন, আমি ক্ষমা চাইতে পারব ন।

রহস্যময় সম্পর্কের খেলায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র

সম্পর্কচ্ছেদের পর ইরান যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থাটা হয়ে যায় প্রক্তন প্রেমিকার মতো। অবজ্ঞায় একজন আরেকজন থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখছে, কিন্তু মন বলছে মিটে যাক এই দূরত্ব। কাছে আসাআসি হোক আবার। ২০১৫ সালে দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রবন্ধে এই রহস্যময় সম্পর্ক খোলাসা করেছিলেন একজন আমেরিকান জৈষ্ঠ দোভাষি বানাফসে কেইনুশ। তিনি ইরানের চার রাষ্ট্রপতির পছন্দের দোভাষী ছিলেন। হেগের আন্তর্জাতিক আদালতেও তিনি দোভাষীর কাজ করেছেন ৭ বছর।

কেইনুশ লিখেছেন, ‘আমি ইরানের চার রাষ্ট্রপতির দোভাষী ছিলাম। দেখেছি—তারা সকলেই আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগাতে সচেষ্ট ছিলেন।

১৯৮৯-৯৭ পর্যন্ত ইরানের রাষ্ট্রপতি ছিলেন আলী আকবর রাফসানজানি। ১৯৮০-৮৮ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় তিনি অস্ত্রের জন্য আমেরিকার সঙ্গে গোপন যোগাযোগ শুরু করেছিলেন। এরপর ১৯৯১ সালে আমেরিকা-ইরাকের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় বিদেশি ইন্টেলিজেন্সদের বলেছিলেন, ‘উপসাগরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি ইরান মেনে নিবে।’ অথচ প্রকাশ্যে তিনি এর বিরোধিতা করেছিলেন।

১৯৯৭-২০০৫ সালে ইরানের রাষ্ট্রপতি ছিলেন মোহাম্মদ খাতমি। ১৯৯৭ সালে নিউইয়র্কের সফরে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে তিনি আমেরিকান ইতিহাসের ধর্মগুরুদের কথা খুব শ্রদ্ধার সাথে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন, আমেরিকা এবং ইরান উভয়ের মূলেই রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস।

২০০৫-২০১৩ সালে ইরানের রাষ্ট্রপতি ছিলেন মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। তিনি মোহাম্মদ খাতামির উত্তরসূরী ছিলেন। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আমেরিকা ইরানের ধর্মীয় ঐতিহ্য দেখাতে একহাতে কোরআন এবং আরেক হাতে বাইবেল নিয়ে বক্তৃতা দিতে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বারাক ওমাবার নির্বাচনের সময় পারমাণবিক কর্মসূচির প্রচারণা কমিয়ে দিয়েছিলেন। শুধু তাই না, বারাক ওমাবাকে তিনি ‘শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান’ বলে প্রশংসাও করেছেন। তার এই প্রশংসা বাক্যটি ঠিকমতো অনুবাদ করায় আমারও পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন তিনি।

২০১৩ সালে হাসান রূহানি রাষ্ট্রপতি হলে হলে পরমানু ইস্যুতে তিনি বারাক ওমাবার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। দীর্ঘদিন ধরেই হাসান রূহানি পারমাণবিক ইস্যু সমাধান করতে ওয়াশিংটনের কাছে তার ইচ্ছের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনি যখন সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি হিসাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ইরানের পারমাণবিক আলোচনার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তখন রুহানি তত্কালীন আইএইএর প্রধান মোহাম্মদ এলবারাদেইকে আমেরিকানদের সাথে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন।’

কেইনুশ তলেবানের বিরুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গে ইরানের চুক্তির বিষয়ে ওই প্রবন্ধে কিছু না বললেও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধিকারিক রায়ান ক্রকার তার স্মৃতিচারণে তা তুলে ধরেছেন। ৯/১১ হামালার সময় ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান ছিলেন সদ্য নিহত কাসেম সুলাইমানি। তিনি আমেরিকানদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন আফগানিস্তানের ম্যাপ। ম্যাপ দেখিয়ে বলেছিলেন আগে এখানে আক্রমণ করুন, তারপর এখানে, তারপর ওখানে। ২০০১ সালের অক্টোবরের শুরুতে ম্যাপ হাতে পাওয়ার পর আমেরিকা আফগানিস্তানে হামলা শুরু করে। এসময় ইরান আমেরিকার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল—আমেরিকান সেনারা সমস্যায় পড়লে তাদের সাহায্য করবে ইরান। তারা চাইলে তাদের খাদ্য সরবরাহের জাহাজের জন্য ইরানের পোর্ট ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু ২০০২ সালে জর্জ ডাব্লিউ বুশ ইরানকে ‘লম্পট’ বলে অভিহিত করলে সরাসরি সহায়তা প্রদান ফলত বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সবসময়ই তখন একটু নমনীয় ছিলেন সুলাইমানি এবং পুনরায় আলোচনা শুরু করতে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দেন তিনি। এরপর ২০০৩ সালে আমেরিকা ইরাকে হামলা করলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও অবনতি হয়। ২০০৮ সালে কারবালায় পাঁচজন মার্কিন সৈন্য নিহত হলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পেট্রিয়াসের কাছে কাসেম সুলাইমানি নমনীয় ভঙ্গিতে লিখেছিলেন, আমি খোমেনির সমাধিতে কসম করে বলছি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আমি বুলেটকে অনুমতি দেই না।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বাহ্যত দৃষ্টিতে শত্রুতা দেখিয়ে সবার চোখে ধূলো দিলেও ভেতরে ভেতরে এতদিন তারা একসঙ্গেই কাজ করে এসেছে। ইরাকে আইএস নির্মূলে আমেরিকার সঙ্গে জোটবেঁধে কাজ করেছে। সিরিয়ায় বিদ্রোহ শুরু হলে ইরান যখন আসাদ সরকারকে সমর্থন দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আসাদের বিপক্ষে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, বরং বিদ্রোহীদের থেকে কার্যত তাদের সমর্থন তুলে নিয়েছে। এমনকি তুরস্ক বিদ্রোহীদের সাহায্য করতে এলে তুরস্কের ওপর নানা বিধি-নিষেধ আরোপের হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। উল্টোদিকে সৌদি যখন ইয়ামেনে হুথিদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে, যুক্তরাষ্ট্র সৌদিকে সরাসরি সাহায্য করে না বরং সৌদিপন্থী ‘জিহাদি’দেরকে হত্যা করে কার্যত ইরান সমর্থিত হুথিদেরকেই সাহায্য করছে।

আমেরিকা-ইসরাইল যেহেতু একই ক্যাটাগরির, প্রসঙ্গত ইরান-ইসরাইল সম্পর্কের প্রসঙ্গটাও এখানে এসে পড়ে।

ইরান-ইসরাইল সম্পর্ক

১৯৪৭-৫৩ সালে রেজা শাহ যখন ইরানের ক্ষমতায়, ইসরাইলের সঙ্গে দারুণ বন্ধুত্ব ছিল ইরানের। যে সময় আমেরিকার সঙ্গেও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। আমেরিকার সেনা অভ্যিত্থানে রেজা শাহ পুনরায় ক্ষমতায় বসলে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হয়। কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর সে সম্পর্কে ভাটা পড়ে। কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে ইরান। অদ্ভুত হলো—সম্পর্ক ছিন্ন করার পরও ১৯৮১ সালে ইরাক-যুদ্ধের সময় ইসরাইলের সঙ্গে অস্ত্র চুক্তি করে ইরান। এসময় ইসরাইল ইরানের কাছে ৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করে। একই বছর বাগদাদের নিকট ওসিরাক পারমাণবিক চুল্লি ধ্বংস করে ইরাকের বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান নিয়ে ইরানকে সহায়তা করে ইসরাইল। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মতে, ১৯৮১-৮৩ সাল পর্যন্ত ইসরাইল ইরানের কাছে ৫০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করে। এর অধিকাংশই তেল দিয়ে শোধ করে ইরান।

কাইনুশ লিখেছেন, ‘আমেরিকা এবং ইরান কেউ চায় না আফগানিস্তানে তালেবান মাথা তুলে দাড়াক। তাই ট্রাম্প তালেবানদের সাথে শান্তি আলোচনা শুরু করলে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইরান। ইরানের আশঙ্কা—মার্কিন সৈন্য সরিয়ে নেয়ার পর তালেবান ক্ষমতায় এসে যেতে পারে। কদিন আগে যখন আফগানিস্তানের সরকার ছাড়াই তালেবানের সঙ্গে আলোচনায় বসে ট্রাম্প, ইরান তখন আফগান সরকারকেও শক্তিশালী করার প্ররোচনা দিয়েছিল ট্রাম্পকে। যেন সৈন্য ফেরানোর পর তালেবান ক্ষমতায় আসতে না পারে।

অন্যদিকে পরমাণু ইস্যুতেও ইরান সমঝোতা চায়। তারা চায়—পরমাণু চর্চা তারা কমিয়ে দিতে রাজি এই শর্তে যে, আমেরিকা ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রত্যাহার করবে।’

শেষ দৃশ্যপট

ইরান-আমেরিকা সম্পর্ক এতদিন যা-ই ছিলো, কাসেম সুলাইমানিকে হত্যার পর এখন তা তীব্র শত্রুতা এবং প্রতিশোধস্পৃহায় জ্বলছে। সম্পর্কটা এরপর কোথায় গড়ায়, তা দেখতে আরও সময় অপেক্ষা করতে হবে। তবে আমেরিকার ঘাটিতে ইরানের সাজানো আক্রমণে প্রমাণিত হয় যে, ইরান আমেরিকার সাথে যুদ্ধ করতে আগ্রহী নয়। বিশ্লেষকদের মতে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কোন ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ সম্পর্ক না থাকলেও অন্তত স্বার্থগত দিক থেকে অনেক বিষয়ে ঐক্য আছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত ভবিষ্যৎ মধ্যপ্রাচ্যের ম্যাপে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে ভাগ করার প্রস্তাব থাকলেও ইরানে হস্তক্ষেপ করার কোন পরিকল্পনা নেই, কাজেই নিকট ভবিষ্যতে ইরান আমেরিকার সম্পর্ক সহজে শেষ হবার কোন আশঙ্কা নেই।

আগের সংবাদক্রুসেড যুদ্ধে শিয়া-সুন্নি সম্পর্কে প্রভাব:  মুখতার শানকিতীর গবেষণা
পরবর্তি সংবাদশিয়া-সুন্নি সম্পর্ক : ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিক বিবেচনা