তাবলিগের সংস্কার নিয়ে কতটা আশাবাদী আলেম সমাজ

|| তাসনিফ আবীদ ||

বিশ্বব্যাপী দ্বীন প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলিগ। হজরতজি মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভি রহ. এর হাত ধরে দাওয়াতের এই পদ্ধতির সূচনা। আজ অব্দি সেই মেহনত চলে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নানা কারণে তাবলিগ নিয়ে মানুষের মাঝ অযাচিত কিছু ধারণা তৈরি হচ্ছে; যা প্রত্যাশিত নয়। এর কারণ কী? দাওয়াতের এই মেহনতকে আরো বেগমান করতে কীভাবে এগুনো উচিৎ? এর সংস্কার নিয়েই বা কী ভাবছেন আলেমরা? এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম দেশের প্রাজ্ঞ মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ’র সঙ্গে। যিনি তাবলিগের বিষয় নিয়ে ভাবেন, কথা বলেন এবং গবেষণা করেন।

মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ বলেন, দাওয়াতের মাধ্যমেই আমরা দ্বীন পেয়েছি। ইসলাম পৃথিবীতে ছড়িয়েছে দাওয়াতের মাধ্যমেই। এই দাওয়াতের কাজকে বেগবান করতেই প্রচলিত ‘দাওয়াত ও তাবলিগ’ পদ্ধতির সূচনা করেছিলেন মাওলানা ইলিয়াস রহ.। আলহামদুলিল্লাহ প্রায় শত বছর ধরে তার মেহনতের ফল মুসলিম উম্মাহ ভোগ করছে। প্রতিদিন এর মাধ্যমে মানুষ দ্বীনের দিশা পাচ্ছে। বিষয়টিকে কোনাভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

‘তবে মনে রাখতে হবে এই কাজই ইসলাম প্রচার বা নবীওয়ালা দাওয়াতের একমাত্র পথ নয়।’ মত দেন তিনি

তার মতে, আজ প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলিগের কিছু সাথীভাই তাদের মেহনতের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়েছে খানকাহি মেহনত, মাদরাসার দরস-তাদরিস, জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহকে ছোট করছে কখনো কখনো। এটা কোনাভাবেই কাম্য নয়। দাওয়াতের যতগুলো শাখা আছে এবং এসবের সঙ্গে যারা যুক্ত আছে সবাই সবাইকে সহযোগী মনে করতে হবে। তাহলেই দ্বীন ও ইসলামের সঠিক বার্তা মানুষের মাঝে পৌঁছানো সহজ হবে।

তিনি বলেন, আজ দাওয়াত ও তাবলিগের মতো নিরেট একটি কাজ নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এই বিষয়ে তাবলিগের সাথীভাই ও ওলামায়ে কেরামকে আরো সচেতন হতে হবে।

তিনি যুক্ত করেন, আল্লাহ তায়ালা কুরআনে দাওয়াতের তিনটি স্তরের বর্ণনা দিয়েছেন। প্রতিটি স্তরের দাওয়াতের জন্যই ইলম আবশ্যক। আর আলেমরাই হলো ইলমওয়ালা। ইলম ও আলেম সম্প্রদায়কে একপাশে রেখে সাহাবা যুগ থেকে এই পর্যন্ত কোনো কালেই দাওয়াতের কাজ হয়নি। তাই এখনো সম্ভব নয়। তাছাড়া ইলিয়াস রহ. এরও মনের তামান্না ছিল আলেমরা যেন তার উদ্ভাবিত এই মেহনতের সঙ্গে বেশি বেশি যুক্ত হয়। বর্তমানে একটি মহল চাচ্ছে আলেমরা দাওয়াত ও তাবলিগের সঙ্গ ছেড়ে দিক। আলেমরা দাওয়াত ও তাবলিগ বিষয়ে কোনো কথা না বলুক। এটা আ’ম মানুষরা যেভাবে পরিচালিত করছে সেভাবেই চলুক। কিন্তু তারা জানেনা এভাবে চলতে থাকলে এই মেহনত ধীরে ধীরে ফেতনায় পরিনত হবে। যেমন আমরা মাওলানা সাদ সাহেবের অনুসারীদের মাঝে দেখতে পাচ্ছি।

‘তারা সরাসরি আলেমদের ব্যাপারে চরম কূটক্তি করে। আগে ইহুদি-নাসারারা যেসব মিথ্যা অভিযোগ তুলতো আলেমদের ওপর সেসব মিথ্যা অভিযোগ এখন সাদ সাহেবের অনুসারীরা তুলছে। এমনকি তারা আলেমদেরকে ফোন করে পর্যন্ত নোংরা গালাগালি করছে। হজরত ইলিয়াস রহ. এর মেহনতে যুক্ত থাকা প্রকৃত কোনো তাবলিগের সাথীর মাধ্যমে এই কাজ কল্পনাও করা যায় না। তাই এসব বিষয়ে সচেতন হতে হবে। তাবলিগের আ’ম সাথীরা অবশ্যই আলেমদের রাহনুমায়িতে চলতে হবে।’ মত দেন তিনি

তিনি বলছেন, উলামায়ে কেরামের মূল দায়িত্ব হলো নবীওয়ালা দাওয়াত মানুষের মাঝে বিস্তারের জন্য কাজ করা। এখন এর পদ্ধতি নানাভাবে হতে পারে। বর্তমান উলামায়ে কেরাম বেশিরভাগ তাদের সময় ব্যয় করছেন পড়ালেখা, তাসনিফাত, গবেষণা ও ওয়াজ-নসিহতের মাধ্যমে। এছাড়া অল্পকিছু আলেম প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলিগের সঙ্গে যুক্ত আছেন। আমি মনে করি এই সংখ্যাটা আরও বাড়ানো দরকার। উলামায়ে কেরাম যদি তাবলিগকে তাদের নিজেদের কাজ মনে করে সাল, চিল্লায় আরও বেশি যুক্ত হয় তাহলে এই মেহনত আরও জৌলস ছড়াবে। আর তাবলিগে থাকা সাধারণ মানুষও বেশ উপকৃত হবে। তাই ইলমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার পাশাপাশি তাবলিগের কাজকেও তারা আপন করে।

মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ বলেন, যে যতটুকু সময় বের করতে পারবে সে যেন ততটুকু সময়ই এই মেহনতে দেয়। যেমন, একটু চেষ্টার মাধ্যমে একটা সালের জন্য সময় বের করা। রমজানের ছুটি কাজে লাগিয়ে চিল্লায় সময় দেওয়া। পরীক্ষা বা অন্যান্য বন্ধের সময় এক সপ্তাহ, তিন দিন বা চব্বিশ ঘণ্টার জন্য তাবলিগের যাওয়া। এছাড়া সিনিয়র পর্যায়ের আলেম যারা আছেন বা ইলমি ব্যস্ততায় যারা ব্যাপকভাবে জড়িয়ে গেছেন তারা তাবলিগের সাথীভাইদের নানা পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে, রাহনুমায়ি করার মাধ্যমেও তাবলিগের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। এছাড়া ফজরের পর যখন মসজিদে মাশওয়ারা হয়, মাগরিবের পর যখন তালিম হয় তখন একটু সময় বের করে তাদের সঙ্গে বসা, তাদের কথা শোনা, তালিম শোনা কিন্তু খুব প্রয়োজন। তারা যেন অজ্ঞতাবশত কুরআন হাদিসের বাইরে কিছু বলে বা করে না বসেন সে বিষয়ে খেয়াল রাখার জন্য এসব অত্যন্ত জরুরি।

দাওয়াত ও তাবলিগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। নবী-রাসুলগণ কালেমার দাওয়াতকে মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছিয়েছেন। সর্বশেষ নবী আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম এসে চলে যাবার আগে বলে গেছেন, ‘আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও একে অপরের কাছে পৌঁছাও।’ [বুখারি-৩৪৬১] এ সিলসিলা বজায় রাখতে দাওয়াত দিতে হয় দীনের প্রতি। তবে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে একজন দায়ীর মাঝে ইলম, হেকমত, ইখলাস, তাকওয়া ও ধৈর্য থাকতে হবে। আর এগুলো কীভাবে অর্জন করতে হয় তা একমাত্র আলেমরা জানে। কেননা আল্লাহ তায়ালা আলেমদেরকেই ইলমের দৌলত দান করেছেন।

‘যুগে যুগে দাওয়াতের কাজের চালিকাশক্তি মূলত উলামায়ে কেরাম। কারণ, দাওয়াত দেবে কুরআন-হাদিসের। আর এর চালিকা শক্তি হলো ইলম। ইলম না থাকলে দাওয়াত দেবে কীভাবে! অগাধ ও সহিহ-শুদ্ধ ইলম দরকার একজন দাঈর। তাহলে দাওয়াত সহিহভাবে পৌঁছবে জনগণের কাছে। আর ইলম না থাকলে গলত-ফলত পৌঁছবে। মানুষ ইসলাম সম্পর্কে ভুল বার্তা পাবে। বিপথে পরিচালিত হবে।’ যুক্ত করেন প্রাজ্ঞ এই মুফতি

আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, অজানা কারণে একসময় আলেম এবং তাবলিগের মাঝে অদৃশ্য একটি রেখা পড়ে ছিল। এখন সেটা দূর হয়ে গেছে অনেকটাই। কিন্তু এখনও যে একেবার নেই এমনটি নয়। তাই আমি বলবো, তাবলিগের এই কাজ আলেমদের তত্ত্বাবধানে এবং আলেম ও আওয়াম এর সমন্বয়ে যদি চলে তাহলেই উম্মতের ফায়দা হবে। না হয় বহুত ক্ষতি হতে পারে। চতুর্দিকে গুমরাহি সম্প্রসারিত হবে। বাতিলের ডালপালা বিস্তার করবে।

তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ঈমানের নূরকে প্রজ্জ্বলিত করতে এবং ঈমানের দাওয়াতকে বেগবান করতে প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলিগের সূচনা করেন হজরত মাওলানা ইলিয়াস রহ.। তার নিয়তের স্বচ্ছতার কারণে আল্লাহ এই মেহনতকে এমনভাবে কবুল করেছেন; কোটি কোটি মানুষ এই কাজের সঙ্গে জড়িত। লাখো পথভোলা মানুষ এর মাধ্যমে সঠিক পথের দিশা পেয়েছে। সময় অনুযায়ী ওলামায়ে কেরামের সঠিক নির্দেশনায় এই মেহনত এগিয়ে গেলে গ্রহণীয় এই মেহনত ফিকে যাবে না।

আগের সংবাদইমরানের দলের সাথে হাত মেলানোর ঘোষণা জমিয়তের
পরবর্তি সংবাদহজের মৌসুমে মক্কা-মদিনায় কাজের সুযোগ