মাহদি হাসান :
তাবলীগ শব্দটির শাব্দিক অর্থ হচ্ছে পৌঁছানো। বস্তুত মহান আল্লাহ তাআলা বিশ্ব মানবতার কল্যাণে বিশ্ব নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে যে দীন প্রবর্তন করেছেন তার যথাযথ প্রচার-প্রসার করার নাম হচ্ছে তাবলীগ। শাব্দিক অর্থের বিবেচনায় তাবলীগের সূচনা ইসলামের প্রাথমিক লগ্ন থেকেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেন,
‘يٰٓأَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَآ أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ۖ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُۥ ۚ’
অর্থঃ হে রাসূল, পৌঁছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তাঁর পয়গাম কিছুই পৌঁছালেন না। [সুরা মায়েদা, আয়াত : ৬৭]
রাসুল সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরামগণ তাবলীগে দীন তথা ধর্মের প্রচার করেছেন। তাবলীগ বা দীনের প্রচার-প্রসার ইসলামের একটি অন্যতম ফরজ বিষয়। ইলম তথা ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা যেমন ফরজ, তেমনি সেই ইলম অনুযায়ী যথাসাধ্য ইসলামের দাওয়াত প্রদান, সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করাও ফরজ। যুগ-যুগান্তরে মুসলিম মনীষীগণ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে সেই ফরজ কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। দাওয়াতি কাজের ধারাকে বলবৎ ও বহাল রেখেছেন। কিন্তু ব্রিটিশ বেনিয়াদের অপতৎপরতা ও অপকৌশলের কারণে দীনি দাওয়াতের সেই জোয়ারে লেগে যায় ভাটার টান। স্তিমিত হয়ে যায়, দাওয়াত ও তাবলীগ। তথাপি উপর্যুপুরি বদদীনির সয়লাবে মুসলমান, মুসলমানি আমল-আখলাক, নীতি-নৈতিকতা, মানবতা ও উদারতা সবই হারিয়ে ফেলে। মুসলিম প্রজন্ম ইসলামি মূল্যবোধ সম্পর্কে বেমালুম বেখবর হয়ে বসে আছে। তখন উপমহাদেশের বিদগ্ধ দায়ী ও মনীষীগণ আল্লাহর কাছে এই এলাকার ইসলাম ও মুসলমানিত্ব সুরক্ষার জন্য বুক ফাটা কান্না-কাটি করেন। দাওয়াত ও তাবলীগের মিশন পুনরায় চালু করার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। তাদের অন্যতম হলেন, প্রখ্যাত আলেমে দীন, আশেকে রাসুল মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াছ রহ. (১৮৮৫-১৯৪৪)। তিনি ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের রাজস্থানের মেওয়াত নামক এলাকায় সর্বপ্রথম তাবলীগ জামাতের কার্যক্রম শুরু করেন। অতঃপর ১৯২০ সালে দিল্লিতে তাবলীগের কর্মতৎপরতার বিস্তৃতি ঘটে। এখান থেকেই সারাবিশ্বে বর্তমান প্রচলিত ধারার দাওয়াত ও তাবলীগ জামাতের সূচনা।
নিঃসন্দেহে দাওয়াত এবং তাবলীগ দীনের বৃহৎ একটি অংশ। এই কাজ যেন সুচারুরূপে শরঈ তরিকায় সম্পন্ন হতে পারে, তজ্জন্য কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা গ্রহণ জরুরি। কাজের সাথে জড়িতদের মানসিকতা গঠনও একান্ত প্রয়োজন। আর কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা গ্রহণের জন্য সম্মানিত উলামায়ে কেরামের পরামর্শ গ্রহণ করাও দরকারি। তাবলীগ জামাতের এই ধারা প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই উলামায়ে কেরামের সুষ্ঠু তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে তৃণমূল পর্যায় থেকে উলামায়ে কেরামের সম্পৃক্ততাহীনতার কারণে তাবলীগ এবং সংশ্লিষ্টদের মাঝে জন্ম হয়েছে কিছু ভুল ধারণার। ভুল থেকে তা একপর্যায়ে গোঁড়ামিতে পরিণত হয়েছে। এমনই একটি ভুল হচ্ছে—শুধু তাবলীগকেই সাফল্যের মাপকাঠি মনে করা।
ই-কার আর ও-কারের দ্বন্দ্ব
শিরোনামটি বোঝার জন্য আমি দুটি ঘটনা উল্লেখ করব। মাগরিবের পর বয়ানে দাঁড়ালেন এক তাবলীগী ভাই। বয়ানের এক পর্যায়ে তিনি বললেন, তাবলিগ হচ্ছে মহাসাগরের মতো। আর দীনের অন্যান্য শাখা হচ্ছে সেই সাগরের এক ফোঁটা পানির মতো। সামনেই বসা ছিলেন একজন সম্মানিত আলেম। প্রসিদ্ধ এক মাদরাসার শায়খুল হাদিস তিনি। ভাইটির এমন বক্তব্য শুনে তিনি তাঁকে ধমক দিয়ে বসিয়ে দিলেন। বললেন, এতটা স্পর্ধা হলো কী করে আপনার? দীনের অন্যান্য রুকনকে খাটো করার সাহস আপনাকে কে দিয়েছে? তাবলীগকে দীনের অংশ বলা যায়। কিন্তু দীনের আরো অনেক অংশ আছে। যেগুলোর কোনোটিই কোনোটির তুলনায় ছোট নয়। ভাইটি সাথে সাথে তার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন।
আরেক ভাই বয়ানে দাঁড়িয়ে বললেন, তাবলীগই হচ্ছে নাজাতের একমাত্র উসিলা তথা মুক্তির মাধ্যম। ই-কারটি তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে উচ্চারণ করলেন। বয়ান শেষে তার সাথে তর্কে জড়ালেন এক তরুণ আলেম। সহজ ভাষায় বললেন, আপনি নির্দিষ্ট করে শুধু তাবলীগকেই নাজাতের উসিলা বলতে পারেন না। বরং বলা যায় তাবলীগও হচ্ছে নাজাতের একটি উসিলা। নাজাতের আরও অনেক উসিলা রয়েছে। কিন্তু সেই ভাইটি তরুণ আলেমের কথা মানতে নারাজ। তিনি নানাভাবে তার বক্তব্যকে প্রমাণ করতে চাইলেন। যদিও তিনি আলেম ছিলেন না, কিন্তু একজন আলেমের কথা এ ক্ষেত্রে তিনি গ্রাহ্য করলেন না।
আশা করি উক্ত ঘটনাটি থেকে শিরোনামে ই-কার আর ও-কারের দ্বন্দ্বের বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। তাবলীগকে সাফল্যের মাপকাঠি বলার ক্ষেত্রে এটিই হচ্ছে সারকথা। শুধু তাবলীগকেই দীন মনে করা যাবে না। বরং তাবলীগকে দীনের একটি অংশ মনে করতে হবে। ঘটনা দুটি কোনো কল্পনা নয়। বাস্তব থেকেই নেয়া। প্রথম ঘটনায় দেখতে পেলাম যে, সাধারণ তাবলীগী ভাইটি তাঁর ভুল বুঝতে তৎক্ষণাৎ ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু দ্বিতীয় ঘটনায় দেখতে পেলাম যে, সেখানে সাধারণ ভাইটি তার ভুলকেই সঠিক ভেবে বসে আছেন। দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকদের কারণেই বর্তমান তাবলীগে চলমান সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। এদের অনেককেই দেখা যায় তারা নিজেদেরকে মহাপণ্ডিত ভেবে বসে থাকেন। আলেমগণকে তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখেন। তাবলীগের চলমান সঙ্কট নিরসনে তাদের এই প্রবণতাকে দূর করার কোনো বিকল্প নেই। তাবলীগের মতো একটি অন্যতম দীনি কাজকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য দীনের সঠিক ধারক-বাহক হক্কানি উলামায়ে কেরামের দিকনির্দেশনা এবং তাদের সম্পৃক্ততা হচ্ছে সবচেয়ে জরুরি। নইলে তাদেরকে পদে পদে স্খলনের শিকার হতে হবে।
সঙ্কট নিরসনে করণীয়
তাবলীগ জামাতের চলমান সঙ্কট এবং কিছু লোকের পদস্খলনের পেছনে প্রধান কারণ বলা যায়, প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস রহিমাহুল্লাহু যে চিন্তা ও দর্শনের উপর তাবলীগের এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন, সেই চিন্তা ও দর্শন থেকে সরে যাওয়া। তাবলীগকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল সেই সময়ের মুসলমানগণের মনে দীনের মর্যাদাবোধ ফিরিয়ে আনার জন্য। ধর্মের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়ে যাওয়ায় তখন মুসলিম সমাজ থেকে ধর্মের মূল্যবোধই হারিয়ে যেতে বসেছিল। অথচ ঈমান এবং ধর্মীয় মূল্যবোধই হচ্ছে ইসলামের মৌলিক ভিত। যদি এ দুটিই হয় দুর্বল তাহলে পুরো দীনটাই যে নড়বড়ে হয়ে যাবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাই ইলিয়াস রহিমাহুল্লাহ সাধারণ মানুষের ঈমান তথা দীনের শিকড়কে শক্তিশালী করার জন্য কিছু করার প্রয়োজনবোধ করেছিলেন। এগুলো অর্জন হলে বাকি বিষয়গুলোর প্রতি তাঁরা এমনিতেই আগ্রহী হয়ে উঠবে। এ থেকে বোঝা যায় যে, দীন সম্পর্কে এবং দীনের মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যেই তাবলীগ জামাতের এই পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। এটিকে দীন শেখার পরিপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে চালু করা হয়নি। কিন্তু কিছু লোক তাবলীগকেই দীন শেখার স্বতন্ত্র প্লাটফর্ম মনে করে বসে আছে। এ ধরনের লোকেরাই সাল, চিল্লা ইত্যাদি তাবলীগী অভিধাগুলোকে যোগ্যতার মানদণ্ডরূপে দাঁড় করাচ্ছে। সঙ্কট সৃষ্টিতে এ ধরনের প্রবণতাই সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। তাই সঙ্কট নিরসনের জন্য এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা অপরিহার্য।
মাদরাসা শিক্ষা বনাম তাবলীগ
মাদরাসা শিক্ষা এবং তাবলীগের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। তাবলীগের মাধ্যমে যে উপকারিতা অর্জিত হয় এ তুলনায় মাদরাসা শিক্ষার উপকারিতা আরও অধিক এবং ব্যাপক। ইলিয়াস রহিমাহুল্লাহ এই মনোভাব নিয়েই তাবলীগী জামাতের এ ধারা প্রবর্তন করেছিলেন যে, এটি মাদরাসা শিক্ষার জন্য সহায়ক হবে। আগেই বলেছি তখনকার মুসলিম সমাজে দীনের মূল্যবোধ এবং মর্যাদাবোধ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। ইলিয়াস রহিমাহুল্লাহ অনুভব করেছিলেন, এভাবে দীনি মর্যাদাবোধ হারিয়ে যেতে থাকলে সমাজের দীনি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে সঙ্কট তৈরি হবে। নতুন কোনো দীনি প্রতিষ্ঠান তৈরি হওয়া তো দূরের কথা, চলমান এবং পুরনো দীনি প্রতিষ্ঠানগুলোও অস্তিত্ব সংকটে ভুগবে। কারণ দীনী মর্যাদাবোধ হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তার অনুভূতি, সেগুলো সংরক্ষণের গুরুত্ববোধ এবং সেখানে কর্মরতদের দ্বীনী খেদমত ও অবদানের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতির মানসিকতা ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছিল। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান দুনিয়ামুখিতা এবং ঈমান ও সওয়াবের প্রতি অনাগ্রহিতার কারণে দ্বীনী ইলম চর্চাও নিষ্ফল হয়ে যাচ্ছে।
মুসলমানদের কল্যাণের জন্য মাদরাসাকে তিনি অপরিহার্য মনে করতেন। কিন্তু মানুষের উদাসীনতার কারণে বিপুল মাদরাসা তখন মেওয়াতেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অথচ এই মাদরাসাগুলো আকাবিরগণ দীনি দাওয়াত ও মেহনতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দীন জিন্দা রাখার জন্য দেশব্যাপী মাদরাসার জাল ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। মাদরাসাগুলোকে তার আপন মহিমায় অটুট রাখার জন্য এবং মানুষের দীনি মর্যাদাবোধ জাগ্রত করার জন্য আবার তেমন দীনি দাওয়াত ও ত্যাগ-তিতীক্ষার প্রয়োজন ছিল। মোটকথা তাবলীগ জামাতের চিন্তাগত ভিত্তির অন্যতম একটি অংশ ছিল মাদরাসাগুলোর অস্তিত্ব সংকট দূর করতে সেগুলোর সহযোগী হিসেবে কাজ করা। মাদরাসার সাথে আদর্শিক দ্বন্দ্ব প্রতিষ্ঠা কখনোই তাবলীগ জামাতের উদ্দেশ্য ছিল না। মাদরাসাকে যারা তাবলীগের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে তারা যে তাবলীগের মূল চিন্তাগত ভিত্তি থেকে বিট্যুত, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
এ কথা স্পষ্ট যে, তাবলীগ জামাতের এই পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার পেছনে ইলিয়াস রহিমাহুল্লাহর উদ্দেশ্য ছিল মানুষের ভেতরকার দীনি জযবা ও মর্যাদাবোধ জাগ্রত করা এবং সমাজে ধর্ম, ধর্মীয় অনুশাসন পালন এবং দীন শিক্ষা করার চাহিদা ব্যাপকতর করা; যেন দীনের অন্যান্য শাখায় যারা কাজ করছেন, তাদের পরিশ্রম পণ্ড না হয়। তাবলীগকে দীন প্রচারের এবং মানুষকে দীনমুখী করার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা কখনোই তার উদ্দেশ্য ছিল না।
অতএব, তাবলীগ জামাতকে তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে হলে সবার আগে নিজেদের গোঁড়ামি বর্জন করতে হবে এবং তাবলীগ জামাতের চিন্তাগত ভিত্তি এবং আদর্শ নিয়ে রিথিংকিং করতে হবে। নয়তো একের পর এক সঙ্কট তাবলীগ জামাতের কুসুমাস্তীর্ণ পথে বিষাক্ত কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে।
