তিন মাসেও শেষ হয়নি তদন্ত : প্রশ্নফাঁসে জড়িতদের বিচার আদৌ কি হবে?

মুসান্না মেহবুব

সম্মিলিত কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড আল-হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশের অধীনে অনুষ্ঠিত দাওরায়ে হাদিসের বিগত পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও প্রকাশ্যে আসেনি প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের পরিচয়। হাইয়াতুল উলয়া থেকে গঠিত প্রশ্নফাঁস বিষয়ক তদন্ত কমিটি এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হচ্ছে না। কমিটি-প্রধান জানিয়েছেন, তদন্তের কাজ চলছে, তদন্ত শেষ হবার আগ অবধি এ বিষয়ে কোনো কিছু বলা যাবে না।

এদিকে কওমি শিক্ষাধারার সঙ্গে জড়িতদের প্রায় সকলেই উন্মুখ হয়ে আছেন, প্রশ্নফাঁসকারীদের পরিচয় ও বিচার প্রক্রিয়া দেখার আশায়। বিশেষ করে দাওরায়ে হাদিসের বিগত পরীক্ষায় বিড়ম্বনার শিকার শিক্ষার্থীরা এদের পরিচয় জনসমক্ষে প্রকাশ করা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় এদেরকে নিয়ে আসার দাবি জানাচ্ছেন।

রাজধানীর ফরিদাবাদ মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিসের বিগত পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী হাসান ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে আমাদের যারপরনাই বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হয়েছিল। তাছাড়া কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারার ঐতিহ্যেও কালিমালেপন হয়েছে ন্যাক্কারজনক এ ঘটনায়। প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসার জন্য হাইআতুল উলয়া যে তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছিল, আমাদের আশা ছিল শিগগির প্রশ্নফাঁসকারীদের পরিচয় আমরা জানতে পারব এবং জাতির সঙ্গে গাদ্দারি করার শাস্তি দেখতে পারব, কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেলেও বিচার তো দূর কি বাত, এখনও এদের পরিচয় জনসমক্ষে প্রকাশ করা হচ্ছে না দেখে আমরা বিস্মিত হচ্ছি।

হাসান আরও বলেন, প্রশ্নফাঁসকারীদের যেন দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হয়, বোর্ড কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের জোর দাবি থাকবে।

রাজধানীর ফরিদাবাদ, লালবাগ, যাত্রাবাড়ি, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, সিলেটের দরগাহ এবং আঙ্গুরা মাদরাসার নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশ্নফাঁস বিড়ম্বনার শিকার আরও অনেক পরীক্ষার্থী ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে এমন দাবি ও ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন। তাঁদের অনেকে এ প্রশ্নও তুলেছেন, তদন্ত দীর্ঘায়িত করে প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদেরকে আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে না তো?

এদিকে প্রশ্নফাঁস তদন্তের কাজ কতদূর এগিয়েছে জানতে চেয়ে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর থেকে হাইআতুল উলয়ার দায়িত্বশীল ও তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট একাধিক নেতার সঙ্গে আজ কথা হয়েছে এ প্রতিবেদকের। তাঁদের কেউই এ বিষয়ে বিশেষ কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি।

হাইআতুল উলয়ার অন্যতম সদস্য ও ফরিদাবাদ মাদরাসার নায়েবে মুহতামিম মুফতি নুরুল আমিনের সঙ্গে কথা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, প্রশ্নফাঁস তদন্ত বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন তদন্ত কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

তিনি বলেন, হাইআর সদ্য বিগত মিটিংয়ে এ বিষয়ে কথা উঠলে তদন্ত কমিটির প্রধান গওহরডাঙ্গা মাদরাসার মুহতামিম মুফতী রুহুল আমীন উপস্থিত বৈঠককে জানিয়েছেন, তদন্তের কাজ এখনও চলমান, প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে কাজ চলছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই বিস্তারিত কিছু বলা যাবে না।

তদন্ত কমিটির সদস্য ও রাজধানীর জামিয়া রাহমানিয়ার মুহতামিম মুফতি মাহফুজুল হকের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি কমিটির প্রধান মুফতী রুহুল আমীনের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। এবং জানান, তদন্তের বিস্তারিত বিষয়ে তিনিই কথা বলবেন।

মুফতী রুহুল আমীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থতার কারণে বিস্তারিত কোনো কিছু বলতে পারেননি এ প্রতিবেদকের কাছে। তবে এটুকু জানিয়েছেন, তদন্ত চলমান আছে, শেষ হলে বিস্তারিত জানানো হবে।

কবে নাগাদ শেষ হতে পারে জানতে চাইলে মুফতী রুহুল আমীন অসুস্থতা জনিত কারণে আর কথা বলতে পারবেন না বলে অপারগতা প্রকাশ করেন।

তবে বিশ্বস্ত ও উঁচু পর্যায়ের একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে বেশ কয়েকটি গ্যাং জড়িত ছিল। এর মধ্য থেকে কয়েকটি গ্যাং সনাক্ত করা গেছে ইতিমধ্যে। তবে এ ব্যাপারে হাইআতুল উলয়া প্রশাসনের সহায়তা নিয়েছে। প্রশাসনের গোয়েন্দা বিভাগই সনাক্ত করেছে এই গ্যাংগুলোকে।

সূত্রটি আরও জানায়, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে উঁচু পর্যায়ের দু-একজন নেতৃস্থানীয়ের ঘনিষ্টজন বা খাদেম পর্যায়ের লোক জড়িত থাকার কারণে ব্যাপারটাকে ধামাচাপা দেওয়ার এবং আভ্যন্তরীণভাবে তাদেরকে ক্ষমা করে দেবার একটা সম্ভাবনাও রয়েছে।

উল্লেখ্য, সম্মিলিত কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড আল-হাইআতুল উলয়া লিলজামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ-এর অধীনে অনুষ্ঠিত এ বছরের দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষায় একাধিকবার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল পরীক্ষার্থীদেরকে। সেই সঙ্গে পেরেশানি ও চাপে পড়েছিল হাইআতুল উলয়া কর্তৃপক্ষও।

প্রশ্নফাঁসের ঘটনা কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারার ইতিহাসে এই প্রথম। সততা আদর্শ ও ঐতিহ্যবাদিতায় আপোষহীন হবার কারণে এ ধারার শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনা কেউ কল্পনাও করতে পারত না। কারণ, এ ধারার শিক্ষাব্যবস্থায় ছাত্রদের পড়াশোনা পরীক্ষা ও রেজাল্ট নির্ভর ছিল না কোনো কালেই, ছাত্ররা পড়ত যোগ্যতা অর্জন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, পরীক্ষা ছিল তাঁদের কাছে কেবলই মেধা যাচাইয়ের একটি মাধ্যম।

অযাচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এ বছর কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসের প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায়, এ ধারার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীরা যেমন মর্মাহত হয়েছেন, তেম্নি হয়েছেন লজ্জিত ও হতবাক।

তবে হাইআতুল উলয়া অন্যান্য শিক্ষাবোর্ডের মতো কোনো ধরনের তালবাহার আশ্রয় নেয়নি। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠামাত্রই সম্মিলিত এ কওমি শিক্ষাবোর্ড সঙ্গে সঙ্গে হয়ে যাওয়া সব পরীক্ষা বাতিল ও পরবর্তী পরীক্ষাগুলো স্থগিত করে নতুনভাবে নতুন প্রশ্নপত্রে আবারও পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করে। দ্বিতীয় বার আবারও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটলে তখনও বোর্ডটি এর দায় স্বীকার করে ফাঁসকৃত প্রশ্নের পরীক্ষা বাতিল করে অভিনব পদ্ধতিতে পরবর্তী পরীক্ষাগুলো গ্রহণ করে। হাইআতুল উলয়ার এ সততা স্বচ্ছতা এবং অভিনবত্ব সর্বমহলে প্রশংসিত হয়।

প্রথম বার প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পরপরই ফরিদপুরের গওহরডাঙ্গা মাদরাসার মুহতামিম মুফতী রুহুল আমীনকে প্রধান করে হাইআতুল উলয়ার উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজন আলেমের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কথা ছিল তদন্ত কমিটি খুব দ্রুত প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদেরকে কঠোর শাস্তির জন্য আইনের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।

কমিটি গঠনের কয়েকদিনের মধ্যে মেশকাতের প্রশ্নফাঁসকারীকে চিহ্নিত করে তাঁর কাছ থেকে লিখিত স্বীকারোক্তি নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিচার করা হবে বলে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর দীর্ঘ তিন মাস পেরিয়ে গেলেও প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত আর কারও নাম প্রকাশ্যে আসেনি, দৃশ্যমান হয়নি তদন্ত কমিটির কোনো কাজও।

আগের সংবাদ১২ আগস্ট পালিত হবে পবিত্র ঈদুল আজহা : বিএএস
পরবর্তি সংবাদইসকনের বিরুদ্ধে করা মামলা খারিজ করে দিলেন মহানগর হাকিম আবু সাঈদ