
মুসান্না মেহবুব
নামাজের পর মসজিদের গেটে ভদ্রগোছের দাড়িওয়ালা এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন। করুণ ভঙ্গিতে সাহায্য চাইছেন বহির্গামী মুসল্লিদের কাছে। দেখতে ভিক্ষুকের মতো লাগছে না, তারপরও হাত পাতছেন তিনি। রাজধানী বা শহরাঞ্চলের মসজিদগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় এমন চিত্র। এঁদের কেউ কেউ নিজেদের নওমুসলিমত্বের প্রমাণ হিসেবে আদালত থেকে আনা এক টুকরো কাগজ সামনে মেলে ধরেন, কেউ কেউ আবার কাগজ-প্রমাণের জরুরত বোধ করেন না। মুসল্লিরা যা পারেন, সাহায্য করেন। কোনো কোনো মুসল্লি আবার সন্দেহের চোখে দেখেন—আসলেই নওমুসলিম, নাকি রুটি-রুজির জন্য নওমুসলিমের ভান ধরেছে?
নওমুসলিমের ভান ধরে এই তরিকায় অনেকে রুটি-রুজির জোগাড় করলেও সত্যিকার নওমুসলিমদের বড় একটি অংশও এইভাবে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করতে বাধ্য হন। সত্যধর্মের প্রতি মুগ্ধ হয়ে তুমুল আগ্রহ নিয়ে ইসলাম কবুলের পর নওমুসলিমদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক—উভয় দিক দিয়েই সংকটে পড়তে হয়। পূর্বধর্ম ত্যাগ করার কারণে একে তো স্বধর্মীয় সমাজে তাঁকে সব দিক দিয়ে বয়কট করা হয়, অন্য দিকে অনেক সময় আপন পরিবার তথা মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনও খেপে যান। কেউ কেউ প্রচণ্ড নির্যাতনের শিকারও হন। তারপরও তাঁরা ইসলামে অবিচল থাকেন, এবং যথাসম্ভব নিজের পরিবার ও সমাজ থেকে পালিয়ে দূরে কোথাও চলে যান, শুরু করেন নতুন জীবন। নতুন এ জীবনে আবারও সংকটের মুখোমুখি হতে হয় তাঁদেরকে। জীবিকার সংকট। বিবাহিতদের অধিকাংশই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। ফলে নিজের জীবিকার পাশাপাশি পরিবারের রুটি-রুজির চিন্তায় তাঁরা বড় একটা পেরেশানির ভেতর দিয়ে যান।
সমাজের অনেকেই নওমুসলিমদেরকে বিক্ষিপ্তভাবে সাময়িক কিছু সাহায্য-সহযোগিতা করেন, কিন্তু স্থায়ী বন্দোবস্তের কোনো উদ্যোগ কিংবা খেয়াল কারও নেই। ফলে নিজেদের উপযোগী কোনো কাজ না পেয়ে অনেক নওমুসলিমকেই হাত পাততে হয় মানুষের দ্বারে দ্বারে।
পাহাড়ি অঞ্চল বা উপজাতীয় জনপদে অমুসলিমদের মধ্যে দাওয়াতি মিশন প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্ত অপ্রতুল হলেও কিছু দাঈ নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন সেই অঞ্চলগুলোতে। আশার চেয়েও বেশি মানুষ সাড়া দিচ্ছে তাঁদের আহ্বানে। এই সমস্ত এলাকার নওমুসলিমদের জীবিকা-নির্বাহ ও কর্মসংস্থান নিয়ে নিতান্ত ক্ষুদ্র হলেও একটা দল চিন্তা করছেন, এবং সাধ্যমাফিক চেষ্টা করছেন, কিন্তু আমাদের সমাজে বা এলাকায় যে সমস্ত লোক ইসলামের আলো গ্রহণ করছেন, তাঁদের সামাজিক সংকট নিরসন এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা কিংবা পুনর্বাসন নিয়ে খুব একটা উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় না। ফলে বাহ্যত এসব লোক ইসলাম গ্রহণ করে যেন বিপদেই পড়েন। একদিকে নিজের চিরপরিচিত সমাজ থেকে বিতাড়িত কিংবা পলায়িত অপরদিকে আর্থিক সমস্যা ও কর্মসংস্থানের অভাব। বাধ্য হয়েই তখন নামতে হয় ভিক্ষাবৃত্তিতে।
এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম অমুসলিমদের মধ্যে দাওয়াতি মেহনতের সাথি ও তরুণ দাঈ আলেম মাওলানা ইমরান হাবিবীর সঙ্গে। মাওলানা ইমরান হাবিবী জানান, ভিক্ষাবৃত্তি বা মসজিদে মসজিদে সাহায্যপ্রার্থনা যাঁরা করেন, তাঁদের অনেকেই রুটি-রুজির জন্য নওমুসলিম সাজেন। তবে নওমুসলিমদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ এ পেশায় আছেন এবং জীবিকার তাগিদে এতে তাঁরা জড়াতে বাধ্য হন উল্লেখ করে ইমরান হাবিবী বলেন, তাঁদের কর্মসংস্থান বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা আমরা যাঁরা দায়িত্বশীল মুসলিম, আমাদের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে তাঁদেরকে সাময়িক সহযোগিতা অনেকেই করেন। আমি মনে করি সাময়িক সহযোগিতার বদলে তাঁদের জন্য যদি স্থায়ী কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতেন, তাহলে রোজগারের একটা বন্দোবস্ত করতে পারলেন তাঁরা। কর্মসংস্থান বলতে, সে যদি কৃষক হয়, একটা গরু বা ছাগল কিনে দিলে, গৃহিণী হলে একটা সেলাই মেশিন কিংবা রিকশা চালাবার উপযোগী হলে একটা রিকশা কিনে দিয়ে তাঁকে যদি আমরা সহযোগিতা করি, তাহলেই তার বড় রকমের উপকার হয়।
মাওলানা ইমরান হাবিবী বলেন, একজনের পক্ষে তো আর এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা অনেক সময়ই সম্ভব হয়ে উঠবে না, এ ক্ষেত্রে কয়েকজন মিলে যদি একজন নওমুসলিমের এভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে নওমুসলিমরা একদিকে যেমন মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাতা থেকে রেহাই পাবে, অপরদিকে ইসলাম গ্রহণের কারণে অভাবের সম্মুখীন হয়েছি—এমন ওয়াসওয়াসা থেকেও তাঁরা মুক্ত থাকবে।
নওমুসলিম যুবক এবং অবিবাহিত হলে যেকোনো মাদরাসায় তাঁকে ভর্তি করিয়ে দেওয়াটাই ভালো। এ ক্ষেত্রে আমাদের মাদরাসাগুলো আশা করি নওমুসলিমদের থাকা-খাওয়া ও আনুষঙ্গিক খরচ যেকোনোভাবে বহন করতে তৎপর থাকবে। এতে করে একদিকে যেমন তার দীন শেখা হবে, অপরদিকে জীবিকার চাহিদাও আপাতত থাকবে না।
পাহাড়ি বা উপজাতীয় জনপদে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরাও রাজধানী বা অন্যান্য এলাকার নওমুসলিমদের দেখভালের যথেষ্ট চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তাদের সাধ্য নিতান্তই সীমিত, তাই অমুসলিমদের মধ্যে দাওয়াতি কার্যক্রম এবং নওমুসলিমদের সেবা, শিক্ষা ও পুনর্বাসনে কওমি তরুণদেরকে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন মাওলানা ইমরান হাবিবী।
